RK NEWZ প্রথম দফার মতো দ্বিতীয়াতেও রেকর্ড গড়ল বঙ্গের ভোটের হার। বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাজ্যের ১৪২ আসনে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট পড়েছে। রাজ্যের ৭টি জেলাতেই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে, উৎসবের আবহে ভোট দিয়েছেন। দিনের শেষে এটাও বলতে হয়, যে প্রথম দফার মতো না হলেও ভোট দ্বিতীয়াতেও ভোট হয়েছে মোটের উপর অবাধ ও শান্তিপূর্ণ। দ্বিতীয় দফায় ৭ জেলার যে ১৪২ আসনে ভোট হল সেই আসনগুলিতে ২০২১ সালে ভোট পড়েছিল ৮০.৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ১০ শতাংশ ভোট বেড়েছে দ্বিতীয় দফায়। এই সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে। দ্বিতীয় দফায় ভোটের চুড়ান্ত হার আরও খানিকটা বাড়তে পারে। সেক্ষত্রে এই ব্যবধান আরও খানিকটা বাড়বে। ভোটদানের হারে সন্তোষপ্রকাশ করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বলছে, “স্বাধীনতার পর এটাই বাংলার দুই পর্বে সবচেয়ে বেশি ভোটদান। নির্বাচন কমিশনের তরফে সকল ভোটারকে শুভেচ্ছা।” এই বিপুল হারে ভোটদানের কারণ কী? আর সেটা কী ইঙ্গিত করে? বস্তুত এবারের ভোটবৃদ্ধির মূল কারণ অবশ্যই এসআইআর। ভোটার তালিকা যত স্বচ্ছ্ব হয়, ভোটের হার তত বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক। এসআইআর প্রক্রিয়ায় সব মিলিয়ে বাংলায় যে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ গিয়েছে তার প্রায় ৬০ লক্ষ হয় মৃত নয় স্থানান্তরিত। অন্তত কমিশনের তথ্য সে কথাই বলছে। এই বিপুল সংখ্যক ভোটার এতদিন ভোটার তালিকায় ছিল। যা মোট ভোটারের প্রায় ৮-৯ শতাংশ। এই বিপুল ভোটার ছেঁটে ফেলার ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভোট শতাংশ সমহারে বেড়েছে। এতদিন ভোটার তালিকায় ৮-৯ শতাংশ ছিল অস্তিত্বহীন ভোটার। অর্থাৎ ভোট হচ্ছিলই ৯১-৯২ শতাংশ ভোটারের মধ্যে। ফলে বিপুল হারে ভোট পড়লেও চূড়ান্ত সংখ্যাটা তুলনায় কমই দেখাত। এবার যেহেতু ভোটার তালিকা থেকে ওই বিপুল অস্তিত্বহীন ভোটার কমে গিয়েছে, তাই এমনিতেই ভোটের হার ৮-১০ শতাংশ বেশি দেখাচ্ছে।
তাছাড়া এসআইআরের ফলে এবার অনেক ভোটারের মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করেছে। ভোটারদের একটা বড় অংশের মনে হয়েছে, এবার ভোট না দিলে পরবর্তীকালে সমস্যা তৈরি হতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকে বহু ভোটার যারা হয়তো এতদিন ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দোনামনা করতেন, তারাও এবার ভোট দিয়েছেন। ভিনরাজ্য থেকে হাজারে হাজারে পরিযায়ী শ্রমিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে এসেছেন স্রেফ ওই আশঙ্কা থেকে। তবে এই দুই ফ্যাক্টরকে হিসাবে ধরেও বলা যায়, আগের তুলনায় কিছুটা হলেও বঙ্গে ভোটদান বেড়েছে। আর সেটাতে নির্বাচন কমিশনের প্রশংসা প্রাপ্য। কমিশন যেভাবে ভোটারদের মনে আতঙ্ক কাটিয়ে সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে, সেটাই ভোটবৃদ্ধির ক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করেছে।
এখন প্রশ্ন হল, এই বিপুল ভোটবৃদ্ধি কী ইঙ্গিত করে? একটা বহু পুরনো তত্ত্ব ভোট বিশারদরা আউড়ে থাকেন। সেটা হল, প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া থাকলে বেশি ভোট পড়ে। তেমন হলে রাজ্যে পোয়াবারো হতে পারে বিজেপির। কিন্তু সম্প্রতি একাধিক নির্বাচনে সেই মিথ ভেঙেচুরে গিয়েছে। যার সর্বশেষ উদাহরণ বিহারের নির্বাচন। সেখানে ভোটের হার অনেকটা বাড়া সত্ত্বেও সরকারের বিরুদ্ধে ভোট পড়েনি। বরং আরও বেশি আসন নিয়ে নীতীশ কুমার সরকার গড়েছেন। সম্প্রতি আরও একাধিক নির্বাচনে এই ট্রেন্ড দেখা গিয়েছে। তবে একটা তত্ত্ব সর্বজনবিদিত। বেশি ভোটের নির্বাচন সাধারণত কোনও ‘ওয়েভের’ বা বড় ঝড়ের ইঙ্গিত দেয়। সেটা শাসকের পক্ষেও হতে পারে বিপক্ষেও। বাংলায় এবারের নির্বাচনে ভোটবৃদ্ধির কারণ যেহেতু SIR, সেক্ষেত্রে SIR-এর বিরোধিতাও ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলতে পারে। আর সেটা হলে কিন্তু শেষ হাসি হাসতে পারে তৃণমূল। আপাতত দুই শিবিরই কিন্তু জয়ের দাবি করছে।
দুপুর ৩টেতেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদানের হারে সমস্ত নজিরকে ছাপিয়ে গিয়েছিল এ বারের ভোট। বিকেল ৫টায় সেই ব্যবধান আরও বাড়ল। বুধবার দ্বিতীয় দফার ভোটে ১৪২টি কেন্দ্রে ৮৯.৯৯ শতাংশ ভোট পড়ল বিকেল ৫টা পর্যন্ত। দু’দফা মিলিয়ে ৯১.৬৮ শতাংশ ভোট ইতিমধ্যেই যন্ত্রবন্দি হয়ে গিয়েছে। বাকি এক ঘণ্টায় এই অঙ্ক নিঃসন্দেহেই আরও বাড়বে। এর আগে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদানের সর্বোচ্চ হার ছিল ২০১১ সালে। ‘পরিবর্তনের’ সেই নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮৪.৩৩ শতাংশ। বুধবার দুপুর ৩টে পর্যন্ত রাজ্যে মোট ভোট পড়ে ৮৬.৩৫ শতাংশ। দ্বিতীয় দফায় মোট ভোটারের সংখ্যা ৩ কোটি ২১ লক্ষ ৭৫ হাজার ২৯৯। অর্থাৎ, হিসাব বলছে, ৫টা পর্যন্ত ভোট পড়ে গিয়েছে ২ কোটি ৮৯ লক্ষ ৫৪ হাজারের সামান্য কিছু বেশি। দু’দফা মিলিয়ে বুধবার ৫টা পর্যন্ত পড়ল ৬ কোটি ২৫ লক্ষ ৭৬ হাজারের বেশি ভোট। রাজ্যে এ বার মোট ভোটার ৬ কোটি ৮২ লক্ষ ৫২ হাজার ৬০৩। ভোট শেষের এক ঘণ্টা বাকি থাকতেই এ বার ভোটদানের হার দাঁড়িয়ে গেল ৯১.৬৮ শতাংশে। প্রথম দফায় বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাজ্যে ভোট পড়েছিল ৮৯.৯৩ শতাংশ। সেই নিরিখে দ্বিতীয় দফা প্রথম দফাকেও ছাপিয়ে গেল। গত বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় রাজ্যের ১৫২টি কেন্দ্রে নির্বাচন হয়েছিল। ওই দফায় মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৬০ লক্ষ ৭৭ হাজার ৩০৪। ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন ৩ কোটি ৩৬ লক্ষ ২২ হাজার ১৬৮ জন। শতাংশের নিরিখে ৯৩.১৯ শতাংশ ভোটার। প্রথম দফায় ভোটদানের চূড়ান্ত হার ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে কমিশন (৯৩.১৩ শতাংশ)। দ্বিতীয় দফায় বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটদানের হার ৮৯.৯৯ শতাংশ। দুই দফা মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত ভোটের হার ৯১.৬৮ শতাংশ, যা ইতিমধ্যেই ২০১১ সালের ভোটদানের হার (৮৪.৩৩)-কে ছাপিয়ে গিয়েছে।





