মনখারাপ হলে এখন আর কেউ সে ভাবে প্যাম্পার করে না: প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়
পদ্মশ্রী পাওয়ার পরে অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম রিলিজ ‘অভিমান’। এই ছবির জন্য প্রস্তুতি পর্ব কেমন ছিল? মাঝে চার দশকের বেশি সময় কাটিয়ে ফেলেছেন ইন্ডাস্ট্রিতে। এখনও কি ছবি মুক্তির আগে একই রকম টেনশন হয়? ব্যক্তি প্রসেনজিৎ অভিমান হলে কী করেন?
অন্য সময় প্রাইম: শুনলাম প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ইদানীং টেনশনে আছেন!
প্রসেনজিৎ: ঠিকই শুনেছেন। এখন একটু টেনশনে আছি। প্রতিটি ছবি রিলিজ়ের আগেই আমার ভয় করে। ১৯ তারিখ ‘অভিমান’ মুক্তি পাচ্ছে। একটু টেন্সড। বাট রেসপন্স খুবই ভালো। ছবিতে আমার অভিনীত চরিত্রের নানা শেডস আছে। খেটে করার মতো একটা চরিত্র পেয়েছি। সব মিলিয়ে বেশ ভালো আছি।
অন্য সময় প্রাইম: পদ্মশ্রী পাওয়ার পরে মুক্তি পাচ্ছে ‘অভিমান’। ছবিটা তা হলে লাকি বলতে হবে?
প্রসেনজিৎ: এ ভাবে কখনও সত্যিই আগে ভেবে দেখিনি। একটু আশ্চর্য লাগছে। কারণ যখন পদ্মশ্রী ঘোষণা হয়েছিল, তখন ‘কাকাবাবু’ সব জায়গায় হাউসফুল। আমি তখন হল ভিজ়িটেই গিয়েছিলাম। যদিও সে দিন সকালে আমাকে ফোন করে জানানো হয়েছিল। দিন কয়েক আগে সেই স্বীকৃতি রাষ্ট্রপতি আমার হাতে তুলে দিলেন। এই সব কিছুই মানুষের ভালোবাসা। সকলে এত বছর ধরে ভালোবেসেছেন। সেই সঙ্গে কো-অ্যাক্টর, প্রডিউসার, পরিচালক, টেকনিশিয়ান, যাঁরা এত বছর ধরে আমার সঙ্গে ছিলেন, প্রত্যেকে এই স্বীকৃতির ভাগীদার। আমাকে তাঁরাই তৈরি করেছেন।
অন্য সময় প্রাইম: পদ্মশ্রী প্রাপ্তির পরেও ছবি মুক্তির আগে এতটা নার্ভাস কেন?
প্রসেনজিৎ: কারণ, দায়িত্ব আরও অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে। বাইরে থেকে দেখে কেউ বুঝতে পারবেন না। কিন্তু ভিতরে-ভিতরে চাপা টেনশন কাজ করছে। আমার সঙ্গে সর্বক্ষণ যাঁরা থাকেন, তাঁরা জানেন রিলিজ়ের চার-পাঁচ দিন আগে থেকে আমি নিজেকে সব কিছু থেকে গুটিয়ে নিই। অন্তরালে চলে যাই। মুড সুইং হয়। আমি আমার মতো করে নিজেকে সামলাই। একা থাকি, হাঁটাহাঁটি করি। অনর্থক বকাবকি করি।
অন্য সময় প্রাইম: ছবিতে আপনি রকস্টার। পর্দায় নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুললেন কী ভাবে?
প্রসেনজিৎ: স্টেজে দর্শকের সঙ্গে কানেক্ট করার জন্য রকস্টারদের অসম্ভব এনার্জেটিক হতে হয়। কিন্তু পারফরম্যান্সের নেপথ্যে অনেক গভীর ভাবনা কাজ করে। আমাদের ছবির গল্পের মধ্যেও সেটা আছে। একটা নতুন ভাষা খোঁজার তাগিদ রয়েছে। ঠিক সেই জায়গা থেকেই আমার অভিনীত চরিত্রটির জার্নি শুরু। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সেখানে ব্যক্তিগত এবং পেশাগত, দু’দিকেই টানাপড়েন আছে।
অন্য সময় প্রাইম: চরিত্র নিয়ে আগে যে ভাবে ভাবতেন, এখন কি সেই ভাবনায় খানিক বদল এসেছে?
প্রসেনজিৎ: অনেকটাই বদল এসেছে। গত ১৫-২০ বছর আগে যে চরিত্রগুলি পেয়েছি, সেগুলির কাঠামো নিয়ে ভাবনার চেয়েও এন্টারটেইনার হয়ে ওঠার বেশি চেষ্টা ছিল। তবে গত কয়েক বছরে যে কাজগুলো করেছি, সেই চরিত্রগুলির একটার সঙ্গে অন্যটার মিল নেই। ফলে ভাবতেই হয়। প্রতিটি চরিত্র যাতে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে, তার জন্য হোমওয়ার্ক, ওয়ার্কশপ করি।
অন্য সময় প্রাইম: আপনার পরের প্রজন্মের মধ্যে কাজের প্রতি এই নিষ্ঠা, অনুশাসন দেখতে পান?
প্রসেনজিৎ: নিশ্চয়ই আছে। না হলে এতগুলো বছর ধরে তাঁরা কাজ করতে পারতেন না। কেরিয়ারের শুরুতে নিজেকে প্রমাণ করার একটা বড় অধ্যায় থাকে। আমিও সেই পর্ব পেরিয়ে এসেছি। দর্শকের চোখে নিজেকে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা সহজ নয়। তবে সেই পরীক্ষায় পাশ করতে পারলে একটা ধাপ সম্পূর্ণ হয়। অভিনেতাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে হয়। কোনও অভিনেতা যদি ভেবে নেন এই তো আমি সফল, সামনে আর কোনও হার্ডল নেই, তা হলে আমার মনে তাঁর অভিনয় না করাই উচিত। নতুনরা খুব ভালো কাজ করছেন। তবে তাঁদের একটা সুবিধা হলো আধুনিক প্রযুক্তি। কোনও বিষয়ে জানতে হলে হাতের কাছেই সব তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে, চ্যাটজিপিটি, উইকিপিডিয়া। আমাদের সেই সুযোগটা ছিল না।
অন্য সময় প্রাইম: শিশু অভিনেতা হিসেবে অভিনয় শুরু। ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় ৫৭ বছর হয়ে গেল। মনের ভিতরে কী-কী অভিমান জমা আছে?
প্রসেনজিৎ: অভিমান শব্দের মধ্যে একটা অদ্ভুত মিষ্টতা আছে। অভিমান শব্দটা সবচেয়ে ভালো যায় বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে। আর আমার একজন বন্ধু ছিলেন। ঋতুপর্ণ ঘোষ। আজ আর তিনি নেই। তাঁর সঙ্গে আমার একটা মান-অভিমানের পর্ব চলত। এখনও চলে। অভিমান মিটে গেলে আবার দারুণ কিছু বেরিয়ে আসে। তবে মায়ের প্রতি আমার অভিমান আছে। অনেক আগে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন। এখন থাকলে ভীষণ খুশি হতেন।
অন্য সময় প্রাইম: বুম্বাদার মান ভাঙাতে কী-কী করতে হয়?
প্রসেনজিৎ: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) আমার অভিমান হয়। সেটা প্রকাশ পায় না। তবে এখন আর আমার অভিমান হলে কেউ আর কিছু করে না। এখন অভিমান হলে আমি চুপ করে যাই। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলি না। ২৫ বছর আগে যেমন অভিমান হতো, এখন আর সেটা করতে পারি না। কারণ আমি অভিমান করে থাকলে পাশের মানুষগুলো বেশি কষ্ট পায়। আমি খুব একটা বেশি কষ্ট দিতে চাই না কাউকে।
অন্য সময় প্রাইম: সারাজীবনে যে খ্যাতি পেয়েছেন, তা নিয়ে কখনও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে?
প্রসেনজিৎ: সে ভাবে নয়। খ্যাতি তো আছেই। এটা সকলের আশীর্বাদ, ভালোবাসা। তবে এটাও ঠিক যে আমার চেয়েও যোগ্য মানুষ আছেন, যাঁরা ঠিক আমার মতো করে খ্যাতি পাননি। আমার যেটুকু যোগ্যতা, হয়তো আমাকে বেশিই দিয়েছেন ঈশ্বর। সে কারণে এটা আমি আগলে রাখি। যে দিন আমি দেখব মানুষজন আমাকে ভালোবাসছেন না, তার পরের দিনটা কী ভাবে কাটাব জানি না। দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়।
অন্য সময় প্রাইম: তারকারদের জীবন মানেই আলো নয়, অন্ধকার সামলান কী ভাবে?
প্রসেনজিৎ: আমরা সকলেই জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। হতে পারি আমরা তারকা। তবে দিনের শেষে রক্ত-মাংসের মানুষ। ১৯-২০ বছর বয়সে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলে, ট্রমায় চলে যেতাম। কেঁদে ফেলতাম ভ্যাঁ করে। জীবন তো পরিণত হতে শেখায়। আমিও শিখেছি।




