Thursday, June 4, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

গেরুয়া ঝড়ে সমূলে উৎপাটিত তৃণমূল! উত্থানে হাত ছিল বিজেপির, পতনও সেই বিজেপির হাত ধরেই!

RK NEWZ মাত্র ২৮ বছরে কী ভাবে ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে এল তৃণমূল? মমতার হাত ধরে রাজ্যে উত্থান, শাসক দলের তকমা লাভ থেকে সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভরাডুবি, দলে ভাঙন। কেমন ছিল তৃণমূলের পথচলা? বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির এক মাসের মাথায় আনুষ্ঠানিক ভাবে ভাঙন ধরল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলে। বুধবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হলেন তৃণমূল থেকে ‘বহিষ্কৃত’ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়! তিন সহকারী দলনেতার তালিকায় ঠাঁই পেলেন আর এক বিদ্রোহী সন্দীপন সাহা। তৃণমূল বিধায়কদের ‘সই-জালিয়াতি’র কথা স্পিকারকে লিখিত ভাবে জানানোর ‘অপরাধে’ সোমবার তাঁদের বহিষ্কার করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। ৪৮ ঘণ্টা পরে দেখা গেল, সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃণমূল বিধায়কের সমর্থনই রয়েছে ঋতব্রত-সন্দীপনদের দিকে!

৫৮ জন তৃণমূল বিধায়কের সমর্থনের চিঠি নিয়ে বিধানসভায় হাজির হন বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত। একে একে অন্য বিধায়কেরাও পৌঁছোন। বিদ্রোহী বিধায়কেরা বিধানসভার কাউন্সিল চেম্বারে বৈঠক করেন। ঘণ্টা দেড়েকের বৈঠকের পর স্পিকারের ঘরে যান তাঁরা। ঋতব্রত এবং তাঁর শিবিরের তৃণমূল বিধায়কদের যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে স্পিকার নতুন বিরোধী দলনেতা এবং অন্য পদাধিকারীদের স্বীকৃতি দেন। নতুন বিরোধী দলনেতার জন্য বিধানসভার ঘর খুলে দেওয়া হয়। সেই ঘরে বসেই সাংবাদিক বৈঠক করেন বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কেরা। ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসাবে চেয়ে বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুকে চিঠি দিয়েছিলেন তৃণমূলের বিদ্রোহীরা। ঋতব্রত এবং সন্দীপন ছাড়া ওই চিঠিতে ৫৮ জন বিধায়কের সই রয়েছে। সেখানে শুধু বিরোধী দলনেতা নন, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় কারা তৃণমূলের উপদলনেতা হবেন, তা-ও উল্লেখ করা হয়েছিল। ছিল সন্দীপন, জাভেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন এবং শিউলি সাহার নাম। মুখ্যসচেতক হিসাবে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল আখরুজ্জামানের নাম। যদিও চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘সভানেত্রী’ বলেই উল্লেখ করেন বিদ্রোহীরা। নতুন বিরোধী দলনেতা হওয়ার পরে ঋতব্রত জানিয়েছেন, তৃণমূলের টিকিটে জয় পাওয়া দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়কই ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। তাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বিধানসভায় শাসক বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করবেন বলেও দাবি তাঁর। তিনি বলেন, ‘‘আপাতত ৫৮ জন। আরও দু’জন আছেন। তাঁরা এখন রাজ্যের বাইরে আছেন। তাঁদেরও সম্মতি রয়েছে। তাঁদের সমর্থন এলে এই সংখ্যা ৬০ হবে।’’ পাশাপাশি, তৃণমূলনেত্রী মমতাকে পরামর্শদাতা হওয়ার আবেদন করেন ঋতব্রত। তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁদের দূরদূরান্তের সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের ‘ভাল কাজ’ সমর্থনের ঘোষণাও করেছেন তাঁরা।

পরিষদীয় দলের ভাঙনের প্রভাব পড়েছে তৃণমূলের সাংগঠনিক অবয়বেও। রাজ্যে দলের সমস্ত কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল। দলে ভাঙন-আশঙ্কা রুখতেই তৃণমূল নেতৃত্ব এই কৌশলী পদক্ষেপ করলেন কি না, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, নির্বাচনে দলের শোচনীয় পরাজয় এবং তার পরেই ভাঙন-সম্ভাবনার আবহে ছাত্র, যুব, শ্রমিক, মহিলা সংগঠনকে নতুন করে সাজাতে চাইছেন তৃণমূলনেত্রী। তাই এই পদক্ষেপ। মমতার হাত ধরে রাজ্যে উত্থান, শাসক দলের তকমা লাভ থেকে সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভরাডুবি, দলে ভাঙন— কেমন ছিল তৃণমূলের পথচলা? শুরু ১৯৯২ সালের নভেম্বর মাসে। মমতা তখন লোকসভা সাংসদ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। যুব কংগ্রেসের রাজ্য সভানেত্রীও বটে। কলকাতায় ব্রিগেডে বিশাল সমাবেশ করে সিপিএমকে নির্মূল করার অঙ্গীকার নেন তিনি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব ছেড়ে রাজ্যে আন্দোলনের ঘোষণাও করেন মমতা। তবে সে বছরই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদের লড়াইয়ে সোমেন মিত্রের কাছে ২৭ ভোটে হেরে গিয়েছিলেন মমতা। ১৯৯৭ সালের অগস্ট মাস। নেত্রী সনিয়া গান্ধীর উপস্থিতিতে নেতাজি ইনডোরে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন। কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে তত দিনে দূরত্ব বেড়েছে মমতার। নেতাজি ইনডোরে কংগ্রেসের সম্মেলনের সময় গান্ধী মূর্তির পাদদেশে আলাদা সভা করেন তিনি। এর কয়েক মাস পরেই ডিসেম্বরে মমতাকে দল থেকে বহিষ্কার করে কংগ্রেস। তত দিন আটঘাট বেঁধে ফেলেছেন মমতা। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন নতুন দল খোলার। ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে মমতার দল, তৃণমূল। তার আগেই নির্বাচন কমিশনের কাছে দলের নাম নথিভুক্ত করিয়েছিলেন তিনি।

প্রথমে তৃণমূলের নাম ছিল পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেস। পরে নাম বদলে করা হয় সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। দল খুলেই মমতা ঘোষণা করেন ধর্মনিরপেক্ষতাই হবে দলের প্রাথমিক দর্শন। কংগ্রেসের অনেক নেতাই যোগ দিয়েছিলেন মমতার তৃণমূলে। যে বিজেপির সঙ্গে লড়াইয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবি, ১৯৯৮ সালে বামেদের সঙ্গে লড়তে সেই বিজেপির সঙ্গেই জোট বেঁধেছিল তৃণমূল। জোট বেঁধেছিলেন মমতা। ফলও মেলে। লোকসভায় জয় হয় সাতটি আসনে। এর পরের বছর লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের আটটি আসনে জয়ী হয় তৃণমূল। কেন্দ্রের অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের মন্ত্রীও হন মমতা। এর পরের বছর, অর্থাৎ ২০০০ সালে তৃণমূলের উত্থান প্রকৃত অর্থে নজর কেড়েছিল রাজ্যবাসীর। কলকাতা পুরসভার নির্বাচনে জয়লাভ করে তৃণমূল। ২০০১ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ত্যাগ করেন মমতা। কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকারের বিরুদ্ধে তহলকা ঘুষকাণ্ডের অভিযোগ উঠতেই ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। ওই বছরই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন ছিল। সেই আবহে দূরত্ব কমিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধে তৃণমূল। নির্বাচনে জয় মেলে ৬০টি আসনে। এর পর ২০০৪ সালে আবার কংগ্রেসের হাত ছেড়ে বিজেপির সঙ্গে জোট বাঁধে তৃণমূল। তবে জিতেছিলেন শুধু মমতা। এর পরের বছর ২০০৫ সালে আবার ধাক্কা খায় তৃণমূল। হাতছাড়া হয় অনেক কষ্টে অর্জিত কলকাতা পুরসভা। এর পর ২০০৬ সালে আবার অনুষ্ঠিত হয় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচনে মাত্র ৩০টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল। তবে সে বছর থেকেই মমতা শুরু করেন সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন, যা আবার লড়াইয়ে এনে দিয়েছিল তাঁকে। ভাগ্য ফিরিয়েছিল তৃণমূলেরও। ২০০৯ সালের কংগ্রেস এবং এসইউসি-র সঙ্গে জোট বেঁধে লোকসভা নির্বাচনে লড়েছিল তৃণমূল। জয় লাভ করে ১৯টি আসনে। এর পর আসে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচন। ফের কংগ্রেস, এসইউসির সঙ্গে জোট বাঁধেন মমতা। ৩৪ বছরের বাম শাসনের পতন ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়ে তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা। ২০১১ সালের পর থেকে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পর্যন্ত কোনও ভোটই চিন্তায় ফেলেনি মমতাকে। ২০১৬ এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কারও সঙ্গে জোট না বেঁধেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। এর মাঝে পঞ্চায়েত, পুরসভা, লোকসভা নির্বাচনেও লাগাতার ভাল ফল করে দল। এর মধ্যেই ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে রাজ্যে ধীরে ধীরে আন্দোলনের ঝাঁজ বাড়াতে থেকে তৎকালীন বিরোধী বিজেপি শিবির। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে নন্দীগ্রাম থেকে হারিয়ে দেন তৎকালীন বিরোধী নেতা শুভেন্দু। এর পর থেকে পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন বিষয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে মাঠেঘাটে নেমে লড়াই করতে দেখা গিয়েছে বিজেপিকে। ২০২৬ সালের ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যায় বিজেপির কাছে ভরাডুবি হয়েছে তৃণমূলের। রাজ্যে মাত্র ৮০টি আসন পেয়েছে তৃণমূল। ভবানীপুরে আবার শুভেন্দুর কাছে হার হয় মমতার।
তার পর থেকে এক মাস তৃণমূলে কেবল ভাঙনই দেখা গিয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় চমক দেখা গিয়েছে বুধবার। ৫৮ জন তৃণমূল বিধায়ক দলের সিদ্ধান্ত না মেনে ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা করতে চেয়ে চিঠি দেন স্পিকারের কাছে। বিধায়কদের চিঠিতে ‘সভানেত্রী’ হিসাবে মমতার নামোল্লেখ থাকলেও দল দু’ভাগে টুকরো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এর পরে দলের সব কমিটি ভেঙে দেন মমতা।

দলটির বয়স ২৮ বছর পাঁচ মাস। কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে এসে মমতা তৃণমূল তৈরি করেছিলেন ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি। ৩ জুন, ২০২৬ ভেঙে গেল তৃণমূল। তীব্র বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে উঠে এসে দেড় দশক শাসন ক্ষমতায় থাকার পর মাত্র ১৩ দিনে লন্ডভন্ড হয়ে গেল দিদির জোড়াফুলের বাগান। ২২ মে যার সূচনা হয়েছিল দিল্লির বঙ্গভবনে। যে দিন রাজধানীতে ‘আচমকা’ দেখা হয়ে গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আর তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রতের। ভোটের ফলপ্রকাশ হয়েছিল ৪ মে। জুনের ৪ তারিখ আসার আগেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল তৃণমূল। ২২ মে-র আগেও বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছিল। যা কালীঘাট কাঁপানো ১৩ দিনের ভিতপুজো করে দিয়েছিল। ৪ মে ফল ঘোষণার পরে ৬ মে কালীঘাটের বাড়ির লাগোয়া দফতরে জয়ী বিধায়কদের বৈঠক ডেকেছিলেন মমতা। সেই বৈঠকেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাকে সম্মান জানাতে সকলকে উঠে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন মমতা। যা তৃণমূলের অনেককেই ক্রুদ্ধ করে তুলেছিল। তার পর থেকেই তৃণমূলের পরিষদীয় দলে ঐক্যের সুর কাটতে শুরু করে। ১৯ মে ফের একটি বৈঠক হয় কালীঘাটে। সেখানেই প্রথম বিস্ফোরণ ঘটান ঋতব্রত এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা। ফলতার জাহাঙ্গির খান ভোটের মাঠ ছাড়ার ঘোষণার পরেও কেন তাঁকে দল বহিষ্কার করছে না, সেই প্রশ্ন তোলেন ঋতব্রত এবং সন্দীপন। তৃণমূল তথা দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে এ কথা সর্বজনবিদিত যে, জাহাঙ্গির অভিষেকের লোক। ফলে ঋতব্রতদের নিশানায় যে আসলে ছিল অভিষেক, তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। রুশ দেশের বলশেভিক বিপ্লব নিয়ে জন রি়ড লিখেছিলেন ‘দুনিয়া কাঁপানো ১০ দিন’। যে বিপ্লবের পরে ভেঙে পড়েছিল জারের শাসন। প্রাক্তন সিপিএম নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ দেখল ‘কালীঘাট কাঁপানো ১৩ দিন’! এ-ও এক বিপ্লবই বটে। যার জেরে ভেঙে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল। দল থেকে সিপিএম বহিষ্কার করার পরে তৃণমূল করেছেন ঋতব্রত। গত পাঁচ বছরে একাধিক বার বলেছেন, মমতার মধ্যে তিনি লেনিনকে দেখতে পান। বলশেভিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লেনিনই। আর তৃণমূল চুরমার করার নেতৃত্ব দিলেন মমতাকে ‘লেনিন’ বলা ঋতব্রত।

সকাল ১০টা থেকে বিধানসভায় প্রবেশ করতে শুরু করেন তৃণমূল বিধায়কেরা। ৫৮ জনের স্বাক্ষরিত চিঠি স্পিকারের হাতে জমা দেন ঋতব্রত, সন্দীপনেরা। যেখানে ঋতব্রতকে বিরোধীদলনেতা হিসাবে মেনে নিয়েছেন বাকিরা। চার উপদলনেতার মধ্যে রয়েছেন জাভেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, সন্দীপন ও শিউলি সাহা। মুখ্যসচেতক করা হয়েছে আখরুজ্জামানকে। তার পরেই ঋতব্রত, সন্দীপনেরা চলে যান নবান্নে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে। যেমনটা ঋতব্রত জানিয়েছিলেন ২২ মে। দিল্লির বঙ্গভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর। শুধু ঋতব্রতেরা নন। তাঁদের সঙ্গে না-থাকা নয়না, কুণাল, ববিরাও হাজির ছিলেন নবান্ন-বৈঠকে। স্পিকারের সচিবালয়ে অভিষেকের স্বাক্ষরিত চিঠিতে ফের শোভনদেবকে বিরোধী দলনেতা, নয়না ও অসীমাকে উপদলনেতা এবং ফিরহাদ হাকিমকে মুখ্যসচেতক করার দাবি জানানো হয়। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে কুণালদের চিঠি গ্রহণ করেনি স্পিকারের সচিবালয়। তাঁরা টেবিলে রেখে বেরিয়ে আসেন। অন্য দিকে ঋতব্রতদের শিবিরে সমর্থন বাড়তে থাকে। নবান্ন থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু জানান, সই জাল-কাণ্ডে ঋতব্রত এবং সন্দীপনের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সিআইডি তদন্ত শুরু করেছে। ২৭ তারিখে যে তাঁরা চিঠি দিয়েছিলেন, তা চাপা ছিল। শুভেন্দু দু’জনের নাম বলে দিতেই পদক্ষেপ করে তৃণমূল। সাংবাদিক বৈঠক শেষ হওয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যে ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করে তৃণমূল। তার পরে দেখা যায়, তাঁরা মূল নিশানা করছেন ‘যুবরাজ’ অভিষেককে। সেই সূত্রেই বিদ্রোহী শিবিরের অন্দরে এই গোটা অভিযানের নামকরণ হয় ‘অপারেশন ক্রাউন প্রিন্স’। বিধানসভা ভোটের ঘোষণার এক মাসের মধ্যে ভাঙনের মুখে তৃণমূল। সেই দল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এখন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। পাশে পেয়েছেন ৫৮ তৃণমূল বিধায়ককে। এমন অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আবার খোঁচা দিলেন কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী। তিনি জানালেন, ঘাসফুলের ‘নিচুতলার’ নেতাকর্মীদের জন্য হাতশিবিরের দরজা খোলা।

ভোটের মুখে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের বিরুদ্ধে দল ভাঙানোর অভিযোগ করেছিলেন বহরমপুরের কংগ্রেস প্রার্থী। তাঁর অভিযোগ ছিল, আগে ভাগে ফোন করে নানা রকম প্রলোভন দেওয়া হচ্ছে তাঁর দলের প্রার্থীদের। নির্বাচনের ফলপ্রকাশ হতেই টানাপড়েনে সেই তৃণমূল। একের পর এক নেতা ‘বেসুরো’ হচ্ছেন। তাঁদের সিংহভাগ নেতা অভিষেকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের অধীরের বার্তা, “যাঁরা তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী রয়েছেন, যাঁরা দলের জন্য বুথে বুথে ভোট করেছেন, মার খেয়েছেন এবং এখনও তৃণমূলকে ভালবাসেন, তাঁদের বলছি, আপনাদের জন্য কংগ্রেসের দরজা সবসময় খোলা।” মঙ্গলবার বহরমপুরে সাংবাদিক বৈঠকে অধীর এ-ও বলেন, “আপনারা আসুন। আলোচনা করে আমরা আগামিদিনে বিজেপি এবং তথাকথিত তৃণমূলের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়াই করার শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলব। বাংলায় বাকি বিরোধী দলগুলিকে একজোট করে একটা মঞ্চ তৈরি করে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করা অত্যন্ত জরুরি। না হলে বাংলায় সুস্থ রাজনীতি বলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।” সম্প্রতি ঠিক একই কথা শোনা গিয়েছে মমতার গলায়। তৃণমূলনেত্রীর আহ্বান ছিল, ‘ইগো’ বাদ দিয়ে বিজেপি বিরোধিতায় তৃণমূলের হাত শক্ত করুক বাকি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। ‘অতিবামেও’ তাঁর আপত্তি নেই। এখন মমতাকে খোঁচা দিয়ে অধীরের মন্তব্য, ‘‘যে দলবদলের খেলা একদিন আপনারা শুরু করেছিলেন, যার আম্পায়ার এবং রেফারি ছিলেন আপনারা নিজেই, আজ ঠিক সেই একই খেলাই উল্টো দিকে চলছে। শুধু রেফারি আর আম্পায়ার বদলে গিয়েছে।” তৃণমূলের যে বিধায়কেরা বিক্ষুব্ধ এবং বিদ্রোহী তাঁদের সম্পর্কে অধীরের পর্যবেক্ষণ, তাঁদের বেশির ভাগই মূলত মুসলমান ভোটব্যাঙ্কের জোরে বিধানসভা ভোটে জয়ী হয়েছেন। তাই তাঁরা যদি বিজেপিতে যান জনরোষের মুখে পড়তে পারেন। এমন বিধায়কদের নিয়ে কংগ্রেস নেতা বলেন, ‘‘আপাতত বিজেপি থেকে ‘দো গজ কি দূরি’ বজায় রেখে চলছেন এঁরা। সরাসরি পদ্মশিবিরে যোগ না দিলেও এঁদের অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত করছে। তাই জনসমক্ষে বিজেপি থেকে দূরত্ব বজায় রাখলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে ওঁদের বিজেপির নির্দেশে উঠতে-বসতে হবে।’’

প্রযোজক-পরিচালক দিদি স্বয়ং!
রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে মমতার নট ও নটীরা

তারকা-মোহে ক্ষতি করলেন রাজ্যের, নিজেরও? রাজনীতিতে যে-কেউ আসতে পারেন। কিন্তু এঁদের অধিকাংশই বছরভর মাঠ-ময়দানের রাজনীতি করার জন্য আসেননি। দলের ইলেকশন মেশিনারির ঘাড়ে চেপে নির্বাচনী বৈতরণী পেরোনোর রাজনীতিই করেছেন অধিকাংশ। মিমি চক্রবর্তী। জন্ম জলপাইগুড়ি। স্কুলজীবন সেখানেই। কাবাডি আর ব্যাডমিন্টনে প্রবল আগ্রহ ছিল, তবে রাজনীতিতে নয়। কলকাতায় পড়াশোনা করতে আসেন ২০০৮-এ। আশুতোষ কলেজ বরাবরই ছাত্র রাজনীতির একটি সক্রিয় ঘাঁটি। তবে রাজনীতি নয়, সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি মিমি বেছে নিলেন মডেলিং। তাতে সাফল্য এলে খুলে যায় ছোট পর্দার দরজা।

ইতিমধ্যে রাজ্যে এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে—বাম বিদায় ও দিদির আগমন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের পাশাপাশি উঠে এল তাঁর টলিউড তারকা ব্রিগেড। ২০১১ সালের ২১ জুলাই ব্রিগেডে তৃণমূলের শহিদ দিবসের মঞ্চ চাঁদের হাট। রঞ্জিত মল্লিক, সন্ধ্যা রায়, দীপঙ্কর দে, বিশ্বজিৎ, তাপস পাল, দেব, শতাব্দী রায়, দেবশ্রী রায়, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। তাঁদের কেউ কেউ ইতিমধ্যেই সাংসদ বা বিধায়ক। মিমির প্রথম দু’টি ছবিরই পরিচালক, সুদেষ্ণা রায় ও রাজ চক্রবর্তী, তত দিনে দিদির তারকা ব্রিগেডের অংশ। মিমিও ভিড়ে গেলেন সেই দলে। তার পর ২০১৯। যাদবপুরের সাংসদ সুগত বসু তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের চাপে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ালেন। মাস্টারমশায়ের বিকল্প হলেন তারকা। মাসখানেক প্রচারাভিযান। তার পর বিপুল ভোটে জিতে সাংসদ মিমি। বয়স মাত্র তিরিশ। পাঁচ বছরে সংসদে উপস্থিতির হার ছিল ২১ শতাংশ। মুখ খুলেছেন ৭ বার। লোকসভা কেন্দ্রেও যে তাঁকে খুব দেখা গিয়েছে, এমনটা নয়।

বাংলা ছবির সর্বনাশ অনেক দিন ধরেই চলছে। কিন্তু এর মাঝেও পৌষ মাস ছিল টালিগঞ্জের নটনটীদের একাংশের। ছবি যদি না-চলে, প্রযোজক, পরিচালক, টেকনিশিয়ান, অভিনেতা-অভিনেত্রী, কারও অবস্থাই ভাল হওয়ার কথা নয়। নটনটীদের কথা একটু আলাদা। তাঁদের প্রধান আয় বিজ্ঞাপন, গ্রামে গিয়ে মাচা বা যাত্রাতে অংশগ্রহণ করা। কিন্তু দিদির রাজনীতি তাঁদের উপার্জনের একটা অতিরিক্ত দরজা খুলে দিয়েছিল।
রাজনীতিতে যে-কেউ আসতে পারেন। কিন্তু এঁদের অধিকাংশই বছরভর মাঠ-ময়দানের রাজনীতি করার জন্য আসেননি। দলের ইলেকশন মেশিনারির ঘাড়ে চেপে নির্বাচনী বৈতরণী পেরোনোর রাজনীতিই করেছেন অধিকাংশ। কাজ মূলত সভাশিল্পীর মতো দিদির মঞ্চে বা মিছিলে ভিড় বাড়ানো। তাঁরা দলকে তাঁদের জনপ্রিয়তার ভাগ দেবেন, বিনিময়ে ক্ষমতার ভাগ নেবেন।

এক বার সাংসদ বা বিধায়ক হতে পারলে সুবিধা কম নয়। বর্তমানে মাসিক এক লাখ টাকার মূল বেতনের পাশাপাশি সাংসদেরা একাধিক ভাতা পান। নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে নিয়ে দেশের মধ্যে বছরে ৩৪ বার বিনামূল্যে বিমান সফর। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় পাঁচ বছরের জন্য বাংলো। সেখানে থাকতে না-চাইলে বাড়িভাড়া বাবদ মাসে ২ লক্ষ টাকা। সারা বছর বিনামূল্যে ট্রেনের প্রথম শ্রেণির কামরার সওয়ারি হতে পারেন, এমনকী ব্যক্তিগত কাজেও। বিনামূল্যে চিকিৎসা, এমনকী নিকটাত্মীয়েরও। শুধু ফোন খরচ বাবদই বছরে পাওয়া যায় দেড় লক্ষ টাকা। প্রাক্তনেরা পান নিজের ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলের জন্য আজীবন পেনশন। এ ছাড়া, বিনামূল্যে ট্রেনের বাতানুকূল কামরায় এক জন সঙ্গী-সহ যাতায়াত ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ। ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে টিকে থাকতে হলে পরিচালক, প্রযোজক তো বটেই, টালিগঞ্জের বিশ্বাস ভ্রাতৃদ্বয়কেও খুশি রাখতে হবে। চরিত্র বুঝতে হবে, প্র্যাকটিস করতে হবে, দিনে ৮-১০ ঘণ্টা খাটতে হবে। তার পরেও ছবি ফ্লপ হলে তার দায়ও নিতে হবে। কিন্তু রাজনীতির সূত্রে মাঝে মাঝে দিদির বা দলের কিছু অনুষ্ঠানে ফ্রি-তে উপস্থিত থেকে নিজেদের সারা বছরের কাজ বাড়িয়ে নেওয়া যেত। রাজ্যের অধিকাংশ মাচা বা মেলার উদ্যোক্তা ছিলেন তৃণমূলের নেতারা আর তাঁরা শুধু তৃণমূলের নটনটীদেরই ডাকতেন।

রাজনীতিতে বিনোদন জগতের ব্যক্তিত্বদের আসা নতুন কিছু নয়। স্বাধীন ভারতের প্রথম দশকগুলিতে কলকাতা বা বম্বের (এখনকার মুম্বই) বিনোদন জগতের অনেক তারকাই সরাসরি বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মূলত গণনাট্য সঙ্ঘের সূত্রে। সোনার কেল্লার ‘সিধু জ্যাঠা’, লেখক-অভিনেতা হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় থাকতেন হায়দরাবাদে। ১৯৫২-র লোকসভা নির্বাচনে সিপিআই-সমর্থিত নির্দল প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেতেন। সরাসরি ভোটে না-দাঁড়ালেও বলরাজ সাহনি বা এ কে হাঙ্গলদের মতো অনেকেই বামেদের হয়ে প্রচার করেছেন। ১৯৬৭-এ অসমে বাম সমর্থিত নির্দল বিধায়ক হয়েছিলেন ভূপেন হজারিকা। ১৯৯৩-তে যেমন কলকাতার চৌরঙ্গী কেন্দ্র থেকে বাম সমর্থিত নির্দল বিধায়ক অনিল চট্টোপাধ্যায়। এঁরা সবাই তখন বামেদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও আদর্শগত ভাবে যুক্ত ছিলেন।

কিন্তু এমজি রামচন্দ্রন হোন বা এনটি রাম রাও, নির্বাচনের ময়দানে বিনোদন জগতের তারকাদের দাপট মূলত দক্ষিণ ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত। জাতীয় রাজনীতিতে তারকা নির্ভরতার দরজা, ওই রামমন্দিরের তালার মতোই, খোলেন রাজীব গান্ধী। ১৯৮৪-তে দাঁড় করিয়ে দেন তিন তারকাকে—ইলাহাবাদে অমিতাভ বচ্চন, বম্বেতে সুনীল দত্ত, মাদ্রাজে (এখনকার চেন্নাই) বৈজয়ন্তীমালা। তিন জনই জেতেন। অমিতাভ দ্রুত রাজনীতি ছাড়লেও, ১৯৯১-এ রাজেশ খন্না কংগ্রেসের হয়ে বিজেপির লালকৃষ্ণ আডবাণীর বিরুদ্ধে লড়ে সামান্য ভোটে হেরে যান। পরের বছর দিল্লিতে লোকসভা উপনির্বাচনে কংগ্রেসের রাজেশের বিরুদ্ধে শত্রুঘ্ন সিন্হাকে নামিয়ে দেয় বিজেপি। জেতেন অবশ্য বড় তারকা রাজেশ।

তারকা-রাজনীতিতে বিজেপির হাতেখড়ি এ সময়েই। মূলত রামায়ণ, মহাভারতের মতো সিরিয়ালের নায়ক-নায়িকাদের দিয়ে। ১৯৯১-এ গুজরাত থেকে সাংসদ হন রামায়ণের ‘সীতা’ দীপিকা চিখলিয়া ও ‘রাবণ’ অরবিন্দ ত্রিবেদী। প্রার্থী না-হলেও, বিজেপির হয়ে চুটিয়ে প্রচার করেন ‘রাম’ অরুণ গোভিল, ‘হনুমান’ দারা সিংহ। অন্য তারকা প্রার্থীদের মধ্যে ছিলেন কলকাতা উত্তর-পশ্চিমে ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, যদিও হেরে যান।
১৯৯৮-৯৯ থেকে দুই বড় দলেই তারকাদের ভিড় বাড়ে—বিজেপিতে বিনোদ খন্না, ধর্মেন্দ্র, হেমামালিনী, কিরণ খের; কংগ্রেসে গোবিন্দ, রাজ বব্বর, নাগমা। তার পরেও, দুই দলেরই যা ব্যাপ্তি, সেই তুলনায় বিনোদন জগতের হার কমই। কিন্তু ২০০৯ থেকে তৃণমূল বাংলার রাজনীতিতে তারকা-কেন্দ্রিকতা দক্ষিণ ভারতের মতোই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে দিল।

ভোটের ময়দানে মমতার তারকাপ্রীতির প্রথম পরিচয় ২০০১-এ। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়কে। ও দিকে চৌরঙ্গীতে অভিনেত্রী তথা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়-জায়া নয়না। মাধবী হারলেন, কিন্তু নয়না জিতলেন। পরের বছর আলিপুর থেকে তৃণমূলের টিকিটে জিতলেন তাপস পাল। তাঁর ক্যারিয়ার তখন আর কোনও গগনেই নেই। তখনও তিনি ‘চন্দননগরের’ মাল বলে খ্যাত হননি, কিন্তু ফিল্মি ডায়লগ নেমে এল রাজনীতির মাঠে। আর, কে না জানে, ফিল্মি ডায়লগ দিদির পরম পছন্দ! নিজেও দিতে ভালবাসতেন। ২০০৬-০৮ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম কেন্দ্রিক নাগরিক আন্দোলনের কারণে তাঁর সঙ্গে শিল্পী ও বিনোদন জগতের তারকাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ২০০৯ লোকসভা নির্বাচনে কবীর সুমনের পাশাপাশি কৃষ্ণনগর থেকে তাপস পাল ও বীরভূম থেকে শতাব্দী রায়কে দাঁড় করিয়ে দেন। সবাই জেতেন। ২০১১-র বিধানসভা ভোটে বারাসতে দীপক ‘চিরঞ্জিত’ চক্রবর্তী, রায়দিঘিতে দেবশ্রী রায়, উত্তরপাড়ায় অনুপ ঘোষাল। বাংলার রাজনীতিতে এল এক নতুন অধ্যায়।

দু’টি রাজনৈতিক অঙ্কের বিষয় ছিলই। এক, তারকাদের জনপ্রিয়তা ব্যবহার করা। দুই, যে আসনে দলীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রবল, সেখানে অন্তর্ঘাত এড়াতে এ রকম ‘অরাজনৈতিক’ প্রার্থী দিয়ে দেওয়া। কিন্তু এর চেয়েও বড় সম্ভবত ছিল দিদির নিজের তারকাপ্রীতি। ২০১৪-য় তারকার হাট বসিয়ে দেন মমতা। বছরের শুরুতে মিঠুনকে পাঠালেন রাজ্যসভায়। লোকসভায় শতাব্দী, তাপসের পাশাপাশি বাঁকুড়ায় মুনমুন, মেদিনীপুরে সন্ধ্যা রায়। শহিদ দিবসের মঞ্চে ‘পাগলু ড্যান্স’-খ্যাত দেবকে দিলেন ঘাটালে। একমাত্র দেবই তখনও কেরিয়ারের শীর্ষে। বাকিরা মূলত অতীত। তবে, ওঁদের দেখে আরও ভিড় বাড়ল দিদির বৃত্তে। দিদির মঞ্চ মানেই ডজনে ডজনে তারকা।

যত দিন গড়াল বিনোদন জগতের সাংসদ-বিধায়কদের তালিকাও লম্বা হল— ইন্দ্রনীল সেন, মিমি চক্রবর্তী, নূসরত জহান, জুন মালিয়া, সোহম চক্রবর্তী, কাঞ্চন মল্লিক, রাজ চক্রবর্তী, অদিতি মুন্সী, লাভলি মৈত্র, সায়নী ঘোষ, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, শত্রুঘ্ন সিন্‌হা, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, কোয়েল মল্লিক। বিজেপি যখন রাজ্যে জমি শক্ত করার কাজ শুরু করল, তখন তারাও বিনোদন জগতের তারকাদের নিয়ে এল সামনে। রূপা ‘দ্রৌপদী’ গঙ্গোপাধ্যায়, বাবুল সুপ্রিয়, বাপ্পি লাহিড়ী, জর্জ বেকার। ক্রমে তৃণমূল হয়ে বিজেপিতে এলেন রুদ্রনীল ঘোষ, লকেট চট্টোপাধ্যায়রা। ২০১৬-য় তৃণমূল-সংশ্রব ও সাংসদ পদ ছেড়ে ২০২১-এর ভোটের আগে বিজেপি শিবিরে ঢোকেন মিঠুন। বিজেপিতে যোগ দেন পার্নো মিত্র, পায়েল সরকার, যশ দাশগুপ্ত, হিরণ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। ভোটের পরে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যান বাবুল।

তারকা সাংসদদের মধ্যে কেউ কেউ কার্যত পূর্ণ সময়ের রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছেন। যেমন, শতাব্দী, রূপা ও লকেট। চার বারের সাংসদ শতাব্দীর প্রথম দফায় সংসদে হাজিরা ছিল ৭৫ শতাংশ। ছ’টি বিষয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। দ্বিতীয়ে উপস্থিতি ৭৪ শতাংশ, বিতর্ক ৪টি। তৃতীয়ে উপস্থিতি ৭৭ শতাংশ, ২৪টি বিষয়ে কথা বলেন। বর্তমান টার্মে এখন উপস্থিতির হার ৭৩ শতাংশ ও ১৫টি বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। নিজের কেন্দ্রেও যান নিয়মিত। অধিকাংশেরই পারফরম্যান্স কহতব্য নয় না। তিন বারের সাংসদ দেব। প্রথম দফায় সংসদে উপস্থিতি ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। দু’বার মুখ খুলেছিলেন। দ্বিতীয় দফায় তাঁর উপস্থিতির হার ১২ শতাংশ। দু’টি বিতর্কে অংশ নেন। তৃতীয় দফায় উপস্থিতি ৮ শতাংশ। এক বারও মুখ খোলেননি। পাঁচ বছরের টার্মে সংসদে মুনমুনের উপস্থিতির হার ৬৯ শতাংশ, মুখ খুলেছেন মাত্র এক বার। সন্ধ্যা রায়ের উপস্থিতির হার ছিল ৫৩ শতাংশ। তিন বার বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। নুসরতের উপস্থিতির হার ছিল ২৩ শতাংশ। বিতর্কে অংশ নেন ১২ বার।

এখন যদি জাতীয় গড়ের সঙ্গে তুলনা করি, তবে ২০১৪-১৯ সালে লোকসভার সাংসদদের গড় উপস্থিতির হার ছিল ৭৯ শতাংশ ও তাঁরা গড়ে ৪৭টি করে বিতর্কে অংশ নেন। আর বিধায়ক? উত্তরপাড়ার অধিকাংশ মানুষ, এমনকী ঘোর তৃণমূলী পর্যন্ত, দিদির বাপান্ত করতেন ২০১১-তে অনুপ ঘোষালের পর ২০২১-এ আবার কাঞ্চন মল্লিককে তাঁদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ায়। ঘটনাচক্রে, এ বার তৃণমূলের তারকা প্রার্থীরা প্রায় সবাই হেরেছেন, বিজেপির তারকা প্রার্থীরা প্রায় সবাই জিতেছেন— রূপা, রুদ্রনীল, হিরণ, পাপিয়া অধিকারী, শর্বরী মুখোপাধ্যায়। কারণ, সম্ভবত, এ বার ভোট হয়েছে সিম্বলে। আর ৯ তারিখ মমতার কালীঘাটের বাড়িতে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনেও দেখা মেলেনি তৃণমূলের তারকাদের। রাজনৈতিক দল ও অভিনেতা অভিনেত্রী-দু’পক্ষই জানে, তাদের সম্পর্ক আসলে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটের মতো একটা এগারো মাসের চুক্তি। ‘‘দল জানে, সে কোনও নেতাকে এনে বসাচ্ছে না, যাঁর সংগঠনের ওপর একটা হাত থাকবে। আবার অভিনেতাও ভাবেন, না-পোষালে ছেড়ে দিয়ে মূল পেশাতেই মন দেবেন।’’

তাঁর মনে আছে, ১৯৯৫-তে কংগ্রেসের তরফে আসা রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন মিঠুন। তখন তাপস পাল এক বার গৌতমকে বলেছিলেন যে, মিঠুন ভুল সিদ্ধান্ত নিলেন। “তাপসের যুক্তি ছিল, অভিনেতা মিঠুন তো মিঠুন হয়ে গেছেন। ওখানে তো তিনি আর দ্বিতীয় বার মিঠুন হতে পারবেন না। কিন্তু রাজনীতিতে এলে নেতা হিসেবে আবার মিঠুন হয়ে উঠতে পারতেন। একটা নতুন সাম্রাজ্য,” বলেন গৌতম।

শেষ পর্যন্ত তাপসই মিঠুনের আগে রাজনীতিতে আসেন। সেই থেকে নতুন সাম্রাজ্যের খোঁজে ক্রমশ দিদি ও মোদীর মঞ্চে ভিড় বাড়িয়েছেন টালিগঞ্জের নটনটীরা।

দিদি নিজেই এ রঙ্গমঞ্চে প্রযোজক তথা পরিচালক। প্রযোজক দিদি দেখেন স্টার ভ্যালু। পরিচালক দিদি আর তাঁদের দিয়ে কাজ করাতে পারেন না। তাঁর সব পদক্ষেপ বোধগম্যও হয় না। যেমন, ২০১৪-য় মুনমুন। বাঁকুড়া আসনে সে বছর তৃণমূলের জয় কার্যত নিশ্চিত। ২০১১-র হিসাবেই তৃণমূল ৫০,০০০ ভোটে এগিয়ে ছিল আর তার পর তো সিপিএমে আরও ধস নেমেছিল। তৃণমূলের টিকিটে যে-কেউ দাঁড়ালেই জিততেন। সে ভাবেই ২০১৯-এ বসিরহাটে নুসরত বা যাদবপুরে মিমি। আসনগুলি কার্যত ওঁদের উপহার দেওয়া হয়েছিল। সাংসদ সদস্যপদ শেষ হওয়ার পরে এঁদের কাউকেই আর দলীয় কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। সাংসদগিরি ও রাজনীতি, এক সঙ্গেই শেষ। সে ভাবেই বুঝে ওঠা যায় না মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে বাবুলকে কেন রাজ্যসভায় পাঠানো হল। আরও ধোঁয়াশা কোয়েলকে রাজ্যসভায় পাঠানো নিয়ে। কোয়েলকে তো নির্বাচনী প্রচারের ঘোরাঘুরিটুকুও করতে হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা আগেই তাঁর বাবা রঞ্জিত মল্লিককে কলকাতার শেরিফ বানিয়েছিলেন। এ বার মেয়ে! তৃণমূলের একটি সূত্র জানিয়েছিল, কোয়েলের যে হেতু পাঞ্জাবি পরিবারে বিয়ে, তাই তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠিয়ে নাকি ভবানীপুরের পাঞ্জাবী ভোটারদের কাছে বার্তা দিতে চেয়েছিলেন মমতা। এই অঙ্ক ভ্রান্ত। ভবানীপুরে পঞ্জাবীদের ভোট এমন কিছু বেশি নয়। ফলে, কোয়েলকে রাজ্যসভায় পাঠানোটা তেলা মাথায় অতিরিক্ত তেল দেওয়ার মতো ঘটনা। দলের অন্দরে কান পাতলে আরেকটা কথাও শোনা যায়। কোয়েলের স্বামী বর্তমানে প্রযোজনা ছাড়াও কিছু রিয়েল এস্টেটের কাজের সঙ্গে যুক্ত। রিয়েল এস্টেট ব্যবসার স্বার্থেই নাকি তিনি মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধ ফেলতে কোয়েলকে না করেন। কোয়েল-ঘনিষ্ঠ এক অভিনেতা অবশ্য এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন।

কারণ যেটাই হোক, তৃণমূলের পতন-পরবর্তী পর্যায়ে দলের দিকে আসা কাদার ভাগ কোয়েল কী ভাবে এড়িয়ে যাবেন? উল্টো দিক থেকে দেখলে, দিদির প্রতিবাদ কর্মসূচিতে কি এই রাজ্যসভা সাংসদকে দেখা যাবে? দিদির সভাশিল্পী হওয়ার পেশাটি আপাতত গিয়েছে। গেরুয়া শিবির এঁদের কী ভাবে ব্যবহার করে, তা দেখার বাকি। তবে দিদি যদি আবার ঘুরে দাঁড়াতে চান, তাঁকে সম্ভবত অভিনেতা নয়, নেতাদের ওপরই ভরসা করতে হবে।‌‌
‌‌‌

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles