পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনের উপর কড়া নজরদারি ও কঠোর নির্দেশ জারি করল নির্বাচন কমিশন। মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের দফতর থেকে জারি হওয়া দুটি পৃথক নির্দেশিকায় থানার ওসি থেকে শুরু করে সাব-ডিভিশনাল ডিএসপি সব স্তরের পুলিশ আধিকারিকদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য স্পষ্টভাবে বেঁধে দিল কমিশন। তাৎপর্যপূর্ণ হল, কমিশন এই পদক্ষেপ করল বাসন্তী থানার আইসি অভিজিৎ পালকে সাসপেন্ড করার পর পরই। অর্থাৎ থানার ওসি ও ডিএসপিদের উদ্দেশে বার্তাটি স্পষ্ট, কপি বুক মেনে চলুন, নইলে অভিজিতের মতই অবস্থা হতে পারে। বাসন্তীতে বিজেপি কর্মীদের উপর হামলা হয়। বাঁশ দিয়ে পেটানোর ভিডিও ফুটেজও ভাইরাল হয়েছে। তার পরই এদিন নির্বাচন কমিশন শুধু বাসন্তীর আইসি-কে সাসপেন্ড করেনি, তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তেরও নির্দেশ দিয়েছে। যা ওই অফিসারের সার্ভিস বুকে থেকে যাবে। কমিশনের এই পদক্ষেপে ইতিমধ্যেই আন্দোলিত রাজ্য পুলিশ। তারই মধ্যে এদিন রাতে পর পর দুই বিজ্ঞপ্তিতে কমিশনের হুঁশিয়ারি যথেষ্ট অর্থবহ বলে মনে করা হচ্ছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নির্বাচন চলাকালীন কোনওরকম শিথিলতা বরদাস্ত করা হবে না। পূর্ববর্তী নির্বাচনের সময়ে নথিভুক্ত সমস্ত অপরাধমূলক মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পূর্ণ করতে হবে। পাশাপাশি সমস্ত জামিন অযোগ্য ওয়ারেন্ট কার্যকর করতে হবে এবং কোনও ওয়ারেন্ট ১০ দিনের বেশি ঝুলে থাকতে দেওয়া যাবে না। পলাতক আসামি ও ঘোষিত অপরাধীদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, সম্ভাব্য দুষ্কৃতী, রাজনৈতিক সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করে আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার উপরও জোর দিয়েছে কমিশন। রাজনৈতিক দলগুলির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের অতীত ইতিহাস খতিয়ে দেখে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। একইসঙ্গে অবৈধ মদ বা অন্য বেআইনি কার্যকলাপ রুখতে গোয়েন্দা তথ্য ভাগ করে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারের সময় প্রার্থীদের নিরাপত্তা, জনসভা, রোড শো, স্ট্রিট কর্নার সভাগুলিতে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হোটেল, লজ, ধর্মশালা ইত্যাদিতে নিয়মিত তল্লাশি চালিয়ে অপরাধী বা অসামাজিক উপাদানদের উপস্থিতি রুখতে বলা হয়েছে। রাজ্য ও আন্তঃজেলা সীমানায় ‘নাকা’ চেকিং ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হবে এবং সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও সংযোগপথে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েনের কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে সাব-ডিভিশনাল ডিএসপি-দের উদ্দেশ্যে পাঠানো নির্দেশিকায় তদন্তের কাজ দ্রুত শেষ করে চার্জশিট জমা দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। পলাতক আসামিদের ধরতে লুক আউট নোটিস জারি, প্যারোল জাম্পারদের তালিকা তৈরি এবং গ্রেফতারের চেষ্টা চালানোর কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে পার্শ্ববর্তী জেলা ও মহকুমার সঙ্গে সমন্বয় রেখে নিয়মিত বৈঠক করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদানপ্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুটি চিঠিতেই বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা সমস্ত আধিকারিক কার্যত নির্বাচন কমিশনের অধীনস্থ। গণপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১-এর ধারা ২৮এ অনুযায়ী তাঁদের উপর কমিশনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকবে। দায়িত্বে গাফিলতি বা অসদাচরণ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে কমিশন। ভোটের আগে কোনওরকম ঝুঁকি নিতে নারাজ নির্বাচন কমিশন। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ প্রশাসনের প্রতিটি স্তরকে সক্রিয় ও জবাবদিহির আওতায় এনে একটি কড়া ও শৃঙ্খলাবদ্ধ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করার লক্ষ্যেই এই নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
ভোটের ময়দানে অশান্তি রুখতে এবার প্রযুক্তিতেই আস্থা রাখছে নির্বাচন কমিশন। গত কয়েক বছরে নির্বাচনের কাজে ব্যবহৃত গাড়ি এবং চালকদের ওপর হামলার ঘটনা বারবার সামনে এসেছে। সেই অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই এবার প্রতিটি নির্বাচনী গাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা বসালো কমিশন। পাশাপাশি, ক্যুইক রেসপন্স টিমের গাড়ির মাথাতেও থাকবে অত্যাধুনিক ‘প্যান টিল্ট জুম’ বা পিটিজেড ক্যামেরা। জিপিএস প্রযুক্তির সাহায্যে এই সমস্ত গাড়ির গতিবিধি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা হবে কমিশনের কন্ট্রোল রুম থেকে। সুরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্যামেরা সাধারণ সিসিটিভির চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী। যেমন নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরতে পারে (প্যান), তেমনই ওপর-নীচে নড়াচড়া করতে পারে (টিল্ট) এবং বহুদূরের দৃশ্যকেও নিখুঁতভাবে বড় করে (জুম) দেখাতে সক্ষম। নির্বাচনের আগেই এই ক্যামেরাগুলিকে বিশেষভাবে প্রোগ্রামিং করে রাখা হবে। গাড়ির ভেতরেই থাকবে এই ক্যামেরার কন্ট্রোলার, যার মাধ্যমে সেটিকে অপারেট করা যাবে। তবে সবথেকে বড় সুবিধা হল এর ‘মাল্টি ভিউ’ ফিচার। অর্থাৎ, গাড়িতে লাগানো একটি ক্যামেরার দৃশ্য একই সঙ্গে জেলা বা রাজ্যের বিভিন্ন কন্ট্রোল রুম থেকে দেখা যাবে। এমনকি নির্দিষ্ট মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেও নজরদারি চালাতে পারবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা। কমিশন সূত্রে খবর, কোনও এলাকায় গোলমাল শুরু হলে এই ক্যামেরার মাধ্যমে জনতাকে খুব সহজেই চিহ্নিত করা যাবে। এমনকি ‘ম্যান টু ম্যান মার্কিং’ করে দুষ্কৃতীদের মুখও শনাক্ত করা সম্ভব হবে। গাড়ির ওপর হামলা হলে বা কোথাও জমায়েত দেখলে তৎক্ষণাৎ ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ করবে এই পিটিজেড ক্যামেরা। পুলিশ ও প্রশাসনের নোডাল অফিসারদের আগেই এই নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নির্দেশিকা পাঠিয়ে দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। ছাব্বিশের নির্বাচনে বুথের ভেতরের পাশাপাশি বাইরের রাস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ‘চলন্ত সিসিটিভি’ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার।





