RK NEWZ মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার পর শনিবার শুভেন্দুর প্রথম জেলাসফর ছিল, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবারে। যেখানকার সাংসদ অভিষেক। আগামী ২১ মে ফলতার পুনর্নির্বাচন উপলক্ষে সভা করেন শুভেন্দু। তার আগে ডায়মন্ড হারবারে পুলিশকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক সারেন। সেখান থেকে ঘোষণা করেন, মমতার তৈরি করার পুলিশ ওয়েলফেয়ার বোর্ড শনিবার থেকেই ভেঙে দেওয়া হল। সভায় গিয়ে মমতা এবং অভিষেককে এক পঙ্ক্তিতে ফেলে আক্রমণ করেন দু’টি পৃথক ইস্যুতে। আরজি করের ঘটনায় কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে তিন আইপিএস-কে সাসপেন্ড করার কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। শনিবার ফলতার সভাতেও সেই প্রসঙ্গ টানেন এবং আরও তীক্ষ্ণ ভাবে তিন বারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে নিশানা করেন। শুভেন্দু বলেন, ‘‘অভয়ার ঘটনায় আগের মুখ্যমন্ত্রীর ইশারায় এবং কথায় যাঁরা যাঁরা অত্যাচার করেছেন, প্রমাণ লোপাট করেছেন, অভয়ার মাকে আগের হেরো মুখ্যমন্ত্রীর কথায় যাঁরা ঘুষ দিতে গিয়েছিলেন, সেই তিন আইপিএস সাসপেন্ড হয়েছেন। এ জেলাতেও ছাড়া হবে না। বিজেপি প্রার্থী বিশ্বজিৎ পালকে প্রকাশ্যে মেরেছিল। (তাই) বারুইপুরের আইসি সাসপেন্ড! ক্যানিংয়ে বিজেপি কর্মীর উপর অত্যাচার করেছিল। (তাই) আইসি অমিত হাতি সাসপেন্ড!’’
শুভেন্দু জানিয়েছেন, ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার অফিসারদের তিনি কল রেকর্ডস্, হোয়াটস্অ্যাপ চ্যাট জমা দিতে বলেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘ভাইপোর পিএ-র নির্দেশে কারা কারা ফলতা, ডায়মন্ড হারবার তথা দক্ষিণ ২৪ পরগনায় অত্যাচার করেছেন, সব বার করব।’’ সেই সময় আবার আরজি কর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘‘বিনীত গোয়েল, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, অভিষেক গুপ্তদের কল রেকর্ড, চ্যাট যখন তদন্তকারীর সামনে আনবেন, সে দিন দেখতে পাবেন, আগের সরকারের কুকীর্তি। কত নীচে নেমেছিলেন!’’
মুখ্যমন্ত্রী কারও নাম না-করে জানান, তিনি অভিষেকের সম্পত্তি সংক্রান্ত নথি এবং তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তারও তদন্ত হবে। তাঁর কথায়, ‘‘মাননীয় ভাইপোবাবু, কাল প্রপার্টির লিস্ট আনালাম কলকাতা কর্পোরেশন থেকে। আপনার লিপস্ অ্যান্ড বাউন্ডসে্র ২৪টি প্রপার্টি (সম্পত্তি) কলকাতায়। আমতলায় (দক্ষিণ ২৪ পরগনা) প্রাসাদের মতো অফিস! …হিসাব হবে।’’ নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় বার বার আলোচনায় উঠে এসেছে ‘লিপস্ অ্যান্ড বাউন্ডস্’ নামক সংস্থাটি। ইডির অভিযোগ, ওই সংস্থার মাধ্যমে দুর্নীতির কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে কিংবা সাদা করা হয়েছে। বার বার সেই অভিযোগ নস্যাৎ করেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক। কয়েক বার ইডির তলবে হাজিরাও দিয়েছেন তিনি।আরজি করে ধর্ষণ এবং খুনের মামলায় ফের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তি নিয়েও হুঁশিয়ারি দিলেন তিনি। শনিবার মুখ্যমন্ত্রীর নির্ঘোষ, দুই ‘কাণ্ডেরই’ শেষ দেখে ছাড়বেন। তাঁর অভিযোগ, আরজি করে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ, খুনের ঘটনায় মূল অভিযুক্তদের আড়াল করার চেষ্টা করেছিল পূর্বতন সরকার। অন্য দিকে, তৃণমূল সরকারে থাকার সুবাদে হিসাব-বহির্ভূত সম্পত্তি বৃদ্ধি হয়েছে সাংসদ অভিষেকের। শুধু সম্পত্তি সংক্রান্ত অভিযোগ করে থেমে থাকেননি শুভেন্দু। অভিষেকের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আবহে সন্ত্রাস, পুলিশকে কাজে লাগিয়ে বিরোধীদের হয়রানির অভিযোগও করেছেন। বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর জায়গায় জায়গায় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগ করছেন অভিষেক। তার পাল্টা হিসাবে শুভেন্দুর মন্তব্য, ‘‘কত জন ঘরছাড়া আছে দেখান আমাকে।’’ শুক্রবার বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাক্যালাপ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘আমরা বলি না, চার তারিখ ফলঘোষণার দিন দুপুর ১২টার পর ডিজে বাজবে। আমাদের রাজ্য সভাপতি বলেন, ‘অভিনন্দন যাত্রা করুন। অনিচ্ছুকের গায়ে আবির দেবেন না।’ এটাই বিজেপি।’’ অভিষেককে উদ্দেশ্য করে শুভেন্দু এ-ও বলেন, ‘‘আপনারা কী করেছেন আমরা জানি না? পুলিশকে ব্যবহার করে ২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর আমার সভায় আসা লোকগুলোকে কী ভাবে মেরেছিলেন! আমি ভুলিনি।’’ শ্লেষের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, ‘‘পৃথিবীটা গোল। চিরদিনই কাহারো সমান নাহি যায়। ভুলব কী করে এগুলো! মানুষ তো শুধু চেয়ারে বসিয়ে দেয়নি। মানুষ বিচার চেয়েছে। এটা শুধু নামের বদল নয়, রঙের বদল নয়, এটা দ্বিতীয় স্বাধীনতা বাংলার, গোটা বাংলা নাচছে।’’
অভিষেক-ঘনিষ্ঠ ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, গত ১০ বছর ফলতার মানুষজন লোকসভা, বিধানসভা এবং পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এ বার তার হিসাব হবে। তাঁর কথায়, ‘‘ফলতায় আসার পথে কুড়ি জায়গায় দাঁড়িয়েছি। একটাই প্রশ্ন ছিল আমার। কত দিন ভোট দিতে পারেননি? সকলে বলল, ‘ভাইপো যত দিন এসেছে তত দিন ভোট দিতে পারিনি।’’’ শুভেন্দুর ব্যাখ্যা, ফলতার নির্বাচন নিছক বিধায়ক নির্বাচিত করার জন্য নয়, সংবিধান অনুযায়ী ভোটাধিকার প্রয়োগের সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা। তিনি সেখানকার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গিরের উদ্দেশে জানান, ২০২১ সালে ভোট-পরবর্তী হিংসায় ১৯ জনকে ‘নটোরিয়াস ক্রিমিনাল’ (কুখ্যাত অপরাধী) বলে ঘোষণা করেছিল মানবাধিকার কমিশন। তার মধ্যে জাহাঙ্গির ছিলেন। ভোট মিটলে তাঁর ‘ব্যবস্থা’ করার দায়িত্ব তিনি নিচ্ছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘পুলিশকে বলেছি, কাল থেকে খাতা-পেন নিয়ে বসুন। গত ৫ বছর বা তারও আগে যত অত্যাচার হয়েছে, অভিযোগ করতে এলে নিতে হবে। এফআইআর করতে হবে। কোনও গুন্ডা বাড়িতে থাকবে না। পুলিশকে বলেছি, প্রধানমন্ত্রী আবাসের বাড়ি, আমফানের টাকা, কৃষকবন্ধু, বার্ধক্যভাতা, ১০০ দিনের কাজ— ঘুষ যদি নিয়ে থাকে সেই পঞ্চুবাবুদের জেলে ঢোকাবেন। মহিলাদের উপর শারীরিক নির্যাতনকারীরা যদি এখনও জয় বাংলা বলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাদেরও ছাড়া হবে না।’’
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভায় পুনর্নির্বাচনের বাকি আর পাঁচ দিন। শনিবার সেখানে সভা করলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডাকে এক লক্ষ ভোটের ব্যবধানে জেতানোর আবেদনের পাশাপাশি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানকে তোপ দাগলেন তিনি। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘ভোট শেষ হোক। ওর ব্যবস্থা করব। সেই দায়িত্ব আমার।’’ অভিষেক-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত জাহাঙ্গির গত কয়েক বছরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান নাম হয়ে উঠেছেন। বিধানসভা ভোটে ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মা ‘বনাম’ তৃণমূল প্রার্থীর ঠান্ডা লড়াই প্রত্যক্ষ করেছে রাজ্য। এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট অজয়পাল উত্তরপ্রদেশের আইপিএস। পুলিশকর্তা হিসাবে তাঁর ইমেজের জন্য বড়পর্দার চরিত্র ‘সিংহম’-এর সঙ্গে তাঁকে তুলনা করা হয় আদিত্যনাথের রাজ্যে। সেই অজয়পালের উদ্দেশে জাহাঙ্গির বলেছিলেন, ‘‘উনি সিংহম হলেও আমিও পুষ্পা… ঝুঁকেগা নহি।’’
ভোট মিটে যাওয়ার পর বিরোধীরা অভিযোগ করেন, ফলতা বিধানসভার বেশ কয়েকটি বুথে সুষ্ঠু ভোট হয়নি। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। আগামী ২১ মে আবার ফলতায় ভোট। বিজেপি প্রার্থীর সমর্থনে শনিবার সেই ফলতাতেই সভা করেন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, ২০২১ সালে ভোট-পরবর্তী হিংসায় ১৯ জনকে ‘নটোরিয়াস ক্রিমিনাল’ ঘোষণা করেছিল মানবাধিকার কমিশন। তার মধ্যে জাহাঙ্গির এক জন। তিনি কটাক্ষ করে সভা থেকে বলেন, ‘‘ওই ডাকাতটা কোথায়, পুষ্পা না কী যেন নাম! যত অভিযোগ করেছে সাধারণ নির্বাচনের সময়, সবগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে। গুন্ডামি করতে দেব না। নিশ্চিন্ত থাকুন। সাদা থান বাড়িতে ফেলতে দেখব না।’’ বিজেপি যখন বিরোধীর আসনে ছিল, তাদের অভিযোগ ছিল, ফলতা তথা ডায়মন্ড হারবার লোকসভায় জাহাঙ্গিরের নেতৃত্বেই সন্ত্রাস-মারামারি, তোলাবাজি, জোর করে বুথ দখলের বহু ঘটনা ঘটে। বিরোধী রাজনীতি করা লোকজন তো বটেই, বহু সাধারণ মানুষ নাকি জাহাঙ্গিরের দাপটে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। জাহাঙ্গির অবশ্য সমস্ত অভিযোগ নস্যাৎ করেছেন। শুধু ফলতা থেকে ডায়মন্ড হারবার লোকসভার তৃণমূল প্রার্থীকে দেড় লক্ষ লিড দেওয়ার প্রধান চরিত্র শুক্রবার দলীয় কার্যালয় খুলে জানিয়েছেন ভোটের জন্য তিনি প্রস্তুত। জাহাঙ্গিরের দাবি, তৃণমূল আমলে সমগ্র ফলতায় তিনি কী কাজ করেছেন, সেই জবাব সর্বসাধারণ দেবে।





