RK NEWZ ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পরেই নির্বাচন কমিশন এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে বিরোধী দলগুলি। তাতে শামিল হলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। কমিশনের বিরুদ্ধে ফের ‘এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটচুরি এবং ইভিএম হাইজ্যাক’-এর অভিযোগ তুলে জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেফতারি চেয়েছেন মমতা। এর পাশাপাশি সম্প্রতি হওয়া সমস্ত নির্বাচন বাতিল করে পুরনো ভোটার তালিকায় নতুন করে ভোটের দাবি জানিয়েছেন। আগাম ঘোষণা করে বুধবার বিকেল ৪টেয় ফেসবুক লাইভে করেন মমতা। সেখানেই তিনি ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর ওই প্রতিবেদনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “এত বড় দুর্নীতি জীবনে দেখিনি। নৈতিকতার দিক থেকে ওঁর (জ্ঞানেশ) পদে থাকার অধিকার নেই।” তার পরেই সুর চড়িয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমার প্রথম দাবি, জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেফতার করতে হবে। ওঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা শুরু করতে হবে। সরকারের তরফে যারা মদতদাতা, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।” তার পরেই নিজের দ্বিতীয় দাবির কথা জানান মমতা। বলেন, “অনেকের নাম বাদ দিয়েছে। পুরনো ভোটার তালিকা ফিরিয়ে দিতে হবে। এসআইআর-এর নামে দখল করে, ইভিএম মেশিন দখল এবং হাইজ্যাক করে জ্ঞানেশ কুমার যে যে রাজ্যে জিতেছে, সেই সমস্ত রাজ্যে পুরনো ভোটার তালিকায় পুনরায় নির্বাচন করাতে হবে।” প্রসঙ্গত, বুধবার মমতার সুরেই নির্বাচনী ব্যবস্থায় কারচুপির অভিযোগ তুলে মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গে ব্যালটে পুনরায় নির্বাচন করানোর দাবি তুলেছেন শিবসেনা ইউবিটি-র প্রধান উদ্ধব ঠাকরে। জ্ঞানেশকে গ্রেফতার করার দাবি জানিয়ে সম্প্রতি হওয়া সমস্ত নির্বাচন বাতিল করে পুনর্ভোটের দাবি জানিয়েছেন আপ প্রধান অরবিন্দ কেজরীবালও। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, দুই কমিশনারের অভিযোগ, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির বিষয়টি এখন আর বিকেন্দ্রীভূত ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় না। গোটা বিষয়টি নাকি নিয়ন্ত্রণ করেন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্না। বুধবার সেই সীমার বিরুদ্ধে সরব হন মমতাও। তিনি বলেন, “সীমা খন্নার কথা প্রথম ফাঁস করেছিল অভিষেকই (বন্দ্যোপাধ্যায়)। এই সীমা খন্না যাঁর কথা বার বার এসেছে, তিনি বিজেপির একজন আইটি (তথ্যপ্রযুক্তি) আধিকারিক। তিনি প্রথমেই এআই ব্যবহার করে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম সিল করে দিয়েছিলেন। আমরা ৩২ লক্ষ নাম তোলার পরেও ২৭ লক্ষ নাম বাদ। বিজেপি আরও ৭ লক্ষ নাম ডিলিট করেছে। মোট ৯২ লাখ ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে। তার পর ইভিএম মেশিন হাইজ্যাক করেছে।” আলিপুরে ইভিএম মেশিন পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।বিদ্রুপের সুরে মমতা বলেন, “এসআইআর-এর মানে স্পেশ্যাল ইনসেনটিভস রুলিং পার্টি। মানে বিজেপির জন্যই সবকিছু। জ্ঞানেশ কুমার নিজের পরিবারকে পাইয়ে দেওয়ার জন্য এসব করছেন। এসআইআর হয়ে গেলে ভোট করতেন। দেখতাম তখন দম, কেমন করে জিততেন। গায়ের জোরে নির্বাচনে জিতেছেন।” মমতার দাবি, জ্ঞানেশ কুমারের জন্যই বিজেপি ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে জিতেছে। ২০২৫ এবং ২০২৬-এ যত ভোট হয়েছে, তাতেও কমিশনের জন্যই বিজেপি জয়ী হয়েছে বলে দাবি মমতার। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটেও কমিশনের সাহায্যে লুট করে বিজেপি জয় পেয়েছে বলে অভিযোগ করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা জানান, বিরোধী দলগুলির তরফে প্রধান বিচারপতির কাছে ‘ভোট কারচুপির’ বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে দেখা করার অনুমতিও চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় পাওয়া যায়নি বলে জানান মমতা। এই সূত্রেই বিচারব্যবস্থার উদ্দেশে মমতার বার্তা, “মানুষ যাতে বিচার পায়, তা আপনাদের দেখতে হবে। শুধু প্রোমোশনের (পদোন্নতি) আশায় যদি ঘুমিয়ে থাকেন, তবে জাগবেন কে?”
দুই নির্বাচন কমিশনারের কাঠগড়াতেও সীমা খন্না, কে তিনি? কমিশনে কী কাজ তাঁর? নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে সরগরম দেশের রাজনীতি। এই বিতর্কে জড়িয়ে গেল সীমা খন্নার নামও। কমিশনের এই আধিকারিককে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন দেশের দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশী। মমতা তৃণমূলের দাবি, এই সীমার বিরুদ্ধে প্রথম সরব হয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “সীমা খন্নার কথা প্রথম ফাঁস করেছিল অভিষেকই (বন্দ্যোপাধ্যায়)।” ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, দুই কমিশনারের অভিযোগ, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির বিষয়টি এখন আর বিকেন্দ্রীভূত ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় না। গোটা বিষয়টি নাকি নিয়ন্ত্রণ করেন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্না। এমনিতে প্রতিটি নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোটার তালিকা তৈরি এবং সংরক্ষণের কাজের দায়িত্ব থাকে নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও-দের কাছে। আগে ‘ইআরওনেট’ সফ্টওয়্যারে ভোটার তালিকা থাকত। এখন তা থাকে ‘ইসিআইনেট’-এ। ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন এবং বাদ দেওয়ার কাজে ইআরও-দের ক্ষমতা হ্রাস করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে একাধিক বার প্রশ্ন তুলেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার। অগস্টে দেশের অন্যতম নির্বাচন কমিশনার সঁধু জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী আধিকারিকদের ‘ইআরওনেট’ পোর্টালে ঢোকার অধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রধান সীমা খন্নার ভূমিকা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সঁধু বলেন, “আইন অনুযায়ী তিনি এটি (পোর্টাল) নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।” ওই প্রতিবেদন অনুসারে, ‘ইআরওনেট’ পোর্টালে এই কেন্দ্রীকরণের ফলেই গোয়ায় বহু মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন। গত ২৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, তথ্যগত অসঙ্গতি, মানে পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে নাম বা বয়সের অমিল থাকা ভোটারদের নথি জমা দেওয়ার ও শোনার সুযোগ দিতে হবে। গোয়ার ইআরও-রা তা শুনে ৯৭ জনকে যোগ্য বলে রায় দেন। কিন্তু সফ্টওয়্যারে সেই রায় লেখার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। ১১ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা সিইও-র দফতর সে রাজ্যের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতীকে চারবার চিঠি লিখে, সীমা খন্নাকে সেই চিঠির কপি দিয়ে, রোলব্যাক অপশন চালু করতে বলে। যাতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো বাদ দেওয়া নাম ফেরানো যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও উত্তর আসেনি, নথি জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু হয়নি। ৯৭ জন যোগ্য ব্যক্তি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান। মমতার তৃণমূলের দাবি, অভিষেক গত ডিসেম্বরেই সীমার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ২৭ ডিসেম্বর একটি সাংবাদিক বৈঠকে অভিষেক বলেছিলেন, “বুথ লেভেল অফিসারদের ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাই করতে হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে ইআরও এবং এইআরও-দের দু’মাস সময় লেগেছে। অথচ আপনারা একই দিনে, মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে এই পরিসংখ্যান তৈরি করে ফেললেন। কোন সফ্টওয়্যার ব্যবহার করে এই বিশ্লেষণ করা হয়েছিল? কে এই বিশ্লেষণ করেছিলেন?” একই সঙ্গে অভিষেক বলেন, “আমার কাছে স্ক্রিনশট রয়েছে। সীমা খন্না নামে একজন মহিলা রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কী? দিল্লিতে কার নির্দেশে তিনি কাজ করছেন? তাঁর কথোপকথনের সমস্ত স্ক্রিনশট রয়েছে।” দুই নির্বাচন কমিশনার সঁধু এবং জোশী সেই সীমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলায় মমতা তৃণমূলের দাবি, তারা যে অভিযোগ তুলেছিল, তাতেই সিলমোহর পড়ল। মমতা তৃণমূলের সাংসদ মহুয়া মৈত্রের কথায়, “আমরা যথাযথ ভাবে জানতাম, কী ভাবে জ্ঞানেশ কুমার (সীমা) খন্না এবং সফ্টওয়্যারের ব্যাক এন্ডকে ব্যবহার করে তালিকা বিকৃত করেছেন।” বুধবার বিকেলে ফেসবুক লাইভ করে মমতা বলেন, “এই সীমা খন্না, যাঁর কথা বার বার এসেছে, তিনি বিজেপির একজন আইটি (তথ্যপ্রযুক্তি) আধিকারিক। তিনি প্রথমেই এআই ব্যবহার করে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম সিল করে দিয়েছিলেন। আমরা ৩২ লক্ষ নাম তোলার পরেও ২৭ লক্ষ নাম বাদ। বিজেপি আরও ৭ লক্ষ নাম ডিলিট করেছে। মোট ৯২ লাখ ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে। তার পর ইভিএম মেশিন হাইজ্যাক করেছে।” জ্ঞানেশের পাশাপাশী সীমারও গ্রেফতারির দাবিতে সরব হয়েছেন মমতা।




