RK NEWZ সরকার বদলের আগে ভয়ের চোটে অনেক কথাই বলতে পারেননি অভিযোগকারিণী। তিনি জানান, কেবল চোখের জল ফেলেছেন। অবশেষে স্বস্তি পেলেন তিনি। চোখের জল মুছে চওড়া হাসি হাসছেন। তাঁর করা অভিযোগের ভিত্তিতেই আলিপুর থানায় গ্রেফতার প্রাক্তন ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস। আনন্দবাজার ডট কম-এর কাছে অভিযোগকারিণীর দাবি, “চোখের জলের দাম পেলাম। আমি খুব খুশি।” স্বরূপের গ্রেফতারি নিয়ে মুখ খুলেছেন বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষও। তাঁর কথায়, “আবার প্রমাণিত, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।” টলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি রহস্য-রোমাঞ্চ ছবির চিত্রনাট্যকেও হার মানাবে! দীর্ঘদিন ধরেই প্রাক্তন ফেডারেশন সভাপতির বিরুদ্ধে লাগাতার অভিযোগ সিনেমহল্লার সবার। রাজ্য রাজনীতির পালাবদল ঘটতেই এ ভাবে স্বরূপের অস্তিত্ব লুপ্ত হবে, সম্ভবত ভাবতে পারেননি তিনিও। তাই বৃহস্পতিবারের রাতে স্বরূপের গ্রেফতারির খবর ছড়াতেই চমকে উঠেছে টলিউড। একই সঙ্গে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন অনেকেই। অভিযোগকারিণীই যেমন বলেছেন, “গত দু’বছর ধরে আমি কী ভাবে দিন কাটিয়েছি, একমাত্র আমিই জানি। কাজ নেই। স্বরূপদার কাছে লিখিত অভিযোগ জানানোয় আমায় খুনের হুমকি দেওয়া হয়।” প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে সেই সময়েও প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ওই মহিলা রূপটানশিল্পী। বিজেপি সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়ার পর বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতে বৈঠক করেছিলেন কলাকুশলীদের সঙ্গে। সে দিনও অভিযোগকারিণী তাঁর দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন বিধায়কের সামনে। রুদ্রনীলের কাছে সে প্রসঙ্গ তুলতেই তাঁর বক্তব্য, “আমি সবিস্তার কিছুই জানি না। তবে স্বরূপের অত্যাচারে নাভিশ্বাস উঠেছিল টলিউডের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সব জেনেও প্রশ্রয় দিয়েছেন তাঁকে।” একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে মেকআপ আর্টিস্ট গিল্ড-এর অন্য এক সদস্য পাপিয়া চন্দকে। তাঁর আফসোস, “স্বরূপদা কিন্তু প্রথম দিকে আমাদের জন্য ভালই কাজ করছিলেন। পরে বদলে গেলেন তিনি।” তাঁর অভিযোগের আঙুল তাঁর গিল্ড-এর সম্পাদক বাপি মালাকারের দিকেও। অভিযোগে জানিয়েছেন, টাকা ছাড়া কোনও কাজ করতে চাইতেন না বাপিও। “কার্ড হারিয়ে ফেললে আগে টাকা চাইতেন। তার পর তার ব্যবস্থা করতেন।” তহবিল গড়তে গিল্ড-এর সদস্যদের উপার্জনের ৭.৫ শতাংশ অর্থ জমা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন স্বরূপ। সে বিষয়েও আপত্তি পাপিয়ার। তাঁর কথায়, “আমরা রাজি হইনি। আমাদের টাকায় তহবিল গড়ে যদি আমাদের সহযোগিতা করা হয়, তা হলে আমরাই তো টাকা জমিয়ে নিজেদের আপৎকালীন প্রয়োজন মেটাতে পারি। তার জন্য স্বরূপ বিশ্বাস বা ফেডারেশনকে টাকা দিতে যাব কেন?”
স্বরূপ জেলে যেতেই মুখ খুললেন অনির্বাণ? ‘আমরা এগুলো জানতাম বলেই বিরোধিতা করেছিলাম।’ ৪ জুন গ্রেফতার হন স্বরূপ বিশ্বাস। তার পরের দিন শহরের এক অনুষ্ঠানে হাজির হন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। সেখানেই মুখ খুললেন অভিনেতা। টলিউডের প্রাক্তন ফেডারশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস এখন জেলবন্দি। তাঁর সঙ্গে যে ক’জন অভিনেতা ও পরিচালকের মতের বিরোধ সর্বজনবিদিত, তাঁদের মধ্যে অনির্বাণ ভট্টাচার্য অন্যতম। গত দু’বছর ধরে অনির্বাণের সঙ্গে যেন প্রায় স্নায়ুর লড়াই চলেছে স্বরূপের। পরিচালক-প্রযোজকেরা যখন টলিপাড়ায় কর্মবিরতির ডাক দেন, সেই সময়ে প্রথমের সারিতে ছিলেন অনির্বাণ। এর পরেই শোনা যায়, ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি ‘ব্যান্ড’! স্বরূপের গ্রেফতারির পরে মুখ খুললেন অভিনেতা। ২০২৫ সালে ‘রঘু ডাকাত’ ছবির মুক্তির পরে সে ভাবে আর কিছু মুক্তি পায়নি তাঁর। চলতি বছরের শুরুতে অনির্বাণের হয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান দেব। তবুও মন গলেনি স্বরূপের। ৪ জুন স্বরূপের গ্রেফতারির পরের দিন, শুক্রবার শহরের এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তারকা। সেখানেই অনির্বাণ জানান, এ লড়াই তাঁর একার নয়। গত দু’বছরে তেমন কাজ পাননি অনির্বাণ। অন্য পরিচালকেরা ক্ষমা চাইলেও সে পথে হাঁটেননি তিনি। স্বরূপের বিরুদ্ধে যেন নিশ্চুপেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন তিনি। শুক্রবার অভিনেতা বলেন, ‘‘অনেকে লড়াই করেছেন। আমি একা নই। আমি তো ইন্ডাস্ট্রির আলোর দিকের মানুষ। গ্ল্যামারের দুনিয়ায় অভিনেতাদের অবাধ চলাফেরা। তবে ইন্ডাস্ট্রির যাঁরা কলাকুশলী, যাঁরা উপার্জনের দিকে কিংবা গ্ল্যামারের দিক থেকে অনেকটা পিছনে— তাঁরা অনেক বেশি ভুগেছেন। আর স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেফতার হওয়ার পরে যে লোকে সবটা জেনেছে, তেমন নয়। আমরা এগুলো জানতাম বলেই, এর বিরোধিতা করেছিলাম।’’ স্বরূপের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ অভিযোগ। চলছে তদন্ত। অন্য দিকে, নতুন ছবির শুটিং শুরু করেছেন অনির্বাণ। তাঁকে দেখা যাবে দেব ও শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দেশু ৭’ ছবিতে।
তৃণমূল জিতলে আমাকেও ‘ব্যান’ করতেন স্বরূপ, ক্ষমাও চাইতে বলা হয়! হেরে যাওয়া মানুষকে নিয়ে আর কী-ই বা বলব। স্বরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে বারবার দ্বন্দে জড়িয়েছেন দেব। কী-ই বা বলা যায় একজন হেরে যাওয়া ব্যক্তিকে নিয়ে? হেরে যাওয়া মানুষের সঙ্গে লড়াইয়েরই বা মানে কী? দেবের স্বভাব এমন নয়! স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারির প্রসঙ্গে এখন এমনই প্রতিক্রিয়া সাংসদ-অভিনেতা দেবের। একই সঙ্গে দেব জানান, নতুন সরকারকে সবটা গুছিয়ে নিতে একটু সময় দেওয়া হোক। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপরে ভরসাও রাখেন দেব। টলিগঞ্জের ফিল্ম পাড়ায় স্বরূপের ‘দাপট’ চালানোর কথা নতুন নয়। আর তা নিয়ে দেবের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্বও বহুচর্চিত। বৃহস্পতিবার রাতে তোলাবাজি ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে টলিউডের সেই ‘সর্বেসর্বা’ স্বরূপকে গ্রেফতার করে নিউ আলিপুর থানার পুলিশ। রাত ৯টা নাগাদ তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় নিউ আলিপুর থানায়। শুক্রবার সকালে আলিপুর আদালতে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। গ্রেফতারের পর থেকেই টালিগঞ্জের বহু শিল্পী-পরিচালক নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সেই থেকেই দেবের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষায় অনেকে। অবশেষে আনন্দবাজার ডট কমের কাছে মুখ খুললেন দেব। অভিনেতা বলেন, ‘‘গতকাল রাত থেকেই প্রচুর ফোন পেয়েছি। একটা কারণেই উত্তর দিতে চাইনি। কী বলব একজন হেরে যাওয়া মানুষকে নিয়ে! হেরে যাওয়া মানুষের সঙ্গে লড়াই করব? এখন প্রচুর কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কী লাভ! যে যার কর্মের ফল ভুগবে। দেবের চরিত্র এমন নয় যে, কারও খারাপ সময়ে কিছু বলবে। যখন ওঁর ভাল সময় ছিল, তিনি সকলের খারাপ সময় এনে দিয়েছিলেন।’’
খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর নিজেরও। অভিনেতা জানান এত দিন না বলা অভিযোগের কথা। দেব বলেন, ‘‘আমি প্রথম বার বলছি কথাটা, আমাকেও সমাজমাধ্যমে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছিল! না হলে আমাকে আর কাজ করতে দেওয়া হবে না, এমনও বলা হয়েছিল। আমি আমার লড়াইটা লড়েছি। আজ তিনি তাঁর কর্মের ফল পেয়েছেন।’’ তৃণমূলের নেতা অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপকে নিয়ে ভূরি ভূরি অভিযোগ এসেছে। টলিউডের এক রূপটানশিল্পীর করা অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর গ্রেফতারির পর থেকে আরও বহু ‘না বলা’ অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে টলিপাড়ায়। দেবের বক্তব্য, ‘‘আমার কাছেই ঝুড়ি ঝুড়ি অভিযোগ এসেছে ওঁর বিরুদ্ধে। আমাদেরও দোষ আছে অনেক। এখনও মনে আছে, আমি আর্টিস্ট ফোরামকে একটা মেল পাঠিয়েছিলাম যে, এত জন শিল্পীকে ব্যান করে রাখা হয়েছে। আর্টিস্ট ফোরামও কিন্তু তখন পদক্ষেপ করেনি। তারা কেন প্রশ্ন করল না স্বরূপ বিশ্বাসকে? আমরা যদি মাথা নিচু করি, আমাদের উপর দিয়ে তো হাঁটবেই কেউ না কেউ। যাঁরা মাথা উঁচু করে ছিলেন, তাঁদের আজ সম্মান বাড়ল। তাঁদের মুখে এখন হাসি, উল্লাস।’’ দেব মনে করান, শুধু শিল্পী নন, বহু টেকনিশিয়ানকেও ‘ব্যান’ করে রেখেছিলেন স্বরূপ। তাঁদের রুজি-রুটিও তো এই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকেই আসার কথা। দেবের অভিযোগ, সমস্যায় পড়ে, ভয় পেয়ে অনেকে আত্মহত্যা করতে গিয়েছেন। দেব বলেন, ‘‘আমি অনেক টেকনিশিয়ানের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। বলেছি, ভাল দিন আসবে। তাঁদের অভিশাপও তো গায়ে লাগবে। আমি চাই না কেউ জেলে যাক। কিন্তু তিনি যা করেছেন, আজ তারই পরিণতি এটা।’’ এক রূপটানশিল্পীর অভিযোগ, তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে কাজ দিতেন না স্বরূপ। তখন তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল, স্বরূপ স্বমহিমায় ছিলেন। তাঁকে ভয় দেখানো হত, সেই খবর পেয়ে দেব তাঁকে এফআইআর করতে বলেছিলেন। শুক্রবার সে কথা নিজেই জানান দেব। এত দিন ধরে জমে থাকা বহু বিরক্তি প্রকাশ পায় অভিনেতার কথায়। তিনি বলেন, ‘‘আমি চেষ্টা করেছি, আমার টেকনিশিয়ানেরা যাতে নির্ভয়ে থাকতে পারেন। যদি দল জিতত, স্বরূপকে আটকানো মুশকিল হয়ে যেত। আমিই ব্যান হয়ে যেতাম। আমি ডিসেম্বর থেকে লড়ছি। স্ক্রিনিং কমিটি হয়েছে, আমি ভোট দিইনি। আমার নামে অভিযোগ দিতে লালবাজারে পৌঁছে গিয়েছিলেন অনেকে। তার মুখও ছিলেন স্বরূপ বিশ্বাস। ‘দেশু ৭’-এর ঘোষণা করার পর আমাকে বলা হয়েছিল, আমি ছবি রিলিজ় করতে পারব না। কারণ, স্ক্রিনিং কমিটিতে আমি ভোট দিইনি। ১২ জন বলেছিলেন, পুজোয় দেবের ছবি রিলিজ় করতে পারবে না। আসলে ক্ষমতা আজ আছে, কাল নেই। ভালবাসা সব সময় থাকে। অন্যায় করলে প্রতিবাদ তো হবেই।’’
আগামী দিনে যাঁরা ‘ইন্ডাস্ট্রি’ চালাবেন, তাঁদের জন্য বিশেষ অনুরোধও রয়েছে দেবের। তাঁর স্পষ্ট কথা, ‘‘আমার অনুরোধ, তাঁরা যেন স্বরূপ বিশ্বাসের মতো ভুল না করেন। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিভার অভাব নেই। কী ভাবে তাঁদের নিয়ে কাজ করানো যায়, তাঁদের তৈরি করা যায়, সে দিকেই লক্ষ্য হওয়া উচিত। নিজের সেরাটা দেওয়ার জন্য সেমিনার হওয়া উচিত। আরও সেরা কাজ করা যায়।’’ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে কি ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে দেবের চিন্তার বার্তা পৌঁছেছিল? দেব বলেন, ‘‘আমি নিজেই অনেক বার জানিয়েছি তাঁকে। এখন দল নির্বাচনে হেরেছে বলে আমরা সকলেই কথা বলছি। সেই সময়ে কেন প্রতিবাদ করিনি? আমাকে বলা হয়েছিল, আমার ছবিতে মিঠুন চক্রবর্তী আছেন বলে নন্দনে শো দেওয়া হয়নি। আমি আবার পরের ছবিতে মিঠুন চক্রবর্তীকে নিয়েছি। আমি আমার মতো করে প্রতিবাদ করেছি। এর পর থেকে আমার প্রযোজনা সংস্থার তৈরি কোনও ছবি নন্দনে চালাইনি। অতনু রায়চৌধুরীর হাত ধরে আবার আমার ছবি নন্দনে চলে। আমি আজ এটা বিক্রি করছি না। আমাদের সকলের সেই সময়ে আরও প্রতিবাদ করা উচিত ছিল। রুদ্রনীল, হিরণ তো প্রতিবাদ করে অন্য দলে চলে গিয়েছিলেন। তাঁদের প্রতি আজ সম্মান বেশি মানুষের। আমার অরূপ বিশ্বাস, স্বরূপ বিশ্বাসকে নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে কারণ, তাঁরা আরও ভাল ভাবে ইন্ডাস্ট্রি চালাতে পারতেন, ইন্ডাস্ট্রির উন্নতি হতে পারত। তাঁরা তা করলেন না।’’
দেবের মনে হয়, ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর কারণেই টালিগঞ্জের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ে চারদিকে মশকরা করা হয় এখন। তিনি জানান, এক বাংলাদেশি প্রযোজক ভিডিয়ো পাঠিয়ে দেবকে জানিয়েছিলেন, কলকাতায় শুটিং করতে গেলে অনুমতি নিতে হবে। সাংবাদিক সম্মেলন করতে হবে। দেব বলেন, ‘‘আমি তাঁকে বলেছিলাম, আপনি আসুন। আমি পাশে দাঁড়াব।’’ কিন্তু দেবের প্রশ্ন, স্বরূপ অনুমতি দিলে শুটিং হবে, যাঁকে নিয়ে কাজ করতে বলবে, তাঁকে নিতে হবে— এমনটা হবে কেন? দেবের অভিযোগ, আগে সকলে জানতেন, কলকাতায় চলচ্চিত্রজগতে কাজ করার জন্য ফেডারেশনকে শুধু জানানো প্রয়োজন। তবে অনুমতি নেওয়ার কোনও বিষয় ছিল না। কিন্তু স্বরূপ এসে অনুমতি দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করেন। অভিনেতার প্রশ্ন, ‘‘স্বরূপ বিশ্বাস অনুমতি দেবেন কেন? তিনি তো ভগবান নন।’’ তিনি বললে ইন্ডাস্ট্রি চলবে, মানুষ কাজ করবে। এটা তো অন্যায়, বক্তব্য দেবের। যে রূপটানশিল্পীর অভিযোগের ভিত্তিতে স্বরূপ গ্রেফতার হয়েছেন, তাঁকে নতুন ছবি ‘দেশু ৭’-এ নেওয়ার কথা ছিল দেবের। তবে তিনি এখনও কাজে ডাক পাননি বলেই জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দেব বলেন, ‘‘দেব কথা দিয়ে তার অন্যথা করে না। তিনি আমাদের টিমের অংশ। দু’দিন মাত্র ছবির শুটিং হয়েছে। আমার নিজস্ব টিম আছে। শুটিংয়ের ডেট পেলেই যোগাযোগ করা হবে আমার টিমের তরফে। আমি অনির্বাণকেও নিয়েছিলাম, কারও কথা ভাবিনি। দল জিতলে আমাকে শুটিং করতে দেওয়া হত না। তবে প্ল্যান-বি ও তৈরি রেখেছিলাম। এসআরএফটিআই-এর ছাত্রছাত্রীদের নিয়েই কাজ করতাম। কিন্তু অনির্বাণকে ছাড়তাম না।’’ তবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতার উপরে এখনও বিরক্তি নেই দেবের। তিনি বলেন, ‘‘আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধা করি, প্রার্থনা করি ওঁর শরীর সুস্থ থাকুক।’’ সঙ্গে দেবের বক্তব্য, দিদি তো বিশ্বাস করেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন স্বরূপকে। তিনি এটা করবেন, তা কেউ জানতেন না। নতুন সরকারের উপরে ভরসা রাখছেন অভিনেতা। রাজ্য সরকার সবে বদলেছে। গুছিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের একটু সময় দিতে হবে। তারা ইন্ডাস্ট্রিকে বুঝছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তা বাস্তবায়িত করার মধ্যে একটু তো সময় লাগবে, মনে করেন দেব। ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে সাংসদ দেবের দীর্ঘ লড়াই। তা নিয়ে কী ভাবছেন তিনি? দেব বলেন, ‘‘আমার সঙ্গে নতুন সরকারের এখনও কোনও কথা হয়নি এই নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন শুনলাম যে, ৫০ শতাংশ কেন্দ্র এবং ৫০ শতাংশ রাজ্যের টাকায় কাজ করবে। আমার বিশ্বাস, কাজ হবে। যদি আমার সঙ্গে দেখা হয়, আমি অবশ্যই তাঁকে জানাব। এই একটিমাত্র কারণে আমার রাজনীতিতে থেকে যাওয়া। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও মেদিনীপুরের মানুষ। তিনি জানেন, এটা হওয়া কতটা দরকার। শুভেন্দুদা আছেন বলে আমার বিশ্বাস, সময়েই কাজটা শেষ হবে।’’ দেবের এত অভিযোগের কথা কি জানেন তৃণমূলের আর কেউ? এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল তৃণমূল বিধায়ক তথা সম্প্রতি গোটা তিনেক ছবিতে অভিনয় করা কুণাল ঘোষের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘‘আমি অতীতে যখন টালিগঞ্জে কাজ করেছি, তখন স্বরূপেরা ছিলেন না। আর সম্প্রতি তিনটি ছবিতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি ওঁরা টেকনিশিয়ানদের নিয়ে কাজ করেন। এর বাইরে ভিতরে কী ছিল, তা আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়।’’ তবে এ বিষয়ে দেবের মন্তব্য শুনেছেন তিনি। সে প্রসঙ্গে কুণাল বলেন, ‘‘দেব এক নম্বর সুপারস্টার। ওঁর সঙ্গে বিশ্বাস ব্রাদার্সের দ্বন্দ্বের কথা সকলের মতো আমিও জানি। এর বাইরে কোনও মন্তব্য নেই।’’
স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অনেক আগেই কড়া পদক্ষেপ করা উচিত ছিল। কিছু জিনিস আগেই আটকানো যেত। এখানে শুধু আমি একা ভুক্তভোগী নই। বহু বছর ধরে অনেক পরিচালক, শিল্পী— বিশেষত যাঁদের সাক্ষাৎকার সচরাচর কেউ নেন না বা জানতে পারেন না, তাঁরা ভুগেছেন। অনেক টেকনিশিয়ানকে হুমকি দিয়ে, ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হচ্ছিল। আমার বরাবর মনে হয়েছে, স্বরূপ বিশ্বাসের মতো এক জন মানুষ, যিনি চলচ্চিত্রজগতের কেউ নন বা কোনও দিন যুক্তও ছিলেন না, তাঁকে একটা ইন্ডাস্ট্রি এতটা ক্ষমতা বিস্তার করার সুযোগ দিয়েছিল কেন? প্রায় ১৫ বছর ধরে তাঁর এই ক্ষমতার আস্ফালন, একটা গোটা ইন্ডাস্ট্রি কেন মেনে নিয়েছিল? কেউ কেউ মেনে নিয়ে কেন চুপ করে ছিলেন? ইন্ডাস্ট্রির প্রভাবশালী মাথারা শুরুতেই স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারতেন। তিনি চলচ্চিত্রজগতের লোক নন, কোনও কার্ড নেই তাঁর, কখনও কোনও ছবির শুটিং ফ্লোরে পা রাখেননি। তিনি কী করে কলাকুশলী বা চলচ্চিত্রজগতের কোনও নিয়ম তৈরি করে দিতে পারেন? এটা গোড়াতেই উচ্ছেদ করে দিতে পারত। যদি আমাদের ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষে বসে থাকা মানুষেরা তখনই এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। সেটা বললে ‘ব্যান’ বা ‘থ্রেট কালচার’-এর সৃষ্টি হত না। এটাই আমার কাছে হতাশাজনক যে, সময় থাকতে এটা করা যেত। এক জন জুনিয়র টেকনিশিয়ান বা নতুন শিল্পী, যাঁরা কাজের সুযোগ কম পান— তাঁদের ভয় দেখিয়ে, তাঁদের উপরে জুলুম করা সহজ। কিন্তু, ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র যাঁরা বা যাঁদের আমরা তারকা বলি। যাঁদের কথা মানুষ শোনেন, যাঁদের কথা প্রশাসন শুনতেও বাধ্য হবেন— তাঁরা যখন চুপ করে থাকেন, সেইটা আমার কাছে অনেক বেশি বিপজ্জনক। তখন বোঝা যায় যে, আজ এক জন স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেফতার হলেন। পরবর্তীকালে আরও এক জন ‘স্বরূপ’ তৈরি হলে, তাঁরা সেই ব্যক্তির ভয়েও চুপ করে থাকবেন আগামীতে। সেই প্রবণতা খুবই বিপজ্জনক। আমি পেশাগত ভাবে কাজ করতে শুরু করেছি ছোট থেকে। ছোটবেলা থেকে দেখেছি বিভিন্ন সরকারের আগ্রাসনের মুখে আমার পরিবারের সবাই (মা, বাবা যে কেউ হতে পারেন) নিজেদের মতো করে প্রতিবাদ করেছেন। সেই সরকারের রোষ বা আগ্রাসন তাঁদের উপরে পড়েছে। কিন্তু, তার জন্য তাঁরা কখনও চুপ করে থাকেননি। কারণ, তাঁরা যে কোনও ‘লাইফস্টাইল’–এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন। কারণ, জীবন থেকে তাঁদের বেশি আকাঙ্খা নেই। বেশি চাহিদা নেই। আগ্রাসনের মুখে পড়লেও যেখানে প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন, সেখানে সেটাই করেছেন। চাইলে অনেক কিছু করা যায়। আমার কাছে ভয়ের হল, স্বরূপের মতো মানুষকে যাঁরা প্রশ্রয় দিয়ে আজ এই পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। তাঁরা আমার কাছে অনেক বেশি ভয়ের। এখানে দেবের প্রসঙ্গ উঠবেই। কারণ, গত কয়েক মাসে এই কারণে তাঁকে অনেক কথা বলতে শোনা গিয়েছে। কিন্তু, একটা কথা আমার বার বার মনে হয়েছে যে, দেব তো এক জন ব্যক্তি। ইন্ডাস্ট্রিতে আরও অনেকে আছেন। আরও অনেকে আছেন যাঁরা প্রভাবশালী। ২০ থেকে ৪০ জন মানুষ একসঙ্গে রুখে দাঁড়িয়ে যদি কথা বলেন, তা হলে যে কোনও ক্ষমতাকে চাপে ফেলে দেওয়া যায়। এটা কোনও কঠিন কাজ নয়। সবাই শুধু বিষয়টাকে কঠিন করে দেখানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়। এই অপারগতার পুরোটাই দেখনদারি। আসলে তাঁরা সত্যিই চাননি বিরোধিতা করতে। কারণ, তাঁরা নিজেরাও বিভিন্ন সময়ে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। এই ব্যক্তিসুবিধার জন্য তাঁরা চুপ করে থেকেছেন। এখন যে হেতু ক্ষমতা বদলে গিয়েছে, তাই কথাগুলো এখন বলা সহজ। সেই সরকারই আর ক্ষমতায় নেই। কারণ, এখন আমি ‘সেফ’। এইটা আমি পারিবারিক ভাবে কখনও দেখিনি। মানুষ আসলে সুবিধা দেখে প্রতিবাদ করে। এখন স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেফতার হবেন, সেটাই স্বাভাবিক। ওঁর গ্রেফতার হওয়ার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কিন্তু এত দিন সবাই সবকিছু জেনে কিছুই করেননি। এটা অনেক আগেই হতে পারত। তবে একটা কথা বলতে চাই, এই সবের মাঝে অনেকেই ভাবছেন যে, রাজনীতিমুক্ত হয়ে যাবে ইন্ডাস্ট্রি। কোনও কিছুই কিন্তু, কখনও রাজনীতিমুক্ত হয়নি। সুতরাং, এটা একটা আকাশ-কুসুম ভাবনা।





