Saturday, June 27, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ববিকে গ্রেফতারের দাবি বিজেপির মজদুর সেলের!‌ তারাতলা বিপর্যয়ে ফিরহাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের!

RK NEWZ কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হল। কলকাতা পুরনিগমের দুই কাউন্সিলর আনোয়ার খান এবং শামস ইকবালের বিরুদ্ধেও তারাতলা থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে ভারতীয় জনতা পার্টির শ্রমিক সংগঠন ‘ভারতীয় জনতা মজদুর সেল’। তারাতলা থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে ভারতীয় জনতা পার্টির শ্রমিক সংগঠন ‘ভারতীয় জনতা মজদুর সেল’।

তারাতলা থানায় দায়ের করা অভিযোগে মূলত চারটি সুনির্দিষ্ট দাবি সামনে রেখেছে ভারতীয় জনতা মজদুর সেল:

প্রাক্তন মেয়র ও কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে এফআইআর দায়ের করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত শুরু করতে হবে। এই বেআইনি নির্মাণ এবং বহুতল ধসের জেরে এতগুলি শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী সমস্ত নেপথ্য কারিগরকে চিহ্নিত করতে হবে। প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম, ৮০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনোয়ার খান এবং ১৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শামস ইকবালকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইন অনুযায়ী কঠোরতম ব্যবস্থা নিতে হবে। ওই এলাকায় থাকা এই ধরনের অন্যান্য সমস্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বেআইনি নির্মাণগুলি দ্রুত পরিদর্শন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
অন্যদিকে, তারাতলার ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে মৃত্যুর মিছিল যেন থামতেই চাইছে না। শুক্রবার রাত পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭। সর্বশেষ মৃত্যুর খবরটি এসেছে ৩৮ বছর বয়সী যুবক খালেক সরদারের। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীর বাসিন্দা ওই যুবক দুর্ঘটনার পর থেকেই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার সেন্টারের ‘রেড জোনে’ চিকিৎসাধীন ছিলেন। তারাতলার ভেঙে পড়া গুদামটির নকশায় চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যেই বড়সড় প্রশ্ন তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিধানসভার ভেতরেই মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন যে, ওই গুদামের নকশাটি সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং তাতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিলেন তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। সরকারি নথির খতিয়ান বলছে, গত বছরের ২০ নভেম্বর মিউনিসিপ্যাল বিল্ডিং কমিটির বৈঠকে এই গুদামের নকশাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। সেই মিটিং নোটে আধিকারিকরা মন্তব্য করেছিলেন যে, নকশায় বিল্ডিং রুল বা নির্মাণ বিধি ‘সেই অর্থে’ ভাঙা হয়নি। তবে একই সঙ্গে নোটে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, বিল্ডিং বিভাগের মেয়র পারিষদ অথবা মেয়রের বিশেষ অনুমতি ছাড়া এই ছাড়পত্র কার্যকর করা যাবে না। যেহেতু ফিরহাদ হাকিম একাধারে মেয়র এবং বিল্ডিং বিভাগের মূল দায়িত্বে ছিলেন, তাই তিনি নিজেই সেই মিটিং নোটে সই করে প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।

এর পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন বাড়িয়েছে ধৃতদের সঙ্গে প্রাক্তন মেয়রের ঘনিষ্ঠতার ছবি। যে গোডাউনটি ভেঙে পড়েছে, সেটি তৈরির মূল দায়িত্বে ছিলেন আসগর হোসেন নামে এক ব্যক্তি। জানা গিয়েছে, এই আসগর সংশ্লিষ্ট ৮০ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর আনোয়ার খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আনোয়ার এবং আসগর— দুজনের সঙ্গেই ফিরহাদ হাকিমের একাধিক ছবিও ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে, যা তাঁদের গভীর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিকেই ইঙ্গিত করছে। এই বিতর্কের মুখে দাঁড়িয়েও অবশ্য নিজের দায় সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। সমস্ত অভিযোগ নস্যাৎ করে তাঁর দাবি, “আমি যত দূর জেনেছি, ওই গোডাউনটি কিন্তু বেআইনি ছিল না। এখানে মূল খামতি ছিল নজরদারির। এখন মেয়র বা পুর কমিশনার নিজে গিয়ে তো আর প্রতিটা সাইটে নজরদারি করতে পারেন না।” নকশায় সই করার বিষয়ে নিজের পক্ষে সওয়াল করে ফিরহাদ বলেন, তিনি নিজে কোনও প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ নন। বিল্ডিং কমিটির তৈরি করা মিটিং নোটে তাঁর সই করাটা ছিল স্রেফ একটি প্রশাসনিক দস্তুর বা ফর্মালিটি মাত্র। তবে ফিরহাদের এই যুক্তিতে চিঁড়ে ভিজছে না রাজনৈতিক মহলে। প্রাক্তন মেয়রের গ্রেফতারির দাবিতে সুর চড়িয়েছেন কালীঘাট তৃণমূলের নেতারাও। তাঁদের সঙ্গে ফিরহাদ-সহ দোষীদের শাস্তির দাবিতে সরব হয়েছে বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা।

দুর্ঘটনাস্থল থেকে শুরু করে হাসপাতালের মর্গ, কোথাও কান্না থামছে না। শেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপ থেকে একে একে আরও দেহ উদ্ধারের পর এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭। কংক্রিটের এই বিশাল ধ্বংসস্তূপের নীচে কেবল কিছু শ্রমিকের দেহাংশ চাপা পড়েনি, তার সঙ্গে পিষে গিয়েছে একাধিক হতদরিদ্র পরিবারের স্বপ্ন, বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। এই ধ্বংসলীলার পরতে পরতে এখন কেবলই স্বজন হারানোর হাহাকার। পেটের তাগিদে ও একটু ভাল ভবিষ্যতের আশায় বিহারের মুঙ্গের থেকে কলকাতায় ছুটে এসেছিলেন একই পরিবারের ৬ জন সদস্য। তারাতলার ওই অভিশপ্ত বহুতলে শ্রমিকের কাজ করছিলেন তাঁরা। কিন্তু বুধবার দুপুরের সেই প্রলয়ঙ্করী ধস কেড়ে নিল ৩ ভাইয়ের প্রাণ। দুর্ঘটনার দিন, অর্থাৎ বুধবার দুপুর ১২টা বেজে ৭ মিনিটে যখন ছাদটি ভেঙে পড়ে, সেদিনই ঘটনাস্থলে মৃত্যু হয় ঘি কুমারের। এরপর বুধবার গভীর রাতে ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর ভাই মন্নু কুমারকে। কিন্তু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনিও মারা যান। আর এক ভাই শিরচাঁদ কুমারের কোনও হদিশ মিলছিল না। দীর্ঘ তল্লাশির পর যখন তাঁর দেহটি উদ্ধার করা হয়, তখন তা এতটাই ক্ষতবিক্ষত ছিল যে চেনার কোনও উপায় ছিল না। শেষ পর্যন্ত যুবকের পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটি দেখেই তাঁর পরিচয় শনাক্ত করেন আত্মীয়রা। ময়নাতদন্তের পর ৩ ভাইয়ের দেহ বিহারে পাঠানো হবে। ওই পরিবারের বাকি ৩ সদস্য এখনও গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।
“এখন মেশিন চালাচ্ছি, পরে কথা বলব।” বুধবার সকালে স্ত্রী নেহা দেবীকে ফোনে এই ক’টি কথাই বলেছিলেন ৩৬ বছর বয়সি শ্রমিক নবীন সিং। কে জানত, সেটাই স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর জীবনের শেষ কথা হতে চলেছে! কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ধসে পড়ে গোডাউনের ছাদ। টিভির পর্দায় দুর্ঘটনার খবর দেখার পর থেকেই স্বামীর ফোনে অনবরত চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন নেহা, কিন্তু প্রতিবারই তা ‘সুইচড অফ’ দেখায়। চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে ১৮ বছরের ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে রানিগঞ্জ থেকে কলকাতা রওনা দেন নেহা। বুধবার গভীর রাতে শহরে পৌঁছে হন্যে হয়ে স্বামীকে খুঁজতে শুরু করেন মা ও ছেলে। অবশেষে বৃহস্পতিবার বিকেলে তাঁদের সব আশার আলো নিভে যায়। হাসপাতালের মর্গে এক আত্মীয়ের চোখে পড়ে একটি কাটা হাত, যার ওপর স্পষ্ট অক্ষরে ট্যাটু করে লেখা রয়েছে ‘নবীন সিং’। সেই ট্যাটু দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন নেহা। নবীনের এক আত্মীয় ডুকরে উঠে বলেন, “এখন এই পরিবারটার কী হবে? দুটি ছেলে আর একটি ছোট মেয়ে রয়েছে নবীনের। ওই তো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ ছিল।” অন্যদিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীর বাসিন্দা ১৭ বছরের কিশোর সাহিল সরদারের গল্পটা আরও বুকফাটা। জীবনে প্রথম বার কলকাতায় পা রেখেছিল সে। বুধবার সকালেই কাকার হাত ধরে মহানগরে এসেছিল সাহিল। তারাতলার ওই নির্মাণ সাইটে কর্মরত তুতো ভাইদের সঙ্গে দেখা করার জন্য বড্ড উৎসাহী ছিল সে। প্রথম কলকাতা দেখার আনন্দ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে। যখন ছাদটি ভেঙে পড়ে, তখন ওই সাইটেই ছিল সাহিল। কংক্রিটের চাঁইয়ের নীচে নিমেষেই পিষে যায় তার ছোট্ট দেহ।

নকশা থেকে নির্মাণকাজ – সর্বস্তরে একের পর এক গলদের চরম পরিণতির সাক্ষী থেকেছে তারাতলা। বুধবার দুপুরে তাসের ঘরে মতো হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৭ জন। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারাজে নেমে তদন্তকারীরা বেআইনি নির্মাণ দেখে রীতিমতো থ! এত ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে নির্মাণকাজ চলছিল, সেই প্রশ্নে তোলপাড় কলকাতা। এই পরিস্থিতিতে পুলিশের অনুরোধে শনিবার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জনের বিশেষজ্ঞ দল। কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ার পার্থপ্রতিম বিশ্বাসের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞরা আজ তারাতলায় গেলেও কাজ সেভাবে শুরু করতে পারেননি। উদ্ধারকাজ সম্পূর্ণরূপে শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা করা সম্ভব নয় বলে জানালেন পার্থপ্রতিম বিশ্বাস। কীভাবে তাঁরা কাজ করবেন, তাও জানিয়েছেন। তারাতলায় ভেঙে পড়া বাণিজ্যিক ভবনটি আসলে তৈরি হচ্ছিল গুদাম ও হিমঘর। কিন্তু তার পরতে পরতে নকশায় ত্রুটি। ঠিক কী কী গলদ ছিল, তা বিশদে জানতে কলকাতা পুলিশ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাহায্য চেয়েছে। সূত্রের খবর, এই মর্মে উপাচার্যের কাছে এনিয়ে অনুরোধ জানানো হয়। সেই অনুরোধ মেনে কনস্ট্রাকশন বিভাগের বর্ষীয়ান ইঞ্জিনিয়ার পার্থপ্রতিম বিশ্বাসের নেতৃত্বে ৫ জনের একটি টিম তৈরি করে তারাতলায় পাঠানো হয়। পার্থপ্রতিম বিশ্বাসের নেতৃত্বাধীন এই টিমে রয়েছেন আর্কিটেকচার মৈনাক ঘোষ, মেটালার্জি ও মেটিরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক মহম্মদ বশিরউদ্দিন শেখ, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দীপঙ্কর চক্রবর্তী ও সম্রাট সেনগুপ্ত। দুর্ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়াররা। পার্থপ্রতিম বিশ্বাস জানান, ‘‘আমরা এখানে এসে দেখলাম ঠিকই, কিন্তু উদ্ধারকাজ যতক্ষণ না পুরোপুরি শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ কিছু করা যাচ্ছে না। এখনও এখান থেকে পচা গন্ধ বেরচ্ছে, সম্ভবত কিছু দেহাংশ আটকে আছে। পুলিশ আমাদের সাহায্য চেয়েছে। সেইমতো উপচার্যের অনুমতি নিয়ে আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৫জন এসেছি। দুটি পর্যায়ে কাজ হবে। উদ্ধারকাজ শেষের পর আমরা আবার এখানে এসে সব দেখব। তারপর এখান থেকে কিছু নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করব। মাটি পরীক্ষাও হবে। সেসব দেখে তারপর রিপোর্ট দিতে পারব।” যদিও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শনিবার দুপুর ২টো নাগাদ উদ্ধারকাজে আপাতত ইতি টেনেছে পুলিশ, দমকল, এনডিআরএফ, সেনা। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, ধ্বংসস্তূপে আর কেউ আটকে নেই। এবার হয়তো কাজ শুরু করবেন বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়াররা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles