লিয়োনেল মেসির ভারত সফরের আয়োজক শতদ্রু দত্তকে অন্তর্বর্তী জামিন দিল বিধাননগর আদালত। ১০ হাজার টাকা বন্ডের বিনিময়ে সোমবার তাঁকে অন্তর্বর্তী জামিন দেওয়া হয়েছে। শতদ্রুর আইনজীবীর সওয়াল ছিল, মামলার এই পর্যায়ে অগ্রগতি কিছু নেই। তা হলে শতদ্রুকে হেফাজতে রাখার কী প্রয়োজন। সরকারি আইনজীবী জামিনের বিরোধিতা করেছিলেন। শেষপর্যন্ত শতদ্রুর আইনজীবীর সেই আর্জি মঞ্জুর করা হয়েছে। লিয়োনেল মেসির সফর ঘিরে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গত ১৩ ডিসেম্বর মেসির ভারত সফরের আয়োজক শতদ্রুকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। শতদ্রুর আইনজীবী সোমবার আদালতে সওয়াল করে জানান, তাঁর মক্কেলকে জেলে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। যুবভারতীতে ক্ষয়ক্ষতির মামলায় বাকিদের জামিন দেওয়া হয়েছে, তা হলে শতদ্রুকে কেন দেওয়া হবে না? আইনজীবীর আরও সওয়াল, মামলার এই পর্যায়ে অগ্রগতি কিছু নেই। তাঁকে শতদ্রুকে হেফাজতে রাখার কি প্রয়োজন? তার পরেই জামিন মঞ্জুর করেছেন বিচারক। পাল্টা সরকারি আইনজীবী আদালতে দাবি করেন, সাক্ষীদের ভয় দেখানো হচ্ছে। যুবভারতীর মাঠে মেসিকে দেখতে হাজার হাজার টাকার টিকিট কেটেছিলেন দর্শকেরা। কিন্তু অনুষ্ঠানের পুরো সময়টায় ফুটবল তারকাকে ঘিরে ছিলেন আয়োজক এবং রাজ্যের নেতা-মন্ত্রীরা। দর্শকাসন থেকে তাঁকে দেখতে পাননি অনুগামীরা। এর পরে মেসি মাঠ থেকে বেরিয়ে গেলে ক্রোধে ফেটে পড়েন দর্শকেরা। তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। মাঠে ভাঙচুর করা হয় চেয়ার। ওই দিনই বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয় শতদ্রুকে। দুটি মামলা দায়ের করে ঘটনার তদন্ত শুরু করে পুলিশ। বিধাননগর দক্ষিণ থানায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করা হয়। অশান্তি, ভাঙচুর, হিংসা ছড়ানো সহ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৯২, ৩২৪ (৪)(৫), ৩২৬ (৫), ১৩২, ১২১ (২), ৪৫, ৪৬ এবং নাশকতামূলক কার্যকলাপ ছড়ানোর ও জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত অভিযোগে এই মামলা দায়ের করা হয়। পাশাপাশি শতদ্রুর রিষড়ার বাড়িতে তল্লাশি চালায় বিধাননগর দক্ষিণ থানার পুলিশ। তল্লাশির পরই ব্যাঙ্ক ও নানা লেনদেন সংক্রান্ত হিসাব খতিয়ে দেখেন সিটের আধিকারিকরা। তারপরই শতদ্রুর ২২ কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়। যুবভারতীতে মেসির গায়ে কার্যত লেপ্টে থাকার অভিযোগ উঠেছিল রাজ্যের তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার তদন্ত শুরু হওয়ার পরে প্রবল সমালোচনার মুখে তিনি ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে ‘অব্যাহতি’ পান। প্রভাবশালীদের ভিড়ে এক সময় মাঠে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে গিয়েছিল। অভিযোগ, মেসির সতীর্থ লুইস সুয়ারেজ়ের পেটে কারও কনুইয়ের গুঁতো লাগে। কারও নখের ঘায়ে ছড়ে যায় রদ্রিগো ডি’পলের হাত। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে মেসির নিরাপত্তারক্ষীরাই তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। তার পরে শুরু হয় স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তাণ্ডব। ক্রুদ্ধ দর্শকেরা মাঠে ঢুকে পড়েন। বিধাননগর দক্ষিণ থানায় ওই ঘটনা নিয়ে দু’টি পৃথক মামলা হয়েছিল। প্রথম মামলায় একমাত্র গ্রেফতার শতদ্রু। দ্বিতীয় মামলায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আরও কয়েক জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আদালতে শতদ্রুর জামিনের বিরোধিতা করে পুলিশ জানিয়েছিল, প্রায় ৩৫ হাজার দর্শক মেসিকে দেখবেন বলে টিকিট কেটেছিলেন। ১৯ কোটি টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছিল। জামিন পেলে শতদ্রু প্রভাব খাটিয়ে পালিয়ে যেতে পারেন বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল পুলিশ। এর আগে তাঁর জামিনের আর্জি খারিজ হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে সোমবার জামিন পেলেন।
এদিকে, লেকটাউনে ফুটবলার মেসি, মারাদোনার মূর্তি বসেছে কোন জমিতে? রাজ্যের কাছে রিপোর্ট চাইল কলকাতা হাই কোর্ট। লেকটাউনে শুধু ফুটবল তারকা লিয়োনেল মেসি নয়, দিয়েগো মারাদোনার মূর্তিও রয়েছে! এই মূর্তিগুলি কি সরকারি জমির উপর বসানো হয়েছে? প্রশ্ন উঠতেই রিপোর্ট তলব করল কলকাতা হাই কোর্ট। দমদম পুরসভা এবং রাজ্য সরকারকে তিন সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ। কলকাতার লেকটাউনে মেসির ৭০ ফুট দীর্ঘ মূর্তি বসানো হয়। কলকাতা সফরের সময় সেই মূর্তি মেসির হাত দিয়েই উন্মোচন করান রাজ্যের মন্ত্রী সুজিত বসু। তবে সেই মূর্তি কার জমিতে বসানো হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি গড়ায় কলকাতা হাই কোর্টে। মামলাকারী স্বদেশ মজুমদারের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে সরকারি জমিতে কোনও মূর্তি বসানো যায় না। আদালতে মামলাকারী দাবি করেন, লেকটাউনে মেসি এবং মারাদোনার মূর্তিগুলি সরকারি জমিতে বসানো হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মামলাকারীর বক্তব্যের পরই প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ দমদম পুরসভা এবং রাজ্য সরকারের থেকে রিপোর্ট তলব করল। তিন সপ্তাহের মধ্যে সেই রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। ২০১৭ সালে লেকটাউনের শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব প্রাঙ্গণে মারাদোনার মূর্তি উদ্বোধন হয়। গত বছর ডিসেম্বরের মেসির মূর্তি উন্মোচন হয় ওই লেকটাউনেই। এই বিষয়েই আদালত জানতে চাইল, সরকারি জমিতে ওই মূর্তিগুলি বসানো হয়েছে কি না! সম্প্রতি মেসির কলকাতা সফরকে কেন্দ্র করে যুবভারতীতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। মেসিকে দেখতে হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটে সল্টলেক স্টেডিয়ামে যান তাঁর ভক্তেরা। কিন্তু মেসি মাত্র ১৬ মিনিট মাঠে ছিলেন। চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার কারণে নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। অভিযোগ, এক মুহূর্তের জন্যেও মেসিকে দেখা যায়নি গ্যালারি থেকে। এর পরেই ক্রোধে উন্মত্ত জনতা তাণ্ডব চালায় স্টেডিয়াম জুড়ে। মাঠে ছোড়া হয় বোতল, ভাঙা চেয়ার। যুবভারতীকাণ্ড নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা হয়েছিল। সেই মামলার শুনানিতেও লেকটাউনে মেসির মূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।





