RK NEWZ বাইকে করে সোনারপুরে ঢোকার মুখে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গায়ে হাত তোলেন বিক্ষোভকারীরা। ক্রিকেটের হেলমেট মাথায় দিয়ে তৃণমূল সাংসদ তার মধ্যেই এগোতে থাকেন। তখন তাঁর গায়ে ডিম ছোড়া হয়। ছোড়া হয় জুতোও। ভোট-পরবর্তী হিংসায় আক্রান্তদের দেখতে গিয়ে নিজেই আক্রান্ত হলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। চারচাকার গাড়ি নয়, শনিবার মূল রাস্তা থেকে নেমে দু’চাকার যানে চেপে সোনারপুরে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে ঢোকার মুখে তাঁর গায়ে হাত তোলেন বিক্ষোভকারীরা। এলোপাথাড়ি চড়-ঘুষি মারা হয় অভিষেকের মাথায়-ঘাড়ে-গায়ে। ভেঙে দেওয়া হয় সেই বাইকটি। অভিষেকের জামা ছিঁড়ে যায়। ভেঙে যায় চশমাও। তার মধ্যে ক্রিকেট খেলার হেলমেট মাথায় দিয়ে তৃণমূল সাংসদ এগোতে থাকেন সোনারপুরে নিহত তৃণমূল কর্মী সঞ্জু কর্মকারের বাড়িতে। সেই সময় তাঁর গায়ে ডিম ছোড়া হয়েছে। জুতোও ছোড়া হয়। ছিঁড়ে দেওয়া হয় পরনের সাদা রঙের শার্ট। ওই অবস্থায় হেঁটে এগোতে থাকেন তৃণমূল নেতা। ওঠে ‘চোর-চোর’ স্লোগান। অভিষেক সোনারপুরে যাওয়ার আগেই কোথাও কোথাও মহিলাদের ডিম হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। কোথাও কালো পতাকা হাতে নিয়ে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দিচ্ছিলেন বিজেপির লোকজন। এই বিক্ষোভের মধ্যে চারচাকা গাড়িতে না-গিয়ে মূল রাস্তা থেকে নেমে দলীয় এক কর্মীর বাইকে বসেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক। মোট তিনটি বাইক যাচ্ছিল। মাঝখানের বাইকে পিছনের আসনে বসেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তাঁর পিছনের আসনে আরও এক জন বসেছিলেন। তখনই বিক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। বাইক ধাওয়া করে দৌড়োতে থাকেন কয়েক জন। তার পর শুরু হয় শারীরিক হেনস্থা। ওই ভাবে নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে পৌঁছোন অভিষেক। সেখানে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখা যায় তৃণমূল নেতাকে। নিহত কর্মীর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তথা বিজেপি সরকারকে। অভিষেক বলেন, ‘‘আমার মাথাটা বেঁচে গিয়েছে হেলমেট ছিল বলে। আমার চশমা ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু আমি হয়তো এই ভাবেই এখান থেকে বেরিয়ে গেলাম। তার পর তো সঞ্জু কর্মকারের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের উপর চড়াও হবে ওই বখাটেগুলো।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘ওরা আমায় মারতে চায়! মেরে দিক! আমি এখান থেকে যাব না। সঞ্জুর বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। আমি হাই কোর্ট এবং রাজ্যপালের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছি। (নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়ির) দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। পুলিশের কেউ নেই এখানে। আমি এসপি এবং আইসি-কে জানাতে বলেছি। এখনও কোনও বাহিনী আসেনি।’’ অভিষেকের দাবি, আগেভাগে তাঁর কর্মসূচির কথা জেলা পুলিশ-প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল। তার পরেও কাউকে দেখা যায়নি। কার্যত তাঁকে বিক্ষোভের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি ডবল ইঞ্জিন সরকারকে নিশানা করেন। খোঁচা দেন শুভেন্দুকে। অভিষেক বলেন, ‘‘যারা তৃণমূলকে চোর বলছে, তারা কোনও মুখ্যমন্ত্রীকে হাত বার করে ক্যামেরার সামনে টাকা নিতে দেখেছে? দু’কান কাটা, নির্লজ্জের মতো এখনকার মুখ্যমন্ত্রীকে টাকা নিতে দেখা গিয়েছে। ঘুষ নিয়েছিল।’’ অভিষেকের কর্মসূচির মধ্যে ছিল ভোট-পরবর্তী হিংসায় নিহতদের বাড়িতে যাওয়া। কলকাতার বেলেঘাটা হয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর। মাঝখানে কালীঘাটের বাড়িতে গিয়ে সিআইডির নোটিস নিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সোনারপুরে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ ঢোকার আগেই রাস্তায় কালো পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বিজেপির নেতা-কর্মীরা। অভিষেককে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দিতে শুরু করেন তাঁরা। পাটুলির কাছে ঢালাই ব্রিজ় থেকে সোনারপুরের কামরাবাদ, সর্বত্র বিজেপি কর্মীরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিধানসভা নির্বাচনের ফলঘোষণার পর তিন সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। শনিবার, ৩০ মে প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় নামেন অভিষেক। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর দক্ষিণ এবং বেলেঘাটার দুই ‘আক্রান্ত’ তৃণমূলকর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান তিনি। তার মধ্যে দুপুর ১টা ২০ মিনিট নাগাদ হরিশ মুখার্জি রোডের বাসভবনে ‘শান্তিনিকেতন’-এ যায় রাজ্য সিআইডি-র একটি দল। তবে তাঁর বাড়ির রক্ষী এবং কর্মীরা জানান, বাড়িতে নেই তৃণমূল নেতা এবং তাঁর বাড়ির কেউ। বিধানসভায় তৃণমূল বিধায়কদের সই-কাণ্ডের তদন্তে অভিষেকের বাড়িতে ওই অভিযান বলে জানা গিয়েছিল। প্রায় ওই সময়ে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ জানান, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তাঁর বাড়িতে রয়েছেন। বেলঘাটায় ভোট-পরবর্তী হিংসায় নিহত তৃণমূল কর্মী বিশ্বনাথ পট্টনায়েকের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে অভিষেক কালীঘাটের বাড়িতে যান। সেখানে সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি বলেন, ‘‘আমি শান্তিনিকেতনে থাকি না। আমার সঙ্গে দেখা করতে হলে এই বাড়িতে আসতে হবে। কেন সিআইডি এসেছে, সেটা তারাই জানে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘সিআইডি কী? ওদের ইডি-সিবিআইয়ের কাছে আমি মাথা নত করিনি। এদের দশপুরুষও যদি চায়, সিআইডি দিয়ে, অফিস ভেঙে ঘর ভেঙে মাথায় আঘাত করে যা ইচ্ছে করে নিক। আমি দমার ছেলে নই।’’ সেখানেই অভিষেক জানান, তিনি সিআইডি-র নোটিস ‘রিসিভ’ করেছেন। তবে কর্মসূচি মুলতুবির প্রশ্ন নেই। বিকেলে সোনারপুরে যাবেন ভোট-পরবর্তী হিংসায় প্রভাবিত পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন বলে জানান অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে যাচ্ছে। বিকেলে সোনারপুরে যাওয়ার কথা রয়েছে আমার। সেখানেও অশান্তি করার চেষ্টা করছে। বেলাঘাটাতেও ধমকাচ্ছে-চমকাচ্ছে। তবে এ সব করে আমাকে দমানো যাবে না।’’ তার পরেই বিকেলে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন অভিষেক।

কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় মিন্টো পার্কের হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে বলেন, “ওঁর (অভিষেকের) মাথায় একটু চোট আছে। বিভিন্ন জায়গায় চোট আছে। ও বলছে গা বমি ভাব আছে। চিকিৎসা হলে, চিকিৎসকেরা এ বিষয়ে সঠিক ভাবে বলতে পারবেন।” বাইপাসের ধারের হাসপাতাল থেকে মিন্টো পার্কের ধারের একটি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে অভিষেককে। গাড়িতে অভিষেকের সঙ্গেই ছিলেন শোভন। বাইপাসের ধারের হাসপাতাল থেকে অভিষেককে নিয়ে যাওয়া হল মিন্টো পার্কের এক হাসপাতালে। গাড়ি থেকে নামিয়ে স্ট্রেচারে শুইয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালের ভিতরে। অভিষেককে হাসপাতাল থেকে বার করার সময়ে মমতা জানান, ডায়মন্ড হারবারের সাংসদকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা এখান থেকে শিফ্ট করছি। এখানে ট্রিটমেন্ট হচ্ছে না। ওপর থেকে বলে দিয়েছে ট্রিটমেন্ট না করতে।” মমতার অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাইপাসের ধারের ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তাঁদের বক্তব্য, যাঁরা অভিযোগ করছেন, তাঁরাই এই বিষয়ে বলতে পারবেন।




