RK NEWZ লিওনেল আন্দ্রেস মেসি— ফুটবল ইতিহাসের এমন এক নাম, যা কোনও বিশেষ দেশ, ক্লাব বা নির্দিষ্ট সময়সীমায় আবদ্ধ নয়। আসলে তিনি ফুটবলকে দিয়েছেন নতুন মাত্রা, প্রতিটি ম্যাচকে রূপ দিয়েছেন এক একটি জীবন্ত ক্যানভাসে। মাঠে তিনি যখন সবুজের ঘাস চিরে বল নিয়ে এগোন অথবা ড্রিবলিং করেন তখন মনে হয় ক্যানভাসে ছবি আঁকছেন মকবুল ফিদা হুসেন। ডালাসের সবুজ গালিচায় বাঁ পায়ে তুলির আঁচড় টেনে শিল্প রচনা শুরু করলেন, লিও। ৩৯তম জন্মদিনের প্রাক মুহূর্তে মার্কিন মুলুকে এমন সব দুর্মুল্য রেকর্ড হাত উজাড় করে উপহার হিসেবে মেসিকে তুলে দিয়েছে এই ডালাস। সেই ডালাস, যেখানে একদা ডোপিংয়ের অভিযোগে ’৯৪ বিশ্বকাপে মারাদোনার নির্বাসন ঘোষণা হয়েছিল। এতদিন পরে হয়তো নিজের পাপস্খলন করছে টেক্সাসের এই শহর। সতীর্থদের সঙ্গে লিও-র জন্মদিন তাহলে এবার কীভাবে পালিত হবে? পরের রাউন্ডে চলে যাওয়া নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পরেও গ্রুপের শেষ ম্যাচ, জর্ডনের বিরুদ্ধে এই ডালাসেই খেলতে হবে আর্জেন্টিনাকে। ফলে রাত পোহালেই ফুটবল ঈশ্বরের জন্মদিন পালন এই ডালাসের হোটেলেই হবে, না কি কানসাসের বেসক্যাম্পে, এখনও নিশ্চিত নয়। তবে আর্জেন্টাইন স্টাইলের বারবিকিউ, যেটাকে আর্জেন্টাইনরা বলেন, ‘আসাডো’। তা সহযোগে বার্থডে ডিনারের আয়োজন করা হচ্ছে, এটা এক প্রকার নিশ্চিত। আর পুরো উদ্যোগটাই নিচ্ছেন, সতীর্থ, দলে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, ডি’পল। বিশ্বকাপের আসরে মেসির এই জন্মদিনের স্বাক্ষী থাকার এক দুর্লভ সুযোগ। ব্রাজিল-রাশিয়া এবং কাতার। পর পর তিনটি বিশ্বকাপে উপস্থিত থাকার সুযোগে শুধু সময় পরিবর্তন হওয়ার কারণে কাতার বিশ্বকাপে মেসির জন্মদিনের উসব পালন দেখার সুযোগ হয়নি। তবে রাশিয়ার পরিস্থিতি এখনও মনে আছে। সামপাওলির কোচিংয়ে খারাপ পারফরম্যান্সে, তখন দলের পরিবেশ এতটাই খারাপ ছিল যে, সেই প্রথমবারের জন্য স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো মেসির জন্মদিন পালনের মুহূর্তে শিবিরে পর্যন্ত আসেননি। এবার পরিস্থিতি পুরোটাই আলাদা। কিন্তু এটাও সত্যি, অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে শুরুতে পেনাল্টি নষ্টর পর সত্যিই বিমর্ষ লাগছিল লিও-কে। অধিনায়কের মনোসংযোগ যাতে নষ্ট না হয়, তাড়াতাড়ি পাশে চলে আসেন ডি’পল। প্রেসবক্স থেকে দেখা যায়, ডি’পলের সঙ্গে কিছু আলোচনাও করছেন অধিনায়ক। আর এরপর তো ডালাসের সবুজ গালিচায় বাঁ পায়ে তুলির আঁচড় টেনে শিল্প রচনা শুরু করলেন, লিও।পেনাল্টি মিসের তীব্র অভিমানকে কীভাবে শিল্পে পরিণত করতে হয়, মাঠে দেখিয়েছেন। ভাগ্যিস পেনাল্টিটা মিস করেছিলেন। নাহলে বাকি সময়টা জুড়ে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর সেই রুদ্রমূর্তিই দেখা যেত না। যে বয়সে বিশ্বফুটবলের নব্বইভাগ তারকারা খেলা ছেড়ে বিশ্রামে চলে যান, অথবা প্রেসবক্সে বসে তরুণ ফুটবলারদের পারফরম্যান্স নিয়ে কাটাছেঁড়া করেন। সেই বয়সে এই ৩৯ বছরের ‘যুবক’ রেকর্ডের পর রেকর্ড ভেঙে চলেছেন। রেকর্ড তৈরিই হয় ভাঙার জন্য। কিন্তু মানুষ তো মনে রাখে শুধু, নীল আর্মস্ট্রংকেই।
১৮ গোল করে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনেই শুধু আসীন হওয়া নয়। অস্ট্রিয়া ম্যাচে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডের আলোচনার স্রোতে, সকলের অলক্ষ্যেই ভেসে গিয়েছে আরও একাধিক রেকর্ডের বন্যা। এখন আর তিনি শুধুই সর্বোচ্চ গোলের অধিকারী নন। পকেটে রয়েছে এমন সব দুর্মূল্য রেকর্ডের ঝলকানি, যার অধিকার হস্তান্তর বিশ্বফুটবলে ভবিষ্যতে আর কারও কাছেই হবে কি না, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হতে পারে। বিশ্বকাপের ৬টি আসরের মধ্যে, পাঁচটি আসরেই গোলের অনন্য রেকর্ড। বিশ্বকাপে সর্বাধিকবার ম্যাচের সেরা হওয়ার রেকর্ড। বর্ষীয়ান ফুটবলার হিসেবে একটি বিশ্বকাপে ৫ গোল করার রেকর্ডও তাঁর। অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি গোল করার নিজের রেকর্ডই আবার ভেঙেছেন ডালাসের মাঠে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি গোলের অ্যাসিস্টের অধিকারীও। লিওনেল মেসি নাকি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। দুই মহাতারকার মধ্যে কে সেরা, তা নিয়েও বিস্তর তর্ক-বিতর্কের অবকাশ আছে। ফুটবল বিশ্বের কার ভক্তসংখ্যা বেশি, এ নিয়েও আজীবন বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু দুই তারকার ভক্তকূলের মধ্যে চরিত্রগত পার্থক্য যে বিরাট, সেটা নিয়ে বিতর্কের কোনও অবকাশ নেই। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের এক সংস্থা মেসি ও রোনাল্ডোর ফ্যানবেসের চরিত্রগত অবস্থান বিশ্লেষণ করে একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। তাতে চমকপ্রদ এবং মজাদার তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। মেসি ও রোনাল্ডোর সমর্থকদের চরিত্রগত ফারাক অনেকটাই। তাতেই উঠে এসেছে মেসিভক্তরা অনেক বেশি মুক্তমনা এবং উদারপন্থায় বিশ্বাসী। তুলনায় রোনাল্ডো ভক্তরা অনেক বেশি প্রাচীনপন্থী, গোঁড়া মানসিকতার হন। সমীক্ষকদের বক্তব্য, “আসল মেসি ও রোনাল্ডোর ব্যক্তিত্ব অনেকটা আলাদা। মেসি অনেক শান্ত, টিমম্যান, ধীরস্থির ভাবমূর্তির। অন্যদিকে রোনাল্ডো অনেক বেশি আগ্রাসী, নিজের সাফল্যগুলি প্রচারে উদ্যমী। সাধারণত মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিল থাকা ব্যক্তিদের প্রতিই আকৃষ্ট হন। এক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছে।”
প্রতিটি ড্রিবল যেন ছন্দ, পাসগুলি শানিত উপমা, জন্মদিনে মেসির মহাকাব্যিক উপাখ্যান। মেসির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতা। তিনি ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘লিও মেসি ফাউন্ডেশন’, যা বিশ্বজুড়ে বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ বহন করে। এছাড়াও ২০০৮ সাল থেকে তিনি জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল ‘ইউনিসেফ’-এর গুডউইল অ্যাম্বাসাডর হিসেবে কাজ করে চলেছেন। একজন কবি যেমন সাধারণ শব্দের আড়ালে গভীর ভাব লুকিয়ে রাখেন, মেসিও তেমনি মাঠের সাধারণ ফাঁকা জায়গাটুকুর মধ্যে এমন সব পাসের রাস্তা খুঁজে পান, যা সাধারণ ফুটবলারের চোখে পড়ে না। মেসির ‘ভিশন’ বা মাঠকে দেখার ক্ষমতা অবিশ্বাস্য। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মতো তিনি ওই সাধারণ ফাঁকগুলোকে প্রতিপক্ষের কাছে অনিশ্চিত করে তোলেন। ফলে পুরো ব্যাপারটা অনুধাবন করার আগেই প্রতিপক্ষ পিছিয়ে যায়। সমগ্র বিশ্বে, কোনও সন্দেহ নেই, ফুটবল একটি জনপ্রিয়তম খেলা। কিন্তু গড় দৃষ্টিতে ফুটবল আসলে নব্বই মিনিটের এক টানটান উত্তেজনা। শারীরিক কসরত। এই খেলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলটাকে যেনতেন প্রকারেন প্রতিপক্ষের জালে জড়ানো। কিন্তু কিছু ফুটবলার আসেন, যাঁরা এই চামড়ার ফুটবলটিকে পায়ে নিয়ে মাঠের সবুজ ক্যানভাসে যখন এগিয়ে যান তখন মনে হয় তাঁরা ফুটবল খেলছেন না, কবিতা লিখছেন। আসলে এঁরা খেলার ব্যাকরণ সবসময় যে মেনে চলেন, তা নয়। বরং নিত্য নতুন ব্যাকরণ তৈরি করেন। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি সেই বিরল ফুটবলারদের একজন, যাঁকে মাঠের জাদুকর বললে কম বলা হয়। ফুটবলার হলেও আমরা তাঁকে মূলত একজন ফুটবলের কবি হিসেবে ভাবতে অধিক স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করি। তাঁর প্রতিটি ড্রিবল যেন একেকটি ছন্দ, তাঁর পাসগুলো সুনিপুণ শানিত উপমা, কখনও কখনও এগুলো হয়ে যায় স্যুররিয়াল মেটাফোর। আর তাঁর গোলগুলো তো এক-একটি কালজয়ী কবিতার স্মরণীয় পঙক্তি। মেমোরিবল স্পিচ। মোৎজাটের সিম্ফনি। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি— ফুটবল ইতিহাসের এমন এক নাম, যা কোনও বিশেষ দেশ, ক্লাব বা নির্দিষ্ট সময়সীমায় আবদ্ধ নয়। আসলে তিনি ফুটবলকে দিয়েছেন নতুন মাত্রা, প্রতিটি ম্যাচকে রূপ দিয়েছেন এক একটি জীবন্ত ক্যানভাসে। মাঠে তিনি যখন সবুজের ঘাস চিরে বল নিয়ে এগোন অথবা ড্রিবলিং করেন তখন মনে হয় ক্যানভাসে ছবি আঁকছেন মকবুল ফিদা হুসেন। মেসি শারীরিকভাবে সতীর্থদের মতো দৃঢ নয় কিন্তু যখন মাঠে নামেন, তখন তাঁর শারীরিক দৃঢ়তার কোনও খামতি থাকে না। বরং সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর শক্তির উৎস। কিছুটা কম উচ্চতার কারণে তাঁর শরীরের ‘সেন্টার অব গ্র্যাভিটি’ মাটির খুব কাছাকাছি হয় যা তাঁকে চোখের পলকে দিক পরিবর্তন করতে অনেকটাই সাহায্য করে। প্রতিপক্ষ দলের ডিফেন্ডাররা যখন তাঁকে আটকানোর জন্য শারীরিক শক্তির ব্যবহার করে, মেসি তখন স্রেফ শরীরের সামান্য দোলাচল অর্থাৎ বডি ফেইন্ট দিয়ে তাঁদের ছিটকে ফেলে দেন। এই কৌশলকে কোনওভাবেই শক্তিপ্রদর্শন বলা যাবে না, বরং তা উচ্চ মানের নান্দনিকতা। আসলে কবিতায় যেমন ছন্দের একটা দোলা থাকে তেমনি মেসির ড্রিবলিংয়েও ঠিক রয়েছে এক সম্মোহনী ছন্দ। সমসাময়িক অনেক ফুটবলার যেখানে পাওয়ার ফুটবল এবং অতিমানবীয় গতি দিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে চান, মেসি সেখানে গুরুত্ব দেন নান্দনিকতায় । বল তাঁর পায়ে মনে হয় আঠার মতো লেগে রয়েছে। মেসির ড্রিবলিংয়ের সবচেয়ে সুন্দর দিক হল নান্দনিকতার পাশাপাশি সরলতা। তিনি কোনও বাড়তি জাঁকজমক বা অপ্রয়োজনীয় ‘স্টেপ-ওভার’ সচরাচর করেন না। খুব সাধারণ এবং কিছু ছোট ছোট ছোঁয়ায় তিনি বিশ্বের সেরা রক্ষণভাগকে ভেঙে তছনছ করে দেন। চার-পাঁচজন ডিফেন্ডার তাঁকে ঘিরে ধরেছে, বের হওয়ার কোনও রাস্তা নেই— এমন দুরূহ পরিস্থিতি থেকেও মেসি যেভাবে আলতো পায়ে বল নিয়ে বেরিয়ে যান এবং গোল দেন, তা দেখে মনে হয় তিনি কোনও ভয়াবহ গোলকধাঁধার খুব সহজেই সমাধান করেছেন।
একজন কবি যেমন সাধারণ শব্দের আড়ালে গভীর ভাব লুকিয়ে রাখেন, মেসিও তেমনি মাঠের সাধারণ ফাঁকা জায়গাটুকুর মধ্যে এমন সব পাসের রাস্তা খুঁজে পান, যা সাধারণ ফুটবলারের চোখে পড়ে না। মেসির ‘ভিশন’ বা মাঠকে দেখার ক্ষমতা অবিশ্বাস্য। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মতো তিনি ওই সাধারণ ফাঁকগুলোকে প্রতিপক্ষের কাছে অনিশ্চিত করে তোলেন। ফলে পুরো ব্যাপারটা অনুধাবন করার আগেই প্রতিপক্ষ পিছিয়ে যায়। ২০২৩-এর মাঝামাঝি সময়ে মেসি ইউরোপীয় ফুটবলের পাট চুকিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকার ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন। মেসির আগমনে আমেরিকায় সকার বা ফুটবলের জনপ্রিয়তা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। মায়ামিতে যোগ দিয়েই তিনি ক্লাবটিকে তাঁদের ইতিহাসের প্রথম ট্রফি ‘লিগস কাপ’ এনে দেন। পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার, কিন্তু মেসি মাঠের ভেতরে যেমন বিনয়ী, মাঠের বাইরেও ঠিক তেমনই এক প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। তাঁর মধ্যে কখনই সেলিব্রিটিসুলভ আচরণ দেখা যায় না। শৈশবের প্রেমিকা আন্তোনেলা রোকুজ্জোকে ২০১৭ সালে বিয়ে করেন মেসি। তাঁদের সংসারে তিন পুত্রসন্তান রয়েছে— থিয়াগো, মাতেও এবং চিরো। মেসির পারিবারিক জীবনও শোনা যায়, খুব স্বাভাবিক। মেসির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতা। তিনি ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘লিও মেসি ফাউন্ডেশন’, যা বিশ্বজুড়ে বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ বহন করে। এছাড়াও ২০০৮ সাল থেকে তিনি জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল ‘ইউনিসেফ’ -এর গুডউইল অ্যাম্বাসাডর হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। করোনাকালীন সময়ে এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনি অকাতরে কোটি কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। সব মিলিয়ে বলাই যায়, লিওনেল মেসি কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি যুগ, একটি অনুপ্রেরণার নাম। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে, শত সমালোচনা আর চাপকে পেছনে ফেলে তিনি যেভাবে ফুটবলের শিখরে আরোহণ করেছেন, তা যে কোনও মানুষের জন্য এক চরম শিক্ষণীয় বিষয়। আর্জেন্টিনা যখন ফ্রি-কিক পায়, প্রতিপক্ষের গোলরক্ষকের বুকে তখন কাঁপন ধরে। মেসির ফ্রি-কিক নেওয়ার ধরণটি এক অদ্ভুত শিল্প। বলের নিচে পায়ের পাতার ভেতরের অংশ দিয়ে যে বাঁক তিনি তৈরি করেন, তাকে পদার্থবিজ্ঞানের সাহায্যে খুব সহজে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এইরকম জিনিয়াসের জীবন খুব স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠেনি । মেসি জন্মগ্ৰহণ করেন ২৪ জুন, ১৯৮৭ সালে আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে। এগারো বছর বয়সে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তাঁর ফুটবলজীবন। ওইসময়ে তাঁর শরীরে গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি ধরা পড়ে, যার ফলে তাঁর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি থমকে যায়। প্রতি মাসে এই চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ছিল যে পরিমাণ অর্থের তা তাঁদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে বহন করা একেবারেই অসম্ভব ছিল। কোনওভাবেই যখন আলোর ইশারা দেখা যাচ্ছে না, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন স্পেনের এফসি বার্সেলোনা। বার্সেলোনার তৎকালীন স্পোর্টিং ডিরেক্টর কার্লেস রেক্সাচ মেসির খেলা দেখে এতটাই মুগ্ধ হন যে, হাতের কাছে কোনও ভালো কাগজ না পেয়ে একটি সাধারণ ন্যাপকিন পেপারে মেসির সঙ্গে ঐতিহাসিক এক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। বার্সেলোনা মেসির চিকিৎসার সমস্ত খরচ বহন করতে রাজি হয় এবং ২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেসি সপরিবারে স্পেনে পাড়ি দেন।
বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি ‘লা মাসিয়া’ অনুকূল পরিবেশে মেসির প্রতিভা যথাযথ বিকশিত হতে সময় লাগেনি। ২০০৪ সালের ১৬ অক্টোবর মাত্র ১৭ বছরের সামান্য কিছু বেশি বয়সে এস্পানিওলের বিপক্ষে বার্সেলোনার মূল দলের হয়ে মেসির অভিষেক হয়। ২০০৫ সালের ১ মে আলবাসেতের বিপক্ষে রোনালদিনহোর চমৎকার পাস থেকে বার্সেলোনার হয়ে নিজের প্রথম গোলটি করেন লিওনেল মেসি। আজও মেসি গোল করার পর দুই হাত তুলে আকাশের দিকে যে ইশারা করেন, জানা গিয়েছে, তা আসলে তাঁর প্রয়াত দিদিমার স্মৃতির প্রতি উৎসর্গীকৃত। রোনালদিনহোর বিদায়ের পর বার্সেলোনার বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সিটি মেসির কাঁধে ওঠে। এর পরের অধ্যায় ফুটবল ইতিহাসে মেসির সবচেয়ে সোনালী অধ্যায়। ২০০৮-২০০৯ ফুটবলবর্ষে বার্সেলোনা ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ক্লাব হিসেবে ‘সেক্সটাপল’ (এক ফুটবল বর্ষে ছয়টি ট্রফি) জয়ের রেকর্ড গড়ে, যার অন্যতম কারিগর ছিলেন স্বয়ং মেসি। তৎকালীন সময়ে জাভি হার্নান্দেজ এবং আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সঙ্গে মেসির বোঝাপড়া ফুটবল মাঠে এক নতুন নান্দনিকতার জন্ম দেয়, যা ‘টিকি-টাকা’ নামে বিশ্ববিখ্যাত। বার্সেলোনার হয়ে মেসি রেকর্ড চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগা এবং কোপা দেল রে শিরোপা জেতেন। ২০২১ সালে ক্লাব ছাড়ার আগে পর্যন্ত তিনি বার্সেলোনার হয়ে ৭৭৮ ম্যাচে রেকর্ড ৬৭২টি গোল করেন। আর আন্তজার্তিক স্তরে? মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ার দীর্ঘদিন ধরে ছিল এক ট্র্যাজিক নায়কের ইতিকথা । ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর অভিষেক ম্যাচটি খুব সুখখর ছিল না। ওই ম্যাচে হাঙ্গেরির বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠে নামার মাত্র ৪৩ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড দেখে তাঁকে মাঠ ছাড়তে হয়।
এরপর ২০০৬, ২০১০ এবং ২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেন তিনি। বিশেষ করে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে তিনি আর্জেন্টিনাকে প্রায় একক প্রচেষ্টায় ফাইনালে তুললেও জার্মানির কাছে পরাজিত হয়ে স্বপ্নভঙ্গ হয়। অবশ্য আর্জেন্টিনার পরাজয় ঘটলেও টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলার হিসেবে ‘গোল্ডেন বল’ পান তিনি। পর পর তিন বছরে তিনটি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনাল (২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকা) হেরে ব্যথিত মেসি ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার কথা ঘোষণা করৈন। তবে ফুটবল বিশ্ব এবং কোটি কোটি ভক্তের আকুল আবেদনে তিনি দ্রুতই অবসর ভেঙে ফিরে আসেন আবার ফুটবল মাঠে। ২০২১ সাল থেকে মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে এক অভূতপূর্ব মোড় ঘোরে। ওই বছর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে মারাকানা স্টেডিয়ামে হারিয়ে মেসি তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি কোপা আমেরিকা জয় করেন। এরপর ২০২২ সালের জুনে ইতালির বিপক্ষে ‘ফিনালিসিমা’ জয় করে আর্জেন্টিনা। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল মেসির কেরিয়ারের অন্যতম মহাকাব্য। ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে নিজে একাই ৭টি গোল এবং ৩টি অ্যাসিস্ট করে মেসি আর্জেন্টিনাকে প্রায় একক প্রচেষ্টায় ফাইনালে নিয়ে যান। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে কিলিয়ান এমবাপের হ্যাটট্রিকের জবাবে মেসি করেন জোড়া গোল। পেনাল্টি শুটআউটে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ গ্ৰহণ করেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে দুটি বিশ্বকাপে (২০১৪ ও ২০২২) গোল্ডেন বল জেতার অনন্য কীর্তি গড়েন তিনি। এরপর ২০২৪ সালেও তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে টানা দ্বিতীয়বার কোপা আমেরিকা জয়ের স্বাদ পান। বিশ্বকাপ ২০২৬-এও ৩৯ বছর বয়সেও রীতিমতো বুড়ো হাড়ে ভেলকি দেখিয়ে চলেছেন। প্রথম ম্যাচে তিনি হ্যাটট্রিক করেছেন। দ্বিতীয় ম্যাচেও অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে তিনি দুটি গোল করেন। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা লিওনেল মেসি। তাঁর গোলসংখ্যা ইতিমধ্যেই ১৮। পরবর্তী গোলদাতা জার্মানের ক্লোজে করেছেন ১৬ টি গোল। শুধুমাত্র অসামান্য ফুটবলার হিসেবে নয়, লিওনেল মেসির কেরিয়ারের পরিসংখ্যান এবং রেকর্ডগুলোও ঈর্ষণীয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্রীড়া সাংবাদিক নেভিল কার্ডাস একসময় একটি প্রতিবেদনে লিখেছিলেন : Scoreboard is an ass.। এই কথাটাকে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে বেদবাক্য হিসেবে গ্ৰহণ করা হয়। কিন্তু কথাটি যে ধ্রুবক নয়, কোনও কোনও ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও হতে পারে তার প্রমাণ স্বয়ং মেসি।
মেসির যেমন রয়েছে ঈর্ষণীয় রেকর্ড তেমনি তাঁর খেলায় আমরা প্রত্যক্ষ করি সৌন্দর্যচেতনা। মারাদোনা এবং মেসির কথা মাথায় রেখেও একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় মেসিই সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ফুটবলার। পেপ গার্দিওলা একবার বলেছিলেন, “মেসিকে নিয়ে লিখো না, তাঁর বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করো না। শুধু তাঁকে খেলা দেখতে থাকো।” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি। কারণ, কবিতাকে যেমন সবসময় তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না, শুধু অনুভব করতে হয়, মেসিও ঠিক তেমনি। তাঁর খেলা। আজ মেসির ৪০ তম জন্মদিন, কিন্তু আজও তিনি আমাদের কাছে বিস্ময়করভাবে তরুণ। আমরা আরও কিছুদিন মেসিম্যাজিকে আক্রান্ত হয়ে থাকতে চাই। মেসির আরও কিছু উল্লেখযোগ্য কীর্তি হল : ব্যালন ডি’অর ৮টি , ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু ৬টি, এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে সর্বোচ্চ গোল ৯১টি গোল (২০১২ সালে বার্সেলোনা ও আর্জেন্টিনার হয়ে, যা গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস), এক ফুটবলবর্ষে (২০১১-২০১২) ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ গোল ৭৩টি গোল, লা লিগার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোল ৪৭৪টি গোল (বার্সেলোনার হয়ে), আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ গোল ও ম্যাচ খেলার রেকর্ড— এগুলোর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য।





