RK NEWZ ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বিধানসভা ভোটে বিজেপি-র জয়ের পর এবার সেই জল গড়াল এ রাজ্যেও। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার দিকে এগোচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। এর পরেই রাজ্য রাজনীতিতে যখন নতুন করে তরজা শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই বিজেপির অবস্থান স্পষ্ট করে দিলেন দলের প্রবীণ নেতা তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য। শমীকবাবুর সাফ কথা, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে বিজেপির অবস্থান বহুদিনের এবং তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এটা দলের নির্বাচনী ইস্তেহার ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অংশ। এখানে কোনও লুকোচুরি বা মুখোশের আড়াল নেই। কেন পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রয়োজন, তার সপক্ষে সওয়াল করে শমীক ভট্টাচার্য জানান, আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের জন্য সমান অধিকার ও সমান কর্তব্য নিশ্চিত হওয়া উচিত। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার কিংবা দত্তক গ্রহণের মতো সামাজিক বিষয়গুলিতে ধর্মভিত্তিক আলাদা আলাদা ব্যক্তিগত আইন থাকার কোনও যৌক্তিকতা নেই। তার বদলে একটি অভিন্ন নাগরিক কাঠামো তৈরি হলে তা দেশের ঐক্য, ন্যায়বিচার এবং সাংবিধানিক সমতার আদর্শকে আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত আইনে যেখানে বহুবিবাহের সুযোগ রয়েছে, এই আইন কার্যকর হলে সেই ধরনের বৈষম্যও দূর করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি। তবে ইউসিসি নিয়ে বিরোধীদের দাবি উড়িয়ে শমীকবাবু স্পষ্ট করে দেন, সন্তানসংখ্যা নির্ধারণ করা কিন্তু এই আইনের কোনও উদ্দেশ্য বা বিধানের অংশ নয়। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এলে আদিবাসী বা তফসিলি জনজাতির নিজস্ব সংস্কৃতি ও প্রথা নষ্ট হয়ে যাবে, বিরোধীদের এই লাগাতার প্রচারকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য। সংবিধানের ধারা উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট জানান, তফসিলি জনজাতি বা ‘শিডিউলড ট্রাইব’ (ST)-দের এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, “সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৬৬ (২৫) এবং অনুচ্ছেদ ৩৪২ অনুযায়ী স্বীকৃত তফসিলি জনজাতির সদস্যরা এই আইনের আওতার বাইরে থাকবেন। তাঁদের সংবিধান স্বীকৃত প্রথা, রীতি ও বিশেষ অধিকার সম্পূর্ণ সংরক্ষিত থাকবে।” রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর জন্য শুভেন্দু অধিকারীর পদক্ষেপের কথা জানার পরেই তৃণমূল-সহ বিরোধী দলগুলি সুর চড়াতে শুরু করেছে। বিশেষ করে আদিবাসী ভোটব্যাঙ্কে এর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শমীক ভট্টাচার্যের এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে যেমন সকল নাগরিকের জন্য সমান আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণ হবে, ঠিক তেমনই সংবিধানপ্রদত্ত তফসিলি জনজাতির বিশেষ রক্ষাকবচকেও যে অক্ষুণ্ণ রাখা হচ্ছে, তা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে পদ্ম শিবির। শমীক ভট্টাচার্যর কথায়, ইউসিসি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কোনও কারণ নেই, সরকার দুই বিষয়কেই সমান প্রাধান্য দিয়ে এগোচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের কালীগঞ্জে ঘটে যাওয়া তামান্না হত্যাকাণ্ডেপুলিশের তৎপরতায় বড়সড় সাফল্য মিলেছে। এই স্পর্শকাতর মামলায় ভিনরাজ্য থেকে আরও বারো জন অভিযুক্তকে পাকড়াও করেছে পুলিশ। গ্রেফতারির পরই কড়া বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তামান্নার পরিবারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং তাঁর জন্য সুবিচার সুনিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। কয়েক দিন আগেই নিহত তামান্নার শোকার্ত মায়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই সাক্ষাতের পর থেকেই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। অপরাধীদের আইনের আওতাধীন করতে এবং তাদের কঠোরতম শাস্তি দিতে অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে কাজ শুরু করে পুলিশ বাহিনী। মুখ্যমন্ত্রী সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে জানান, এই মামলার এফআইআরে নাম থাকা প্রায় সমস্ত মূল অভিযুক্তকেই ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এও জানিয়েছেন, গত কয়েক দিন ধরে রাজ্য পুলিশের বিশেষ দল এ রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ভিন রাজ্যে টানা তল্লাশি অভিযান চালায়। গুরুগ্রাম এবং নাগপুরের মতো দূরবর্তী শহরগুলি থেকে অপরাধীদের সূত্র ধরে ধাওয়া করে আরও বারো জন পলাতক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের নামের তালিকাও সামনে এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পুলিশি অভিযানে ধরা পড়া এই বারো জন হল – জিয়ারুল শেখ, সাবির শেখ, ফকর শেখ ওরফে ইসমাইল শেখ, হাফিজুল শেখ, মিনারুল শেখ, আনিসুর শেখ, মিলন শেখ, রাজাবুল শেখ, জাকাত শেখ, সাহিবুল শেখ, আমিরুল শেখ এবং রকিবুল শেখ। এই ব্যাপক ধরপাকড়ের ফলে তামান্না হত্যা মামলায় তদন্তের জল অনেক দূর গড়াবে এবং বাকি তথ্য দ্রুত সামনে আসবে বলে মনে করছে পুলিশ প্রশাসন। পুলিশের এই দ্রুত পদক্ষেপকে সামনে রেখে বিগত জমানাকে তীব্র ভাষায় বিঁধেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, পুলিশের এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ রাজ্যের দুষ্কৃতীদের কাছে একটি অত্যন্ত কড়া এবং স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। আগের সরকারের জমানায় যেমন অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় দেখে বিচার করা হত কিংবা ভুক্তভোগীর রাজনৈতিক পরিচয় কী, তার ওপর ভিত্তি করে পুলিশের ভূমিকা নির্ধারিত হত – বর্তমান সরকার সেই সংস্কৃতিতে পুরোপুরি ইতি টেনেছে। শুভেন্দু অধিকারীর কথায়, “আমাদের সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতিতে কাজ করে। আমরা রাজ্যে ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠা করতে এবং যেখানে ‘শাসকের আইন’ চলত, সেই অন্ধকার যুগের সম্পূর্ণ অবসান ঘটাতে এক অনমনীয় ও দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেছি।” মুখ্যমন্ত্রী আরও যোগ করেন, অপরাধ সবসময়ই অপরাধ, তার অন্য কোনও সংজ্ঞা হতে পারে না। আক্রান্ত বা অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন ধর্মের, কোন বর্ণের বা কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, তা বর্তমান প্রশাসনের কাছে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। এই প্রসঙ্গেই তাঁর বার্তা, কোনও রকম ভয়, পক্ষপাতিত্ব বা রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে এবং দ্রুততার সঙ্গে প্রত্যেকটি অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তামান্নার ঘটনায় পুলিশের এই নজিরবিহীন তৎপরতা রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সেই সদিচ্ছারই প্রমাণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।





