RK NEWZ সোশাল মিডিয়ায় রথযাত্রার শুভেচ্ছা জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মহাপ্রভু জগন্নাথের কাছে সকলের সুস্বাস্থ্য, সুখ ও সমৃদ্ধি কামনা করেন মোদি। অন্যদিকে, দেশ, সমাজ ও মানবজাতির সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। রথের দিন সকালে মা ও স্ত্রীকে নিয়ে ইসকনের হেডকোয়ার্টার মায়াপুরে আসেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ। মায়াপুর চন্দ্রদয় মন্দিরে ভগবানের উদ্দেশে আরতি করেন তিনি। এরপর অংশ নেন গোমাতার পুজোয়। সোশাল মিডিয়া প্রধানমন্ত্রী লেখেন, “পবিত্র রথযাত্রা উপলক্ষে সকলকে জানাই শুভেচ্ছা। এই উৎসব ভারতের শাশ্বত আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। রথযাত্রার সঙ্গে জড়িত রীতিনীতি ভারত তথা বিশ্বজুড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে এসেছে। এই উৎসব বিনম্রতা, সম্মিলিত অংশগ্রহণ এবং নিঃস্বার্থ সেবার আদর্শকে অনুপ্রাণিত করে। মহাপ্রভু জগন্নাথ সকলকে সুস্বাস্থ্য, সুখ ও সমৃদ্ধি দিক।” মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সোশাল মিডিয়ায় লেখেন, “শুভ রথযাত্রার পবিত্র তিথিতে শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেব, শ্রীশ্রী বলভদ্র দেব ও মাতা সুভদ্রা দেবীর চরণে জানাই শতকোটি প্রণাম। প্রভুর অশেষ কৃপায় সকলের জীবন সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ হোক। তাঁর আশীর্বাদে আমাদের দেশ, সমাজ ও মানবজাতির সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল ও কল্যাণ সাধিত হোক এই প্রার্থনা করি। পবিত্র রথযাত্রা উপলক্ষে সকলকে জানাই আন্তরিক প্রীতি, শুভেচ্ছা ও শুভকামনা। জয় জগন্নাথ” অন্যদিকে, রথযাত্রার দিন সকালে মা ও স্ত্রীকে নিয়ে মায়াপুরে আসেন দিলীপ ঘোষ। আরতির পর গোসেবা করেন তিনি। নিজের হাতে গোমাতাকে খাবার খাওয়ান। তারপর গোমাতার পা ধুয়ে দেন। অংশ নেন যজ্ঞানুষ্ঠানেও। স্ত্রী’কে নিয়ে রথের সকালে যজ্ঞাহুতিও দেন। দিলীপ জানান, ইসকনের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের রথযাত্রায় অংশ নিতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত এবং খুশি। এদিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “তৃণমূলের জন্য বিজেপির দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মশা, মাছি পর্যন্ত আর ঢুকতে পারবে না।” মদন মিত্রের শিবির বদলের প্রসঙ্গে তিনি জানান, এটা তৃণমূলের অভ্যন্তরীন বিষয়, এবিষয়ে তিনি কিছু বলতে চান না।
রথযাত্রাকে ঘিরে যখন পুরীর পথে লাখো ভক্তের ঢল নামার অপেক্ষা, ঠিক তখনই কোভিড-১৯ নিয়ে বাড়তি সতর্কতার পথে হাঁটল ওড়িশা সরকার। প্রতিবেশী অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুতে সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে রথযাত্রার আগে রাজ্যজুড়ে নজরদারি, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং সমাগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও সজাগ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য একটাই, ভিড়ের মধ্যে যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। তবে রথযাত্রার মতো বিশাল জনসমাগমে শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস দ্রুত ছড়ানোর আশঙ্কা থেকেই যায়। তাই এবার উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উপরও জোর দিচ্ছে প্রশাসন। রথযাত্রার প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী মুকেশ মহালিংয়ের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। সেখানে জেলার কোভিড পরিস্থিতির উপর নজরদারি বাড়ানো, সম্ভাব্য সংক্রমণ মোকাবিলায় হাসপাতালগুলিকে প্রস্তুত রাখা, পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করা এবং রথযাত্রার সময় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিডকে আর বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যে জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে না দেখলেও ভাইরাসটি এখনও পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। রথযাত্রার মতো উৎসবে একসঙ্গে বিপুল মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘ দূরত্বের যাতায়াত, ভিড়ের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান এবং বিভিন্ন রাজ্য ও বিদেশ থেকে আগত মানুষের মেলামেশা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক, ক্রনিক ডিজিজে ভোগা ব্যক্তি এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কারা বেশি সতর্ক থাকবেন? ৬০ বছরের বেশি বয়সিরা। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগে আক্রান্তরা। ক্যানসার রোগী বা যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। গর্ভবতী মহিলারা সম্প্রতি অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিরা। রথযাত্রায় যাওয়ার আগে জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে ভিড় এড়িয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। শুধু পুরীর রথযাত্রা নয়, যে কোনও ভিড় বা জনসমাগমে অংশ নিলে কয়েকটি সাধারণ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। নিয়মিত হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজার ব্যবহার, ভিড় বা বদ্ধ জায়গায় মাস্ক পরা, কাশি-হাঁচির সময় মুখ-নাক ঢেকে রাখা, অসুস্থ ব্যক্তির কাছাকাছি না যাওয়া, পর্যাপ্ত জল পান করা এবং অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা জরুরি। রথযাত্রা শেষে অসুস্থ বোধ করলে দেরি না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। যাঁদের কোভিড ভ্যাকসিন বা বুস্টার নেওয়ার সময় হয়েছে, তাঁদের তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ওড়িশা সরকারের এই উদ্যোগ মূলত আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। রাজ্যে বড় ধরনের কোভিড সংক্রমণের ইঙ্গিত নয়, বরং প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতে সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে আরও মজবুত করার প্রচেষ্টা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি এবং সময়মতো চিকিৎসা নিলেই নিরাপদে রথযাত্রার আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব।
জগন্নাথদেবের মহাপ্রাসাদে থাকে ‘টঙ্কা তোরানি’, প্রবল গরমে শরীর ঠান্ডা রাখে টক-ঝাল এই পানীয়। গরমে তেতেপুড়ে ভক্ত এসেছে ভগবানের দোরে। তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে ছাতি। এমন অবস্থায় ভক্তের প্রাণ জুড়াতে পারে কেবল প্রসাদই। তাই তো জগন্নাথদেবের প্রসাদের তালিকায় রয়েছে এমন এক পানীয়, যা পান করলে নিমেষে শান্ত হয় দেহ-মন। পথের ক্লান্তি ভুলে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিতে দুই হাত জড় হয়ে আসে ভক্তের। মনে করা হয়, হাজার বছর ধরে জগন্নাথদেবের ভোগের মধ্যে এই পানীয় প্রদান করার চল রয়েছে। ছাপান্ন ভোগে যে ভাত দেওয়া হয় ইশ্বরকে, তা থেকেই কিছুটা তুলে নিয়ে, জলে দীর্ঘ সময় ভিজিয়ে রেখে তৈরি হয় এই পানীয়। এত বছর পার করেও তার তৈরির পদ্ধতিতে কোনও বদল আসেনি। তবে তা নির্দ্বিধায় পান করতে পারেন সেখানের জনসাধারণও। ওড়িশার এই পানীয়র নাম ‘টঙ্কা তোরানি’। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের মহাপ্রসাদ হিসেবে তো বটেই, রথযাত্রার সময়েও পান করা হয় এটি। মানুষ চাইলে গ্রীষ্মের প্রবল দাবদাহের সঙ্গে যুঝতে, বাড়িতেও বানিয়ে পান করতে পারেন। চলতি শরবতের মতো চিনি বা মিষ্টির নামগন্ধ নেই এতে। বরং স্বাদে ঝাল-টকের আধিক্যই পাওয়া যায়। ‘টঙ্কা তোরানি’ শরীরকে ডিহাইড্রেটেড হতে দেয় না। টক্সিনমুক্ত হতে সাহায্য করে। তাছাড়া জারণ করে তৈরি হয় বলে এতে প্রোবায়োটিক থাকে, যা হজমে সাহায্য করে। ‘টঙ্কা তোরানি’ তৈরির জন্য প্রয়োজন। সেদ্ধ ভাত (এক কাপ)। টক দই (৩ টেবিলচামচ)। আমআদা (এক ইঞ্চি মাপের খণ্ড)। লেবুপাতা (১০টি)। কারিপাতা (১২-১৫টি)। কাঁচালঙ্কা (৫টা)। পাতিলেবু। কাগজিলেবু। ভাজা জিরে গুঁড়ো। লবণ। পানীয় জল। সেদ্ধ ভাত জলে ভিজিয়ে রাখুন প্রায় ২৪ ঘণ্টা। পাত্রটি চাপা দিয়ে রেখে দিন কোনও এক ঠান্ডা কোণে। তারপর পরিষ্কার হাতে জারিত হওয়া ভাত আর জল একসঙ্গে চটকে মেখে ফেলুন। তাতে মেশান টক দই, অর্ধেকখানা পাতিলেবুর রস, ভাজা জিরে গুঁড়ো। কাগজিলেবু গোল গোল ফালি করে কেটে, দিয়ে দিন এর মধ্যে। অন্যদিকে শিলনোড়া বা হামানদিস্তায় একসঙ্গে থেঁতলে নিতে হবে আমআদা, লঙ্কা, লেবুপাতা ও কারিপাতা। ভাতের মিশ্রণটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে এই থেঁতলানো মশলাও। এরপর একদিকে হাতে করে সমস্ত মিশ্রণ চটকাতে থাকুন, অন্যদিকে জল ঢালতে থাকুন তাতে। মিশ্রণ জলের ভিতর ডেলা বেঁধে থেকে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তৈরি হয়ে গেলে, জগন্নাথদেবের উদ্দেশে নিবেদন করুন। তারপর পান করুন স্বচ্ছন্দে।
বাংলার ঐতিহ্যের রথে সওয়ার নানা রূপে জগন্নাথ। প্রাচীনত্ব ও ঐতিহ্যের নিরিখে রথযাত্রা বললেই প্রথমেই নাম আসে পুরীর। পশ্চিমবঙ্গে সেই বিচারে হুগলির মাহেশের রথের স্থান সম্ভবত সর্বাগ্রে। ৬২৫ বছরের পুরনো এখানকার রথযাত্রা। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাধারাণী’ উপন্যাসেও মাহেশের রথের মেলার উল্লেখ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রা প্রাচীনত্ব ও ঐতিহ্যের নিরিখে সর্বপ্রথম নাম আসে হুগলির মাহেশের। ছ’শো বছরের পুরনো এই রথযাত্রাকে ঘিরে শুরু হওয়া মেলা এখনও বসে। তবে মাহেশ শুধু নয়, বঙ্গের নানা প্রান্তেই রথের সঙ্গে রয়েছে নানা কাহিনি। এমন রথও আছে, যেখানে জগন্নাথ সওয়ার নানা রূপে। মাহেশে এখন যে রথ টানা হয়, সেটি চার তলবিশিষ্ট লোহার রথ। উচ্চতা ৫০ ফুট। ১২টি লোহার চাকা। রথের প্রথম তলে চৈতন্যলীলা, দ্বিতীয় তলে কৃষ্ণলীলা এবং তৃতীয় তলে রামলীলা চিত্রিত রয়েছে। চার তলায় বিগ্রহ বসানো হয়। তামার দু’টি ঘোড়া রথের সামনে লাগানো হয়। কাঠের তৈরি সারথিও থাকে। প্রাচীনত্ব এবং ঐতিহ্যের বিচারে মাহেশের রথযাত্রা ভক্তমহলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলেও, এই রাজ্যের জেলায় জেলায় রথযাত্রা হয়। সেই সব রথের ইতিহাসও বেশ পুরনো। এমন রথও হয় যেখানে রথে আসীন হন রঘুনাথ, মদনমোহন। কোথাও আবার রথযাত্রাকে ঘিরে মজার রীতিরও প্রচলন রয়েছে। এমন রথ কোথায় হয়?
শান্তিপুরের রথ — রাস, ঝুলন কিংবা জন্মাষ্টমীর মতোই শান্তিপুরের রথযাত্রার ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। তবে শান্তিপুরের রথে আসীন হন গোস্বামীবাড়িগুলির মূলদেবতা রঘুনাথ। এটি আসলে রামচন্দ্রের দারুমূর্তি। ধূতি পরিহিত পদ্মাসনে আসীন তিনি। গায়ের রং সবুজ। পাশে থাকে জগন্নাথের বিগ্রহ। প্রায় আড়াইশো বছরেরও বেশি পুরনো বড়গোস্বামী বাড়ির রথযাত্রা। একসময় জগন্নাথের বিগ্রহের পাশাপাশি রঘুনাথের কাঠের বিগ্রহ রথে তোলার প্রচলন হয়। কালক্রমে রঘুনাথই হয়ে ওঠেন রথের মূল আকর্ষণ। রথের সময় নানা রকমের ভোগের প্রচলন আছে। যেমন উল্টোরথের আগের দিন আষাঢ নবমীতে রাতে ‘দেওড়াভোগ’ দেওয়া হয়। এতে কলমিশাক-সহ থাকে নিরামিষ হরেক পদ, যেমন সাদা ভাত, খিচুড়ি, তরকারি, দই, পায়েস, ভাজা। রথযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে মেলা। শান্তিপুরে মূলত দু’টি রথের মেলা বসে। একটি বড়গোস্বামী বাড়ি সংলগ্ন মাঠে, অন্যটি রথতলায়। শিয়ালদহ থেকে শান্তিপুর লোকাল ধরে পৌঁছতে পারেন। স্টেশন থেকে টোটো পাওয়া যাবে। কলকাতা বা যে কোনও জায়গা থেকেই সড়কপথেও শান্তিপুর যাওয়া যায়।
কোচবিহারের রথ — কোচবিহারের রথযাত্রা হয় মদনমোহনকে কেন্দ্র করে। ১৮৯০ সালে শুরু হয় এই রথযাত্রা। রীতি মেনে রথযাত্রার আগের দিন হয় অধিবাস। সুগন্ধি তেল মাখিয়ে চলে মদনমোহনের অঙ্গরাগ পর্ব। পরদিন থাকে মদনমোহনের মহাস্নান। রথযাত্রার দিন মূল মন্দিরের পশ্চিম দিকে অন্য একটি মন্দিরে স্থানান্তরিত করা হয় মদনমোহনকে। মদনমোহনের রথের উচ্চতা ২২ ফুট। ছ’টি চাকা। সামনে দু’টি রুপোর ঘোড়া। সারথিরা কাঠের। মন্দিরেই ফি বছর ৪০ কেজি পাট দিয়ে তৈরি হয় রথের রশি। রথে শহর পরিক্রমা করে মদনমোহন মাসির বাড়ি ‘গুঞ্জবাড়ি’তে সাত দিন থাকেন। উল্টোরথের শেষে মন্দিরে ফিরে এলে মদনমোহনকে বারান্দায় রাখা হয়। ঠাকুর বিশ্রাম নেন। ‘ঠাকুরের হাওয়া খাওয়া’ নামে এই রীতিটি প্রচলিত। এই সময় তাঁকে বিশেষ ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয় শুধুই রসগোল্লা। পরে সিংহাসনে গিয়ে বসেন তিনি।
গুপ্তিপাড়ার রথ — গুপ্তিপাড়ার রথ ‘বৃন্দাবন জিউ’-র রথ নামেও পরিচিত। হুগলির বলাগড় থানা এলাকায় বর্ধমান জেলার সীমানায় রয়েছে বর্ধিষ্ণু এই জনপদ। গুপ্তিপাড়ার রথ ও রথের মেলার খ্যাতি বহু দিনের। ২৮৫ বছরের পুরনো রথযাত্রায় ৯ চূড়ার রথ টানা হয়। প্রতিটি চূড়াতেই থাকে রঙিন ধ্বজা। বৃন্দাবন মন্দির থেকে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা যান প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গোঁসাইগঞ্জ-বড়বাজারে মাসির বাড়ি। গুপ্তিপাড়ার রথের বিশেষত্ব হল ভান্ডার লুট। উল্টোরথের দিন মাসির বাড়ির মন্দিরের তিনটি দরজা একসঙ্গে খোলা হয়। ভিতরে মালসায় থাকে রকমারি খাবার। সেই ভোগপ্রসাদের জন্যেই হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। ৫২টি পদের প্রচুর মালসা থাকে। পুণ্যার্থীরা সেখানে ঢুকে যা প্রসাদ পান, তুলে নেন। হাওড়া থেকে কাটোয়া লোকালে করে নামুন গুপ্তিপাড়া স্টেশনে। সড়কপথেও যেতে পারেন। কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় ৯৪ কিলোমিটার।
৩৬১ বছরের ঐতিহ্য! জগন্নাথ নন, মাধবগঞ্জে পিতলের রথে আসীন রাধামদন গোপাল। পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সঙ্গে সাদৃশ্য থাকলেও বিষ্ণুপুরের মাধবগঞ্জের রথযাত্রার পরিচয় একেবারেই স্বতন্ত্র। এখানে রথে আরোহন করেন না জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। মল্লরাজাদের আমল থেকে ৩৬১ বছর ধরে একই নিয়মে পিতলের ঐতিহ্যবাহী রথে বিরাজ করেন শ্রীশ্রী রাধামদন গোপাল ঠাকুর জিউ। এখানে জগন্নাথ কৃষ্ণ রূপে পূজিত হন। শতাব্দীপ্রাচীন সেই পরম্পরা অক্ষুণ্ণ রেখেই বৃহস্পতিবার ভোরে শুরু হল মাধবগঞ্জ ১১ পাড়া রথযাত্রা উৎসব। ভোর থেকেই হরিনাম সংকীর্তন, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ‘জয় গোপাল’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। রথের রশিতে টান দিতে ভিড় জমান হাজার হাজার ভক্ত ও পুণ্যার্থী। ইতিহাস অনুযায়ী, ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে মল্লরাজাদের সময় রানি শিরোমণি দেবীর ইচ্ছায় মাধবগঞ্জে নির্মিত হয় পাথরের পাঁচচূড়া মন্দির। সেই মন্দিরেই প্রতিষ্ঠিত হন শ্রীশ্রী রাধামদন গোপাল ঠাকুর জিউ। একই সময়ে তৈরি হয় পিতলের সুদৃশ্য রথ। তারপর থেকে একদিনের জন্যও রীতির পরিবর্তন হয়নি। প্রতি বছর রথযাত্রার দিন সকালে নির্দিষ্ট শুভক্ষণে মন্দির থেকে হরিনাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে বিগ্রহকে রথে আনা হয়। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে পূজা, আরতি ও মাঙ্গলিক আচার সম্পন্ন হওয়ার পর সাধারণ মানুষরাও রথের রশিতে টান দেন। সকাল ৫টা ২০ মিনিটে মন্দির থেকে শুরু হয় শোভাযাত্রা। খোল, করতাল, মৃদঙ্গ ও কীর্তনের সুরে রাধামদন গোপাল ঠাকুরকে পিতলের রথে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর শুরু হয় রথ টানা। বিষ্ণুপুর শহরের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন প্রান্ত এবং পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও অসংখ্য মানুষ এই ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রায় যোগ দেন।
মাধবগঞ্জ ১১ পাড়া রথযাত্রা ষোলআনা কমিটির সম্পাদক দীপক দে বলেন, “৩৬১ বছরের এই রথ উৎসব বিষ্ণুপুরবাসীর আবেগ ও গর্ব। সারা বছর মানুষ এই দিনের অপেক্ষায় থাকেন। সোজা রথ থেকে উলটো রথ পর্যন্ত ৯ দিন ধরে পূজা, ভোগ, মহাপ্রসাদ ও নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে। প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজারেরও বেশি মানুষ রাজভোগ গ্রহণ করেন। এই কয়েকদিনে গোটা মাধবগঞ্জ উৎসবের আবহে মেতে ওঠে।” স্থানীয় ভক্ত মধুমিতা রক্ষিত, কৃষ্ণা দে ও মধুমতি পালদের কথায়, “আমাদের কাছে এই রথ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, পারিবারিক মিলনমেলা। সারা বছর এই দিনের অপেক্ষায় থাকি। দুর্গাপুজোর ৪ দিনের থেকেও এই ৯ দিনের আনন্দ আমাদের কাছে বেশি। বহু দূর থেকে আত্মীয়-স্বজন বাড়িতে চলে আসেন। প্রতিদিন মহাপ্রসাদ বিতরণ হয়, চারদিকে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।” মদনগোপাল মন্দিরের পুরোহিত বলরাম চট্টোপাধ্যায় জানান, “দ্বিতীয়া তিথি, অমৃতযোগ ও মহেন্দ্রযোগ মেনে শতাব্দীপ্রাচীন বিধি অনুসারেই রথযাত্রা শুরু হয়। এখানে জগন্নাথ কৃষ্ণ রূপে পূজিত হন। আমাদের পূর্বপুরুষরা যে নিয়মে পূজা করে গিয়েছেন, আজও সেই নিয়মের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। সোজা রথ থেকে উলটো রথ পর্যন্ত প্রতিদিন বিশেষ রাজভোগ, মহাপ্রসাদ ও ধর্মীয় আচার পালিত হয়।” মন্দির নগরী বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্যের অন্যতম পরিচয় এই রথযাত্রা। পিতলের শতাব্দীপ্রাচীন রথ, রাধামদন গোপাল ঠাকুরের আরাধনা, হাজারো ভক্তের সমাগম এবং ৯ দিনব্যাপী ধর্মীয় উৎসব আজও মল্লভূমের ইতিহাস ও সংস্কৃতির জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
রথযাত্রার সাক্ষী থাকতে চলেছে কলকাতা শহর। কলকাতার ট্রামপ্রেমীদের উদ্যোগে এদিন ট্রামে চড়ে শহর ঘুরবেন জগন্নাথ-বলরাম-শুভদ্রা। এর জন্য দু’কামরার একটি ট্রামকে রথের মতো করে সাজিয়ে তোলা হবে। ভিতরে থাকবেন তিন ভাইবোন। থাকবে ছোট রথও। ট্রামটি সাজানো হবে জগন্নাথদেবের বিভিন্ন ছবি দিয়ে। গড়িয়াহাট থেকে ছেড়ে এসপ্ল্যানেড হয়ে ট্রামটি যাবে শ্যামবাজার পর্যন্ত। ভিতরেই হবে পুজো। যেমনভাবে রথ সাজানো হয় তেমনভাবেই সাজবে ট্রাম। রথ উপলক্ষে এই বিশেষ আয়োজন করছে ট্রামযাত্রা ও ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশন। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, জগন্নাথদেবের রথের আদলে সাজানো বিশেষ এই ট্রামটি সকাল ১০টা ৩০ নাগাদ গড়িয়াহাট থেকে ছাড়বে। এরপর এসপ্ল্যানেড হয়ে শ্যামবাজার টার্মিনাস পর্যন্ত চলবে। আয়োজকদের দাবি, কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ট্রামকে মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলা এবং শহরের ঐতিহ্য রক্ষার বার্তা দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত তিন দশক ধরে ট্রাম সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে তাঁরা কাজ করে চলেছেন। রাজ্য সরকারের ট্রাম পরিষেবা পুনরুজ্জীবনের আশ্বাসকেও স্বাগত জানিয়েছে এই সংগঠনের সদস্যরা। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত, পরিবহণ ও শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিংহ, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়-সহ বহু বিশিষ্টজনের। সংগঠনের সদস্যরা জানাচ্ছেন, আগের সরকারের আমলে ট্রামকে কার্যত তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তাঁরাই ট্রাম বাঁচিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তবে নতুন সরকার আসার পর ট্রামকে ফিরিয়ে আনার জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা প্রসংশনীয়। তাঁদের বক্তব্য, নতুন চেহারায় ট্রামকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন পরিবহণমন্ত্রী। বিদেশি ধাঁচে ট্রাম চলবে। তাতে আমরা আশাবাদী। ট্রাম কলকাতার ঐতিহ্য। এটার সঙ্গে শহরবাসীর আবেগ জড়িয়ে আছে। একে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। সংগঠনের তরফে মহাদেব শী বলেন, ‘‘শহরে ট্রাম চালানোর লড়াই আমাদের দীর্ঘদিনের। নতুন সরকার আমাদের দাবি মেনে নতুনভাবে ট্রামকে ফিরিয়ে আনছে। আমরা খুব খুশি।’’




