স্পেন : ৪ (ইয়ামাল, ওয়ারজাবাল ২, আলতামবাক্তি আত্মঘাতী) সৌদি আরব : ০
বেলজিয়াম : ০ ইরান : ০
RK NEWZ স্প্যানিশ আর্মাডার সামনে উড়ে গেল সৌদিরা। ৪-০ গোলে সৌদিকে উড়িয়ে বিশ্বকাপে প্রথম জয় পেল স্পেন। একটি গোল লামিনে ইয়ামালের, জোড়া গোল মিকেল ওয়ারজাবালের, একটি আত্মঘাতী। আগের ম্যাচের ‘ভুল’ থেকে শিক্ষা নিয়ে এদিন একাধিক বদল আনেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। কিন্তু এই ম্যাচ বুঝিয়ে দিয়ে গেল, এবার ১৯ বছরের লামিনে ইয়ামালের উপর কতটা নির্ভরশীল ২০১০-র বিশ্বজয়ীরা।চোটের সমস্যা এখনও পুরোপুরি মেটেনি ইয়ামালের। আগের ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে নামিয়েও লাভের লাভ হয়নি। এদিন বাধ্য হয়েই ইয়ামালকে শুরু থেকে খেলান ফুয়েন্তে। পুরো ম্যাচ খেলার মতো অবস্থায় আসেননি বার্সেলোনা তারকার। স্প্রিন্ট টানতে সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু তাতেই এলেন, দেখলেন, জয় দেখলেন। বিশ্বকাপে প্রথম গোলটা তুলে নিতে আটলান্টা স্টেডিয়ামে সময় লাগল মাত্র ১০ মিনিট। মাঝমাঠ থেকে অ্যালেক্স বায়েনা বল দেন মিকেল ওয়ারজাবালকে। বাঁদিকে বক্সের মাথা থেকে বাঁপায়ের নিখুঁত পাস বাড়ান তিনি। গোলকিপার ও ডিফেন্সের মাঝখান দিয়ে তা অরক্ষিত দ্বিতীয় বারে এসে পৌঁছয়। ঝাঁপিয়ে পড়ে পা ছুঁইয়ে গোল করেন ইয়ামাল। আগের ম্যাচে ইয়ামালের জায়গায় শুরু করেছিলেন ফেরান তোরেস। ভুল জায়গায় খেলানো হয়েছিল বার্সেলোনার স্ট্রাইকারকে। উইং থেকে চাপ না থাকায় লোক বাড়িয়ে লো ব্লক ডিফেন্সে বাজি মেরে দেয় কেপ ভার্দে। ইয়ামাল সৌদির ডিফেন্ডারদের টেনে আনলেন উইংয়ে। সেখান থেকে কখনও ক্রস রাখলেন, কখনও একটা-দু’টো-তিনটে ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ঢুকে গেলেন বক্সের মধ্যে। তাঁকে আটকাতে দু’জন ডিফেন্ডার ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় দ্বিতীয় বার পুরোপুরি খুলে গেল। পরের তিনটি গোল সেই জায়গা থেকেই এল। ইয়ামাল ছাড়াও প্রথম একাদশে তিনটি বদল করেন ফুয়েন্তে। আরেকটা উইংয়ে নিয়ে আসেন গতিশীল বায়েনাকে। সাইড ব্যাকে মার্কোস লরেন্তের জায়গায় খেলানো হয় পেড্রো পোরোকে। পুরনো তিকিতাকা ভুলে গতিময় পাসিং ফুটবল। এর সঙ্গে ফাবিয়ান রুইজের বদলে মাঝমাঠে দায়িত্ব দেওয়া হয় দানি ওলমোকে। তিনি ফলস নাইন, নম্বর ১০- একাধিক জায়গায় খেলতে পারেন। সেই কারণে সৌদির বক্সের জঙ্গল থেকেও দুই উইংয়ে বল ছড়িয়েছে। দ্বিতীয় গোলটি আসে ২১ মিনিটে। কর্নার থেকে জটলার মধ্যে গোল করেন মিকেল ওয়ারজাবাল। তিন মিনিটের মাথায় ফের তাঁর গোল। আগের ম্যাচে প্রথম আধঘণ্টা ওয়ারজাবালকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। এদিন দু’টো দিকে চাপ কম থাকায় ফাঁকা জায়গা নিতে পারছিলেন। সেভাবেই ওলমোর বাড়ানো বল থেকে দ্বিতীয়বার থেকে ফাঁকা গোলে বল ঠেলে দেন তিনি। ৩৭ মিনিটে একটা দুর্দান্ত ট্রিভেলা শট মেরেছিলেন। কিন্তু তা অল্পের জন্য বারের উপর দিয়ে চলে যায়। ইয়ামালের একটি শটও সেভ করে দেন সৌদির গোলকিপার মহম্মদ আল ওয়াইস। প্রথমার্ধে ৩-০ গোলে এগিয়ে। ম্যাচ পকেটে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আর ঝুঁকি না নিয়ে ইয়ামালকে তুলে নেন স্পেন কোচ। হ্যাটট্রিকের সুযোগ ছেড়েই মাঠ ছাড়েন ওয়ারজাবাল। তাতে স্পেনের গোলের ব্যবধান বাড়াতে অসুবিধা হয়নি। ৪৯ মিনিটে মার্ক কুকুরেয়ার হেড আটকাতে গিয়ে নিজেদের জালে জড়িয়ে দেন সৌদির ডিফেন্ডার আলতামবাক্তি। এরপর আর গোলের ব্যবধান বাড়েনি। বাড়তেই পারত। নিকো উইলিয়ামস, ইয়েরেমি পিনোরা একের পর এক আক্রমণ শানিয়েও লাভের লাভ হয়নি। ফেরান তোরেসের গোল অফসাইডের জন্য বাতিল হয়। ৪-০ গোলে জিতে ২ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ শীর্ষে স্পেন। দ্বিতীয়ার্ধে আর বেশি গোল না হওয়ায় কিছু চিন্তা রয়েই গেল। আর সেই সঙ্গে এটাও যেন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট, ইয়ামালের উপর কতটা নির্ভরশীল এই দলটা।

বেলজিয়াম বনাম ইরান ম্যাচেও কোনও গোল হল না। তবে দুই দলই গোল করার অনেক সুযোগ পেয়েছে। বিশেষ করে, সুযোগ নষ্ট না করলে বেলজিয়ামেরই এই ম্যাচ জেতার কথা। অবশ্য গোল না হওয়ার নেপথ্যে দুই দেশের গোলকিপারের প্রশংসা প্রাপ্য। বেলজিয়ামের গোলকিপার থিবো কুর্তোয়া এবং ইরানের গোলকিপার আলিরেজা বেইরানভান্দ প্রাণ দিয়ে গোল বাঁচালেন। ৬৭ মিনিটে বেলজিয়ামের নাথান এনগোয় লাল কার্ড দেখেন। বাকি সময়ে দাপটে খেলেও জয়সূচক গোল পায়নি ইরান। বিশ্বকাপে আরও এক বার গোলশূন্য ড্র দেখা গেল। ১৪ জুন স্পেন বনাম কাবো ভার্দে ম্যাচের পর রবিবার রাতে বেলজিয়াম বনাম ইরান ম্যাচেও কোনও গোল হল না। র্যাঙ্কিংয়ে ১৩ ধাপ পিছিয়ে থাকা ইরানের বিরুদ্ধে প্রথম ১৫ মিনিট শাসন করেছে বেলজিয়াম। মাঝমাঠে খেলা নিয়ন্ত্রণ করছিলেন কেভিন দ্য ব্রুইন। মাঠের প্রায় সর্বত্রই ছিল বেলজিয়ামের দাপট। ইরান বল ছুঁতেই পারছিল না। প্রথম কয়েক মিনিটে তাদের নাভিশ্বাস তুলে দেয় বেলজিয়াম। বোঝাই যাচ্ছিল, মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে লস অ্যাঞ্জেলেসে পা দেওয়া ইরান এখনও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি। ২৯ মিনিটে দুরন্ত একটি ফ্রিকিক থেকে এগিয়ে যেতে পারত তারা। সেটি অল্পের জন্য অফসাইডে বাতিল হয়। ইরানের নেওয়া ফ্রিকিক মনে পড়িয়ে দিয়েছিল কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বনাম নেদারল্যান্ডস ম্যাচকে। সেই ম্যাচে এ রকই একটি ফ্রিকিক থেকে গোল করেছিল নেদারল্যান্ডস। বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রিকিক পেয়েছিল ইরান। মনে করা হয়েছিল গোলে শট মারবেন এহসান হাজিসফি। কিন্তু ‘ওয়াল’-এ দাঁড়ানো মেহদি তারেমিকে পাস দেন তিনি। তারেমি বল ধরেই জালে জড়িয়ে দেন। কিন্তু বল ধরতে গিয়েই সামান্য অফসাইড হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ফলে ‘ভার’ পরীক্ষার পর সেই গোল বাতিল হয়ে যায়। বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্ম দেশকে কোনও ট্রফি দিতে পারেনি। দেখা গেল, এখনকার প্রজন্মকে নিয়েও খুব বেশি আশা দেখা যাবে না। রোমেলু লুকাকু ৭৩ মিনিট মাঠে ছিলেন। একটিও শট নিতে পারেননি। বেশ কয়েক বার বক্সে ভাল সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু গোলের দিকে পিছন করে বল রিসিভ করার রোগ এখনও তাঁর যায়নি। ফলে ঘুরতে ঘুরতেই তাঁর পা থেকে বল ছিনিয়ে নিয়েছে ইরান। দ্য ব্রুইন মোটের উপর খারাপ খেলেননি। কিন্তু বয়স ছাপ ফেলেছে তাঁর খেলাতেও। বেশ কয়েক বার তাঁর পা থেকে বল ছিনিয়ে নিয়েছেন ইরানের ফুটবলারেরা। ইরানের রক্ষণও ভাঙতে পারেননি তিনি।

বেলজিয়াম গোলের সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছিল তাঁর পাস থেকেই। বেইরানভান্দ সেই বল এক হাতে না বাঁচালে তখনই এগিয়ে যায় বেলজিয়াম। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ইরান (২২) এগিয়ে রয়েছে মহম্মদ সালাহের মিশর এবং আর্লিং হালান্ডের নরওয়ের থেকেও। কেন তারা এগিয়ে, সেটা বোঝা গিয়েছে ম্যাচে। আয়োজক আমেরিকার সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব যতই থাক, যতই বার বার ম্যাচ খেলেই ফিরে যেতে হোক, ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের জেদ এবং প্রতিজ্ঞা মাঠের বাইরের এই বাধা দমাতে পারবে না। রাজনীতি বা কূটনীতির প্রভাব দেখাই যাচ্ছে না তাদের খেলায়। ফুটবলারেরা খোলা মনে খেলতে পারছেন। বরং এখনকার পরিস্থিতি তাঁদের জেদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই দলের মধ্যে বন্ধন আছে। যে কারণে ম্যাচ শেষের পর গোটা দলকে নিয়ে ভাষণ দিলেন তারেমি। কোচ বসে থাকলেন ডাগআউটেই। ইরানের খান তিনেক নিশ্চিত গোল বাঁচিয়েছেন কুর্তোয়া। অতীতে বার বার দেশকে বিপদের হাত থেকে উদ্ধার করেছেন। ইরানের বেইরানভান্দ শুরুতেই চোট পেয়েছিলেন।





