Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

বিশ্বকাপে ভারতের সোনালি সফরে সৌম্যজিৎ! ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল বিশ্বকাপে গোল করে নজরে রিষড়ার কিশোর

RK NEWZ পূর্ব ইউরোপের দেশ আজা রবাইজানের বাকুতে বিশ্বকাপ উৎসবের গ্রুপ কে-র পাঁচ ম্যাচে তিনটিতে জয়। একটি ড্র। একটিতে হার ভারতের ছেলেদের। অভাবনীয় হলেও সত্যি। লাওসের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেই নজর কেড়েছে রিষড়ার এই কিশোর। প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের বাইরে থেকে তাঁর নেওয়া জোরালো শট জড়িয়ে যায় জালে। টালির চালের ছোট ঘর। দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। অভাবের সংসারে প্রতিদিনের লড়াই। সেই ঘর থেকেই একদিন দেশের জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চে নামার স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্নেরই যেন প্রাথমিক ধাপ পূরণ হল রিষড়ার সাতগড়ার সৌম্যজিৎ সরকারের। ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল বিশ্বকাপে ভারতের হয়ে মাঠে নেমে প্রতিপক্ষের জালে বল জড়ালো ১৫ বছরের এই কিশোর। লাওসের বিরুদ্ধে ৪-২ গোলে জেতে ভারত। আর সেই জয়ের অন্যতম মুহূর্ত সৌম্যজিতের দুরন্ত গোল। টিভির পর্দায় ছেলের কীর্তি দেখে গর্বে বুক ভরে উঠেছে বাবা-মায়ের। তবে এই আনন্দের পিছনে রয়েছে বছরের পর বছর লড়াই, ত্যাগ আর অদম্য জেদ। সাতগড়া হাই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র সৌম্যজিৎ মূলত ডিফেন্ডার। প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়াই তার কাজ। কিন্তু সুযোগ পেলে আক্রমণাত্মক খেলে গোল করতেও যে সে সমান পারদর্শী ফুটবল বিশ্বকাপে নিজেদের মেলে ধরছে ভারত। ডিফেন্স সামলানোর দায়িত্বে থাকা ছেলেটির পা থেকেই এল বিশ্বমঞ্চে ভারতের হয়ে গোল। এই সাফল্যের পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। সৌম্যজিতের বাবা পাঁচুগোপাল সরকার একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। মা পুষ্পাঞ্জলি সরকার গৃহবধূ। সীমিত আয়ের সংসারে ছেলের ফুটবল প্রশিক্ষণ, পড়াশোনা এবং খেলার খরচ সামলানো সহজ ছিল না। তবু ছেলের স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়াননি তাঁরা। পাশে থেকেছেন পরিবারের অন্য সদস্যেরাও।
বিশ্ব ফুটবলে যে কটা আফ্রিকার দেশের নাম সমীহের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, সেগুলির মধ্যে অন্যতম ক্যামেরুন। সেই ক্যামেরুনকে কঠিন ম্যাচে ২-১ গোলে হারিয়ে দেয় ভারতের অনূর্ধ্ব-১৫ ছেলেরা। ফিফা আয়োজিত প্রথম ম্যাচে লাওসের বিরুদ্ধে বাকুর হোভসান কম্পিটিশন কমপ্লেক্সে দুরন্ত ফুটবল উপহার দেয় বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজের ছেলেরা। ৪-২ গোলে জেতে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৫ দল। ভারতের হয়ে জোড়া গোল করে আর লালরেমরুতফেলা। গোল করে ম্যাকডোনিশ এনগাইরাংবাম এবং শ্রীরামপুরের সাতঘড়া পূর্বপাড়ার সৌম্যজিৎ সরকার। ক্যামেরুনের বিরুদ্ধে অনেক কঠিন লড়াইয়ে পড়তে হয়েছে টিম ইন্ডিয়াকে। অনূর্ধ্ব ১৫ বিশ্বকাপে জয়ের হ্যাটট্রিক অল্পের জন্য হাতছাড়া ভারতের। গ্রেনাডার বিরুদ্ধে ৩-০ গোলে এগিয়ে থেকে ৩-৩ গোলে ড্র বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজের দলের। একমাত্র হার সেনেগালের বিরুদ্ধে, বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজের ছেলেরা তিন ম্যাচ জিতে দ্বিতীয় রাউন্ডে।

২০২২ সালে বিধাননগর মিউনিসিপ্যাল স্পোর্টস অ্যাকাডেমিতে যোগ দেওয়া, ২০২৪ সালে এফসি মাদ্রাজে সুযোগ পাওয়া, আর ২০২৬ সালে ভারতীয় অনূর্ধ্ব-১৫ দলে জায়গা করে নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে আজারবাইজান পাড়ি। সৌম্যজিতের এই যাত্রাপথের প্রতিটি ধাপেই রয়েছে পরিশ্রম আর নাছোড় মানসিকতা। সৌম্যজিতের ফুটবলার হয়ে ওঠার কাহিনির শুরু রিষড়া জুভেনাইল কোচিং সেন্টারে। শান্তনু দেব ওরফে নাড়ুদার হাত ধরে। সেখান থেকেই নাড়ুদা তাকে নিয়ে আসে বিধাননগর মিউনিসিপ্যাল স্পোর্টস অ্যাকাডেমিতে। সেই থেকেই যাত্রা শুরু বৈশাখী মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে। পরে সুযোগ পায় অ্যাকাডেমির অনূর্ধ্ব-১৩ দলে। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের প্রতিভার পরিচয় দেয় সৌম্যজিৎ। ২০২৩ সালে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের সাব-জুনিয়র লিগের মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে অ্যাকাডেমি। দল যায় ওড়িশায়। সেখানে এফসি মাদ্রাজের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ ১-১ গোলে শেষ হয়। সেই ম্যাচেই সৌম্যজিতের খেলা নজর কাড়ে এফসি মাদ্রাজের কর্তাদের। পরের বছরই নতুন দলের জার্সিতে দেখা যায় তাকে। অ্যাকাডেমির হয়ে বিভিন্ন ম্যাচে সৌম্যজিতের পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। তার শেখার আগ্রহ প্রবল। পাশাপাশি পরিশ্রম করার ক্ষমতাও মুগ্ধ করেছিল কোচদের। রিষড়ার মাঠে ফুটবলের প্রাথমিক পাঠ নেওয়ার পরে এফসি মাদ্রাজে আরও উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ পায় সে। সেখানেই নিজেকে আরও পরিণত করে জাতীয় দলে সুযোগ পায় সৌম্যজিৎ। ছোটবেলায় ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচে ম্যাসকট হিসাবেও মাঠে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল সৌম্যজিতের। ফুটবলারদের হাত ধরে মাঠে প্রবেশ করেছিল সে। তখন হয়তো কেউ ভাবেননি, এক দিন দেশের হয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে নামবে সেই ছোট্ট ছেলে। মা পুষ্পাঞ্জলি সরকারের কথায়,“আমরা বিরাট ধনী পরিবারের নই। মধ্যবিত্ত পরিবারের। ছোট থেকে যে কষ্ট করেছে, তার প্রতিদান পেল। ও যেখানে যেখানে গিয়েছে, বাধা দিইনি। অনেক কষ্ট করে অর্থ জোগাড় করেছি এর জন্য। হাল ছেড়ে দিইনি। ও যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। ওর পাশে থেকেছি। লেকে দেশের হয়ে খেলতে দেখার অনুভূতি ভাষায় বোঝানো যায় না। আমরা ভীষণ গর্বিত। চাই, ও আরও ভাল খেলুক, দেশের নাম উজ্জ্বল করুক। অনেক পথ চলা বাকি। ও আরও এগিয়ে যাক। একজন বাঙালি হিসেবে দেশের নাম আরও উঁচুতে নিয়ে যাক—এটাই আমাদের চাওয়া।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles