আপনি কি রোগা এবং আপনার কোলেস্টেরল রিপোর্ট নরমাল? তা সত্ত্বেও আপনার হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকতে পারে! কার্ডিওলজিস্ট ডক্টর বিনায়ক আগরওয়াল ব্যাখ্যা করলেন ‘থিন-ফ্যাট ইন্ডিয়ান ফেনোটাইপ’ (Thin-Fat Indian Phenotype) কী এবং কোন ৪টি গোপন লিপিড আপনার ধমনী ব্লক করছে। খুব কমবয়সি, ফিট এবং রোগা-পাতলা কোনও মানুষ হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। এই ধরনের ঘটনা আমাদের প্রচলিত ধারণাকে বড়সড় ধাক্কা দিচ্ছে। আমরা সাধারণত ভাবি, ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকলে এবং রক্তের রুটিন কোলেস্টেরল রিপোর্ট ‘নরমাল’ বা স্বাভাবিক থাকলে হার্টের কোনও ঝুঁকি নেই। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, টোটাল কোলেস্টেরল বা এলডিএল (LDL)-এর সাধারণ নম্বরটি হৃদযন্ত্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি আংশিক চিত্র মাত্র। রক্তের সাধারণ লিপিড প্যানেলে ধরা পড়ে না এমন কিছু ‘গোপন লিপিড কণা’, কোষের ভেতরের প্রদাহ (Inflammation) এবং জিনগত গঠনের কারণে রোগা মানুষদের শরীরেও ব্লক তৈরি হতে পারে। সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট বিস্তারিত আলোচনা করেছেন কেন শুধু কোলেস্টেরলের ওপর ভরসা করা বিপজ্জনক এবং দক্ষিণ এশীয়দের জন্য কোন অ্যাডভান্সড স্ক্রিনিং প্রয়োজন।
কী এই ‘থিন-ফ্যাট ইন্ডিয়ান ফেনোটাইপ’ (Thin-Fat Indian Phenotype)?
মেডিক্যাল পরিভাষায় ভারতীয়দের শারীরিক গঠনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে ‘থিন-ফ্যাট ইন্ডিয়ান ফেনোটাইপ’ বলা হয়। এর অর্থ হল, একজন ব্যক্তির বডি মাস ইনডেক্স (BMI) বা ওজন স্বাভাবিকের গণ্ডিতে থাকতে পারে, বাইরে থেকে তাঁকে দেখতে বেশ রোগা বা লিন (Lean) লাগতে পারে, কিন্তু তাঁর পেটের ভেতরে এবং লিভার, হার্ট বা ফুসফুসের মতো অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর চারপাশে বিপজ্জনক চর্বি বা ভিসেরাল ফ্যাট (Visceral fat) জমা থাকে। এই অভ্যন্তরীণ মেদ এবং রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট (ভাত, ময়দা, চিনি) যুক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা সরাসরি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং হার্টের ব্লকেজের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
৪টি ‘গোপন লিপিড’ যা নিঃশব্দে ধমনী ব্লক করছে
ডক্টর বিনায়ক আগরওয়ালের মতে, রুটিন টেস্টের বাইরে নিচের ৪টি লিপিড মার্কার রোগা মানুষের হার্ট অ্যাটাকের জন্য প্রধানত দায়ী:
১. লাইপোপ্রোটিন(এ) বা Lp(a)
এটি হল রক্তে থাকা এক ধরণের বিশেষ কোলেস্টেরল বহনকারী কণা, যার মাত্রা সম্পূর্ণভাবে বংশগত বা জিনগত (Genetic factors) বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। ডায়েট বা ব্যায়াম করে এটি সহজে কমানো যায় না। লিন বা রোগা ভারতীয়দের শরীরে এই Lp(a)-র মাত্রা বেশি থাকলে ধমনীতে খুব দ্রুত রক্ত জমাট বাঁধা বা প্লাক তৈরির সম্ভাবনা থাকে।
২. ট্রাইগ্লিসারাইডস (Triglycerides)
এটি আমাদের রক্তের সবচেয়ে সাধারণ ফ্যাট, যা অতিরিক্ত ক্যালোরি থেকে তৈরি হয়। অনেক সময় রোগা মানুষের ওজন বেশি না হলেও উচ্চ কার্বোহাইড্রেট ডায়েটের কারণে ট্রাইগ্লিসারাইড বর্ডারলাইন বা তার চেয়ে বেশি থাকে। এটি সরাসরি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং মেটাবলিক সিন্ড্রোমের ইঙ্গিত দেয়।
৩. স্মল, ডেন্স এলডিএল (Small, Dense LDL)
সাধারণ কোলেস্টেরল টেস্টে কেবল ‘LDL’ বা খারাপ কোলেস্টেরলের মোট ওজন মাপা হয়। কিন্তু ক্ষতিকর বিষয় হলো এর কণার আকার (Particle size)। এই স্মল ও ডেন্স (ছোট ও ভারী) এলডিএল কণাগুলো এতই সূক্ষ্ম হয় যে, এগুলো ধমনীর দেওয়ালে সহজে ঢুকে গিয়ে দ্রুত প্লাক বা ব্লকেজ তৈরি করে। সাধারণ টেস্টে এটি ধরা পড়ে না।
৪. লো এইচডিএল বা কম ভাল কোলেস্টেরল (Low HDL)
এইচডিএল (HDL) হল আমাদের হার্টের রক্ষাকবচ বা ভাল কোলেস্টেরল। দক্ষিণ এশীয় এবং ভারতীয়দের জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ওজন ঠিক থাকলেও রক্তে এইচডিএল-এর মাত্রা প্রাকৃতিকভাবেই বেশ কম থাকে। ভাল ফ্যাটের এই ঘাটতি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
কোন ৪টি রেড ফ্ল্যাগ বা সতর্কবার্তা অবহেলা করবেন না?
পরিবারে বা বংশে যদি অল্প বয়সে কারো হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগের ইতিহাস থাকে।
রক্তের সাধারণ রিপোর্টে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বর্ডারলাইনে (Borderline high) থাকা।
অল্প পরিশ্রমে প্রচণ্ড হাঁফিয়ে ওঠা, ক্লান্তি বা স্ট্যামিনা কমে যাওয়া।
হাত-পা রোগা হলেও পেটের অংশে চর্বি বা মেদ (Central obesity) জমা হওয়া।
সাধারণ কোলেস্টেরল টেস্টের বাইরে চিকিৎসকেরা কোন কোন পরীক্ষার পরামর্শ দিচ্ছেন?
ডক্টর বিনায়ক আগরওয়াল স্পষ্ট জানিয়েছেন, হার্টের ভেতরের আসল অবস্থা জানতে এবং নিখুঁত স্ক্রিনিংয়ের জন্য রক্তের সাধারণ কোলেস্টেরল টেস্টের বাইরে নিচের অ্যাডভান্সড লিপিড ও ইনফ্ল্যামেটরি মার্কার পরীক্ষা করা জরুরি:
১. Lipoprotein(a) Test: জীবনে অন্তত একবার এই টেস্টটি করা উচিত, যাতে বংশগত হার্টের ঝুঁকি পরিমাপ করা যায়।
২. ApoB Levels (Apolipoprotein B): এটি রক্তে উপস্থিত সমস্ত ক্ষতিকারক প্লাক-তৈরি কণার মোট সংখ্যা নির্ভুলভাবে গণনা করে।
৩. Triglyceride-to-HDL Ratio: এই অনুপাতটি শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং স্মল ডেন্স এলডিএল-এর উপস্থিতি বোঝার অন্যতম সেরা ঘরোয়া মার্কার।
৪. Hs-CRP (High-Sensitivity C-Reactive Protein): এটি ধমনীর ভেতরে কোনও প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন হচ্ছে কিনা তা শনাক্ত করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নন-ইনভেসিভ পরীক্ষা।
রোগা হলেও হার্ট সুরক্ষিত রাখার ৫টি নিয়ম
রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট ও চিনি বর্জন: সাদা ভাত, ময়দা, ফাস্টফুড এবং অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়া বন্ধ করুন। এগুলোই লিভারে গিয়ে ট্রাইগ্লিসারাইড তৈরি করে।
প্রোটিন ও হেলদি ফ্যাট বাড়ান: ডায়েটে পর্যাপ্ত প্রোটিন (ডাল, ডিম, মাছ) রাখুন। চিপস বা ভুজিয়ার বদলে কাঠবাদাম, আখরোট ও চিনাবাদামের মতো ভাল ফ্যাট খান, যা এইচডিএল (HDL) বাড়াতে সাহায্য করবে।
কার্ডিও ও স্ট্রেন্থ ট্রেইনিং: কেবল রোগা থাকার মানেই শরীর ফিট নয়। হার্টের পেশী শক্ত করতে সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন মাঝারি মানের কার্ডিও (হাঁটা, দৌড়ানো) এবং সপ্তাহে ২ দিন হালকা স্ট্রেন্থ বা পেশী মজবুত করার ব্যায়াম করুন।
ধূমপান ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ বন্ধ: ধূমপান ধমনীর দেওয়ালকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা লিপিড কণাগুলোকে দ্রুত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।
অ্যাডভান্সড স্ক্রিনিং: বয়স ৩০ পেরোলেই, বিশেষ করে পারিবারিক ইতিহাস থাকলে, বছরে অন্তত একবার একজন কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শে অ্যাডভান্সড লিপিড প্রোফাইল করান।
হৃদরোগ বা কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ (CVD) বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হার্ট ভাল রাখার কথা উঠলেই সাধারণত আমাদের মাথায় আসে চর্বিযুক্ত খাবার কমানো বা চিনি বর্জন করার কথা। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, কেবল ক্ষতিকর খাবার বাদ দেওয়াই শেষ কথা নয়, বরং রক্তনালীকে ভেতর থেকে সুস্থ রাখতে ডায়েটে কিছু নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষামূলক উপাদানের সংযোজনও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এরকমই একটি অত্যন্ত কার্যকরী প্রাকৃতিক উদ্ভিদ যৌগ হলো ‘ফ্ল্যাভোনল’ (Flavanol)। এটি মূলত এক ধরনের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা বিভিন্ন ফল, শাকসবজি ও উদ্ভিজ্জ খাবারে পাওয়া যায়। সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট জানিয়েছেন, ফ্ল্যাভোনল সমৃদ্ধ খাবার রক্তনালীর ভেতরের আস্তরণকে (Endothelium) সুস্থ রাখে, যার ফলে রক্তনালী সহজে সংকুচিত ও প্রসারিত হতে পারে। এটি শরীরে স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখতে এবং ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরাসরি সাহায্য করে।
হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় কাজ করে যে ৭টি ফ্ল্যাভোনল সমৃদ্ধ খাবার। আপনার হার্টের ধমনী সুরক্ষিত রাখতে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে নিচে উল্লিখিত ৭টি খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় যোগ করতে পারেন:
১. ডার্ক চকোলেট — ডার্ক চকোলেটকে ফ্ল্যাভোনলের অন্যতম সেরা উৎস বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে যে চকোলেটে ৭০% বা তার বেশি কোকো (Cocoa) থাকে, তা হার্টের রক্তপ্রবাহ উন্নত করতে এবং রক্তনালীর দেওয়ালে চর্বি জমা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখবেন, এতে ক্যালোরি ও সামান্য চিনি থাকায় এটি পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।
২. কোকো পাউডার — চিনি ছাড়া বা আনসুইটেনড কোকো পাউডার হলো ফ্ল্যাভোনলের একটি ঘনীভূত উৎস। ডার্ক চকোলেটের বাড়তি ক্যালোরি ও চিনি এড়াতে আপনি আপনার সকালের ওটস, স্মুদি বা গরম দুধে এক চামচ কোকো পাউডার মিশিয়ে নিতে পারেন। এটি ধমনীর প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
৩. আপেল — ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘An apple a day keeps the doctor away’। কার্ডিওলজিস্টদের মতে, খোসাসহ আপেল খাওয়া হার্টের জন্য অত্যন্ত উপকারী। আপেলের খোসায় প্রচুর পরিমাণে ফ্ল্যাভোনল এবং ফাইবার থাকে, যা শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল (LDL) নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
৪. বেরি জাতীয় ফল — ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি, ব্ল্যাকবেরি এবং রাসবেরি ফ্ল্যাভোনল ও অ্যান্থোসায়ানিনের মতো শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। এগুলো রক্তনালীর কোষগুলোকে ফ্রি-র্যাডিক্যালের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। বেরিতে থাকা উচ্চ ফাইবার মেটাবলিক স্বাস্থ্যকেও উন্নত করে।
৫. আঙুর— বিশেষ করে লাল এবং কালো আঙুর ফ্ল্যাভোনল ও পলিফেনলের চমৎকার উৎস। এটি রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়াকে মসৃণ রাখে এবং রক্তনালীতে প্লেক বা ব্লকেজ তৈরির প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। এটিকে বিকেলের হেলদি স্ন্যাক্স হিসেবে খাওয়া যেতে পারে।
৬. চা — গ্রিন টি এবং ব্ল্যাক টি—উভয়ই ফ্ল্যাভোনলের পাওয়ারহাউস। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত চিনি ছাড়া চা পান করলে তা ধমনীর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি কোল্ড ড্রিঙ্কস বা অতিরিক্ত মিষ্টিযুক্ত পানীয়ের একটি দুর্দান্ত ও সুস্থ বিকল্প।
৭. নাশপাতি — নাশপাতিতে ফ্ল্যাভোনলের পাশাপাশি রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ডায়েটারি ফাইবার, জরুরি ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। এর ফাইবার উপাদানটি পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি কোলেস্টেরল ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করে, যা পরোক্ষভাবে হার্টকে সুরক্ষিত রাখে। স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট সুপারফুড বা উপাদান কখনওই হার্টের সার্বিক সুরক্ষার একমাত্র চাবিকাঠি হতে পারে না। ফ্ল্যাভোনল সমৃদ্ধ খাবার অবশ্যই কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমকে সাহায্য করে, তবে এর সর্বোচ্চ সুফল পেতে হলে আপনাকে প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের মতো স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল বজায় রাখতে হবে।





