RK NEWZ বাঙালি চিরকালই মাছে-ভাতে। আর পাতে যদি পড়ে ইলিশ মাছ, তাহলে তো কোনও কথাই নেই। স্বাভাবিকভাবেই ভোজনরসিক বাঙালি দুর্গাপুজোর সময় পাত পেড়ে খেতে পছন্দ করে। তাই বাংলা-সহ গোটা ভারতেই ইলিশের চাহিদা বাড়ে ওই সময়। আর পদ্মার ইলিশ হলে তো কথাই নেই। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে সেভাবে ভারতে আসছে না বাংলাদেশের ইলিশ। উৎসবের আবহে এবার অবশ্য উলট পুরাণ! ভারতের ইলিশ খাবে বাংলাদেশের মানুষ। তাও আবার কি না মোদির রাজ্যে! অবাক হচ্ছেন তো! হ্যাঁ, এটাই সত্যি! জানা গিয়েছে, বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন নাকি একধাক্কায় অনেকটাই তলানিতে এসে ঠেকেছে। এহেন পরিস্থিতিতে ভারতই ভরসা ঢাকার কাছে। তথ্য বলছে, গত দুমাসে ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানি হয়েছে বাংলাদেশে। তাও আবার গুজরাত থেকে। এহেন পরিস্থিতিতে পদ্মার ইলিশ পুজোয় বাঙালির পাতে পড়বে? উঠছে প্রশ্ন।
২০১৯ সাল থেকে শুধু দুর্গাপুজোর ‘উপহার’ হিসেবে কিছু ইলিশ পাঠায় বাংলাদেশ। অতিমারির পর থেকে সেই পরিমাণ আরও কমেছে। এ বার উল্টে তারাই ভারতের থেকে আমদানি করছে ইলিশ। উলট্পুরাণ! প্রতি বছর পুজোর আগে ‘উপহার’ হিসেবে ও পার বাংলা থেকে ইলিশ আসে এ পার বাংলায়। কিন্তু এ বছর বাংলাদেশে উৎপাদন কম হওয়ায় ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করেছে তারা। এই প্রথম বার। পরিসংখ্যান বলছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজ্য গুজরাত থেকে গত দু’মাসে ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশে। প্রশ্ন উঠছে, এই যখন অবস্থা, তখন কি পুজোয় আর বাঙালির পাতে পড়বে পদ্মার ইলিশ! উৎসব-অনুষ্ঠানে পাতে ইলিশ না পড়লে বাঙালির মন ভরে না। সে এ পার হোক বা ও পার বাংলা। ইলিশ ধরায় বিশ্বের এক নম্বর বাংলাদেশ। ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ইলিশই তারা ধরে। তবে চলতি বছর বাংলাদেশেও ইলিশ কম উঠছে। ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশের মাছ ব্যবসায়ীরা গুজরাতের ভারুচ বন্দর এবং হাওড়া পাইকারি মাছ বাজার থেকে গত দু’মাসে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি করেছে। শুধু তা-ই নয়, সেই মাছ প্রক্রিয়াকরণ করে বিদেশেও পাঠিয়েছে।
হাওড়া পাইকারি ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ বলেন, ‘‘আমরা সাধারণত এ পার বাংলা থেকে বোয়াল, রুই, পারসে, ট্যাংরা পাঠাই ও পার বাংলায়। তবে এ বার ওখানে ইলিশের ঘাটতি রয়েছে। তাই প্রথম বার এখান থেকে বাংলাদেশে ইলিশ পাঠানো হয়েছে।’’ তিনি আরও জানিয়েছেন, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং সিলেটে ডিম ভর্তি ইলিশের চাহিদা অনেক বেশি। গুজরাতে ডিম-ভরা ইলিশ মেলে বেশি। তাই সে রাজ্য থেকেই ইলিশ আমদানি করেছে ঢাকা। মকসুদ এ-ও জানিয়েছেন, গুজরাত থেকে আমদানি করা ইলিশের ডিমও আলাদা করে বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশে। সেই মাছ প্রক্রিয়াকরণ করে বিদেশে রফতানি করছে তারা। গুজরাত থেকে যে ইলিশ বাংলাদেশ আমদানি করছে, তা শুকিয়েও (নোনা ইলিশ) স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার জলচুক্তি ‘ভেস্তে’ দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরের বছরই ১ অগস্ট সব রকম মাছ রফতানির উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাংলাদেশ। যুক্তি ছিল, দেশে পর্যাপ্ত মাছের অভাব রয়েছে। ২০১১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর অন্য মাছে নিষেধাজ্ঞা উঠলেও, ইলিশে তা থেকেই যায়। তার পর পদ্মা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। ইলিশ রফতানির নিয়ম কখনও আলগা হয়েছে, কখনও জাঁকিয়ে বসেছে। ২০১৯ সাল থেকে শুধু দুর্গাপুজোর ‘উপহার’ হিসেবে কিছু ইলিশ পাঠায় বাংলাদেশ। অতিমারির পর থেকে সেই পরিমাণ আরও কমেছে।
গত বছর ১২০০ টন ইলিশ রফতানিতে ছাড়পত্র দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। এসেছিল ১৪৩.৮০ টন। তার আগের দু’বছর ৬০০ টনেরও কম। প্রশ্ন, বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পরে এ বার কী হবে? শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে তাঁকে আম পাঠিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ইলিশ নিয়ে তাঁর সরকারের বক্তব্য, রফতানি বন্ধ। ভারতে যা পাঠানো হয় সবই ‘সৌজন্য উপহার’। এ বার ‘উপহার’-এর পরিমাণ কী হবে, তা স্পষ্ট নয়। মকসুদ বলেন, ‘‘ওই দেশে নতুন সরকার গঠন হয়েছে। এই বছর এ পারের মাছ ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য বিভাগের কাছে সরাসরি ইলিশ মাছের জন্য আবেদন করেছেন। কবে পদ্মার সুস্বাদু ইলিশ ঢুকবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।’’
ইলিশ উৎপাদনে এক নম্বরে বাংলাদেশ। একটা বড় অংশের মাছ পদ্মা থেকেই ধরা হয়। তার স্বাদের তুলনা হয় না। মাছ ব্যবসায়ীদের কথায়, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ইলিশ বাংলাদেশি জেলেরাই ধরেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গিয়েছে। একধাক্কায় ইলিশের উৎপাদন অনেকটাই কমে গিয়েছে। পদ্মায় ইলিশের খরা! বিপুল ঘাটতি মেটাতে তাই ভারতের দ্বারস্থ হয়েছে বাংলাদেশ। জানা গিয়েছে, গত কয়েকদিনে গুজরাতের ভারুচ বন্দর থেকে বটেই, হাওড়া পাইকারি মাছ বাজার থেকে ইলিশ পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ। ধাপে ধাপে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ পাঠানো হয়েছে। হাওড়া পাইকারি ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ বলেন, “বাংলাদেশে এবার প্রথম ইলিশ আমরা রপ্তানি করেছি। মূলত এপার থেকে রুই, পারসে, ট্যাংরা ওপারে পাঠাই। কিন্তু বাংলাদেশে এবার ইলিশের ঘাটতি রয়েছে। সেজন্য হাওড়া বাজার থেকে ইলিশ পাঠানো হয়েছে।” কিন্তু গুজরাটের ইলিশ কেন? এই প্রসঙ্গে সৈয়দ আনোয়ার জানান, এবার গুজরাটে ব্যাপক ইলিশের উৎপাদন হয়েছে। এই মাছের দাম খুব একটা বেশি হয় না। কারণ এতে ডিম থাকে। আর সেই কারণেই গুজরাটের ইলিশ মাছ পাঠানো হয়েছে। তাঁর কথায়, চট্টগ্রাম এবং সিলেটে ইলিশের ডিম আলাদাভাবে বিক্রি হয়েছে। এমনকী নোনা মাছ খাওয়ারও চল রয়েছে এই সমস্ত এলাকায়। আর সেই কারণেই আগামিদিনে আরও গুজরাটের ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হবে বলেও জানিয়েছেন সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ। তাঁর কথায়, ১০০ থেকে ১৫০ টন আরও ইলিশ পাঠানো হবে। সেই কথাবার্তা চলছে।



