RK NEWZ ভারতীয় ক্রিকেটের ম্যাকিওভেলী বাস্তববাদী রাজনীতির গুরু। প্রত্যাবর্তনের গুরু। ক্রিকেটের ভারতীয় অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তিনি। আজ ক্রিকেটের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি থেকে যে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় হয়, সেই ধারণার পথপ্রদর্শক ছিলেন ডালমিয়াই। নব্বইয়ের দশকে তিনি বুঝেছিলেন, ক্রিকেট শুধু খেলা নয়, এটা বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রও। সেই ভাবনা থেকেই ক্রিকেট সম্প্রচারের স্বত্ব বেসরকারি টিভি চ্যানেলের কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। তখন বিষয়টি নিয়ে প্রবল বিতর্ক হয়েছিল। দূরদর্শনের একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে ক্রিকেট সম্প্রচারকে বাজারের অংশ করে তুলেছিলেন তিনি। ১৯৯৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে ক্রিকেট সম্প্রচার স্বত্বকে বিসিসিআই-এর সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আর তারপর থেকেই ভারতীয় ক্রিকেটের অর্থনৈতিক উত্থান শুরু হয় নতুন মাত্রায়। আজ বিসিসিআই যে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড, তার ভিত তৈরি হয়েছিল ডালমিয়ার হাত ধরেই। শুধু অর্থনীতি নয়, বিশ্ব ক্রিকেটের ক্ষমতার সমীকরণও বদলে দিয়েছিলেন তিনি। একসময় ক্রিকেট মানেই ছিল ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু ডালমিয়া সেই শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কলকাতায় বসেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ এশিয়াতেই। ১৯৮৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানে বিশ্বকাপ আয়োজন ছিল তাঁর প্রথম বড় সাফল্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর আগে বিশ্বকাপ শুধুমাত্র ইংল্যান্ডেই হত। সেই ধারণা বদলে দিয়ে উপমহাদেশে বিশ্বকাপ আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন ডালমিয়া। পরে ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনও ভারতীয় ক্রিকেটের মর্যাদা অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। ১৯৯৭ সালে তিনি আইসিসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ভারত থেকে প্রথমবার কোনও ব্যক্তি সেই পদে বসেন। তখন আইসিসির আর্থিক অবস্থা খুব শক্তিশালী ছিল না।

৩০ মে, ১৯৪০ সালে কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত মারওয়ারি পরিবারে জন্ম জগমোহন ডালমিয়ার। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি গভীর টান ছিল। ক্লাব ও কলেজ পর্যায়ে উইকেটকিপার হিসেবেও খেলেছেন। এমনকী একবার দ্বিশতরানও করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু পরে ক্রিকেটারের জীবন ছেড়ে তিনি পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন। ডালমিয়া পরিবারের সংস্থা ‘এমএল ডালমিয়া অ্যান্ড কোং’ দেশের অন্যতম নামী নির্মাণ সংস্থা হিসেবে পরিচিতি পায়। কলকাতার বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম তৈরির কাজও করেছিল তাঁদের সংস্থা। তবে ব্যবসায় সফল হলেও ক্রিকেট তাঁকে টানত সবসময়। আর সেই টানই তাঁকে নিয়ে আসে ক্রিকেট প্রশাসনের জগতে। ১৯৭৯ সালে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল বা সিএবি-তে যোগ দেন তিনি। সেই শুরু। এরপর ধাপে ধাপে শুধু বাংলা নয়, ভারতীয় ক্রিকেট এবং পরে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম ক্ষমতাশালী মুখ হয়ে ওঠেন জগমোহন ডালমিয়া। জগমোহন ডালমিয়া বিশিষ্ট ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসক ছিলেন। তিনি মিডিয়া জগতে “ভারতীয় ক্রিকেটের ম্যাকিওভেলী বাস্তববাদী রাজনীতির গুরু”, “প্রত্যাবর্তনের গুরু” প্রভৃতি সম্মানসূচক বিশেষণে ভূষিত ছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল ধরে ভারত ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড ও বঙ্গীয় ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন।পূর্বে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি কলকাতা শহরে একজন ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেন। ডালমিয়া ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে যদি সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রশাসকদের নাম লেখা হয়, তবে সেই তালিকার একেবারে প্রথম সারিতেই থাকবেন জগমোহন ডালমিয়া। তিনি শুধু একজন ক্রিকেট প্রশাসক ছিলেন না, ছিলেন এক যুগ বদলে দেওয়া সংগঠক। আজ ভারতীয় ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এবং শক্তিশালী ক্রিকেট বোর্ড, এই ভিত গড়ে দিয়েছিলেন কলকাতার মানুষটিই, যাঁকে সকলে ভালবেসে ডাকতেন ‘জগুদা’।





