RK NEWZ ক্রিকেট : বাংলার ক্রিকেটে এখন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ক্ষমতায়। গত বছর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি দ্বিতীয় বার সিএবি-র সভাপতি হয়েছেন। কিন্তু নির্বাচন না হওয়ায় তাঁর বিরোধী অভিষেক ডালমিয়া গোষ্ঠী তখন নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছিলেন। সিএবি-র এক সদস্য বললেন, ‘‘তখন একাধিক বিধায়ক, সাংসদ, এমনকি পুর প্রতিনিধিরাও সিএবি-তে নিজেদের লোক ঢোকানোর চেষ্টা করেছেন। সফলও হয়েছেন।’’ জানা গেল, এই প্রচেষ্টায় বাদ যাননি কয়েক জন জেলাশাসকও। বৃহস্পতিবার ইডি-র হাতে গ্রেফতার হওয়া পুলিশকর্তা শান্তনু সিংহ বিশ্বাসও নাকি বিরাট ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। ভোটারদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও এখন উঠছে তাঁর বিরুদ্ধে। সিএবি-র এক কর্তা বললেন, যত দিন যাবে এই অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে আসবে। সৌরভ কী ভাবে ক্ষমতায় এসেছেন, আমরা জানি। ওঁকে সিএবি-র সিংহাসনে বসানোর নেপথ্যে নবান্নের সরাসরি ভূমিকা ছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তো ভোটই করতে দেননি। অবশ্য নির্বাচন হলেও সৌরভকে ঠেকানো যেত না বলে মনে করছেন ওই কর্তা। তাঁর দাবি, এ বার সকলে সাহস করে গলা তুলতে পারবে। প্রতিবাদ হবে। যেমন, সৌরভের বিরুদ্ধে তো একাধিক স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ। আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিটালস দলের সঙ্গে যুক্ত থেকেও কী ভাবে সিএবি সভাপতি থাকতে পারেন সৌরভ, প্রশ্ন ওই কর্তার। ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা বেঙ্গল প্রিমিয়ার লিগ নিয়েও ভূরি ভূরি দূর্নীতির অভিযোগ। আগামী সেপ্টেম্বরে সিএবি-র নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগেই দু’জন কর্তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। সচিব বাবলু কোলে ৭০ বছরের ঊর্ধ্বসীমা অতিক্রম করে যাবেন। যুগ্ম সচিব মদনমোহন ঘোষ সব মিলিয়ে ন’বছর ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ পূর্ণ করে ফেলবেন। সহ-সভাপতি নিশীথরঞ্জন দত্তের বয়স নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই তিনটি পদে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা। সিএবি-র এক কর্তা বললেন, নির্বাচন হবে কি না, এখনই বোঝা মুশকিল। অন্তত আরও এক-দেড় মাস যাক। অভিষেক শিবিরের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, তারাও এখনই নির্বাচন নিয়ে কিছু ভাবছে না। তিনটি পদের অন্তত দু’টি অভিষেক শিবিরকে সৌরভ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দিয়ে দিতে পারেন বলেও শোনা গেল। এটা জানার পর সিএবি-র সঙ্গে যুক্ত কেউ কেউ বলছেন, ওঁদের কোনও বদান্যতার দরকার হবে না। সিএবি-র এক সদস্য বললেন, সকলেই নিজের মতো করে ঘুঁটি সাজাবে। ইতিমধ্যেই কোষাধ্যক্ষ সঞ্জয় দাস নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিককে অভিনন্দন জানিয়ে এসেছেন। সৌরভের সঙ্গেও মন্ত্রীর কথা হয়েছে। ওই সদস্য তার পরেই বললেন, কোন ঘুঁটিটা কোথায় রাখলে কিস্তিমাত হবে, সেটা এত তাড়াতাড়ি বোঝা যাচ্ছে না। সকলেই আরও অপেক্ষা করতে চাইছেন।
ফুটবল : রাজ্যের ফুটবল নিয়ামক সংস্থা আইএফএ-তে সভাপতি পদে রয়েছেন অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ভাই। অন্যতম সহ-সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস, যিনি প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই। দীর্ঘ দিনের অভিযোগ, সচিব বা অন্য কয়েক জন কর্তা এঁদের চাপে এবং অত্যাচারে কোনও কাজই করতে পারেন না। এই দমবন্ধ পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক হবে বলে মনে করছেন এক কর্তা। আইএফএ-র আর এক কর্তা বললেন, ডায়মন্ড হারবার ফুটবল ক্লাবকে (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্লাব) কলকাতা লিগে খেলানোর জন্য স্বরূপেরা কী কাণ্ড করেছিলেন, সকলের জানা। এগুলো আশা করি বন্ধ হবে। কিন্তু এঁরা কি সরবেন? সেই সম্ভাবনা এখনই দেখছেন না ওই কর্তা। ক্রিকেটকর্তাদের মতো তিনিও বললেন, সবে তো রাজ্যে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে। খেলায় তার প্রভাব পড়তে সময় লাগবে। তা ছাড়া যত ক্ষণ না সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন নতুন সংবিধান কার্যকর করতে পারছে, তত ক্ষণ চাইলেও আমরা নির্বাচন করতে পারব না। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার, সরকারের বাহুবলে স্বরূপেরা আর ছড়ি ঘোরাতে পারবেন না। সেই দিন শেষ।
টেনিস : রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর সব খেলার মধ্যে সবচেয়ে সুবিধা হবে টেনিসের। কারণ, বেঙ্গল টেনিস অ্যাসোসিয়েশন বিধানসভা নির্বাচনের আগেই লিয়েন্ডার পেজকে তাদের সভাপতি করেছে। আর বিটিএ সভাপতি হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই লিয়েন্ডার আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। বিটিএ-র এক কর্তা সেটা স্বীকারই করে নিলেন। বললেন, ‘‘লিয়েন্ডার থাকায় আমাদের তো সুবিধে হবেই। পালাবদল না হলে আমরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তাম। এখন বোধ হয় আমরাই সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গায়। আমাদের এই সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে।’’
অন্য খেলা : সরকারি সাহায্য না পেয়ে সবচেয়ে ভুগতে হয়েছে ক্রিকেট-ফুটবল বাদ দিয়ে অন্য খেলাগুলোকে। বেঙ্গল অলিম্পিক্স অ্যাসোসিয়েশন বিওএ-এর সচিব চন্দন রায়চৌধুরী ১৮০ ডিগ্রি ডিগবাজি খেয়ে বললেন, ‘‘পরিবর্তন সব সময়ে ভাল। কেন্দ্রীয় সরকার যে ভাবে খেলাধুলো নিয়ে কাজ করেছে, এখানে তা হয়নি। আমরা খুব তাড়াতাড়ি নতুন ক্রীড়ামন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করব। এখানে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘খেলো ইন্ডিয়া’ করতে দেওয়া হয়নি। আশা করি এ বার হবে। আমরা সকলের আগে দাবি জানাব, জাতীয় গেমস করার। এই রাজ্যে এখনও জাতীয় গেমস হয়নি। হয়তো কেন্দ্র এবং রাজ্যে ভিন্ন সরকার থাকার কারণে। এ বার একই সরকার। আশা করি, আমরা জাতীয় গেমস আয়োজন করতে পারব। একটা জাতীয় গেমস করতে পারলে যে কোনও রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামো বদলে যায়। সেই রাজ্যের খেলাধুলোয় বিরাট উন্নয়নের সুযোগ চলে আসে। এটা হওয়া দরকার।’’ বিওএ-র আর এক কর্তা সরাসরি আগের সরকার এবং ক্রীড়ামন্ত্রীকে একহাত নিয়ে বললেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর দাদা-ভাইয়েরা যা খুশি তা-ই করেছেন। আশা করি এ বার সেই পরিবারতন্ত্র কায়েম হবে না। আগের মন্ত্রী খেলাধুলো কিছু বুঝতেনই না। এখন যিনি দায়িত্ব নিয়েছেন, তিনি সে রকম নন। কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। তবে পুরোটা বুঝতে আরও একটু সময় দরকার।’’
ময়দানের ক্লাবগুলোর মধ্যে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ইস্টবেঙ্গলের উপর। শোনা যাচ্ছে, স্পনসর হিসাবে সরে যেতে পারে ইমামি। তারা কোনও সময়েই লাল-হলুদের স্পনসর হতে চায়নি। শেষ মুহূর্তে জোর করে ইস্টবেঙ্গলকে তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়। ইস্টবেঙ্গলের স্পনসর হওয়ার দৌড়ে ছিল একাধিক সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সংস্থা। ইমামি ধারেকাছে ছিল না। একেবারে শেষ মুহূর্তে তাদের এবং ইস্টবেঙ্গলের প্রতিনিধিদের নবান্নে ডেকে পাঠিয়ে চুক্তি করানো হয়। এর পর সময় যত গড়িয়েছে, তত স্পষ্ট হয়েছে, দু’পক্ষের কেউই পরস্পরকে নিয়ে খুব একটা খুশি নয়। যে সরকারের চাপে ইমামি লাল-হলুদে টাকা ঢেলেছিল, সেই সরকার পড়ে যাওয়ায় ইমামির পক্ষেও এখন সরে আসা কঠিন নয়। যদিও ইমামির পক্ষ থেকে এখনই এই সম্ভাবনার কথা বলা হয়নি।
মোহনবাগানের ফুটবল দল শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েন্কার হাতে। ফলে আর্থিক সমস্যা নেই। কিন্তু ক্লাবের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বদল আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। গত সরকারের হস্তক্ষেপে মোহনবাগানের নির্বাচনও শেষ মুহূর্তে হয়নি। যুযুধান দুই গোষ্ঠী এখন একসঙ্গে ক্লাব চালাচ্ছে। সভাপতি হয়েছেন দেবাশিস দত্ত। সচিব হয়েছেন সৃঞ্জয় বসু। নির্বাচনী প্রচারে দেবাশিস এবং সৃঞ্জয় পরস্পরের বিরুদ্ধে অসংখ্য বার তোপ দেগেছিলেন। তাঁর পরিবারে দেবাশিস ভাঙন ধরাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছিলেন সৃঞ্জয়। তৃণমূলের একাধিক নেতা-মন্ত্রী তখন দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়েছিলেন। শোনা যাচ্ছে, নতুন সরকার আসায় দেবাশিস নাকি সুবিধা পাবেন। যুক্তি, সৃঞ্জয় এবং তাঁর বাবা সদ্যপ্রয়াত টুটু বসু একসময় রাজ্যসভায় তৃণমূলের সাংসদ ছিলেন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই বিজেপি সরকারে আসায় দেবাশিসের সুবিধা। যদিও দুই গোষ্ঠীর লোকজনই এটা মানতে চাইলেন না।
কলকাতার আর এক ক্লাব মহামেডানের সবচেয়ে বেশি সমস্যা। তাঁদের এক কর্তা বললেন, অস্বীকার করে লাভ নেই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যই আমরা আইএসএল খেলতে পারছি। ওঁর জন্যই আমরা ফুটবলারদের বকেয়া মিটিয়ে নিজেদের উপর থেকে ফিফার নির্বাসন তুলেছি। এখনও সাত মাসের বেতন বাকি। নতুন সরকারের থেকে সাহায্য না পেলে এই টাকা আমরা দিতে পারব না। তখন আবার না নির্বাসিত হয়ে যাই।
দু’-এক দিনের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছেন মহামেডান কর্তারা। ওই কর্তা বললেন, আমরা ওঁকে অনুরোধ করব। তার বেশি আর কী করতে পারি। যদি আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তা হলে নিজেদের মতো করে যত দিন পারি ক্লাব চালাব।
কলকাতার অন্যতম প্রধান ক্লাব দক্ষিণ কলকাতা সংসদ বা ডিকেএস। এই ক্লাবের সভাপতি দেবাশিস কুমার। রাসবিহারী কেন্দ্রে এ বার হেরে গিয়েছেন দীর্ঘদিনের তৃণমূল বিধায়ক। ফেঁসেছেন জমি সংক্রান্ত বিতর্কে। ক্লাবের এক সদস্য বললেন, নির্বাচনে ওঁর হারটা অপ্রত্যাশিত। ব্যক্তিগত ভাবে বলতে পারি, ওঁর থেকে ক্লাব সব সময়ে সাহায্য পেয়েছে। ওঁকে যে কোনও সময়ে আমরা পেয়েছি। মানুষ হিসাবে ভাল। রাজ্যের পালাবদলে বা ওঁর হারে এখনও পর্যন্ত ক্লাবে কোনও প্রভাব পড়েনি। আশা করি, ভবিষ্যতে পড়বে না। এখনই ক্লাবের ক্ষমতাবদলের কোনও সম্ভাবনা দেখছি না। পরিবর্তনের অপেক্ষায় সময় চাইছে গোটা ময়দান। সকলেই চাইছেন, খেলাধুলোয় রাজনীতিকরণ বন্ধ হোক। যাঁরা আগের সরকারের বদান্যতায় ক্ষমতায়, তাঁরা নতুন করে ছক কষছেন। যাঁরা আগের সরকারের বিরাগভাজন হওয়ার কারণে ক্ষমতায় আসতে পারেননি, তাঁরাও ঘুঁটি সাজাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদল হয়েছে। তাই রাজ্যের খেলাধুলোর প্রশাসনিক স্তরেও পরিবর্তনের আঁচ পাচ্ছেন অধিকাংশ কর্তাই। তবে, সকলেরই প্রাথমিক বক্তব্য, বদলাতে সময় লাগবে। ঠিক কোন পদ্ধতিতে, কবে, কী ভাবে বদলটা আসবে, সেটা এখনই বলা বা বোঝা সম্ভব নয়। আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। ময়দানের এক কর্তাকে শুভেন্দু অধিকারীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে সেজেগুজে সোৎসাহে যেতে দেখে আর এক কর্তা টিপ্পনী কেটে বলেছিলেন, ‘‘এত তাড়াতাড়ি ডিগবাজি খেয়ে গেলেন?’’ গত শনিবার ব্রিগেডে যাওয়া কর্তার সোজাসাপটা জবাব ছিল, ‘‘ক্লাবটা তো চালাতে হবে। সরকারকে নিয়ে তো চলতে হবে।’’





