RK NEWZ তিনি জগন্নাথ। বড় নিজের লোক। বড় আপন। তাঁর কাছে মনের সুখ-দুঃখের কথা বলা যায়। দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলা যায়। আবার রাগ-অভিমানও করা যায় অক্লেশে। তার পরে কোনও এক দিব্য মুহূর্তে তিনি ধরাধামে অবতীর্ণ হন। চরাচর ভেসে যায় জ্যোতির্পুঞ্জে। আকুল নয়নে কেঁদে ওঠেন ভক্ত, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে।’ ভক্ত মন্দির গড়ে। ভক্তই শত কষ্ট, বাধা অতিক্রম করে যাত্রা করে ‘ধাম’-এ। ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান বলে মানুষের বিশ্বাস। তবু কোনও কোনও স্থানের প্রতি ভক্তের আলাদা টান থাকে। কারণ, বিশ্বাস বলে সেখানে ঈশ্বর লীলা করেছেন। তাঁর পায়ের ধুলো লেগে রয়েছে পথে, তাঁর স্পর্শ রয়েছে বাতাসে-প্রকৃতিতে। এটাই বোধহয় স্থান মাহাত্ম্য। প্রচলিত ধারণা, এখানে এলে তাঁকে ছোঁয়া যায়, অনুভব করা যায়। দিঘার নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দিরের সঙ্গে ‘ধাম’ শব্দটি জুড়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওডিশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝির শত আপত্তি অনুরোধেও তাঁর মন টলেনি। রাজ্যে পালাবদলের পরে মোহনচরণের অনুরোধকে মান্যতা দিয়ে ‘ধাম’ শব্দ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘শ্রীশ্রী জগন্নাথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’। তবে রীতিনীতিতে কোনও প্রভাব পড়বে না বলেই মত শাসক দলের রাজনীতিকদের। পরম শ্রদ্ধার সঙ্গেই জগন্নাথ দেবের পুজো চলবে, ভজন-কীর্তনও। ধাম হোক অথবা মন্দির, তা নিয়ে ভক্তদের মধ্যে কোনও দড়ি টানাটানি নেই। বরং, ধর্মীয় বিশ্বাসের টানে ভক্তরা মন্দিরে গিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো দেন। আর ধামে গিয়েও ভক্তিভরে শ্রদ্ধা জানান ভক্তরা। তাই, ছুটি পেলেই পরিবার নিয়ে বাঙালি পুরী ধামে গিয়ে দু’দিন কাটিয়ে আসে। আর এখন দিঘায় জগন্নাথ মন্দির তৈরি হওয়ার পরে সেখানে সারা বছর পর্যটকদের ভিড়। মন্দিরে পুজো দেওয়ার জন্য সকাল, বিকেল লাইন পড়ছে ভক্তদের। দিঘা-শঙ্করপুর হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গিয়েছে, ওল্ড এবং নিউ দিঘা মিলে মোট ৮০০টি হোটেল রয়েছে। সাধারণত, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এবং এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত দিঘায় পিক সিজ়ন। কিন্তু, জগন্নাথ মন্দির তৈরি হওয়ার পরে পুরো চিত্রটাই বদলে গিয়েছে। সারা বছর দিঘায় পর্যটকদের ভিড় লেগেই রয়েছে। এই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ বুঝে হোটেল ভাড়া বেশি নিচ্ছেন বলে অভিযোগ। মন্দির আর ধাম নিয়ে যখন চর্চা হচ্ছে, তখন জেনে নেওয়া দরকার দেশে কতগুলি ধাম রয়েছে। সনাতন পরম্পরায় বিষ্ণুর চারটি ধামের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। দেশের চার দিকে অবস্থিত এই চার ধাম সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি — এই চার যুগের প্রতিনিধিত্ব করে।
উত্তরে হিমালয়ের কোলে বদ্রীনাথ— অলকানন্দা নদীর তীরে বিষ্ণু এখানে বদ্রী নারায়ণ রূপে বিরাজ করেন বলে বিশ্বাস। পৌরাণিক কাহিনি মতে, এখানে হাজার হাজার বছর ধরে তপস্যায় মগ্ন ছিলেন স্বয়ং বিষ্ণু। বিশ্বাস, সত্যযুগে এই ধাম-মাহাত্ম্যের সূচনা।
দক্ষিণে সাগরবেষ্টিত রামেশ্বরম— ত্রেতাযুগের স্মারক। লোকবিশ্বাস, লঙ্কা অভিযানের আগে স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র এখানেই শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে মহাদেবের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছিলেন।
পশ্চিমে গুজরাটের দ্বারকা— শ্রীকৃষ্ণের রাজ্য, তাঁর লীলাভূমি। দ্বাপর যুগের প্রতিনিধিত্ব করে।
পূর্বে নীলাচলের জগন্নাথপুরী— কলিযুগের ধাম। পুরাণের কাহিনি ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এখানেই জগন্নাথরূপে শ্রীকৃষ্ণ বিরাজ করছেন ভ্রাতা বলরাম আর ভগিনী সুভদ্রার সঙ্গে। ধর্ম যেমন ধারণ করে, ‘ধাম’-ও তেমন। এখানে ঈশ্বর স্বয়ং অধিষ্ঠান করেন বলে বিশ্বাস, পুরাণ-কথন। তাঁর পূর্ণাবতার বা লীলাবতারের আবির্ভাব হলেও সেই স্থান ধাম হিসেবে গণ্য করা হয়। এখানে নিত্যপুজো হয়, শুদ্ধভক্তরা আসেন। ভগবত পাঠ হয়। এর সঙ্গে মন্দিরের কোনও সম্পর্ক নেই বলেই মনে করেন শাস্ত্রজ্ঞ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি। তাঁর কথায়, ‘ধাম মানে জায়গা, স্থান। আবার জ্যোতিও। যাকে আমরা তেজঃপুঞ্জ বলি। এর মধ্যে মন্দিরও থাকতে পারে, আবার অন্য কিছুও।’ এ প্রসঙ্গে নবদ্বীপধামের উদাহরণ টানলেন তিনি, ‘শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম হয়েছিল নবদ্বীপে। তাই ধাম। কারণ সেখানে জ্যোতিঃস্বরূপ ব্রহ্ম রয়েছেন। তাই ওই বিশেষ স্থানটি ধাম।’
আগম শাস্ত্রে মন্দির নির্মাণের জন্য আয়তাকার বা বর্গাকার জমি তৈরির কথা রয়েছে। আবার যে জমির পশ্চিম, দক্ষিণ অথবা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে পাহাড় বা উচ্চভূমি থাকে, সেই জমি আদর্শ। উত্তর, পূর্ব ও উত্তর-পূর্বমুখে প্রবাহিত নদীর পাশের জমিকেও উত্তম বলা হয়েছে। মন্দিরের দ্বার হবে পূর্ব বা উত্তরমুখী। স্থাপনের পরে বিগ্রহে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হবে। ভক্তরা আসবেন। তবে এই স্থানের সঙ্গে ঈশ্বরের লীলার কোনও সম্পর্ক নেই। ঋগ্বেদে ‘ধাম’ শব্দের উল্লেখ রয়েছে বলে জানালেন গবেষক বিজলীরাজ পাত্র। তাঁর কথায়, ‘ধাম এসেছে ‘ধামানি’ শব্দ থেকে। ঋক বেদে আমরা এই শব্দটি পাচ্ছি। বঙ্গীয় শব্দকোষে এই নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।’ তবে চারটি স্থানের মধ্যে ‘ধাম’-কে বেঁধে রাখতে চান না তিনি। বিজলীরাজের কথায়, ‘এর ফলে অন্যান্য সম্প্রদায় ক্ষুণ্ণ হতে পারে।’ আঠারো শতকের শেষের দিকে ‘ধাম’ শব্দের উদ্ভব হয় বলেও দাবি তাঁর।
রবীন্দ্রভারতীর সংস্কৃত বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সোমা বসুর কথায়, ‘ধামের অর্থ আবাস। যখন কোনও স্থান দেবতার ধাম হিসেবে চিহ্নিত হয়, তার সেই স্থানে দেবতা স্বয়ং বিরাজ করেন, সেখানকার জল-বাতাস-ধুলো-মাটি সবেতেই তিনি জড়িয়ে। জগন্নাথদেব পুরীর জীবনযাত্রার অঙ্গ। তাই পুরীর জগন্নাথ মন্দির জগন্নাথ ধামের মর্যাদা পেয়েছে।’
তবে ভক্তের আকুলতায় তত্ত্বের কচকচানি চলে না। সে মন্দিরে ছুটে যায়, আবার ধামেও। কখনও বাৎসল্য রসে প্লাবিত হয় তার মন। কখনও বন্ধু ভাবে। ‘দেখা দাও’, এটুকুই তার চাওয়া। তাঁর উপস্থিতিটাই সব। একবার তাঁকে অনুভব করতে পারলেই জীবন ধন্য। ভক্ত কখনও প্রহ্লাদ, কখনও মীরা। পথে পথে খুঁজে ফেরে তাঁকে। কান পেতে বুকে টেনে নেয় সেই গান, ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর।’

ছোট্ট রোডট্রিপ। হোটেল নেই, টিকিট নেই! তবু পুরীর রথদর্শন হবে নির্বিঘ্নেই, রইল ‘নিখুঁত’ পথ-সফর পরিকল্পনা। রথযাত্রার মরসুমে পুরী যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে এক বছর আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখেন তীর্থযাত্রীরা। শেষমুহূর্তে যদি জগন্নাথধামের টান চাগাড় দিয়েই থাকে। ভক্তেরা বলেন, ‘প্রভু টানলে’ সাড়া না দিয়ে উপায় নেই। আর সেই টানও চাগাড় দিতে পারে যখন-তখন, যে কোনও মুহূর্তে। রথযাত্রার দিন সাতেক আগেও মনে হতে পারে, এ বার পুরীতে গিয়ে রথযাত্রা দেখে আসতে পারলে ভাল হত! মুশকিল হল, এ ক্ষেত্রে ‘যেমন ভাবা, তেমনি কাজ’ করাটা সোজা কথা নয়। রথযাত্রার মরসুমে পুরী যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে এক বছর আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখেন তীর্থযাত্রীরা। কারণ, ওই ক’দিন যে ট্রেন, ফ্লাইট এমনকি, এসি বাসেও টিকিট পেতে কালঘাম ছুটবে, জানেন সকলেই। পাওয়া যায় না হোটেলও। বিশেষত সঙ্গে যদি মহিলা, শিশু বা বয়স্কেরা থাকেন, তবে তাঁদের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন থাকার জায়গা জরুরি। শেষ মুহূর্তে যদি সে সব পাওয়া না যায়, তবে কি ভক্তের ইচ্ছে অপূর্ণ থেকে যাবে? একেবারেই না। চাইলে আড়াই দিনেই কলকাতা থেকে চারচাকায় ঝটিতি সফরে রথ দেখে ফিরে আসা সম্ভব। সেই পথ-সফর বা রোড ট্রিপ যেমন নির্বিঘ্নে হবে, তেমনই খাওয়া, বিশ্রাম, ঘুমের বন্দোবস্তও মিলবে যথা সময়ে। তবে তার জন্য দরকার হবে একটি ‘নিখুঁত’ পরিকল্পনা। ১৬ জুলাই রথযাত্রা। উল্টোরথ বা বহুদা যাত্রা ২৪ জুলাই। জুলাই মাসের শুরুতে পুরী যাওয়ার পরিকল্পনা করলে সোজা রথের বদলে উল্টো রথযাত্রার জন্যই সাজাতে পারেন রোড ট্রিপ। তাতে হাতে সময় থাকবে বেশি। উল্টো রথে ভিড়ের মাত্রা কিছুটা হলেও কম থাকবে। তা ছাড়া উল্টোরথের ঠিক পরের দিন জগন্নাথ-বলরাম এবং সুভদ্রার বিগ্রহকে ‘সোনাবেশ’-এ সাজানো হয়। ওই সময়ে গেলে সেই সাজও দেখার সুযোগ পাবেন পুণ্যার্থীরা। তবে কেউ যদি একান্তই সোজা রথযাত্রা দেখবেন বলে ভেবে থাকেন, তবে তাতেও অসুবিধা নেই। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরুন। যে দিন রথযাত্রার অনুষ্ঠান তার আগের দিন ভোর ৪টেয় যাত্রা শুরু করুন। ভোরে বেরোলে কোনা এক্সপ্রেসওয়ের জ্যাম এড়ানো যাবে। সঙ্গে ছোট শিশু থাকলে সেও আরামে ঘুমিয়ে নিতে পারবে কিছু ক্ষণ।

প্রথম হল্ট কোলাঘাট, সকাল ৭টায়: কোলাঘাটে থেমে প্রাতরাশ সেরে নিন। ওখানে ধাবা এবং খাওয়াদাওয়ার হোটেলে পরিষ্কার শৌচাগার এবং বিশ্রামের পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে মহিলা-শিশু এবং বয়স্ক সদস্যেরা জিরিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিতে পারবেন। দ্বিতীয় হল্ট ভদ্রক, দুপুর সাড়ে ১২টায়: কোলাঘাট থেকে রওনা হওয়ার পরে টানা গাড়ি চালিয়ে খড়্গপুর, বালেশ্বর পেরিয়ে ওড়িশায় ঢোকার পরে বিশ্রাম নিন ভদ্রকে এসে। এখানে হাইওয়ের ধারে ভাল ফ্যামিলি রেস্তরাঁ পাবেন একাধিক। পরিবার নিয়ে খাওয়াদাওয়া করা এবং বিশ্রামের উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে সেখানে। ১ ঘণ্টার বিরতি নিয়ে একটু ক্লান্তি কাটিয়ে নিন। এখানেই সেরে নিন দুপুরের খাওয়াদাওয়াও। চাইলে ওই অঞ্চলে কোথায় কী রেস্তরাঁ আছে, তা আগে থেকে গুগলম্যাপে দেখে ঠিক করেও রাখতে পারেন।

বিকেল ৪টেয় ভুবনেশ্বর: পুরীতে না থেকে ভুবনেশ্বরে থাকুন। পুরী থেকে ভুবনেশ্বরের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। রথের সময়ে পুরীতে হোটেল পাওয়া না গেলেও ভুবনেশ্বর স্টেশন রোড, রসুলগড় বা জয়দেব বিহার এলাকায় হোটেল এবং গেস্ট হাউজ় ভাড়া পাওয়া যায়। আগে থেকে বুক করে রাখতে পারেন। অথবা ওখানে পৌঁছেও বুকিং করতে পারেন। রাতে সেখানেই খাওয়াদাওয়া করে ঘুমিয়ে ভোর ভোর উঠে পড়ুন রথযাত্রা দেখার জন্য।

দ্বিতীয় দিন ভোর ৫টায় পুরীর উদ্দেশে রওনা: ভুবনেশ্বরের হোটেল থেকে সকালের খাবার প্যাক করে নিয়ে জাতীয় সড়ক ৩১৬ ধরে পুরীর দিকে রওনা হোন। দেড় ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন। পথে গাড়িতেই সেরে নিন প্রাতরাশ।

গাড়ি পার্কিং ও পুরীতে প্রবেশ: রথযাত্রার দিন মালতিপাটপুর বা তালবানিয়া পার্কিং লটে গাড়ি আটকে দেওয়া হয়। সেখানে দর্শনার্থীদের জন্য বিশ্রামের জায়গা এবং বড় বড় অস্থায়ী শৌচাগারের ব্যবস্থাও থাকে। গাড়ি পার্কিংয়ে রেখে ওড়িশা সরকারের বিশেষ রথযাত্রার বাস অথবা টোটো বা অটোতে করে পৌঁছে যান ‘বড়দণ্ড’ বা গ্র্যান্ড রোডে। জগন্নাথ মন্দির থেকে গুণ্ডিচা মন্দির পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাজপথেই রথযাত্রা হয়।

রথদর্শন: সব ঠিক ঠাক চললে আটটার মধ্যেই বড়দণ্ডে পৌঁছে যাবেন। সেখানে সামনে থেকে সাজানো রথ দেখার সুযোগ পাবেন। রথের রশিতে টান পড়ে সাধারণত দুপুর বা বিকেলের দিকে। সেটি দেখার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা বড়দণ্ডের দু’পাশের হোটেলের বারান্দা বা ছাদ। অনেকেই টাকার বিনিময়ে সেখানে বসতে দেন। রথযাত্রা দেখতে হলে সকালে সেখানে পৌঁছে আগেই ওই বসার জায়গার ব্যবস্থা করে ফেলুন। মূল রথযাত্রার ভিড়ে না ঢোকাই ভাল। আর যদি শুধু সাজানো রথ দেখেই ফিরতে চান, তবে তা-ও করতে পারেন। মধ্যাহ্ণভোজ: যদি রথযাত্রা দেখতে চান, তবে দুপুরের খাবার খেতে হবে বড়দণ্ড এলাকাতেই। রেস্তরাঁগুলিতে সেই সময় প্রচুর ভিড় থাকে। তবে রথযাত্রা উপলক্ষে বহু ধর্মীয় সংগঠন এবং ট্রাস্ট সেই সময়ে ভক্তদের জন্য অন্নসত্রের ব্যবস্থা করেন। সেখান থেকেও দুপুরের খাবার খাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া ব্যাগে শুকনো চিঁড়েভাজা, বিস্কুট, মিষ্টি বা অন্য কোনও শুকনো খাবার রাখতে পারেন। পানীয় জল সঙ্গে রাখতেও ভুলবেন না। আর যদি সাজানো রথ দেখে ফিরে আসেন তবে স্বর্গদ্বারে ফিরে যে কোনও হোটেলে পছন্দসই খাবার পেতে পারেন। বিকেল ৪টেয় ভুবনেশ্বরের উদ্দেশে রওনা: রথ টানা শুরু হলে ভিড় বাড়তে শুরু করে। তাই জটিলতা এড়াতে বিকেল ৪টে থেকে ৫টার মধ্যেই ফিরে আসুন পার্কিং লটে। সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে ফিরে যান ভুবনেশ্বরের হোটেলে। রাতে বিশ্রাম এবং সকালে বাড়ির পথে: হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নিন। রাতের খাবার সেরে নিশ্চিন্তে ঘুমোন।

১৬ জুলাই দেশ জুড়ে পালিত হতে চলেছে রথযাত্রা। আর রথযাত্রা মানেই সব থেকে প্রথমে মাথায় আসে পুরীর কথা। লক্ষ লক্ষ ভক্ত এবং পর্যটক ভিড় জমান পুরীর জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা দেখার জন্য। এ বছরেও তার ব্যতিক্রম নয়। ইতিমধ্যেই পুরীতে ভিড় করতে শুরু করেছেন পর্যটকরা। তবে রথযাত্রা ছাড়াও পুরীতে দেখার মতো রয়েছে আরও অনেক কিছু। দ্বাদশ শতাব্দীতে তৈরি পুরীর জগন্নাথ মন্দির ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় তীর্থক্ষেত্র। কলিঙ্গ শৈলীতে তৈরি এই মন্দিরের স্থাপত্য এবং বছরের পর বছর ধরে চলে আসা প্রাচীন রীতিনীতি পর্যটকদের মুগ্ধ করে। রথযাত্রার দিনগুলিতে মন্দিরের পরিবেশ আরও উৎসব মুখর হয়ে ওঠে। মন্দির দর্শনের পরে ক্লান্তি দূর করতে একবার ঢুঁ মারাই যায় পুরী সমুদ্র সৈকতে। এখানে সূর্যোদয়ের মনোরম দৃশ্য দেখার মতো। সন্ধের দিকে পুরীর সৈকত স্থানীয় খাবারের দোকান এবং ঘর সাজানোর জিনিসের দোকানে জমজমাট হয়ে ওঠে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রান্নাঘরে প্রতিদিন তৈরি হয় বিখ্যাত মহাপ্রসাদ। ৫৬ রকম পদ দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয় জগন্নাথকে। পুরী এসে সেই মহাপ্রসাদ না খেলে অনেকেই মনে করেন সফর অসম্পূর্ণ। জগন্নাথ মন্দির থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে গুন্ডিচা মন্দির। এই মন্দির জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি হিসেবে পরিচিত। রথযাত্রার শোভাযাত্রা এই মন্দিরে এসেই শেষ হয়। জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা এখানে বেশ কয়েক দিন কাটান। তার পরে উল্টো রথের দিন আবার মূল মন্দিরে ফিরে যান। পুরী বেড়াতে এসে কেনাকাটার আনন্দই আলাদা। মন্দির এবং সমুদ্র সৈকতের কাছের বাজারগুলি থেকে ওডিশার ঐতিহ্যবাহী কটকী শাড়ি কেনা যেতে পারে। এ ছাড়া রুপোর গয়না, ঝিনুকের তৈরি নানারকম হাতের কাজ, পটচিত্র, কাঠের তৈরি জিনিস এবং অ্যাপ্লিকের কাজ করা রঙিন সামগ্রী পাওয়া যায়। পুরী থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত UNESCO স্বীকৃত কোর্ণাকের সূর্য মন্দির। এক বিশাল রথের আকারে এই মন্দির গড়া হয়েছে। পাথরের তৈরি এই মন্দিরের গায়ে খোদাই করা সূক্ষ্ম কারুকার্য দেখার জন্য সারা পৃথিবী থেকে পর্যটকেরা আসেন। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য চিলকা হ্রদ বেশ আদর্শ। এশিয়ার বৃহত্তম লোনা জলের হ্রদ এটি। এখানে নৌকা বিহার বা বোট রাইডের ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে পরিযায়ী পাখি এবং বিরল প্রজাতির ডলফিন দেখতে পাওয়া যায়। পুরীর ট্রিপে এসে স্থানীয় সুস্বাদু খাবার চেখে দেখতে পারেন। ওডিশার ঐতিহ্যবাহী ডালমা, ছানাপোড়া, খাজা, পাখাল ভাত (পান্তা ভাত) এবং সামুদ্রিক মাছের পদ অবশ্যই চেখে দেখুন। অনেক নামী রেস্তোরাঁয় ওডিয়া থালি পাওয়া যায়, যা ওখানকার খাদ্য সংস্কৃতিকে সুন্দর ভাবে তুলে ধরে।

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের লীলাকথার শেষ নেই। কখনও তাঁর দর্শন পেতে ছুটে আসেন স্বয়ং সমুদ্রদেব, ভেসে যায় সব ঘর বাড়ি। কখনও আবার তিনি তাঁর প্রিয় ভক্তের সঙ্গে যান আম চুরি করতে, তারপর ধরা পড়লে দোষ চাপিয়ে দেন সেই ভক্তের কাঁধে। হাওয়ার বিপরীতে ওড়ে জগন্নাথ মন্দিরের ধ্বজা। তেমনই আরেক বিশেষত্ব হলো এখানে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা ও সুদর্শনের কোনও পাথর বা ধাতুর মূর্তি নেই। বরং তা নির্মিত বিশেষ ভাবে নির্বাচিত নিমকাঠ দিয়ে। ভারতের অধিকাংশ হিন্দু মন্দিরে যেখানে পাথরের বিগ্রহ পূজিত হয়, সেখানে জগন্নাথদেবের কাঠের মূর্তি কেন? তাও আবার যে সে কাঠ নয়, স্বপ্নাদেশে পাওয়া বিশেষ চিহ্নযুক্ত নিমকাঠ। পুরাণ, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা বিশেষ আচার। জগন্নাথ সংস্কৃতিতে নিমকাঠকে ‘দারু ব্রহ্ম’ বলা হয়। ‘দারু’ অর্থ কাঠ এবং ‘ব্রহ্ম’ অর্থ পরম চৈতন্য। বিশ্বাস করা হয়, ভগবান স্বয়ং এই পবিত্র কাঠে অধিষ্ঠান করেন। তাই জগন্নাথদেবের মূর্তি সাধারণ কাঠ দিয়ে নয়, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে নির্বাচিত নিমগাছের কাণ্ড থেকেই তৈরি করা হয়। যে কোনও নিমগাছ দিয়ে এই মূর্তি তৈরি করা যায় না। ‘নবকলেবর’ অনুষ্ঠানের সময় মন্দিরের দৈতাপতি সেবক ও পুরোহিতরা বিশেষ ধর্মীয় আচার পালন করে উপযুক্ত গাছের সন্ধান করেন। প্রচলিত বিশ্বাস, সেই গাছে শঙ্খ, চক্র, গদা বা পদ্মের মতো শুভ চিহ্ন থাকতে হয়। পাশাপাশি গাছটির অবস্থান, আশপাশের পরিবেশ এবং আরও একাধিক ধর্মীয় লক্ষণও বিচার করা হয়। এই পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া অত্যন্ত গোপনীয় ভাবে সম্পন্ন হয়। জগন্নাথদেবের মূর্তি চিরস্থায়ী নয়। নির্দিষ্ট সময় অন্তর, সাধারণত ১২ থেকে ১৯ বছর অন্তর, নবকলেবর উৎসবে পুরোনো বিগ্রহের পরিবর্তে নতুন নিমকাঠের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পুরোনো মূর্তির অন্তর্নিহিত পবিত্র ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ বিশেষ গোপন আচার মেনে নতুন মূর্তিতে স্থানান্তর করা হয়। এই প্রথা জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্মের চিরন্তন দর্শনের প্রতীক বলে মনে করা হয়। পুরাণ ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ভগবান জগন্নাথের মূর্তি তৈরির ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে মালব দেশের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন-এর সঙ্গে। বলা হয়, রাজা স্বপ্নে ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশ পান যে, তিনি নীলাচলে তাঁর এক বিশেষ রূপে অধিষ্ঠিত হতে চান। সেই স্বপ্নাদেশ অনুসারে রাজা পুরীতে এসে একটি মহামন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু দেবমূর্তি কী দিয়ে তৈরি হবে, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন। তখন সমুদ্রতটে এক অলৌকিক নিমকাঠের গুঁড়ি ভেসে আসে। প্রচলিত বিশ্বাস, এটি ছিল স্বয়ং বিষ্ণুর ‘দারু ব্রহ্ম’ রূপ। রাজা সেই কাঠ দিয়েই মূর্তি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মূর্তি গড়বে কে? লোকবিশ্বাস, বিষ্ণুর আদেশে এক বৃদ্ধ ছুতোরের বেশে বিশ্বকর্মা রাজদরবারে এসে জানান, তিনি মূর্তি গড়বেন। তবে তাঁর একটি শর্ত ছিল— মূর্তি গড়তে সময় লাগবে একুশ দিন। সেই সময় মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকবে, কেউ ভিতরে উঁকি দিতে পারবেন না। আর যদি কেউ নিয়ম ভঙ্গ করেন, তা হলে যতদূর কাজ হবে, সেখানেই থামিয়ে রেখে তিনি চলে যাবেন। রাজা সেই শর্তও মেনেও নেন। কিন্তু কয়েক দিন পর ভিতর থেকে কোনও শব্দ না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ইন্দ্রদ্যুম্ন দরজা খুলে দেন। তখনই বিশ্বকর্মা অন্তর্ধান করেন। দেখা যায়, জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার মূর্তি সম্পূর্ণ হলেও তাঁদের হাত-পা পূর্ণাঙ্গ নয়। রাজা অনুতপ্ত হলেও দৈববাণী হয়, এই রূপেই ভগবান পূজিত হতে চান। সেই থেকেই নিমকাঠ দিয়ে নির্মিত অসম্পূর্ণ অঙ্গবিশিষ্ট জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার মূর্তিই আজও পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে পূজিত হয়ে আসছে। এই কাহিনি ভক্তদের কাছে বিশ্বাস, ভক্তি ও ঈশ্বরের অলৌকিক লীলার এক অনন্য প্রতীক। বিশেষজ্ঞদের মতে, জগন্নাথদেবের কাঠের মূর্তি শুধু একটি ধর্মীয় প্রথা নয়। বরং এটি জীবনের অসম্পূর্ণতা, নবজন্ম এবং ঈশ্বরের চিরন্তন উপস্থিতির প্রতীক। এই অনন্য ঐতিহ্যই পুরীর জগন্নাথ ধামকে বিশ্বের অন্যান্য মন্দিরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা পরিচয় দিয়েছে।



