RK NEWZ ব্যস্ত জীবনে ক্লান্তি, অবসাদ আর দুর্বলতা যেন আমাদের ছায়াসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় ডায়েট বা রূপচর্চা করেও ত্বকের জেল্লা ফিরছে না বা চুল পড়া থামছে না। এর মূল কারণ হতে পারে অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা। আমাদের দেশে বিপুল সংখ্যক মহিলা এই পুষ্টিহীনতায় ভোগেন। প্রখ্যাত সেলিব্রিটি পুষ্টিবিদ রুজুতা দিওয়েকর জানাচ্ছেন, শরীর যদি ঠিকমতো আয়রন শোষণ করতে না পারে, তবেই এই বিপত্তি ঘটে। আর এর প্রতিকার লুকিয়ে আছে আমাদের প্রাত্যহিক খাদ্যাভ্যাসের ছোট ছোট পরিবর্তনের মধ্যে।
মরসুমি ফলের জাদু ও ভিটামিন সি-র গুরুত্ব
রুজুতার মতে, ফল হল স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে অবহেলিত এক ‘সুপারফুড’। বিশেষ করে গরমকালের আম আয়রন বাড়ানোর অন্যতম সেরা হাতিয়ার। আমে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে, যা শরীরকে খাবার থেকে আয়রন শুষে নিতে সাহায্য করে।
আম ছাড়াও পেয়ারা বা কাজু ফলও পাতে রাখা জরুরি। মনে রাখবেন, শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি না থাকলে আপনি যতই আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খান না কেন, তা রক্তে ঠিকমতো মিশবে না।
ডাল, ভাত ও রুটির যুগলবন্দি
মুগ, অড়হর, ছোলা কিংবা মটকি— সব ধরনের ডালই অ্যামাইনো অ্যাসিড, ভিটামিন বি এবং ফাইবারে ভরপুর। কিন্তু শুধু ডাল খেলে হবে না। রুজুতা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ডালের পুষ্টিগুণ শরীর তখনই পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে যখন তা ভাত বা রুটির সঙ্গে খাওয়া হয়। এটি আয়রনের আত্তীকরণ বা অ্যাসিমিলেশন প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ করে দেয়।
দই ও লস্যি: দুপুরের খাবারের অপরিহার্য সঙ্গী
গ্রীষ্মের দুপুরে এক গ্লাস লস্যি বা এক বাটি দই শুধু শরীর ঠান্ডা রাখে না, এটি ভিটামিন বি-১২ এর মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আর এই ভিটামিন বি-১২ শরীরে আয়রন শোষণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। তাই সকালের জলখাবার বা দুপুরের খাবারে দই রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
গুড়-ছোলা: বাংলার চিরন্তন পুষ্টি
ছোলা এবং গুড়— এই কম্বিনেশনটি ভারতের প্রাচীনতম ও জনপ্রিয় নাস্তা। রুজুতার মতে, এই জুড়ি রক্তে আয়রনের মাত্রা বাড়াতে অদ্বিতীয়। এছাড়া আলিব বা হালিভ বীজের লাড্ডু প্রতিদিনের তালিকায় রাখলে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। শুকনো এপ্রিকট বা খুবানি ফলও দিনে অন্তত একবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
লোহার বাসনে রান্না ও অন্যান্য টিপস
সবচেয়ে জরুরি এবং সহজ একটি পরামর্শ হল, রান্নার পদ্ধতিতে বদল আনা। অ্যালুমিনিয়াম বা নন-স্টিকের বদলে লোহার কড়াই বা বাসনে রান্না করলে খাবারের পুষ্টিগুণের সাথে প্রাকৃতিক উপায়ে কিছুটা আয়রন যুক্ত হয়। একবার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিক হলে আপনার থাইরয়েড ও ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা যেমন বাড়বে, তেমনি মেজাজ ও ত্বকের জেল্লাও ফিরে আসবে।
কী কী এড়িয়ে চলবেন?
রুজুতা সতর্ক করেছেন যে, অতিরিক্ত মদ্যপান লিভারের ক্ষতির পাশাপাশি আয়রন শোষণে বাধা দেয়। এছাড়া অতিরিক্ত ব্ল্যাক কফি, মাত্রাতিরিক্ত ফলের রস বা স্মুদি এবং ল্যাক্সেটিভের ব্যবহার হিতে বিপরীত করতে পারে। কেবল স্যালাড খেয়ে বেঁচে থাকাও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি হল, বৈচিত্র্যপূর্ণ ও পুষ্টিকর খাবার। তাই সাপ্লিমেন্টের পেছনে না ছুটে প্রকৃতির ওপর ভরসা রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। ওজন কমানোর যাত্রায় সবচেয়ে কঠিন সময় কোনটি? অধিকাংশ মানুষের উত্তর হবে, বিকেল। সকালে দারুণ উৎসাহে স্বাস্থ্যকর ব্রেকফাস্ট, দুপুরে পরিমিত মধ্যাহ্নভোজ— সব ঠিকঠাকই চলে। কিন্তু বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুখে মনের মধ্যে শুরু হয় প্রবল টানাপড়েন। মনে হয় চটজলদি মুখরোচক কিছু একটা না খেলে আর চলছে না। এই ক্রেভিংস বা খাওয়ার প্রবল ইচ্ছার জন্য নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করুন। কারণ, এটি আপনার মনের দুর্বলতা নয়, বরং শরীরের ভেতরের হরমোনের পরিবর্তন।
হরমোনের সেই লুকোচুরি খেলা
আমাদের শরীরে খিদে এবং তৃপ্তির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে প্রধানত দুটি হরমোন— ঘ্রেলিন এবং লেপটিন। ঘ্রেলিন হল ‘হাঙ্গার হরমোন’ যা আমাদের জানান দেয় যে পেট খালি, এবার খেতে হবে। অন্যদিকে লেপটিন হল সেই হরমোন যা মস্তিষ্ককে বলে দেয় যে পেট ভরে গেছে। দিনের আলো যত কমতে থাকে, আমাদের শরীরে ঘ্রেলিনের মাত্রা বাড়তে শুরু করে এবং লেপটিনের মাত্রা কমতে থাকে। এর পাশাপাশি সারা দিনের কাজের চাপে এনার্জি লেভেল কমে যায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রায় ওঠানামা শুরু হয়। এই সময় মস্তিষ্ক খুব দ্রুত শক্তি পাওয়ার জন্য শর্করার খোঁজ করে। আর সেই কারণেই বিকেল ৫টা বাজলেই আমাদের মন মিষ্টি, চকোলেট বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবারের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে।
সমাধান কী? স্মার্ট স্ন্যাকস সিলেকশন
পুষ্টিবিদ মামি আগরওয়ালের মতে, এই খিদেকে উপেক্ষা করা বা একদম না খেয়ে থাকা কোনও সমাধান নয়। বরং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিকেলের টিফিন নির্বাচন করতে হবে। তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন এমন খাবার খেতে যা ‘প্রোটিন এবং ফাইবার’-এর সঠিক মিশ্রণ।
কেন এই মিশ্রণটি কার্যকর?
১. দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে: প্রোটিন হজম হতে সময় নেয়, তাই বারবার খাওয়ার ইচ্ছা জাগে না।
২. শর্করার ভারসাম্য: ফাইবার রক্তে চিনির মাত্রা হুট করে বাড়তে দেয় না, ফলে এনার্জি লেভেল স্থিতিশীল থাকে।
৩. রাতের খাবারের ওপর নিয়ন্ত্রণ: বিকেলে স্বাস্থ্যকর কিছু খেলে ডিনারে অতিরিক্ত খেয়ে ফেলার প্রবণতা কমে যায়।
বিস্কুটের বদলে কী খাবেন?
চায়ের সঙ্গে বিস্কুট বা ভাজাপোড়া না খেয়ে আপনি বেছে নিতে পারেন অল্প কিছু বাদাম ও ফল। এছাড়া টক দইয়ের সঙ্গে ফ্ল্যাক্স সিড বা চিয়া সিড মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে। অল্প ছোলা সেদ্ধ বা একটি সেদ্ধ ডিমও হতে পারে চমৎকার বিকেলের নাস্তা।
আসল কথা হলো, নিজের শরীরের বিরুদ্ধে লড়াই না করে শরীরের চাহিদাগুলো বুঝে নেওয়া। যখন আপনি জানবেন যে আপনার বিকেলের খিদের পেছনে হরমোন দায়ী, তখন আপনি অপরাধবোধে না ভুগে বরং সঠিক খাবার দিয়ে তাকে সামলাতে পারবেন। এই ছোট ছোট পরিবর্তনই আপনার ওজন কমানোর লক্ষ্যকে অনেক সহজ করে তুলবে।





