RK NEWZ ভার্টিক্যাল ড্রিল দিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে গর্তে দড়ি দিয়ে নিচে নেমে বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করে সেনা। ড্রোন উড়িয়ে দেখা হয় ধ্বংসস্তূপের খুঁটিনাটি। বহু বিপর্যয় দেখেছে শহর কলকাতা। একেকটা দুর্ঘটনার ক্ষত অনেকদিন থেকে গিয়েছে তিলোত্তমার বুকে। বুধবার, ২৪ জুন শহরবাসী সাক্ষী রইল আরও এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের। তারাতলায় নির্মীয়মাণ তিনতলা বাণিজ্যিক ভবন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে লোহার বিম, সিমেন্টের চাঁই যে ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ল, সে দৃশ্য মনে করলে শিউরে উঠবেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা পাঁচ হলেও তা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। তবে এই পরিস্থিতিতে যা ব্যতিক্রমী, তা হল উদ্ধারকাজ। এতদিন শহরে বড় বিপর্যয় ঘটলে, যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সেনার সাহায্য নেওয়া ছিল দূরঅস্ত। কিন্তু বুধবার তারাতলায় দ্রুত নেমে সেনাবাহিনী পরিস্থিতি না সামলালে আরও বাড়ত মৃতের সংখ্যা। সাম্প্রতিককালের মধ্যে এমন অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বিপর্যয় মোকাবিলার নজির দেখেনি কলকাতাবাসী। ভার্টিক্যাল ড্রিল মেশিন, অ্যাঙ্গেল কাটার, ডায়মন্ড টেন স, এয়ার প্লাজমা কাটিং মেশিন, কর্ডলেস হ্যামার – আরও কত কী! এমন সব যন্ত্রপাতির নামও শোনা যায়নি। এছাড়া ক্রেন তো ছিলই। একা সেনা নয়, বিপর্যয় মোকাবিলা দল, এনডিআরএফ, দমকল, পুলিশ – হাতে হাত মিলিয়ে সকলে রীতিমতো ঝাঁপিয়ে পড়েন। জানা যাচ্ছে, দুপুর আড়াইটে নাগাদ রাজ্য সরকারের তরফে সেনার নামানোর আবেদন জানানো হলে বিহার রেজিমেন্ট থেকে শতাধিক সেনাকে পাঠানো হয়। প্রথমে গ্যাস কাটার দিয়ে লোহার বিম কেটে আটকে থাকা লোকজনকে বের করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গতি আসে উদ্ধারকাজে। ভেঙে পড়া কাঠামোকে সরিয়ে সেখান ২টি পেল্লাই ক্রেন লাগানো হয়। যার মাধ্যমে ভিতরে কেউ আটকে রয়েছেন কিনা, তা সহজে দেখা যায়। অন্যদিকে, ভার্টিক্যাল ড্রিল মেশিন দিয়ে গর্ত করে দড়ি বেয়ে নিচে নেমেও সেনা উদ্ধারে তৎপর হয়। বাইরে থেকে যাঁদের দেখা গিয়েছে, তাঁদের উদ্ধারের পাশাপাশি ঘোষণা করা হয়, ভিতরে কেউ আটকে থাকলে সাড়া দিতে, সঙ্গে সঙ্গে বাইরে বের করার ব্যবস্থা হবে। সন্ধ্যার আগে পর্যন্ত মোট ২৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি ২০ জনের মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এখনও ১২ জনের কাছাকাছি আটকে বলে খবর। আলো জ্বালিয়ে তাঁদের উদ্ধারকাজ চলছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, যত বড় বিপর্যয় ঘটেছিল, সেই তুলনায় অনেক দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আসলে যে কোনও রাজ্যে বড় দুর্ঘটনা ঘটলে তা সামলাতে সেনাবাহিনীর সাহায্য নেওয়া স্বাভাবিক। তা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোরই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বাংলায় তৃণমূল সরকারের আমলে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সেনাকে উদ্ধারকাজে ডাকার ঘোর বিরোধী ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।তাই একেকটি বিপর্যয় সামলাতে সময় লাগত অনেকটা। দুর্ঘটনার পর সাংবাদিক বৈঠকে তা নিয়ে খোঁচা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বলেন, ‘‘সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ। আমরা দুপুর আড়াইটে নাগাদ তাদের ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলাম। একঘণ্টার মধ্যে তারা বাহিনী পাঠিয়ে উদ্ধারকাজে হাত লাগান। কলকাতায় সেনাবাহিনীর দায়িত্বে থাকা অফিসার খুব সাহায্য করেছেন। আগে তো সেনাকে কাজে লাগানো হতো না। এখন আমরা এই দুর্ঘটনার খবর পেয়েই সেনার সাহায্য নিয়েছি।” দ্রুত উদ্ধারকাজ নিয়ে রাজ্য সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করেন প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমও।
তৃণমূলের আমলে পাশ হওয়া নির্মীয়মাণ বাণিজ্যিক ইমারত তৈরি আপাতত বন্ধ। ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ওই নির্মীয়মাণ ইমারতগুলির স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হবে। ছাড়পত্র মিললে তবেই ফের শুরু হবে নির্মাণকাজ। বুধবার তারাতলার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর ‘অ্যাকশন’ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেন, “কলকাতা পুর এলাকায় বাণিজ্যিক, জলাশয় বুঝিয়ে হওয়া নির্মাণগুলি আপাতত ৩১ জুলাই পর্যন্ত কাজ বন্ধ থাকবে। পিডব্লুডি, সিভিল ডিফেন্স, পুলিশ আর পুরসভা, দমকলের নেতৃত্বে একটি অডিট টিম গড়ে দেওয়া হবে। ওই টিম বিল্ডিং প্ল্যান, এলাকা পরিদর্শন করে সিদ্ধান্ত নেবে অনুমোদন ত্রুটিযুক্ত কিনা। তারপরই ফের শুরু হবে কাজ।” তবে হাসপাতাল, দমকল, মেট্রো, সেনা যেখানে কাজ করছে সেই জায়গাগুলি নির্মাণ বন্ধের আওতাধীন নয়। তারাতলা গোডাউন বিপর্যয়ের আসল কারণ এখনও তদন্তসাপেক্ষ। তবে প্রাথমিকভাবে কলকাতা পুরসভার ইঞ্জিনিয়াররা জানিয়েছেন, ত্রুটিপূর্ণ নকশার জেরেই ভেঙে পড়েছে নির্মীয়মান গুদাম ও কোল্ড স্টোরেজটি। সে কারণেই তৃণমূল আমলে পাশ হওয়া বিল্ডিংয়ের নকশা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু জানান, চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি বহুতলের নকশার অনুমোদন দেয় পুরসভা। মাত্র ৫ মাসের মাথায় বুধবার ১২টা ৭ মিনিটে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছে তারাতলার তিনতলাক গুদাম। ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে যান বহু শ্রমিক। খবর পাওয়া মাত্রই একের পর এক মন্ত্রী ঘটনাস্থলে যান। ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়, পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ঘটনাস্থলে পৌঁছন। উদ্ধারকাজের প্রতি মুহূর্তের আপডেট নিচ্ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তিনি জানান, দুপুর আড়াইটে নাগাদ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয় মুখ্যসচিব মনোজকুমার আগরওয়ালের। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় উদ্ধারকাজে সেনার সাহায্য নেওয়া হবে। সেই মতো তড়িঘড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছয় সেনা। দমকল, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীও যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হয় কাজ। ভার্টিকাল ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে শুরু হয় উদ্ধারকাজ। কে, কোথায় আটকে রয়েছেন তার হদিশ পেতে ড্রোন উড়িয়ে শুরু হয় তল্লাশি অভিযান। নামানো হয়েছে দু’টি স্নিফার ডগও। মুখ্যমন্ত্রী জানান, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই ঘটনায় প্রাণ গিয়েছে মোট ৩ জনের। তাঁরা হলেন বছর চল্লিশের রোহিত চৌধুরী, বছর তিরিশের কৃষ্ণ চৌধুরী এবং আরেকজনের নাম-পরিচয় এখনও জানা যায়নি। জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে মোট ১৮ জনকে। মোট ২০টি অ্যাম্বুল্যান্স উদ্ধার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তারাতলা থেকে আহতদের উদ্ধারের পর গ্রিন করিডর করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এসএসকেএম হাসপাতালে। সেখানে আপাতত চিকিৎসাধীন মোট ৮ জন। তাঁরা হলেন দুর্বাশা মাল্লান, মণিচাঁদ কুমার, শাহিদ কুমার, রাজেশ রুইদাস, বিশ্ব প্রকাশ, বোদন মুণ্ডা, রাজেন্দ্র রাও, রামপ্রসাদ চৌধুরী। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার এসএসকেএমে জখমদের চিকিৎসার দিকে নজর রেখেছেন। বিপর্যয়স্থলেও খোলা হয়েছে একটি মেডিক্যাল ক্যাম্প। সন্ধ্যায় দুর্ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা মুখ্যসচিব এবং স্বরাষ্ট্রসচিবের। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বিবৃতি দেবেন বলে জানান।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশের ঘণ্টাদেড়েকের মধ্যেই ‘অ্যাকশন’। তারাতলায় গুদাম বিপর্যয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। ধৃতরা হল সৈয়দ মহম্মদ গুলজার, মহম্মদ আতাউল ও সুভাষ চৌধুরী। জানা গিয়েছে, সৈয়দ মহম্মদ গুলজার ছিল ওই নির্মাণকাজের সুপারভাইজার। আতাউল এবং সুভাষই কাজের জন্য শ্রমিক সরবরাহ করত। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। এসএসকেএমে আহতদের সঙ্গে দেখা করতে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, “তারাতলার কারখানায় কর্মরতদের বেশিরভাগই বিহার ও মুঙ্গেরের বাসিন্দা। ঠিক কতজন শ্রমিক ওই ধ্বংসস্তূপের নিচে কাজ করছিলেন, তার হিসাব পেতে লালবাজারকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক সরবরাহকারীকে অবিলম্বে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাহলেই জানা যাবে ঠিক কতজন শ্রমিক কাজ করছিলেন। কতজন নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন। আর কতজন উদ্ধার হয়েছেন তা স্পষ্ট হবে।” তাঁর নির্দেশের ঘণ্টাদেড়েকের মধ্যে লালবাজারের তরফে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু হয়। বেহেরা ব্রাদার্সের খোঁজে বহুতলে তল্লাশিও চালান আধিকারিকরা। এরপরই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।





