RK NEWZ তারাতলায় ভেঙে পড়া গুদামের ভিতর আটকে রয়েছেন এখনও বেশ কয়েক জন। তাঁরা সংখ্যায় কত, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে গুদামের লোহা এবং কংক্রিটের কাঠামোর নীচ থেকে এখনও মানুষের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে সেনা। উদ্ধারকাজে হাত লাগিয়েছে তারা। আগে থেকেই ঘটনাস্থলে রয়েছেন দমকল এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলাকারী দল বা এনডিআরএফ-এর সদস্যেরা। তিনতলার ছাদের ঢালাইয়ের সময় তারাতলায় নির্মীয়মাণ গোডাউনের ছাদ ভেঙে বিপত্তি। প্রায় ১০ জনকে উদ্ধার করা হলেও এখনও ভিতরে বহু শ্রমিকের আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই নবান্নের তরফে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। বিপর্যয়ের খবর পেয়েই ঘটনাস্থলেই পৌঁছেছেন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ ও অগ্নিমিত্রা পাল। ইন্দ্রনীল খাঁ বলেন, “দমকল, পুলিশ, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী পৌঁছে গিয়েছে। সেনা নামানো হয়েছে। আমাদের প্রথম লক্ষ্য প্রাণগুলোকে বাঁচানো। দ্রুত গতিতে উদ্ধার কাজ শুরু করা হয়েছে।” পাশাপাশি তৃণমূলের আমলে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে গোডাউনটি তৈরি করা হচ্ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। গোটা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

উদ্ধারকাজে গতি আনতে একাধিক ক্রেন নিয়ে যাওয়া হয়েছে ঘটনাস্থলে। ৫০ টন পর্যন্ত ওজন তুলতে পারে, এমন হাইড্রোলিক ক্রেনও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওই ক্রেনের সাহায্যে ভেঙে পড়া কাঠামোটিকে আটকে রাখা হয়েছে, যাতে সেটি নতুন করে আর ধসে যেতে না পারে। প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে, গুদামটি প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট এলাকার উপর ছিল। মূল কাঠামোটির ভিতর কোনও দেওয়াল বা আলাদা কক্ষ না-থাকায় গোটা অংশটাই এক সঙ্গে ভেঙে পড়ে। অতিরিক্ত ভার সামলাতে না-পেরে লোহার বিমগুলিও জায়গায় জায়গায় বেঁকে গিয়েছে। প্রথমে ভেঙে পড়া কাঠামোর পিছন দিকে একটি জায়গা দিয়ে মাটি কেটে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন উদ্ধারকারীরা। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি। বন্দরের জমিতে তৈরি হচ্ছিল ওই চায়ের গুদামটি। বুধবার চলছিল তিনতলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ। সেই সময় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ। নিচে চাপা পড়ে যান শ্রমিকরা। খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দমকল, পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। আনা হয়েছে অত্যাধুনিক পদ্ধতির গ্যাসকাটার, ক্রেন। পৌঁছেছে অ্যাম্বুল্যান্স। খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছন বিধায়ক রাকেশ সিং, মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ ও অগ্নিমিত্রা পাল, পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে। সূত্রের খবর, ভিতর আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারের কাজ চলছে পুরোদমে। ইতিমধ্যেই ৭ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। রাকেশ সিংয়ের দাবি, ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে ভিতরে এখনও কমপক্ষে ৩০ জন আটকে রয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। উদ্ধার কাজে সেনা নামানো হয়েছে বলেও খবর। ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে ভেসে আসছে আর্তনাদ। বাইরে থেকে ভিতরে আটকে পড়াদের নাম ধরে ডেকে বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে তাঁরা কোন পরিস্থিতিতে রয়েছেন।

উদ্ধার হওয়া সমস্ত শ্রমিকদেরই অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় গ্রিন করিডোর করে তড়িঘড়ি কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়েই নবান্ন থেকে সরাসরি দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছেন রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলা সেনা ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর যৌথ অভিযানের ফলে ধ্বংসস্তূপের তলা থেকে এখনও পর্যন্ত মোট ১৬ জন শ্রমিককে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে লোহার বিশাল কাঠামোর নীচে ঠিক কতজন শ্রমিক এখনও আটকে রয়েছেন, তা এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে এই নির্মাণকাজ নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এলাকা সূত্রের খবর, ব্রেসব্রিজের কাছে এই বিশাল গুদামটি তৈরির কাজ গত প্রায় দেড় বছর ধরে একটানা চলছিল। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, আজ সকাল থেকেই গোডাউনের মূল লোহার কাঠামোটি অস্বাভাবিকভাবে নড়ছিল। সেই গলদ ও নড়বড়ে কাঠামোটি ঠিক কী অবস্থায় রয়েছে, তা পরখ করতে বা পরীক্ষা করতেই ছাদের ওপর ও নীচে জড়ো হয়েছিলেন বেশ কয়েকজন শ্রমিক। আর ঠিক তখনই তাসের ঘরের মতো আচমকা সম্পূর্ণ লোহার ছাদ ও ভারী বিম হুড়মুড় করে ধসে পড়ে। ফলে নীচে কর্মরত ও পরখ করতে যাওয়া সমস্ত শ্রমিকরা মুহূর্তের মধ্যে লোহার চাঁইয়ের তলায় চাপা পড়ে যান। যখন এই ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে, তখন ওই সাইটে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। ছাদটি ভেঙে পড়ার পরই চারদিকে তীব্র হাহাকার ও কান্নার রোল পড়ে যায়। লোহার বিমগুলি বিশালাকার ও অত্যন্ত ভারী হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে তা সরানো কোনও ভাবেই সম্ভব ছিল না। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী ও কলকাতা পুলিশের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর জওয়ানরা একাধিক জেসিবি ক্রেন এবং শক্তিশালী গ্যাসকাটার নিয়ে এসে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। গ্যাসকাটার দিয়ে লোহার বিমগুলি কেটে এবং জেসিবি দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ভেতরের আটকে থাকা বাকি শ্রমিকদের কাছে পৌঁছনোর আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুর্ঘটনাস্থলে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স।

এই ঘটনার খবর পেয়ে দুর্ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র তথা কলকাতার বন্দর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ফিরহাদ হাকিম। কিন্তু ঘটনাস্থলের মাত্র কয়েক মিনিট দূরত্বে পৌঁছলেও, শেষ পর্যন্ত সেখানে গিয়ে পা রাখতে পারলেন না কলকাতার প্রাক্তন মহানাগরিক! মাঝরাস্তায় পুলিশি বাধার মুখে পড়ে কার্যত বাধ্য হয়েই তাঁকে ফিরে আসতে হয়। নবান্ন ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, তারাতলার মূল দুর্ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ৩০০ মিটার দূর থেকেই ফিরে আসতে হয় ফিরহাদকে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, যেহেতু ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাক্তন কাউন্সিলরকে ধাক্কা খেতে হয়েছে, তাই এই সময়ে তাঁর সেখানে যাওয়া সমীচীন হবে না। প্রাক্তন মেয়রের যাতে সম্মানহানি না হয় সে কথা মাথায় রেখেই এই অনুরোধ করা হয়। সমগ্র পরিস্থিতির ওপর সরাসরি নবান্ন থেকে নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং রাজ্য সরকারের তরফে একটি বিশেষ আপৎকালীন কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও আটকে থাকা শ্রমিকদের পরিবারের সুবিধার্থে নবান্ন যে ৪টি হেল্পলাইন নম্বর জারি করেছে, সেগুলি হল – ১০৭০, ৮৬৯৭৯৮১০৭০, ০৩৩ ২২১৪৩৫২৬ এবং ০৩৩ ২২৫৩৫১৮৫।




