RK NEWZ প্রতিবাদ করেছিলেন অভিষেক ডালমিয়া। স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছিলেন। কিন্তূ, সংস্থার নাম একবারও কোথাও উচ্চারণ করেন নি। অথচ, প্রশ্ন উঠছে, অভিষেকের চিঠিতে কোথাও সিএবির নাম ছিলই না। তাহলে সিএবি কেন যেচে সাফাই গাইতে গেল? এটা কি খানিকটা ‘ঠাকুরঘরে কে? আমি তো কলা খাইনি’ হয়ে গেল? প্রশ্ন উঠছে, এই পদক্ষেপে কি সিএবির ‘দুর্নীতি’ই প্রকাশ্যে চলে এল? সিএবির প্রাক্তন সভাপতি অভিষেক ডালমিয়া ক্রীড়াক্ষেত্রে দুর্নীতি থামাতে আবেদন জানান। আলাদা করে কোনও সংস্থার নাম উল্লেখ না করার সত্ত্বেও, সেই চিঠির পালটা পত্রাঘাত করল সিএবি। বঙ্গ ক্রীড়া সংস্থার দাবি, যাবতীয় নিয়মকানুন মেনেই কাজ করেছে তারা। সিএবি সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় নিজে গিয়ে এই চিঠি তুলে দিয়েছেন ক্রীড়ামন্ত্রীর হাতে। ক্রীড়া মহলে প্রশ্ন উঠছে, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ক কেনই বা তাড়াহুড়ো করে দুর্নীতি নেই কথাটা জানাতে তড়িঘড়ি দৌড় দিতে হল? তিনি কী সত্যিই এবার রান আউটের আশঙ্কা করছেন?
অভিষেক ডালমিয়া ক্রীড়ামন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে বলেন, স্বনামধন্য এক ক্রীড়া সংস্থায় অর্থের বিনিময়ে খেলার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচনে থ্রেট কালচারেরও উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু অভিষেক একবারের জন্যও সিএবির নাম করেননি। যদিও ময়দানের অনেকে মনে করছেন, নাম না করলেও অভিষেকের নিশানায় সিএববি’ই। এই চিঠির প্রেক্ষিতে মুখ খুলেছেন ক্রীড়ামন্ত্রীও। ভবিষ্যতে বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বুধবার ক্রীড়ামন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছে সিএবি। দীর্ঘ সেই চিঠির সারকথা, সিএবির অন্দরে যাবতীয় কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা বজায় থাকে। বাংলার ক্রিকেটের স্বার্থেই কাজ করে সংস্থা। চিঠিতে আরও বলা হয়, অভিষেকের পত্রবাণের জেরেই এই চিঠি পাঠাচ্ছ সিএবি। মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, গত ৩০ বছর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বঙ্গ ক্রীড়া সংস্থার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠেনি। ক্রীড়ামন্ত্রীকে সিএবি’তে আসার আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে এই চিঠিতে। ময়দানের প্রশ্ন, যদি কোনো দুর্নীতি না-ই হয়ে থাকে, তা হলে নিজে থেকে যেচে সাফাইয়ের দরকারটা কোথায়? এই চিঠিতে আরও একটা গোলমাল রয়েছে। চূড়ান্ত বিতর্কের পর যুগ্মসচিবের পদ থেকে সরানো হয়েছে মদনমোহন ঘোষকে। কিন্ত এই চিঠিতে তিনি সই করেছেন প্রাক্তন হিসাবেই। সরকারি চিঠিতে কি প্রাক্তন পদাধিকারীর সই করার এক্তিয়ার থাকে? উঠছে অনেক প্রশ্ন। শাখ দিয়ে মাছ ঢাকতে উঠেপড়ে লেগেছেন বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলি।

এমনিতেই, কিছুদিন আগেই প্রাক্তন কিংবদন্তি ক্রিকেটার পঙ্কজ রায়ের পুত্র বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার প্রণব রায় সিএবির দুর্নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মুখ খুলেছেন। ‘বলতে বাধ্য হচ্ছি, সিএবি এখন মিথ্যের ভিত্তিতে চলছে’, আক্ষেপ প্রণব রায়ের। যত দিন যাচ্ছে, তত সিএবি আর বিতর্ক যেন সমার্থক হয়ে যাচ্ছে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের রাজত্বেই একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে। কখনও সংস্থার যুগ্ম সচিব মদন ঘোষ সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশিকাকে ‘অশ্রদ্ধা-অমান্য’ করে দিনের পর দিন পদে বসে রয়েছেন। নিজের প্রশাসনিক মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পরেও। কখনও সংস্থার অ্যাপেক্স কাউন্সিল সদস্য সুরজিৎ লাহিড়ীর বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ উঠে পড়ছে। কখনও আবার বাংলার প্রথিতযশা প্রাক্তন অধিনায়ক প্রণব রায়ের সঙ্গে বঙ্গ ক্রিকেট সংস্থার ‘যুদ্ধ-বিগ্রহ’ লেগে যাচ্ছে! এবার সিএবি কর্মী মনোজিৎ মৌলিকের বিরুদ্ধে একশো কোটি টাকার মানহানির মামলা করলেন প্রণব রায়। তাঁর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সেই সিএবি কর্মীর করা কুরুচিকর ফেসবুক পোস্টের বিরুদ্ধে। শুধু মামলা করাই নয়, আদালত থেকে সেই মামলার অন্তর্বর্তীকালীন আদেশও পেয়ে গেলেন প্রণব। যেখানে আদালতের তরফে সুস্পষ্ট নির্দেশিকা দেওয়া হল যে, অভিযুক্ত সিএবি কর্মী প্রণবের বিরুদ্ধে কোনও রকম অপমানজনক বিবৃতি বা পোস্ট করতে পারবেন না। দ্বিতীয়ত, সিএবি কর্মীর প্রতি আদালত-নির্দেশিকা হল, নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রণব রায় সম্পর্কিত যে পোস্ট তিনি করেছেন, অবিলম্বে সেটাকে ‘ফ্রিজ’ করে দিতে হবে। যথাযথ পদক্ষেপ করতে হবে। সুনিশ্চিত করতে হবে, সেই পোস্ট যেন ইন্টারনেটে অন্য কেউ ব্যবহার না করতে পারে। তৃতীয়ত, আগামী পনেরো দিনের মধ্যে অভিযুক্ত সিএবি কর্মীকে জানাতে হবে, কেন তাঁর বিরুদ্ধে এ হেন আদেশ প্রদান করা যাবে না? ঠিক কী ঘটেছে?
দিন কয়েক আগে প্রবাদপ্রতিম পঙ্কজ রায়ের জন্মদিন পানলকে কেন্দ্র করে কলঙ্কিত হয়েছিল সিএবি। পিতার জন্মদিন পালনে পঙ্কজ-পুত্র প্রণবকেই না ডেকে! যা নিয়ে তুলকালাম বেঁধে গিয়েছিল বাংলা ক্রিকেটে। যার পর ক্ষুব্ধ প্রণব বলেছিলেন যে, তাঁর পিতার জন্মদিন পালন বন্ধ করে দিক সিএববি! বঙ্গ ক্রিকেট সংস্থা সে রাত্রেই মিডিয়া রিলিজ করে জানিয়েছিল যে, পঙ্কজ-পুত্রকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। পঙ্কজের জন্মদিনে কোন ফুল ব্যবহার হয়েছিল, বাসি না টাটকা–তা নিয়েও একপ্রস্থ তর্ক-বিতর্ক চলে সে সময়। সিএবির কাছে প্রণব তাঁর বাবার জন্মদিন পালনের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজও চেয়ে পাঠান। যেহেতু ফুল নিয়ে এত কথা উঠছে। ঘটনাটা সেখানে শেষ হয়ে গেলে তবু কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। বরং সিএবি কর্মী পরবর্তীতে একটা ফেসবুক পোস্ট করে বসেন প্রণবের বিরুদ্ধে (যার প্রমাণ রয়েছে)। যেখানে তাঁকে কদর্য ভাবে আক্রমণ করা হয়। কেন তিনি সিএবির কাছে সিসিটিভি ফুটেজ চেয়েছেন, কেন ‘আমন্ত্রণ’ তিনি দেখেও দেখেননি, কী ভাবে সিএবি আধিকারিকদের ফোনের অপেক্ষায় না থেকে তিনি ‘কোটা’-র টিকিট তুলতে চলে আসেন– সব কিছু নিয়ে প্রণবকে আক্রমণ করে বসেন ওই সিএবি কর্মী। যার পরিণতি হিসেবে একশো কোটি টাকার মানহানির মামলা দায়ের। এবং আদালতের অন্তবর্তিকালীন আদেশ। প্রণব ক্ষুব্ধভাবে বললেন, ‘‘সিএবি কর্মীর পোস্ট থেকে এটা পরিষ্কার যে, উনি আমার বা আমার বাবা পঙ্কজ রায় সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এটা পরিষ্কার যে ওঁকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে লেখানো হয়েছে। দেখুন, আমার পরিবারকে কেউ যদি অপমান করে, আমাকে যদি অপমান করে, ছেড়ে কথা বলব না। কারণ আজ যদি ছেড়ে দিই, তা হলে আগামীকাল আবার আমাকে অপদস্থ করার চেষ্টা করা হবে।’’ সঙ্গে প্রাক্তন বাংলা অধিনায়কের উত্তেজিত সংযোজন, ‘‘সিএবির বিরুদ্ধে বলতে আমার ভালো লাগে না। কারণ, বাংলা ক্রিকেট, বাংলার ক্রিকেট সংস্থার কারণেই আমি প্রণব রায় হয়েছি। সংস্থার বিরুদ্ধে আমি বলছি না। বলছি, যারা সংস্থা আজ চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে। আমি মিডিয়ায় দেখেছি, বাবার জন্মদিনে যে ফুল ব্যবহার করেছে সিএবি, তা বাসি না তাজা, তাই নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। আমি তাই সিএবির কাছে সিসিটিভি ফুটেজ চেয়েছি। যাতে চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন হয়। তাতে ভুলটা কোথায়? আমি ফুটেজ চেয়ে ই-মেল করেছিলাম সিএবিকে। আজ পর্যন্ত তার কোনও উত্তর পাইনি। দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি, সিএবি এখন মিথ্যের উপর ভিত্তি করে চলছে!’’
ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রশ্ন? কে এই দাগী মনোজিৎ মৌলিক? সিএবিতে হঠাৎ অনুপ্রবেশ কিভাবে? একসময়ে সাংবাদিক পরিচয়ে অসংখ্য দুর্নীতিতে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে মনোজিৎ মৌলিকের বিরুদ্ধে। এক বৈদ্যুতিন মাধ্যমে নানান অনৈতিক ক্রিয়াকলাপে যুক্ত এই ব্যক্তি। কোনও সংবাদমাধ্যমেই ঠাঁই হচ্ছিল না জনৈক ব্যক্তির। যথার্থ যোগ্যতার অভাব থাকায় (ইংরেজী ভাষা বুঝতে, লিখতে, এমনকি বলাতেও অদক্ষতা প্রকট), খুব স্বল্প বেতনের চাকরিও কোনও সংবাদমাধ্যমে মেলেনি বলে শোনা যায়। এমনকি কস্মিনকালেও কোনও বড় সংবাদমাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই বলেও শোনা যায়। এই সময়ে দ্বারস্থ হন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের। বিভিন্ন অছিলায় সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে সিএবির মিডিয়া সম্পর্কে ভুল তথ্য পরিবেশন করে, বঙ্গ ক্রিকেট সংস্থার মাথা গলানোর সুযোগ হাতছাড়া করেননি এই মনোজিৎ। সূত্র মারফৎ জানা যায়, উক্ত ব্যক্তির নামে স্ত্রী ব্যাভিচার থেকে শুরু করে অত্যাচার এমনকি ডিভোর্সের ফৌজদারী মামলাতেও নাম জড়িয়ে রয়েছে এই সিএবি কর্মীর। স্ত্রীর উপর অকথ্য নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে বলে শোনা গিয়েছে এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সিএবিতে এই কর্মীর নিয়োগ নিয়েও বিতর্কের ঝড় উঠেছিল সেই সময়ে। নিজেকে সেফ জোনে রাখতেই, প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সুযোগ কাজে লাগান ধুরন্ধর চাতুর্যে ভরা এই সুযোগসন্ধানী কর্মী। সিএবির অন্দরমহলে প্রবেশের পরই কোনও কোনও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিকেও হুমকি জারি করার অভিযোগ রয়েছে মনেজিতের বিরুদ্ধে। সিএবির অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যায়, সংস্থার দীর্ঘদিনের কর্মরত অধিকাংশ কর্মীরাই ক্ষিপ্ত মনোজিতের উপর, এমনকি আড়ালে আবডালে মানসীক বিকারগ্রস্ত বলেও অভিহিত করে থাকেন অনেকেই, এমন অভিযোগও রয়েছে। সংস্থায় থেকে নানান রাজনৈতিক পোস্টও বিতর্কের ঝড় তুলেছে। সিএবির কর্মী হয়ে এইরকম রাজনৈতিক পোস্ট করা যায় কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। ‘মাথার উপর সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের হাত আছে’- হাবেভাবে ও কথাবার্তায় এ হেন আচরণে সংস্থার কেউই প্রতিবাদ করতে বা মুখ খুলতে পারেন নি। এবার মনোজিৎ সরাসরি আঘাত করলেন গৌরব অর্জন করা ক্রিকেটারকে অসম্মান করে। কদর্য ভাবে আক্রমণ করা হয়। প্রাক্তন বাংলা অধিনায়ক ক্ষোভে উত্তেজিত। সামান্য এক সিএবির কর্মীর কাছ থেকে প্রাপ্ত অনাকাঙ্খিত অপমানের যন্ত্রনায় কাতর। প্রণব রায়ের অপমানে ক্ষুব্ধ বাংলার ক্রিকেট মহল। নতুন সরকারের রাজত্বে সর্ব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতার অভিযান চলছে। অচিরেই উক্ত ‘দাগী’ কর্মীর বরখাস্তের দাবিও উঠেছে ক্রিকেট মহলে। উক্ত কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রীকে চিঠিও পাঠাবেন প্রাক্তন ক্রিকেটারদের অধিকাংশই, বলে সূত্রের খবর। আপাতত দেখার বিষয়, একাধিক কলঙ্কে কালিমালিপ্ত কর্মীর শাস্তি হিসাবে সিএবি থেকে বিতাড়িত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কি না? অপেক্ষায় ক্রীড়ামহল। অভিষেক ডালমিয়া ক্রীড়ামন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে বলেন, স্বনামধন্য এক ক্রীড়া সংস্থায় অর্থের বিনিময়ে খেলার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচনে থ্রেট কালচারেরও উল্লেখ করেন। ‘সিএবি’তে দুর্নীতি নেই’, অভিষেকের চিঠির পরেই ক্রীড়ামন্ত্রীকে ‘আগ বাড়িয়ে’ বলে এলেন সৌরভ। ক্রীড়ামহল এই বিষয়টাকে অনেকটা সাফাই হিসাবে দেখে প্রশ্ন তুলেছে। ক্রীড়ামন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক্তন এই ক্রিকেটারের ছবি সোস্যল মিডিয়ায় বিতর্কের ঝড়ও তুলেছে। আগ বাড়িয়ে সৌরভের উপস্থিতির বিষয়কে ‘সেটিং’ এর বার্তাও বলে অভিহিত ছাড়েননি নেটিজনেরা?




