Monday, July 13, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

রাজ্যে চালু গুন্ডা দমন আইন!‌ নতুন আইনে ‘গুন্ডা’ বা ‘সমাজবিরোধী’ শব্দের সংজ্ঞা ও পরিধি অনেকটাই বিস্তৃত

RK NEWZ ১৫ বছরের তৃণমূল জমানায় পশ্চিমবঙ্গে বারবার সমাজবিরোধীদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। থানায় ঢুকে দুষ্কৃতী ছাড়িয়ে আনা থেকে শুরু করে খোদ পুলিশকর্মীদের উপর হামলার ঘটনাও রাজ্যবাসী দেখেছে। এই আইনশৃঙ্খলার অবনতিকে হাতিয়ার করেই বিধানসভায় কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সমাজবিরোধী কার্যকলাপ এবং সংগঠিত অপরাধের বাড়বাড়ন্ত রুখতে এবার কোমর বেঁধে নামল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সোমবার থেকেই রাজ্যজুড়ে কার্যকর হয়ে গেল বহু চর্চিত ‘গুন্ডাদমন আইন’। গত শুক্রবারই বারুইপুরে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই কড়া আইন বলবৎ করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। নবান্ন সূত্রে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও মজবুত করতে এবং দুষ্কৃতীদের মনে ভয় তৈরি করতেই এই কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই নতুন আইন চালুর ফলে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের হাতে অপরাধ দমনের ক্ষমতা অনেকটাই বেড়ে গেল।

কেন এই কড়া পদক্ষেপ?

গত ১৫ বছরের তৃণমূল জমানায় পশ্চিমবঙ্গে বারবার সমাজবিরোধীদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। থানায় ঢুকে দুষ্কৃতী ছাড়িয়ে আনা থেকে শুরু করে খোদ পুলিশকর্মীদের উপর হামলার ঘটনাও রাজ্যবাসী দেখেছে। এই আইনশৃঙ্খলার অবনতিকে হাতিয়ার করেই বিধানসভায় কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংস, দাঙ্গা, বেআইনি সমাবেশ বা হিংসাত্মক বিক্ষোভের মাধ্যমে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নষ্ট করা হলে এক ইঞ্চিও রেয়াত করা হবে না।

কোন কোন ক্ষেত্রে সরাসরি গ্রেফতার করতে পারবে পুলিশ?

রাজ্যে সম্পত্তি ধ্বংস, দাঙ্গা এবং উগ্র-ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের অবসান ঘটাতে বিধানসভায় দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করেছে নতুন সরকার। নতুন এই আইন অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলার গুরুতর অবনতি বা হিংসাত্মক বিক্ষোভের সামান্য আঁচ পেলেই অর্থাৎ কোনও অপরাধমূলক ঘটনা ঘটার আগেই, সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তকে পুলিশ সরাসরি গ্রেফতার বা আটক করতে পারবে।

‘সমাজবিরোধী কার্যকলাপ’ ও ‘গুন্ডা’ কারা?

এই বিলে অপরাধ ও অপরাধীদের পরিধি স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। বিল অনুযায়ী, যে সমস্ত কাজ সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, ভয় বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে এবং জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি করবে, তা ‘সমাজবিরোধী কার্যকলাপ’ হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ, বালি-পাথর-খনি বা বনজ সম্পদের বেআইনি কারবার যা সরকারি কোষাগারের ক্ষতি করে, তাও এই আইনের আওতায় আসবে।

বিলে ‘গুন্ডা’ শব্দটিরও আইনি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। কোনও ব্যক্তি যদি এককভাবে বা কোনও গ্যাং বা সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে নিয়মিত এই ধরণের অপরাধমূলক কাজে যুক্ত থাকেন, তবে তিনি গুন্ডা হিসেবে চিহ্নিত হবেন। এছাড়া ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩’-এর ১১১ বা ১১২ নম্বর ধারায় চার্জশিটভুক্ত ব্যক্তি, অস্ত্র আইন, মাদক আইন, বিস্ফোরক আইন বা নারী পাচার প্রতিরোধ আইনে অপরাধী বা অপরাধে মদতদাতারাও এই আইনের কোপে পড়বেন।

আইন অনুযায়ী অপরাধীদের দমনে নেওয়া হচ্ছে চরম পদক্ষেপ:

পুলিশ সুপারের নীচে নন, এমন পদমর্যাদার কোনও অফিসারের রিপোর্টের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার যদি সন্তুষ্ট হয় যে কোনও গুন্ডাকে আটক করা প্রয়োজন, তবে তাকে সরাসরি আটক করা যাবে। হিংসাত্মক ঘটনায় যেকোনও সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি নষ্টের ক্ষেত্রে, এবার থেকে অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা থাকবে সরকারের হাতে। নবান্নের এই নতুন আইন রাজ্যের অপরাধ দমনে কতটা কার্যকরী হয়, এখন সেটাই দেখার।

নতুন এই আইনের রূপরেখা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, অপরাধদমনে প্রশাসনকে এমন কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনের প্রধান দিক হল, বিনা বিচারে ১ বছর পর্যন্ত আটক ও এলাকাছাড়া করার ক্ষমতা। ‘প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন’ বা নিবর্তনমূলক আটকের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী, প্রশাসন যদি মনে করে, কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি জননিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন কিংবা কোনও বড়সড় সমাজবিরোধী অপরাধের চক্রান্ত করছেন, তবে অপরাধ ঘটানোর আগেই তাঁকে বিনা বিচারে সর্বোচ্চ ১২ মাস অর্থাৎ ১ বছর পর্যন্ত আটকে রাখা যাবে। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ একে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘জাতীয় নিরাপত্তা আইন’-এর (এনএসএ)-এর সমকক্ষ বলে মনে করছেন। যুক্ত হয়েছে ‘এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার’ বা এলাকাছাড়া করার ক্ষমতা। জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার বা ডিআইজি পদমর্যাদার আধিকারিকেরা যদি নিশ্চিত হন যে, কোনও দাগী অপরাধী বা গুন্ডা নির্দিষ্ট এলাকায় থাকলে অশান্তি ছড়াতে পারে, তবে সেই অপরাধীকে অনধিক এক বছরের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা বা সমগ্র জেলা থেকে ‘বহিষ্কার’-এর নির্দেশ দিতে পারবেন। নয়া এই আইনে জামিন-অযোগ্য ধারা ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সংস্থানও রাখা হয়েছে। আইনটিকে আরও নিশ্ছিদ্র করতে এর আওতাধীন সমস্ত অপরাধকে সম্পূর্ণ ভাবে জামিন-অযোগ্য করা হয়েছে। এর ফলে পুলিশ কোনও পরোয়ানা ছাড়াই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারবে এবং আদালত থেকে সহজে জামিন পাওয়া অপরাধীদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। শুধু তা-ই নয়, কোনও ব্যক্তি সমাজবিরোধী বা সিন্ডিকেটের মতো সংগঠিত অপরাধের মাধ্যমে যদি কোনও সম্পত্তি বা টাকা উপার্জন করেন, তবে সেই সম্পত্তি সরাসরি বাজেয়াপ্ত করার আইনি অধিকারও দেওয়া হয়েছে প্রশাসনকে। নতুন আইনে ‘গুন্ডা’ বা ‘সমাজবিরোধী’ শব্দের সংজ্ঞা ও পরিধি অনেকটাই বিস্তৃত করা হয়েছে। প্রশাসন সূত্রে খবর, নিম্নলিখিত অপরাধগুলিকে এই আইনের আওতায় কঠোর ভাবে দমন করা হবে। সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, সিন্ডিকেটরাজ, তোলাবাজি এবং গায়ের জোরে সাধারণ মানুষের জমি বা বাড়ি দখল করা, বেআইনি ভাবে নদী থেকে বালি তোলা, অবৈধ খনি কারবারকে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে গণ্য করা হবে। সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ব্যবসা-বাণিজ্য বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা দেওয়াও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ বলে ধরা হবে। পাশাপাশি আধুনিক যুগের সাইবার অপরাধ এবং বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতিকেও এই আওতায় আনা হয়েছে। আন্দোলন বা ক্ষোভ-বিক্ষোভের নামে সরকারি এবং বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের প্রবণতা রুখতেও এই আইনে কড়া বিধান রয়েছে। ট্রেন-বাস পোড়ানো, সরকারি ভবনে ভাঙচুর বা পুলিশের উপর হামলার ঘটনা ঠেকাতে এই আইনের পাশাপাশি কার্যকর হচ্ছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। এর অধীনে একটি বিশেষ ‘ক্লেম কমিশন’ গঠন করা হবে। কোনও দাঙ্গা, বিক্ষোভ বা হিংসাত্মক আন্দোলনের জেরে যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হবে, তার সম্পূর্ণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ চিহ্নিত অভিযুক্তদের থেকে উশুল করবে এই কমিশন। বিল পাশের সময় শুভেন্দু বলেছিলেন, ‘‘২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সিএএ-কে এনআরসি হিসেবে প্রচার করে যে আন্দোলন হয়েছিল, তাতে মুর্শিদাবাদে থানায় আক্রমণ করা হয়। ট্রেনের উপর হামলা হয়েছিল, ভাঙচুর করা হয়েছিল রেলওয়ে স্টেশন। সরকারি সম্পত্তি ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আমি সেই সময়ে পরিবহণমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলাম। সে সময়ে ২০টি সরকারি বাস পুড়িয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু কিছুই করতে পারিনি।’’ রাজনৈতিক মহলের একাংশের ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং উপযুক্ত আইনের অভাবেই এই সব কাণ্ড ঘটে গিয়েছিল রাজ্যে। তাই তাঁর জমানায় সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনা রুখতে এবং তেমনটা হলে ক্ষতিপূরণ আদায় করতেই আগাম সতর্কতামূলক এই আইন কার্যকর করেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles