RK NEWZ এক্সিট পোল কী? কীভাবে করা হয়, এবং এই এক্সিট পোল কতটা ভরসাযোগ্য? আসলে বাংলার ক্ষেত্রে এই এক্সিট পোলের ফলাফল ইদানিং সেভাবে মিলছে না। ২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে এক্সিট পোলের ফলাফল মেলেনি। ফলে এক্সিট পোলের প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছে। এক্সিট পোল নিয়ে উত্তপ্ত বঙ্গ রাজনীতি। কে জিতবে, কে হারবে তা নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। অধিকাংশ এক্সিট পোলই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে তৃণমূল ও বিজেপির। তবে খানিকটা এগিয়ে গেরুয়া শিবির। আবার দু-একটি এক্সিট পোলে ইঙ্গিত দিচ্ছে তৃণমূলের প্রত্যাবর্তনেরও। ভোটদানের পর ভোটারদের মতামতের ভিত্তিতে ফলাফলের আগাম পূর্বাভাসই হল এক্সিট পোল। ওপিনিয়ন পোল আর এক্সিট পোলের মধ্যে একটা মূল পার্থক্য হল, ওপিনিয়ন পোল করা হয় ভোটের আগে। ভোটারদের প্রশ্ন করা হয়, তাঁরা কাকে ভোট দিতে চান। আর এক্সিট পোল ভোটের পর করা হয়। প্রশ্ন করা হয়, তিনি ভোট কাকে দিলেন। ডাচ সমাজতত্ত্ববিদ মার্সেল ভ্যান ড্যাম এবং আমেরিকান ভোট বিশেষজ্ঞ ওয়ারেন মিটোফস্কি এই এক্সিট পোল ধারনাটির জন্মদাতা। একটি মতানুযায়ী, ১৯৬৭ সালে ডাচ আইনসভার নির্বাচনে ভ্যান ড্যাম প্রথম সমীক্ষা শুরু করেছিলেন। আবার অপর একটি মত অনুসারে আমেরিকার কেন্টাকির স্থানীয় নির্বাচনে মিটোফস্কি সিবিএস নিউজের পক্ষে ১৯৬৭ সালে প্রথম এক্সিট পোল পদ্ধতিটি প্রয়োগ করেন। ভারতেও ১৯৬৭ সালেই ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক ওপিনিয়ন নামের সংস্থা ন্যাশনাল ইলেকশন স্টাডি নামের একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল। তবে এক্সিট পোল বলতে যা বোঝায়, সেই ব্যাপারটি প্রথম ভারতে শুরু হয় ১৯৮৪ সালে প্রণয় রায়, ডেভিড বাটলার এবং অশোক লাহিড়ীর তত্ত্বাবধানে। তাঁরা তিনজন মিলিতভাবে ‘এ কমপেনডিয়াম অফ ইন্ডিয়ান ইলেকশনস’ নামে একটি বই লেখেন যেখানে তাঁরা এই সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল তুলে ধরেন। কীভাবে হয় এক্সিট পোল? সাধারণত কোনও ভোটার ভোট দিয়ে বেরোলে তাঁর কাছ থেকে নির্বাচন সম্পর্কে মতামত নেওয়া হয়। জানতে চাওয়া হয়, তিনি কাকে ভোট দিলেন। অনেক সময় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে এই নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আবার কখনও কখনও সরাসরি ভোটারকে কাকে ভোট দিলেন না প্রশ্ন করে, অন্যান্য প্রশ্নের মাধ্যমে তাঁর মনোভাব পরীক্ষা করা হয়। মতামত সংগ্রহের ক্ষেত্রে ভোটারদের গোপনীয়তার দিকটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভোটারদের নাম না জানতে চেয়ে শুধুই মতামত চাওয়া হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে নাম জানতে চাওয়া হলেও সেটা গোপন রাখাই দস্তুর। যদিও ইদানিং সেগুলি করা হচ্ছে কিনা তাতে সন্দেহ রয়েছে। নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হয় আলাদা আলাদা বয়স, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, শ্রেণি সবকিছু ওই এলাকার আনুপাতিক হারে নমুনার মধ্যে রয়েছে কিনা। একই এলাকায় প্রচুর নমুনা সংগ্রহ না করে আলাদা আলাদা এলাকায় নতুনা সংগ্রহ করা হয়। কারণ এলাকার ভেদেও ভোটারদের মতামত পালটায়। অনেক সময় স্থানীয় ইস্যু নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। এক্সিট পোলের ক্ষেত্রে এই নমুনার সংখ্যাটা যতটা বেশি হয়, তত ফলাফল নিখুঁত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নমুনার বৈচিত্র যত বেশি হয় ফলাফলের নিখুঁত হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়ে। যে কোনও নির্বাচনে মোট ভোটারের অন্তত ১-২ শতাংশ নমুনা না সংগ্রহ করতে পারলে সেই এক্সিট পোলের নিখুঁত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম হয়। নমুনা সংগ্রহই শেষ নয়, সেই নমুনা থেকে পাওয়া ফলাফলের সঙ্গে ওই এলাকার অতীতের ভোটচিত্র, ইস্যু এবং প্রচারের বহর সবকিছু হিসাবের মধ্যে এনে তবেই ফলাফল সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা যায়। এখানেই সমীক্ষকের নিজের প্রজ্ঞা এবং অনুমান শক্তি গুরুত্ব পায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবশ্যই সমীক্ষকের নিরপেক্ষতা। ইদানিং বহু এক্সিট পোল ভুল হওয়ার কারণ মূলত নমুনা সংগ্রহে আলস্য, নমুনায় বৈচিত্রর অভাব, সমীক্ষাকারীর প্রজ্ঞা এবং নিরপেক্ষতার অভাব। ইদানিং অনেক ক্ষেত্রে নমুনার সঙ্গে অন্যান্য ফ্যাক্টরের তুলনার হিসাব করার সময় এআই ব্যবহার করা হচ্ছে, কারও কারও মতে সেটাও এক্সিট পোল ভুল হওয়ার অন্যতম বড় কারণ। তাৎপর্যপূর্ণভাবে সি ভোটার এবং অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার মতো তথাকথিত গ্রহণযোগ্য এবং নামী সমীক্ষক সংস্থা এবার বাংলার নিজেদের সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশই করেনি। অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার কর্তার বক্তব্য, “এমন কোনও তথ্য আমরা প্রকাশ করতে চাই না। যাতে আমাদের নিজেদেরই আস্থা নেই।” বস্তুত তিনি বকলমে স্বীকার করে নিয়েছেন বাংলার মন বুঝতে তাঁর সংস্থার সমীক্ষকরা ব্যর্থ হয়েছেন। আসলে বাংলার ক্ষেত্রে এক্সিট পোল কাজটা বরাবরই বেশ কঠিন। এখানকার রাজনীতি সচেতন মানুষ সচরাচর কোনও সমীক্ষক সংস্থাকে সঠিক তথ্য দেন না। তাছাড়া বাংলার মহিলা ভোটাররা নির্বাচনের ফলাফলে নির্ণায়ক ভূমিকা নেন। যে তথ্য অনেক সময় বুথ ফেরত সমীক্ষায় ধরা পড়ে না। সম্ভবত সেকারণেই সেই ২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে এক্সিট পোলের ফলাফল অন্তত বাংলার ক্ষেত্রে অন্তত মেলেনি।





