RK NEWZ চর্চায় কালী। জানেন কে এই কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়? তারাতলা বিপর্যয় নিয়ে বিধানসভায় নথি তুলে ধরে ফিরহাদ হাকিমকে আক্রমণ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানেই তাঁর মুখে শোনা যায় কালী নামে এক ব্যক্তির কথা। সেই সূত্র ধরেই তারাতলা বিপর্যয়েও জড়িয়ে গেল ‘কালীঘাট তৃণমূলে’র সেকেন্ড ইন কম্যান্ড অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্যায়ের নাম। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “ক্যামাক স্ট্রিটের নির্দেশেই পুরসভায় নিয়োগ করা হয়েছিল কালীকে। আর কালী জানে না এমন কোনও বিল্ডিং কলকাতায় নেই। সব বিল্ডিংয়ের অনুমোদন হত ওর কথায়।” বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কালীকে ধরলেই সব সামনে চলে আসবে।” ২০০৩ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে দ্বিতীয় হন কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। যোগ দেন ভূমি রাজস্ব দপ্তরে। এরপর ২০০৬ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিস পরীক্ষায় বসেন। তাতে প্রথম হয়ে ২০০৮ সালে রাজ্য পুলিশে যোগ দেন। কিন্তু প্রশিক্ষণের সময় তা ছেড়ে দেন বিশেষ কারণে। ওই বছরই ফের ভূমি রাজস্ব দপ্তরে ফিরে যান তিনি। সূত্রের খবর, ২০১০ সাল থেকে পুরসভায় কাজ শুরু কালীচরণের। সেই সময় মেয়র পারিষদ ছিলেন ফিরহাদ। কালীচরণ ছিলেন ফিরহাদের আপ্ত সহায়ক। ২০১৮ সালে কলকাতা পুরনিগমের মেয়র হন ফিরহাদ হাকিম। ক্যামাক স্ট্রিটের নির্দেশেই সেই সময় ফিরহাদ হাকিম কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজের ওএসডি পদে নিয়ে আসেন। তারপর সময় যত এগিয়েছে উত্তরোত্তর বেড়েছে কালীর দাপট। পুরসভার কর্মী সূত্রে খবর, সেখানে যাবতীয় কাজ চলত কালীচরণের অঙ্গুলিহেলনে। তাঁর নির্দেশ ছাড়া একটি পাতাও নড়ত না। কেউ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারতেন না। তবে কালীচরণ এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস ছিল না কারও। কারণ, মেয়রের কাছে অভিযোগ জানাতে গেলেও টপকাতে হবে সেই কালীচরণকে। তাঁর অনুমতি ছাড়া ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে দেখা করতে পারতেন না কেউ। তারাতলা কাণ্ডের রেশ ধরে এবার প্রকাশ্যে সেই কালীর কীর্তি। যদিও ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে অভিষেকের বন্দ্য়োপাধ্যায়ের তরফে জানানো হয়েছে, তাঁর সঙ্গে কালীচরণের কোনওদিনই কোনও যোগ ছিল না। তবে আগেই তাঁরা জানতে পেয়েছিলেন সাংসদের নাম ভাঙিয়ে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে প্রতারণা করছেন ওই ব্যক্তি। এই মর্মে ২০২৪ সালে থানায় অভিযোগও জানানো হয়েছিল।

তারাতলায় গুদাম বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১১। বুধবার সারা রাত উদ্ধারকাজ চলেছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন ভারতীয় সেনা, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যেরা। তবে বেলা গড়াতেই ব্যাঘাত ঘটে। প্রবল বৃষ্টি এবং বজ্রপাতে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়। যে হাইড্রোলিক ক্রেন ব্যবহার করে ভাঙা ছাদের অংশ তুলে নীচের ধ্বংসস্তূপ সরানো হচ্ছিল, বজ্রপাতের কারণে তা বেশি ক্ষণ তুলে রাখা যায়নি। ফলে দীর্ঘ ক্ষণ থমকে গিয়েছে উদ্ধারকাজ। তারাতলার ধ্বংসস্তূপ থেকে বৃহস্পতিবার সকালে এক জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তিনি লোহার বিমের নীচে আটকে ছিলেন প্রায় সাড়ে ১৮ ঘণ্টা। তবে তাঁর আঘাত তেমন গুরুতর নয়। উদ্ধারের পর তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সেখানেই তিনি চিকিৎসাধীন। এই মুহূর্তে এসএসকেএমে চিকিৎসা চলছে তারাতলার ১৯ জনের। মোট ১১ জনকে সেখান থেকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এখনও ধ্বংসস্তূপের নীচে কয়েক জন আটকে আছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তাঁরা কী অবস্থায় আছেন, স্পষ্ট নয়। ভিতর থেকে আর কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবার সকালে রোদের তেজ ছিল প্রবল। স্থানীয় সূত্রে দাবি, তাতে উদ্ধারকাজ কিছুটা মন্থর হয়ে পড়েছিল। তীব্র দাবদাহের কারণে কিছু ক্ষণেই হাঁপিয়ে উঠছিলেন উদ্ধারকারীরা। বার বার উদ্ধারকারী দল পরিবর্তন করতে হচ্ছিল। কোথাও গ্যাস কাটার দিয়ে লোহা কাটা হচ্ছে, কোথাও শাবল দিয়ে সরানো হচ্ছে মাটি। সকাল থেকে মূলত তিনটি হাইড্রোলিক ক্রেন ব্যবহার করা হচ্ছিল তারাতলায়। আর্থ মুভার দিয়ে ভাঙা ছাদের অংশ সরিয়ে নীচে প্রাণের খোঁজ চলছিল। তবে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় সেই কাজ বন্ধ করে দিতে হয়। ক্রেনের উপরের অংশ ঘনঘন বজ্রপাতের মধ্যে উঁচুতে তুলে রাখা সম্ভব ছিল না। তাই উদ্ধারকাজ থামিয়ে দিতে হয়। সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে গিয়েছেন তিনি। ধ্বংসস্তূপের সামনেই অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে। যাঁদের উদ্ধার করা হচ্ছে, তাঁদের প্রাথমিক ভাবে সেখানে চিকিৎসার পর অ্যাম্বুল্যান্সে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এসএসকেএমে। বৃষ্টি থামলে এবং পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ফের পুরোদমে উদ্ধারকাজ শুরু করা যাবে।

তারাতলা বিপর্যয়ের পর কেটে গিয়েছে চব্বিশ ঘণ্টা। এখনও যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে উদ্ধারকাজ। ধ্বংসস্তূপের নিচে আর চাপা রয়েছেন কতজন, সে তথ্য জানা নাকি সম্ভব হচ্ছে না কিছুতেই। কারণ, এত বড় গুদাম এবং কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের কাজ চললেও সেখানে ছিল না কোনও রেজিস্টার। তার ফলে শ্রমিকদের তথ্যের খোঁজে হয়রান সিটের তদন্তকারীরা। বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সেকথাই জানালেন অ্যাডিশনাল সিপি ক্রাইম কুণাল আগরওয়াল। অ্যাডিশনাল সিপি জানান, বন্দরের থেকে এই জায়গাটি লিজ নিয়েছিল শম্ভুনাথ বহেরা। আগে তিন ভাইয়ের সংস্থা ছিল ‘বহেরা ব্রাদার্স’। পরে যদিও একক মালিক হয়ে যান শম্ভুনাথ। তিনিই ওই জায়গাটি গুদাম এবং কোল্ডস্টোরেজ তৈরি করছিলেন। ঠিকাদারি সংস্থা অয়ন ট্রেডার্স সেখানে কাজ করছিল। ওই কাজই করাচ্ছিলেন আসগার হোসেন। পুলিশের দাবি, এই বিপর্যয়ে প্রাণ গিয়েছে আসগরের। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত মোট ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধৃতদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত খুন, খুনের চেষ্টা, অপরাধ ষড়যন্ত্রের চেষ্টায় মামলা রুজু হয়েছে। ধৃতদের মধ্যে মৃত আজগার হোসেনের বিরুদ্ধে ইকবালপুর এবং দক্ষিণ বন্দর থানায় পুরনো দু’টি মামলা রয়েছে। সৈয়দ মহম্মদ গুলজারের বিরুদ্ধেও পুরনো মামলা রয়েছে। বুধবারই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এই গুদামটির অনুমোদন দেয় কলকাতা পুরসভা। সেই অনুযায়ী কাজ শুরু হয়। সে কারণেই ভেঙে পড়া ওই গুদাম সংক্রান্ত আরও তথ্য জানতে কলকাতা পুরসভার থেকে তথ্য চেয়েছে লালবাজার। প্রয়োজনে পুরসভার ইঞ্জিনিয়ারদের প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

এই বিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন মোট ১১ জন। নিহতেরা হলেন কৃষ্ণ চৌধুরী, রোহিত চৌধুরী, চন্দ্রমা চৌধুরী, রাহুল চৌধুরী, পাপ্পুকুমার রজক, ঘি কুমার, আসগার হোসেন, সাহিল সর্দার, হাসান ইমাম, গণেশ কালান্দি, নবীন সিং। জখম অবস্থায় এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি ১৯ জন। তাঁরা হলেন দুর্বাশা মাল্লাহ, মণিচাঁদ কুমার, শহিদ কুমার, বিশ্ব প্রকাশ, রাজেশ রুইদাস, বোদন মুণ্ডা, রাজেন্দ্র রাও, রামপ্রসাদ চৌধুরী, মহম্মদ আবিদ খান, সূরজ চৌধুরী, জওহর আলি গায়েন, দেবাশিস দাস, আরমান খান ওরফে মহম্মদ সোনু, সন্দীপ পাণ্ডে, মুস্তাকিন গায়েন, রাজকুমার রজক, কার্তিক পাত্র, খালেক সর্দার, মান্নু কুমার।




