রাজকুমার মণ্ডল
ক্রীড়া সাংবাদিক
প্রথমা থেকে দশমী। টানা দশদিন বনেদি বাড়ির পুজো দেখার সৌভাগ্য সকলের হয় না। প্রথমার পুজো থেকে শুরু করে দশমির বিষাদময়তার আবহ। পুরোটাই সরোজমিনে দেখার সুযোগ। এদিকে ডালমিয়া দম্পতিও খুব ব্যস্ত। অগনিত অতিথি। আপ্যায়নে কোনও বছরই ত্রুটিবিচ্যূতি নেই। ডালমিয়া বাড়ির পুজো বলে কথা। একমাস আগে থেকেই তার রেশ শুরু হয়। ক্যানভাসে রঙ তুলি নিয়ে আপন মনে আঁকচারা কাটতে কাটতেই ফুটে ওঠে দুর্গার সপরিবারের ছবি। শিল্পী সত্ত্বার বহি:প্রকাশ বললে ভুল হবে। গানের গলাও খারাপ নয়। তাই গুন গুন করে গাইতে গাইতেই তাঁর হাতে তৈরী এক শারদীয় আবহের ছবি। পাশাপাশি সমানতালে পুজোর সাজসজ্জা দেখাশোনার কাজ। অভিষেক জায়া শালিনি ডালমিয়া। বাংলার মহিলা ক্রিকেট প্রশাসকের দায়িত্বে হাতেখড়ি চলছে। কিংবদন্তি ক্রিকেট প্রশাসক জহমোহন ডালমিয়ার পুত্রবধু।

অভিষেক ডালমিয়া ছোটো বেলা থেকেই মায়ের বাড়িতেই দূর্গা পুজো কাটিয়ে এসেছেন। মায়ের বাড়ি বনেদী পরিবার। রীতি মেনেই পুজো হত। সেই ছোট বেলা থেকেই খুব কাছ থেকে মামার বাড়ি অর্থাৎ পাথুরিঘাটার ঘোষ বাড়ির দূর্গা পূজার নিয়ম কানুন দেখে এসেছেন। এখন আর মামার বাড়ি নয়, বেশ কয়েক বছর ধরে নিজেদের ১০ নম্বর আলিপুর রোডের বাড়িতেই নিষ্ঠার সঙ্গে, রীতি মেনে জাঁকজমক ভাবে দূর্গা পূজা করেন অভিষেক ডালমিয়া। বাবা-মা প্রয়াত জগমোহন ডালমিয়া ও চন্দ্রলেখা ডালমিয়ার অনুপস্থিতি। এখন পরিবারের পুজোর যাবতীয় দায়িত্ব অভিষেক ও তাঁর স্ত্রী শালিনী ডালমিয়ার। দিদি বৈশালীকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি বছর পুজো করেন। ডালমিয়ার পরিবারের পুজো বেশ জাঁকজমক। সৎ নিষ্ঠাবান ও সর্বজনপ্রিয় ক্রিকেট প্রশাসক হিসাবেও দায়িত্ব পালনে এতটুকু খামতি নেই অভিষেকের। মহাদশমির গোধুলি লগ্নে ডালমিয়া বাড়ির বিধি অনুযায়ী প্রসন্ন কুমার ঘাটে মাঝ গঙ্গায় প্রতিমা নিরঞ্জন। এই বছর মন্ডপসজ্জায় একটু অভিনবত্ব বেশীই ছিল। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী স্বপন দাসগুপ্ত, উমেশ রাই থেকে শুরু করে তাপস রায়, রীতেশ তিওয়ারী সহ বিভিন্ন জগতের তারকারা।

অভিষেক একজন অন্যতম সফল ক্রিকেট প্রশাসক। দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক। অবশ্যই সফল ব্যবসায়ী। ৩৬৫ দিন চরম ব্যস্ততা। নিজের ব্যবসা, ক্রিকেট এবং মাঠ- সবকিছুই সামলান। অবশ্য নিন্দুকের অন্য কথা বলে বেড়ান। তাতে কুছ পরোয়া নেই জুনিয়র ডালমিয়াজির। বাংলার ব্যবসার জগতে বাবার একটা তো পরিচিত ছিলই। তারপরেও বাবার ক্রিকেট মাঠে যাতায়াত। ক্রিকেটকে ভীষণ ভাবে ভালোবাসতেন জগুবাবু। ক্রিকেট প্রশাসক হিসেবে তাঁ কাজ তো সকলেই জানেন। ব্যবসায়ী জগতে বাবা প্রতিষ্ঠিত হলেও সামাজিক প্রতিষ্ঠা বেশি করে পেয়েছেন ক্রিকেট প্রশাসক হিসেবে। ব্যবসায়ী পরিবার হলেও ক্রিকেটের প্রতি একটা প্যাশান ছিল বরাবরই। উনি ইডেনকে মন্দির ভাবতেন। স্বাভাবিক ভাবেই ছেলেও বেড়ে উঠেছেন ক্রিকেট ঘরানার মধ্যে দিয়ে। ক্রিকেট নিয়ে আবেগ কাজ করে। প্রত্যেক মানুষকেই জীবনে ব্যাল্যন্স করে চলতে হয়, সেটা খুব ভালোরকম জানেন অভিষেক। ব্যবসাও দেখতেও হয়। পাশাপাশি গড়ের মাঠ, বিশেষ করে ক্রিকেট। ক্রিকেট অ্যসোসিয়েশন অব বেঙ্গলে আমার কুলিং অব পিরিয়েডেও ক্রিকেট নিয়ে মেতে থাকেন। ক্রিকেট প্রশাসনে অনেকদিন জড়িত। ২০১৫ এ বাবার মৃত্যুর পর ক্রিকেট প্রশাসনে। বাবার হাত ধরে গড়ের মাঠ শুরু রাজস্থান ক্লাবের ক্রিকেট দল নিয়ে। মাঠেই কাটিয়েছেন অনেকটা সময়। খেলা শুরুর আগে পৌঁছে যেতেন শেষ পর্যন্তও থাকা। কম বয়সে ব্যাক অফিসের কাজ সেরে ক্রিকেট নিয়ে কেটেছে অনেকটা সময়। পৈতৃক ব্যবসাকে নজর রেখে ক্রিকেট, ব্যবসা, পরিবার সবকিছুকেও ব্যালেন্স চলাচাই স্বাভাবিক ঘটনা মনে করেন অভিষেক।

শালিনীও নিতান্ত্যই প্রাসঙ্গিক। কম বয়েসে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। এরপর বিদেশে পড়তে যাওয়া। বছর দুয়েক বাইরেই পড়াশোনার কারণে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা। পড়াশোনার শেষে চাকরির ব্যস্ততা। বিয়ের আগে পুজো মানে ছিল, নতুন জামা কাপড় পরা, বাবা মায়ের সঙ্গে আনন্দ করা। আর ভালো ভালো খাওয়া দাওয়া ও ঠাকুর দেখা। এখন পুরোপুরি ব্যাপারটা পাল্টে গেছে। এখন নিজের বাড়িতেই দূর্গা পুজো। এই বাড়ির বৌ হয়ে আসার পর এই বাড়ির পুজোটা বুঝতেই সময় লেগে গিয়েছিল। অনেক নিয়ম কানুন মেনেই পুজো হয় শ্বশুর বাড়িতে। বনেদী বাড়ির পুজো অনেক প্রথা মেনে চলতে হয়। ধীরে ধীরে করায়ত্ত। পুজোর প্রতিদিন দুবেলা আরতি হয়। নৈবেদ্য তৈরী করা থেকে শুরু করে পুজোর জন্য যাবতীয় সরঞ্জাম জোগাড় করার পাশাপাশি নিয়ম মেনে চলে মা দূর্গার আরতি। পুজোর সময় কাজও বেশা। তার চেয়েও আনন্দ অনেক বেশি। অভিষেক বরাবই দূর্গাঠাকুরের ভক্ত। ভাবতে থাকেন কখন পুজো আসবে। সারা বছর তাকিয়ে থাকা, কবে পুজো আসবে। পুজোর টানা কয়েকদিন আনন্দের পর পুজোর শেষ দিনটা মন খারাপ। আবার অপেক্ষায় সামনের বছর। শুরু হয়ে যায় পঞ্জিকা ঘাঁটা।

পারিবারিক পুজোতে সকলের ভূমিকা থাকেই। দূর্গাপুজো খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। পুজোর নিয়মগুলো পালন হচ্ছে কিনা খেয়াল রাখতে হয়। অনেক মানুষ আসেন সকলকে আপ্যায়ন করতে হয়। পুজোর দিনগুলো বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই ব্যস্ত হয়ে যায়। দিদি বৈশালী ডালমিয়া ও স্ত্রী শালিনি সকলে মিলেই কাজ ভাগ করে নেওয়া যেহেতু ছোটবেলা থেকেই মামা বাড়ির দূর্গা পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা, তাই নিয়ম, নীতি নখদর্পনে। ভুলভ্রান্তি কমই হয়। মিলেমিশে কাজ চলে। এই কটা দিন আনন্দ বেশি হলেও ঘুমটা খুব কম হয়। পারিবারিক পুজো। ঠাকুর দেখেত যাওয়ার অভাব কখনোই অনুভূত হয় না। মা স্বয়ং নিজের বাড়িতে থাকেন। মায়ের বাড়ি পাথুরিঘাটার বাড়িতে পুজো হতো। সেখানে বেশি সময় কাটানো। সপ্তমীর দিন ভোর চারটেয় কাজ শুরু। সকাল থেকে রাত। অতিথিরা আসেন। সব মিলিয়ে অতি ব্যস্ততা বললে ভুল হবে না। এবছর পুজোয় সপ্তমি দুদিন। অতিথি আপ্যায়নে পুজোর কটা দিন খাওয়ার সময় ঠিক থাকে না। অতিথিদের সবাইকে খাইয়ে তবে খান। সব অতিথিরা খেয়ে চলে যাবে তার পর উনি খেতে বসেন।





