বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লিগের তৃণমূল স্তরের কর্মী-সমর্থকদের পরামর্শ মেনে তিনি দলে কিছু মৌলিক পরিবর্তন করবেন। বাংলাদেশের সব জায়গা থেকে একটি নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব উঠে আসা দরকার। শুধু ঢাকার অভিজাত মহল নয়, বরং প্রতিটি জেলার এমন কণ্ঠস্বর, যারা স্থানীয় বাস্তবতা বোঝে। নতুন নেতৃত্বের দাবি যৌক্তিক। তিনি বলেছেন, তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও যদি সামনের সারিতে আসতে চায়, তাহলে তাঁদেরও যোগ্যতা প্রমাণ করেই আসতে হবে। যোগ্যতার অন্যতম মানদণ্ড হবে দলের নীতির সঙ্গে আপস না করে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পথ চলা। নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশকে রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত বলে উল্লেখ করেছেন হাসিনা। গত বছর ৫ অগস্ট অল্প সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারত সরকার যেভাবে তাঁকে ভারতে আশ্রয় দিয়েছে সে জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভূয়সী প্রশংসা করে হাসিনা বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদীর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল সহমর্মিতা ও প্রজ্ঞার প্রতিফলন। তিনি বুঝেছিলেন যে এটি শুধু বিপদে পড়া এক প্রতিবেশীকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয় নয়, বরং আমাদের দুই দেশের অভিন্ন গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিকে সমর্থন করার বিষয়ও। তার এই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে ভারত চরমপন্থী শক্তিকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নতুনভাবে গড়ে তুলতে দেবে না।
হাসিনা বলেন, আওয়ামী লিগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া মানে বাংলাদেশের জনগণকে সত্যিকারের বৈধ সরকার নির্বাচনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা। ভোটে অংশ নিতে দিলে আওয়ামী লিগ ভোটের সিংহভাগ জিতবে বলে দাবি করেন হাসিনা। প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে বলে দেয়, তিনি কী রকম এক অসম্ভব অবস্থার মধ্যে পড়েছিলেন। গত ষোলো মাস ধরে তিনি অসহায়ভাবে দেখেছেন, কীভাবে আমরা যে সবকিছু গড়ে তুলেছিলাম, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা সবই ধ্বংস করে দিয়েছেন ইউনুস। একজন প্রকৃত নেতা পুরো দেশের কল্যাণে শাসন করেন, এমনকি যারা তাঁর মতের সঙ্গে একমত নন, তাঁদেরও অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু ইউনূস দেশ পরিচালনার দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়ার বদলে কয়েকজন চরমপন্থীকে তুষ্ট করতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। আমাকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করে যে প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনই এখন বাংলাদেশের শেষ সাংবিধানিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত নেতা। ইউনুস পরিকল্পিতভাবে সংবিধানের আওতায় তাঁর ক্ষমতার ওপর নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণ রাখতে সক্ষম প্রতিটি কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতিকে জনতার ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে পদচ্যুত করা হয়েছে, ঊর্ধ্বতন বিচারকরা হুমকির মুখে পদত্যাগ করেছেন, আর এখন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট নিজেকেও সরে যেতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এগুলো সবই একটি অনির্বাচিত শাসনব্যবস্থার অধীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেঙে পড়ার লক্ষণ যে শাসন আমাদের সংবিধানকে পরিত্যাগ করেছে। এখন এগিয়ে যাওয়ার সর্বোত্তম পথ হলো মুক্ত, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণকে নিজেদের নেতা বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া, যেখানে সব রাজনৈতিক দল অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বাংলাদেশের জনগণ গৃহযুদ্ধ চায় না, তারা চায় তাদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হোক। কিন্তু ইউনুস সরকারের দ্বারা উৎসাহিত কয়েকজন চরমপন্থীর অস্তিত্ব উপেক্ষা করা কঠিন, যারা নৈরাজ্য সৃষ্টিতে মরিয়া। এরা সেই একই গোষ্ঠী, যারা বর্তমানে সংবাদপত্রের অফিসে আগুন দিচ্ছে এবং গণতন্ত্র ফিরে আসতে দেখতে চাওয়া সাধারণ নাগরিকদের হুমকি দিচ্ছে। ইউনুস আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে দেশে অস্থিতিশীলতা করার অভিযোগ তুলছেন, অথচ তাঁর নিজের সরকার বিরোধী দলগুলিকে নিষিদ্ধ করেছে, মিথ্যা অভিযোগে শত শত মানুষকে আটক করেছে, এবং সংখ্যালঘু ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রতিদিনের হিংসার সাক্ষী হয়ে আছে। এই বলির পাঁঠা বানানোর কৌশল সফল হবে না। সাধারণ বাংলাদেশিরা আওয়ামী লিগের নেতৃত্বে পনেরো বছরের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অগ্রগতির কথা মনে রাখে। তারা এই জাতির স্বাধীনতা অর্জনে আমাদের ভূমিকার কথাও স্মরণ করে। আমি আমার দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং এই বেদনাদায়ক সময়ের পর ২০২৪-এর ৫ আগস্টের অস্থিরতা, যে সময়ে আমি গভীর যন্ত্রণার সঙ্গে দেখেছি একসময়ের স্থিতিশীল একটি দেশ কীভাবে আইনহীনতার দিকে ধাবিত হচ্ছে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে দেশে ফিরে যেতে চাই।
আমাদের তৃণমূল স্তর থেকে যে বার্তাটি আসছে তা একেবারেই স্পষ্ট, এবং একটি দল হিসেবে আমরা তা শুনছি। এই সংকট আমাদের সামনে তুলে ধরেছে কোথায় মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। কিছু নেতা যাদের সেবা করার কথা ছিল, তাঁরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছেন। আবার কেউ কেউ বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা বিশেষ করে তরুণদের মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন; সুযোগ সৃষ্টি করা সত্ত্বেও তাঁরা অনুভব করেছে যে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হচ্ছে না। সংস্কার শুধু প্রয়োজনীয়ই নয়, তা অনেক আগেই করা উচিত ছিল। আমাদের এমন নেতা দরকার, যাঁরা ঐতিহ্যবাহী সংগঠন গড়ে তোলার কৌশল যেমন বোঝেন, তেমনি আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও আয়ত্তে রাখেন, যাঁরা মাঠে কাজ করা শ্রমিকদের সঙ্গে যেমন সংযোগ স্থাপন করতে পারেন, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও কথা বলতে পারেন। যে দল আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলেছে, তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে নীতির সঙ্গে আপস না করেই সে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এর অর্থ হলো শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নিশ্চিত করা যে আমাদের স্থানীয় নেটওয়ার্কগুলো শুধু ভোট সংগ্রহের যন্ত্র না হয়ে মানুষের উদ্বেগ ও দাবি নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রকৃত মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
আওয়ামী লীগ কখনই শুধু আমার পরিবারের দল নয়। এটি সেই লক্ষ লক্ষ সাধারণ বাংলাদেশির দল, যারা আমাদের সমর্থন করে এবং যাদের স্বার্থ আমরা প্রতিনিধিত্ব করি। সজীব বা সাইমা যদি আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন, তা হবে যোগ্যতা ও দলের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, বাংলাদেশের সব জায়গা থেকে একটি নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব উঠে আসা দরকার। শুধু ঢাকার অভিজাত মহল নয়, বরং প্রতিটি জেলার এমন কণ্ঠস্বর, যাঁরা স্থানীয় বাস্তবতা বোঝে। নতুন নেতৃত্বের দাবি যৌক্তিক। একই মুখ নিয়ে ফিরে এসে ভিন্ন ফল আশা করা যায় না। দলের এমন নেতা প্রয়োজন যারা প্রজন্মগত বিভাজন ঘোচাতে সক্ষম, যারা বোঝেন যে আজকের শাসনব্যবস্থায় মাঠপর্যায়ের সংগঠন যেমন জরুরি, তেমনি ডিজিটাল যোগাযোগও অপরিহার্য। এই রূপান্তর ঘটতে হবে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের মাধ্যমে, যেখানে আমাদের সমর্থকরা সত্যিকার অর্থে তাদের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে সর্বসম্মত সমর্থন প্রমাণ করে যে বিষয়টি এখানে আসলে সকলের ভাবনার মধ্যে রয়েছে শুধু ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও। এটি দলীয় রাজনীতির বিষয় নয়; এটি চরমপন্থার বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্ন। এই অসাধারণ সংহতির প্রকাশের জন্য আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রী মোদীর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল সহমর্মিতা ও প্রজ্ঞার প্রতিফলন। তিনি বুঝেছিলেন যে এটি শুধু বিপদে পড়া এক প্রতিবেশীকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয় নয়, বরং আমাদের দুই দেশের অভিন্ন গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিকে সমর্থন করার বিষয়ও। তাঁর এই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে ভারত চরমপন্থী শক্তিকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নতুনভাবে গড়ে তুলতে দেবে না। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে একটি মুহূর্ত হিসেবে, যখন সম্ভাব্য জটিলতা সত্ত্বেও ভারত দৃঢ়ভাবে সঠিক পক্ষেই দাঁড়িয়েছিল।
ভারত সব সময়ই বাংলাদেশের পাশে থেকেছে এবং আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে তারা ইউনুস শাসনামলে ক্রমবর্ধমান মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের নিন্দা করেছে। বর্তমানে তারা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে, কীভাবে বাংলাদেশ আইনশৃঙ্খলাহীনতার দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং কীভাবে কঠোর ও দমনমূলক আইনের মাধ্যমে আওয়ামী লিগকে দমিয়ে রাখা হচ্ছে। তবে ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল নয়, এবং একজন প্রতিবেশী ও মিত্র হিসেবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে নয়, নিজেদের ভূমিকার প্রতি ভারতের এই শ্রদ্ধাশীল অবস্থানকে আমি সম্মান করি। প্রযুক্তি আমাদের মানুষের সঙ্গে সংযোগের ধরন সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করেছে। প্রতিদিনই আমি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলি, যাঁরা হয়রানির মুখোমুখি, অর্থনৈতিক কষ্টে জর্জরিত পরিবার এবং যাঁরা পরিবর্তনের জন্য আগ্রহী তরুণ। ভৌত দূরত্ব এই সম্পর্ককে হ্রাস করেনি; বরং এটি আরও শক্তিশালী করেছে। এই ভার্চুয়াল উপস্থিতি আমাদের অঞ্চলের রাজনীতিতে অভূতপূর্ব, কিন্তু এটি একটি বড় সত্যকে প্রতিফলিত করে যে বৈধতা মানুষের মূল্যবোধ থেকে আসে, সরকারের অফিস নিয়ন্ত্রণ করা থেকে নয়। ইউনুস ঢাকার ক্ষমতা দখল করে থাকতে পারেন, কিন্তু তিনি আমাদের সেই স্থান দখল করতে পারেন না যা, আমরা লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির মানসপটে অবস্থান করে করি। প্রতিটি আহ্বান, প্রতিটি বার্তা, প্রতিটি ভার্চুয়াল বৈঠক নিশ্চিত করে যে আমরা সংযুক্ত, সমন্বিত, এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছি। আমি প্রতিদিন যে কথোপকথন করি তা কোনও সন্দেহ রাখে না, যদি বাংলাদেশের ভোটারদের কাছে সত্যিকারের বিকল্প দেওয়া হয়, আওয়ামী লিগ ভোটের বড় অংশ জিতবে। কোন দল নির্বাচন জিতবে তা নিয়ে এখনই কোনও পূর্বাভাস দেওয়া ঠিক হবে না। তবে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, আওয়ামী লিগ আমাদের দেশের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সরকারে হোক বা বিরোধী দলে, আমাদের দেশের আলোচনার অংশ হওয়া উচিত। আমাদের নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া মানে বাংলাদেশের জনগণকে সত্যিকারের বৈধ সরকার নির্বাচনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা।





