Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

বাড়তে চলেছে রসগোল্লা-সন্দেশের দাম? চিনির মূল্যবৃদ্ধিতে মুখ ‘তেতো’ সরকারের!

RK NEWZ উৎসবের মরসুমের মুখে খুচরো হু-হু করে বাড়ছে চিনির দাম। এর জন্য বাধ্যতামূলক ইথানল যুক্ত জ্বালানি বিক্রির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন অনেকেই। ফলে পুজোর সময় রসগোল্লা-সন্দেশ বেশি টাকায় কিনতে হতে পারে আমজনতাকে। উৎসবের মরসুমের মুখে অগ্নিমূল্য চিনি। ইতিমধ্যেই খুচরো বাজারে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে শর্করার দাম। পরিস্থিতির বদল না হলে পুজোর আগেই সন্দেশ-কালাকাঁদ বা রসগোল্লার দর যে বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য। এর জন্য কেন্দ্রের ইথানল-যুক্ত পেট্রল বিক্রির সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। অন্য দিকে, আমজনতাকে স্বস্তি দিতে কয়েক দশক পর ফের বিপুল চিনি আমদানিতে সিলমোহর দিয়েছে দিল্লি। ভারতের চিনি ব্যবসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হল মহারাষ্ট্রের কোলহাপুর। চলতি বছরের অগস্টের প্রথম ১৫ দিনে সেখানকার পাইকারি বাজারে শর্করার দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। ফলে ১০০ কিলো চিনি বিক্রি হয়েছে ৫,৩৫০ টাকায়, যেটা এ যাবৎকালের মধ্যে রেকর্ড। অন্য দিকে, উপভোক্তা বিষয়ক দফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ অগস্ট খুচরো বাজারে গড়ে ৫২-৫৩ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে শর্করার কেজি। সূত্রের খবর, বেশ কিছু রাজ্যে লাগামছাড়া দরে বিক্রি হচ্ছে চিনি। উদাহরণ হিসাবে পঞ্জাবের কথা বলা যেতে পারে। সেখানকার খুচরো বাজারে কেজিপ্রতি শর্করা বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়। অন্য দিকে, মুম্বই এবং ভোপালের মতো শহরগুলিতে এর মূল্য ৫৮ থেকে ৬৩ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। কলকাতায় এক কেজি চিনি কিনতে লাগছে ৬০ টাকা। ১ এপ্রিল থেকে দেশ জুড়ে ইথানল যুক্ত জ্বালানি (পড়ুন ই-২০ পেট্রল) বিক্রি বাধ্যতামূলক করে নরেন্দ্র মোদী সরকার। বিশ্লেষকদের দাবি, তার পর থেকেই পরিশোধন কেন্দ্রগুলিতে (পড়ুন ডিস্টিলারি) লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আখের সরবরাহ। শুধু তা-ই নয়, এর জেরে চিনি উৎপাদনে দেখা গিয়েছে ভাটার টান। ফলে, শর্করার বাজার অস্বাভাবিক সঙ্কটের মুখে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছে ইথানল উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির সংগঠন ‘অল ইন্ডিয়া ডিস্টিলার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (এআইডিএ)। তাদের দাবি, এ বছর চিনির মূল কাঁচামাল আখের উৎপাদন কম হয়েছে, এমনটা নয়। কিন্তু, ই-২০ পেট্রল তৈরিতে কেন্দ্র জোর দেওয়ায় খুব দ্রুত বিভিন্ন এলাকায় গজিয়ে উঠেছে কয়েক ডজন ইথানল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র। বর্তমানে চিনিকলের বদলে সেখানেই যাচ্ছে অধিকাংশ আখ। এআইডিএ-র দাবি, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি বাৎসরিক ১,৮২২ কোটি লিটার ইথানল উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করবে ভারত। সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৪৯৯-তে নিয়ে যেতে চাইছে কেন্দ্র। উল্লেখ্য, বর্ণহীন জৈব যৌগটির ৩০-৩৫ শতাংশ তৈরি হয় আখ থেকে। বাকিটা আসে ভুট্টা বা ধান থেকে। মদ ও বিয়ারের মতো নেশার পানীয় তৈরির অন্যতম কাঁচামালও এই ইথানল বা ইথাইল অ্যালকোহল। বাধ্যতামূলক ই-২০ পেট্রল বিক্রির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত কিন্তু ইচ্ছাকৃত নয়। এ দেশে নেই বড় কোনও অপরিশোধিত খনিজ তেলের খনি। আর তাই তরল সোনার জন্য বিদেশের উপর নির্ভরশীল নয়াদিল্লি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে নামে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল। এর জেরে পশ্চিম এশিয়ায় বেধে গিয়েছে যুদ্ধ। এই সংঘর্ষের জন্য বিশ্ব বাজারে হু-হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে অপরিশোধিত কাঁচা তেলের দাম। তরল সোনার এ-হেন মূল্যবৃদ্ধিতে বেজায় অস্বস্তিতে পড়েছে কেন্দ্র। এর জেরে হঠাৎ করেই অনেকটা বেড়ে গিয়েছে আমদানি খরচ। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো ডলারের নিরিখে দিন দিন কমছে টাকার মূল্য। ফলে পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদেশি মুদ্রাভান্ডারের উপর যে চাপ পড়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এই ব্যয় হ্রাসে পেট্রলের ব্যবহার কমাতে চাইছে সরকার। তাই ইথানল যুক্ত জ্বালানি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে ফল হিতে বিপরীত হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা কৃষিবিজ্ঞানী সুধীর পানওয়ার। তাঁর কথায়, ‘‘ইথানল উৎপাদনের জন্য আখের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় চিনির দর চড়তে শুরু করেছে। তবে শর্করার বাজার সঙ্কুচিত হওয়া উচিত নয়। বেশি মুনাফার লোভে মজুতদার ও ফাটকাবাজেরা নানা রকম কারসাজি করতে পারেন।’’ উত্তরপ্রদেশের পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য পানওয়ার মনে করেন, কোনও অবস্থাতেই জ্বালানি নীতি খাদ্যমূল্যের বিনিময়ে হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘ফসলের রোগের কারণে গত আর্থিক বছরে (২০২৫-’২৬) আখের ফলন কম হয়েছে। তার মধ্যেই ইথানল উৎপাদনের চাপ পড়ায় জটিল হচ্ছে পরিস্থিতি। এ বছরের জুলাইয়ে আখচাষের জমির পরিমাণ অবশ্য ১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।’’ চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে চিনি উৎপাদনের হিসাব প্রকাশ করে সরকার। তার পরই ইথানলযুক্ত জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়। বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, এতে পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাওয়ার কথা নয়। তার পরও শর্করার মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে দু’টি ফাঁকের কথা বলেছেন তাঁরা। প্রথমত, পরিসংখ্যানে কারচুপি। দ্বিতীয়ত, ইথানলের নাম করে চিনির বেআইনি মজুতদারি। গত শতাব্দীর ৬০-এর দশক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিনি রফতানিকারী দেশের তকমা ধরে রেখেছে ভারত। এই তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে ব্রাজ়িল। ২০২১-’২২ আর্থিক বছরে সর্বাধিক শর্করা বিদেশে পাঠায় দিল্লি। তার পরিমাণ ছিল প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ মেট্রিক টন। তবে ইথানলযুক্ত জ্বালানি তৈরির নীতি নেওয়া ইস্তক এই সূচককে ক্রমাগত নিম্নমুখী হতে দেখা গিয়েছে। ২০২৫-’২৬ আর্থিক বছরে মাত্র ২০ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি রফতানি করে ভারত। এ বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশের বাজারে শর্করা পাঠানোর উপর চাপানো হয়েছে নিষেধাজ্ঞা, অতীতে যেটা কখনওই করেনি কেন্দ্র। তবে ঘরোয়া বাজারে চিনির মূল্যবৃদ্ধি আটকাতে এর আগেও বেশ কয়েক বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) চিনি রফতানিতে সুনির্দিষ্ট কোটা ঠিক করতে দেখা গিয়েছে সরকারকে। অল ইন্ডিয়া সুগার ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ২০২৫-’২৬ বিপণন বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ লক্ষ ১ হাজার ৫৪৭ টন চিনি রফতানি করে ভারত। এর সিংহভাগ গিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে (ইউএই)। বোম্বে সুগার মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অশোক জৈন আবার বলেছেন, ‘‘উৎসবের মরসুমে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ঠিক করতে আমদানি ছাড়া দ্বিতীয় রাস্তা খোলা নেই।’’ চিনির এই মূল্যবৃদ্ধি রাতারাতি হয়নি। ২০২৩ সালের গোড়ায় প্রতি কেজিতে শর্করার দাম বৃদ্ধি পায় প্রায় ৪০-৪৫ টাকা। এ বছরের অগস্টে সেটাই ৫০ টাকার বেশি হয়ে গিয়েছে। খুচরো দোকানিদের বক্তব্য, অগস্টে ২০ দিনে কেজিতে প্রায় ২০ টাকা বেড়েছে চিনির দর। সেই সঙ্গে মহার্ঘ হয়েছে গুড়ও। তার দাম শেষ ২০ দিনে অন্তত ২৫ টাকা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। গত বছরের অগস্টে ভারতের খুচরো বাজারে কেজিতে ৪৬-৪৭ টাকা দরে বিক্রি হয় চিনি। অর্থাৎ, বছর থেকে বছরের হিসাবে ১২-১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে শর্করার দাম। এই পরিস্থিতিতে ১০ লক্ষ টন চিনি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। তাতে অবশ্য কোনও শুল্ক নেওয়া হবে না। প্রায় ১০ বছর পর শর্করার ভাঁড়ারে টান পড়ায় এই সিদ্ধান্ত নিতে হল সরকারকে। ভারতের ঘরোয়া বাজারে ফি বছর ২ কোটি ৮০ লক্ষ টন চিনি বিক্রি হয়ে থাকে। ২০২৬ সালে শর্করার উৎপাদন ৩ কোটি ১১ লক্ষ টনে গিয়ে পৌঁছোবে বলে আশাবাদী ছিল সরকার। তার মধ্যে ৩১ লক্ষ টন ইথানল তৈরির জন্য সরানো হয়েছে। কিছুটা আবার গিয়েছে রফতানিতে। কিন্তু, উৎসবের মরসুমের জন্য অগস্ট থেকে চাহিদা বাড়তে থাকায় চিনিকলগুলিতে জোগানে টান পড়েছে। চিনির মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজাও। আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরীবাল বলেছেন, ‘‘পুরোপুরি অশিক্ষিতদের সরকার। কী করলে কী হবে, সেটা কেউ জানে না। তেল আমদানিতে বিদেশি মুদ্রা সাশ্রয় করতে আখ থেকে ইথানল তৈরি হচ্ছে। ফলে চিনিতে টান পড়েছে। এখন বিদেশি মুদ্রা খরচ করেই চিনি আমদানি করতে হবে।’’ একই সুর শোনা গিয়েছে কংগ্রেসের গলায়। দেশের শতাব্দীপ্রাচীন দলটি আবার অন্য একটি প্রশ্ন তুলেছে। সেটা হল, মহারাষ্ট্রের চিনিকল মালিকদের ফয়দা দিতেই কি প্রথমে রফতানি এবং তার পর আমদানির সিদ্ধান্ত নিল সরকার? যদিও মজুতদারির উপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কেন্দ্র। যাঁদের ১০ টনের বেশি চিনি লাগে, তাঁরা কোনও অবস্থাতেই ১৫ দিনের বেশি শর্করা মজুত করতে পারবেন না বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে পুরোদস্তুর উৎসবের মরসুম। আগামী মাসে রয়েছে গণেশ চতুর্থী ও বিশ্বকর্মা পুজো। তার পর অক্টোবর ও নভেম্বর জুড়ে রয়েছে দুর্গাপুজো, কালীপুজো ও ভাইফোঁটার মতো অনুষ্ঠান। এই সময় চিনির জন্য মিষ্টির দাম বাড়লে সমস্যায় পড়বে আমজনতা। তাই সেপ্টেম্বর থেকেই ইথানল উৎপাদনে কিছুটা রাশ টানার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করতে পারে কেন্দ্র, জানিয়েছে রয়টার্স।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles