Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে শারোদৎসব! নাদব্রক্ষে মহিষমর্দিনী — অন্ধকারে অন্তরালে মায়ের জাগরণ

সোহিনী মণ্ডল
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আর কে নিউজ

আশ্বিনের শারদপ্রাতে .‌.‌.‌.‌.‌.‌
শরতের নীল আকাশ, পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ আর শিউলি ফুলের মনমুগ্ধকর সৌগন্ধ জানান দেয় উমার আগমনী বার্তা। ‌রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এসে ধরা দেয়। তখন তা কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা রূপান্তরিত হয় এক মহামিলনের উৎসবে। মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পীঠস্থান বিশ্বকবি ‌রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শারদ উৎসব ধারণ করে এক অনন্য এবং বর্ণিল মাত্রা। বাঙালি ছাত্রসমাজের কাছে এই শারদ উৎসবের আনন্দ শুধু চার দেয়ালের গৃহকোণে বা পাড়ার মণ্ডপেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর এক অনন্য ও প্রাণবন্ত রূপ দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে। ক্লাস-পরীক্ষা আর অ্যাসাইনমেন্টের চেনা ব্যস্ততা একপাশে সরিয়ে রেখে মেতে ওঠার এই দিনগুলো যেন তারুণ্যের এক মহাসম্মিলন। ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস চত্ত্বরে শারদ উৎসবের আয়োজন মানেই বাঙালি সংস্কৃতির শিকড়ে ফেরার টান। চারুকলা অনুষদের ঐতিহ্যবাহী বকুলতলা কিংবা সবুজ প্রাঙ্গণ—সবখানেই সুর আর ছন্দের এক অভূতপূর্ব জাগরণ বিচ্ছুরিত হয়।

‘‌বাজলো তোমার আলোর বেণু’ ‌গানের সুরে ভোরবেলা যে উৎসবের সূচনা হয়, তা দিনভর নানা নাচ, গান, আবৃত্তি ও নাটক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়। এ যেন এক অপরূপ শান্তিনিকেতনের আশ্রমি আবহে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রাক উৎসব ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য সেতুবন্ধ। তারুণ্যের সাজ ও মিলনের আনন্দ। ক্যাম্পাসের দৃশ্যপটে পুরোপুরি বদল। জিন্স আর টি-শার্টের অভ্যস্ত তরুণরা এদিন সেজে ধুতি কিংবা পাঞ্জাবিতে, আর তরুণীদের পরনে শোভান্বিত লাল-পাড় সাদা শাড়ি কিংবা বাসন্তী রঙের পোশাক। ক্লাসঘরের গম্ভীর পরিবেশ ভেঙে সবাই মেতে আড্ডায়, সেলফির পর সেলফি, ছবি তোলা আর খুনসুটি। এই মিলনমেলায় কোনো জাত-পাত বা ধর্মের ভেদাভেদ থাকে না। থাকেনা সারা বছরের জমে থাকা ক্রোধ, বিড়ম্বনা, বিরহগাথার লেশমাত্র।

সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে সত্য ও সুন্দরের আরাধনায় মেতে ওঠে ক্যাম্পাসের সকল শিক্ষার্থী। হস্টেলে থাকা দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীদের কাছে এই শারদ উৎসব এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে আসে। একদিকে যেমন বাড়ি ফেরার প্রবল আকুলতা, অন্যদিকে ক্যাম্পাস ছাড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে বন্ধুদের সাথে কাটানো শেষ মুহূর্তের আনন্দ। পূজা বা উৎসবের ছুটি শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিনটিতে হস্টেলগুলোর ডাইনিংয়ে চলে বিশেষ ভোজের আয়োজন। চেনা বন্ধুটির হাত ধরে মণ্ডপে ঘোরা বা একসাথে ঢাকের আওয়াজে মেতে ওঠার এই স্মৃতিগুলো প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের মনে আজীবনের জন্য জমা হয়ে থাকে। স্মৃতি ও গৃহকোণে ফেরার টান। প্রাঙ্গণজুড়ে শিউলির সুবাস আর আড্ডার এই রঙিন দিনগুলো প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে এক পশলা তাজা বাতাস, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের পথে চলার শক্তি ও সুন্দর অনুভূতির যোগান দিয়ে যায়।

বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় আনন্দযজ্ঞ হলো শারদীয় উৎসব। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত সাংস্কৃতিক সংগঠন ও হলের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে পূজার প্রস্তুতি। আলপনা আঁকা এবং আলোকসজ্জার কাজে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নেয়। এই যৌথ কর্মযজ্ঞের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল সৌন্দর্য। প্রদীপ প্রজ্বলন থেকে শুরু করে ঢাকের তালে ধুনুচি নাচ—সবকিছুতেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। উপাচার্যের শুভেচ্ছা বাণী এবং শিক্ষকদের উপস্থিতি এই উৎসবের মহিমায় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও প্রাণের স্পন্দন। আগমনী গান, নাটক এবং নৃত্যনাট্যের মাধ্যমে বাঙালি ঐতিহ্যের নান্দনিক রূপটি প্রস্ফুটিত। বিভাগের সিনিয়র-জুনিয়রদের একসঙ্গে গান গাওয়া কিংবা চেনা বন্ধুদের নতুন সাজে দেখার আনন্দ ক্যাম্পাস জীবনকে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতিতে রূপান্তরিত। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে শারদ উৎসব ২০২৬ উদযাপিত। এই অনুষ্ঠানে ক্যাম্পাসে এক চমৎকার সাংস্কৃতিক পরিবেশ। ক্যাম্পাসে শারতের ছোঁয়া ও উৎসবের রঙে মেতে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। ছাত্রছাত্রীরা নাচ, গান এবং বিভিন্ন পরিবেশনার মাধ্যমে শারদ আনন্দ ফুটিয়ে তোলেন।

সকল বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের কলাকুশলী মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়ে নিজেদের প্রতিভার বিচ্ছুরণের সংকেত প্রদান। দুর্গাপূজার ঠিক আগে রবীন্দ্রভারতীর প্রাঙ্গণ মুখরিত। আশ্বিনেরই এক শারদসন্ধ্যায় সঙ্গীত ভবনের অভ্যন্তরে উদয়শঙ্কর নাট্যমঞ্চ তখন গমগম করছে। তিলধারনের জায়গাটুকুও নেই। লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরিহিত ছাত্রীদের কাতর অত্যুক্তি, একটু বসার জায়গা দাও না.‌.‌.‌.‌। নাদব্রক্ষে মহিষমর্দিনীর শো তখনও চলছে। সকলকে নিজ নিজ আসন গ্রহনের আবেদন সঞ্চালিকা ড.‌ দেবলীনা সিংহরায়ের। গান,নাচ, মহিষাসুরমর্দিনীর যন্ত্রনুসঙ্গে সৌরভ, দেবাঙ্ক, প্রবীর সহ আরও সহশিল্পীদের সহাবস্থান। সবশেষে ‘‌শক্ত্যুদ্ভব’‌ নৃত্যনাট্যের উপস্থাপনা। কণ্ঠসঙ্গীত বিভাগের সুকৃতী ও শুভমের তত্বাবধানে নৃত্যনাট্যের সু-‌উপস্থাপনায় দেবরাজ, হৃত্বিক, শ্রেয়া, মৌমিতা, কৃষ্ণ, তৃষা,দেবব্রত, প্রীতিময়, দীপশিখা, মহাশ্বেতা, অম্বিকা, অনন্য, অনুপ্রিয়া,সায়ন, সুদীপারা। সমগ্র অনুষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রদানের প্রধান কাণ্ডারী ‌রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কণ্ঠসঙ্গীত বিভাগের প্রধান কঙ্কণা মিত্র রায়চৌধুরী। সহকারী ভুমিকায় ঝুমকি কর্মকার।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগের শারদীয় উৎসবের আনন্দযজ্ঞে শামিল অধ্যাপক ও অধ্যাপিকাও। সমগ্র অনুষ্ঠান পরিচালনায় ও তত্বাবধানে সঞ্চিতা চৌঝুরী, ড.‌দ্বিমাধব কার্তানীয়া, সুদীর কর্মকার, অনিন্দিতা মুখার্জ্জী, কৌশিক সাহা, সুজিত কর্মকার, অজয় রায়, সৌমি ঘোষ, সুপ্রিয়া বর, রবীন সাঁপুই, ড.‌ দোয়েল মজুমদার, ড.‌ নিবেদিতা মিত্র, পার্থ ঘোষ, সব্যসাচী চন্দ্র, ড.‌ সুজয় চন্দ্র, প্রসেনজিৎ শীল, রাজবিজয় আচার্য্য, সুতপা বসু, রণিতা বিশ্বাস সহ অন্যান্য অধ্যাপক-‌অধ্যাপিকা এবং প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীরাও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles