Friday, July 3, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

সিএবি’‌র প্রতি কৃতজ্ঞ কেকেআর সুপার ফ্যান অশোক!‌ নবদ্বীপের কলকাতা নাইট রাইডার্স ভক্ত রাতে খেলা দেখেও ট্রেকিং করেন!‌

কলকাতা নাইট রাইডার্স অর্থাৎ কেকেআর দলের সুপার ফ্যান। ১৯৯৯ সাল থেকে ইডেন গার্ডেনে হাজির থাকা। প্রতিটি আইপিএল এবং ভারতের ম্যাচেই। নবদ্বীপের অশোক চক্রবর্তী। এই মরশুমে নাইটদের সব খেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ সহ ‘‌গোল্ডেন টিকিট’‌ জয়ী। আইপিএলে কেকেআরের প্রথম হোম ম্যাচে মাঠে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন অশোক। কেকেআর এসআরএইচকে ম্যাচের আতিথ্য নবদ্বীপের বাসিন্দাকে। ইডেন গার্ডেনের বাইরে আবার কখনও গ্যালারিতে হাজির থাকেন অশোক চক্রবর্তী। ইডেনে প্রবেশাধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে সিএবি’‌র প্রতি কৃতজ্ঞ অশোক। বাংলার সকলের ‌‘‌দাদা’‌ সৌরভ গাঙ্গুলির কেকেআর দলের হয়ে আইপিএল খেলা শুরু থেকেই নাইটদের ফ্যান এই নবদ্বীপের বাসিন্দা। ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল প্রেসিডেন্ট স্নেহাশীষ গাঙ্গুলির প্রতিও কৃতজ্ঞ বলে জানালেন ‘‌গোল্ডেন টিকিট’‌ জয়ী। কেকেআর সুপার ফ্যান অশোক।

অগনিত ভক্তের সমাহার। সকলের মাঝেই রয়েছেন অশোক চক্রবর্তী। নবদ্বীপে একটি স্টেশনারি দোকান চালান ৪৫ বছরে অশোক। ১৯৯৯ সাল থেকে ইডেন গার্ডেনে আইপিএল বা ভারতের একটিও ম্যাচ মিস করেননি। ২০০৮ সাল থেকে ইডেনে কলকাতা নাইট রাইডার্স অর্থাৎ কেকেআরের সমস্ত হোম ম্যাচেই উপস্থিত থাকা। অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেকেআর ম্যানেজমেন্ট অশোককে সুপারফ্যান উপাধিতে ভূষিত করে। মার্চে নাইটস আনপ্লাগডে “গোল্ডেন টিকিট” জয়ী। এই মরসুমে হোম এবং অ্যাওয়ে সমস্ত কেকেআর ম্যাচ দেখার সুযোগ। অশোকের বাড়ি থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে ইডেন। কেকেআর-এর খেলা দেখার জন্য পাগল সমর্থক। ভ্রমণ ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের খেলা দেখার জন্য প্রথম ইডেনে পা রাখা। ইডেনে ম্যাচ চলাকালীন শচীন তেন্ডুলকরের প্রেমে পাগলপারা। মাস্টার ব্লাস্টার দুটি ইনিংসে মাত্র নয় রান করেছিলেন। প্রথম ইনিংসে গোল্ডেন ডাকও ছিল। ভারত ৪৬ রানে ম্যাচ হেরেছিল। সবচেয়ে আবেগপ্রবণ ভক্তদের একজন অশোক। কেকেআরের সুপারফ্যান। ইডেনে ম্যাচের দিনগুলিতে, অশোককে সহজেই চেনা যায় তার রঙ করা শরীর, একটি শঙ্খ, একটি বিশাল ভারত বা কেকেআর পতাকা। ঘন্টার পর ঘন্টা পরিশ্রম এবং ঘামের ঝরানো। মাথায় নিজের জন্য তৈরি একটি অনন্য মুকুট। কেকেআর সন্ধ্যায় তাদের ঘরের মাঠে খেলা বা অনুশীলন যাই হোক না কেন। হাজির অশোক। ম্যাচ সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিটে শুরু। অশোক সকাল ১০ টায় নবদ্বীপে তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে রওনা দেন ইডেনের উদ্দ্যেশে। আড়াই ঘন্টার ট্রেন জার্নি। হাওড়া স্টেশনে এসে গঙ্গা পার হওয়ার জন্য ফেরিতে। বিকাল ৩টার মধ্যে ইডেনে পৌঁছানো। এর পর খেলা শুরু হওয়ার আগে সাজতে জন্য প্রস্তুত হতে চার ঘন্টারও বেশি সময় লাগে। কেকেআর খেলোয়াড়দের ওয়ার্ম আপ করার সময়ের থেকেও দ্বিগুণেরও বেশি সময় অতিবাহিত করতে হয় এই ফ্যানকে! অশোকের ম্যাচ-পূর্ব প্রস্তুতি। রঙের বাক্স বের করে এবং দুই তরুণকে (যারা মুখ এবং শরীরের রঙ করার বিশেষজ্ঞ) তাকে সাহায্য করতে বলে। অশোকের খালি গায়ে সাদা হাইলাইট সহ একটি সাধারণ বেগুনি টি-শার্ট আঁকা। শরীরের উপরের অংশ বেগুনি রঙ করার পর শুখনো করার জন্য পর্যাপ্ত সময় নিতে হয়। অশোক কেকেআর রঙে রঙিন। ম্যাচের দিনের বার্তায় ভুল বানান না হয়। এই মরসুমে কেকেআরের থিমের সঙ্গতি রেখে অশোকের বার্তা, ‘‌রুকেঙ্গে নাহি, ঝুকেনগে নাহি’‌ অর্থাৎ আমরা থামব না, আমরা মাথা নত করব না। বার্তার ঠিক উপরে, অশোক তার ঘাড়ের নীচে ‘‌এএমআই কেকেআর’‌ রঙ। পিঠে প্রয়াত ক্রিকেট প্রশাসক জগমোহন ডালমিয়ার প্রতি তার ঐতিহ্যবাহী শ্রদ্ধাঞ্জলি। অশোকের মাথায় মুকুটটাই নাইট রাইডার্সের হেলমেটের মতো। শহরের সবচেয়ে গ্ল্যামারাস টপ। ২০০০ সাল। ভারতীয় দলের জার্সি কেনার সামর্থ ছিল না। ইডেনে খেলা দেখার সামর্থও ছিল না। দলের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করার জন্য একটি টি-শার্টের নকশায় নিজেকে রাঙিয়ে তোলার কথা ভাবা। তারপর থেকে আমি থামেননি অশোক। আজকাল ইডেনে আসার জন্য কেউ অশোকের কাছ থেকে টাকা নেন না। বছরের পর বছর ধরে সিএবি-এর সমর্থন এবং উদারতার জন্য অশোক তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। অশোক বলেন ‘‌ইডেনে আমার প্রথম খেলা চলাকালীন, ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে শচীন রান আউট হয়ে যান। রান করার চেষ্টা করার সময় তাঁকে শোয়েব আখতার ধাক্কা দিয়ে ফেলেছিলেন বলে মনে হয়েছিল। পুরো মাঠ এমনভাবে কেঁপে ওঠে যে ম্যাচ থামাতে হয়। আমার মনে আছে শচীন তখন জগমোহন ডালমিয়ার (তৎকালীন আইসিসি এবং সিএবি সভাপতি) সাথে বেরিয়ে এসে ভক্তদের শান্ত করেছিলেন। খেলা আবার শুরু হয় এবং ক্রিকেটের প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মে’‌। অশোক জানতে পারেন যে ২০০৮ সালে আইপিএলের অভিষেকের আগে কেকেআরকে শাহরুখ খান কিনেছেন এবং সৌরভ গাঙ্গুলি নেতৃত্বের শুরু থেকেই নাইটদের সমর্থন করা শুরু। “২৫ বছরের ক্রিকেট প্রেমে, আমি যখনই ইডেনে এসেছি, ততবারই আমি অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। ধীরে ধীরে, মানুষ আমাকে নবদ্বীপের ভক্ত হিসেবে চিনতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর, ক্যান্টিনে বিক্রেতারা আমার কাছ থেকে টাকা নেওয়া বন্ধ করে দেয়। এমনকি আমি যখন ইডেনে আসি তখন কেউ আমার কাছ থেকে টাকা নেয় না। আমি জগমোহন এবং অভিষেক ডালমিয়ার পাশাপাশি সৌরভ এবং স্নেহাশিস গাঙ্গুলির কাছে বছরের পর বছর ধরে তাদের উদারতা এবং সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞ। সিএবি সর্বদা আমাকে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধায় ভরিয়ে দিয়েছে, এবং ইডেনে প্রতিটি সফরে ফ্যানসুলভ এই ধরনের আচরণ করতে পেরে আমি অবিশ্বাস্য বোধ করি ও নিজেকে ধন্য মনে করি।” আবেগপ্রবণ অশোক।

২০২০ সালে, কেকেআর অশোককে সুপারফ্যান হিসেবে স্বীকৃতি। অশোকের ছবি টিম বাসে এবং বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংয়ে। ‘‌কেকেআর ম্যানেজমেন্ট আমার প্রতি সত্যিই সদয় হয়েছে। সুপারফ্যান হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া আমার জন্য খুবই গর্বের। এই বছর, যখন তারা আমাকে নাইটস আনপ্লাগড ইভেন্টের জন্য ডাকে, তখন আমি বুঝতে পারিনি আমি কী করব। কিন্তু যখন আমি মঞ্চে উঠি, শ্রেয়স আইয়ার আমাকে গোল্ডেন টিকিট দেন, যা অবিশ্বাস্য ছিল! প্রথমে, আমি টিকিটের অর্থ জানতাম না, কিন্তু তারপর কেউ আমাকে ব্যাখ্যা করে যে আমি কেকেআরের সমস্ত খেলায় প্রবেশাধিকার পাব, বাড়িতে এবং বাইরে। কেকেআর আমার ভ্রমণ, খাবার এবং থাকার ব্যবস্থাও করতে রাজি হয়েছিল, “অশোক বলেন। এই মরশুমের আগে, একজন ভক্ত হিসেবে অশোকের প্রতিশ্রুতির কারণে সিএবি তাকে কেকেআর বা ভারত, প্রতিটি ইডেন ম্যাচের জন্য বিনামূল্যে টিকিট দিয়েছে। এখন, কেকেআরের জন্য ধন্যবাদ, সারা দেশে কেকেআরের অ্যাওয়ে ম্যাচের জন্য একই বিলাসিতা প্রাপ্তি।’‌ অশোক ২০২৪ সালে বেঙ্গালুরু, দিল্লি এবং চেন্নাইতে কেকেআর-এর খেলা দেখেছেন। গত বছরের নভেম্বরে আহমেদাবাদে আইসিসি পুরুষদের ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখার পাশাপাশি ভারতের স্টেডিয়ামগুলির মধ্যে ইডেনের স্থান প্রথম বলে তিনি মনে করেন। ‘‌ইডেন আমার কাছে এক নম্বরে। আপনি স্টেডিয়ামে যত আসনই রাখুন না কেন, আপনি অন্য কোথাও ইডেনের আবেগ এবং পরিবেশ পুনরায় তৈরি করতে পারবেন না। বিশ্বকাপ ফাইনালের সময়, নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম খেলার বেশিরভাগ সময়ই মৃত ছিল। যখন ট্র্যাভিস হেড সেঞ্চুরি করেছিলেন, তখন দর্শকরা খুব কমই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। খুব কম লোকই হাততালি দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। এটিকে ইডেনে ভারত বনাম পাকিস্তানের সাথে তুলনা করুন (জানুয়ারী ২০১৩ সালে) যখন নাসির জামশেদ ১০০ রান করেছিলেন এবং কেউ বসে ছিল না। তাহলে যদি একজন পাকিস্তানি খেলোয়াড় তিন অঙ্কে পৌঁছাতেন? ইডেন সবসময় ভালো ক্রিকেটের প্রশংসা করে।’‌ অশোকের দৃঢ় বিশ্বাস।ইডেনে সেঞ্চুরি। অশোক কোন খেলা বা অভিজ্ঞতাকে ক্রিকেটের মক্কায় তার সেরা বলে মনে করেন? ‘‌এটা অবশ্যই ২০০১ সালের সেই বিখ্যাত টেস্টে ভারত ফলোঅনের পর অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল। ভিভিএস লক্ষ্মণ এবং রাহুল দ্রাবিড় ক্রিকেট মাঠে আমার দেখা সেরা প্রত্যাবর্তনের চিত্র।’‌ ভারতীয় ক্রিকেটে মরশুমে গৌতম গম্ভীরকে নাইটস ডাগআউটে ফিরে আসতে দেখে আনন্দিত অশোক বলেন, ‘‌২০১১ সালে যখন গম্ভীর অধিনায়কত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি তারকাদের একটি দলকে একটি পরিবারে পরিণত করেছিলেন। এখন তিনি ফিরে এসেছেন, আমি নিশ্চিত যে ২০২৪ আবার কেকেআরের বছর হতে পারে।’‌

ইডেনে তীর্থযাত্রা ছাড়াও, অশোক ট্রেকিংয়ের একজন বিরাট ভক্ত, বলেন “আমি নবদ্বীপের একটি ট্রেকিং ক্লাবে অনুশীলন করি এবং আমরা প্রায়শই দীর্ঘ দূরত্ব ভ্রমণ করি, যার মধ্যে হিমালয়ও রয়েছে।,” ইডেনে প্রতিটি খেলার পরে বাড়ি ফেরা ট্রেকিং নিজেই চ্যালেঞ্জিং। উভয় দল স্টেডিয়াম খালি করার পরে যত দেরিই হোক না কেন, অশোক হাওড়া স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হন শরীরের রঙ অক্ষত। প্রায়শই মধ্যরাতেরও বেশি সময় পরে। ট্রেনে ওঠার পরের দিন সকাল ৭টার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসেন। অশোকের কথায়, “আমি কখনও ম্যাচ দেখিনি এই আশায় যে আমি এর থেকে কিছু পাব। আমি এটা ভালোবাসা থেকে দেখেছি। বাড়ি ফিরে ক্লান্ত না হয়ে সরাসরি কাজে ফিরে যাই,” অশোকের কাছে ক্রিকেটের প্রতি তার নিষ্ঠা অসাধারণ কিছু নয়। এটি এমন কিছু যা তার কাছে স্বাভাবিকভাবেই আসে। সর্বোপরি, একজন কেকেআর সুপারফ্যান হিসাবেই নিজেকে পরিচয় দিতেই পছন্দ করেন কলকাতা নাইট রাইডারর্সের ভক্ত।

ছবি তুলেছেন ক্রীড়া চিত্রসাংবাদিক অরিন্দম দাস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles