শতদ্রুর আইনজীবী দাবি করেছেন, তাঁর মক্কেল মেসিকে রাজ্যে নিয়ে এসেছিলেন একটি ‘মহৎ’ উদ্দেশ্যে। বাংলার খুদে ফুটবলারেরা যাতে তাঁর থেকে শিখতে পারেন, সেটাই ছিল উদ্দেশ্য। তিনি কোনও সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করেননি। মাঠে কী হয়েছে, সেই দায় তাঁর নয়। রবিবার সকালে বিধাননগর মহকুমা আদালতে দাঁড়িয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে এমনই দাবি করলেন কলকাতায় লিওনেল মেসির অনুষ্ঠানের আয়োজক শতদ্রু দত্ত। নিজের মক্কেলের জামিনের আবেদনও করেন আইনজীবী। সরকারি আইনজীবী পাল্টা সওয়াল করে জানান, মেসির সামনে কে যাবেন, কে যাবেন না তাঁর দায়িত্ব ছিল আয়োজকেরই। কিন্তু সেখানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। এর পরেই শতদ্রুর জামিনের আবেদন খারিজ হয়েছে কোর্টে। ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানো হয়েছে শতদ্রুকে। বিমানবন্দরের সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয় শতদ্রুকে। রবিবার তাঁকে বিধাননগর মহকুমা আদালতে হাজির করানো হয়। সেখানেই শতদ্রু আইনজীবীর মাধ্যমে বলেন, ‘‘আমার অতীতে যা খ্যাতি ছিল, তা নষ্ট হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে একাধিক আইনের ধারা (পিডিপিপি, এমপিও) দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কে দোষ করেছে? আমি কোনও সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করিনি।’’ শতদ্রুর বিরুদ্ধে এমপিও (মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার) আইনে মামলা রুজু হয়েছে। আদালতে সেই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর আইনজীবী। তাঁর সওয়াল, ‘‘আমি কী করেছি, যে এই আইনে আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে?’’

শতদ্রু আইনজীবী দ্যুতিময় ভট্টাচার্যের মাধ্যমে আদালতে বলেন, ‘‘আমি এক জনকে নিয়ে এসেছি, যিনি শিক্ষা দেবেন। বাচ্চাদের দেখাবেন। স্টেডিয়ামে কী হয়েছে, তার জন্য আমার বিরুদ্ধে কেন মামলা হবে? ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজত কেন চাওয়া হচ্ছে?’’ জামিন যদি না হয়, তা হলে হেফাজতের দিন সংখ্যা কমানো হোক বলে আর্জি জানিয়েছেন। সরকারি আইনজীবী অমিতাভ লালা শতদ্রুর এই দাবি মানেননি। তিনি আদালতে সওয়াল করে বলেন, ‘‘তদন্তে উঠে এসেছে, অন্যদের সঙ্গেও একই কাজ করেছেন ধৃত। মেসির সামনে কে যাবেন, কে যাবেন না, তার দায়িত্ব আয়োজকেরই। তিনি নিজের লোকদের নিয়ে এমন ঘিরে ছিলেন, যে বাকি লোকেরা মেসিকে দেখতে পাননি।’’ শনিবার যুবভারতীর মাঠে মেসিকে দেখতে হাজার হাজার টাকার টিকিট কেটেছিলেন দর্শকেরা। কিন্তু অনুষ্ঠানের পুরো সময়টায় ফুটবল তারকাকে ঘিরে ছিলেন আয়োজক এবং রাজ্যের নেতা-মন্ত্রীরা। দর্শকাসন থেকে তাঁকে দেখতে পাননি অনুগামীরা। এর পরে মেসি মাঠ থেকে বেরিয়ে গেলে ক্রোধে ফেটে পড়েন দর্শকেরা। তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। সরকারি আইনজীবী রবিবার আদালতে সেই প্রসঙ্গও তুলেছেন। তিনি সওয়াল করে বলেন, ‘‘মেসি যখন মাঠে প্রবেশ করেন, তখন এ দিক থেকে ও দিকে যাওয়া-আসা করছিল লোকজন। দর্শকেরা মাঠ থেকে মেসিকে দেখতে পাননি।’’ সরকারি আইনজীবী ১০টি কারণে শতদ্রুকে পুলিশে হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানান। প্রমাণ সংগ্রহ, বয়ান নেওয়া-সহ একাধিক কারণে ধৃতকে হেফাজতে চেয়ে আদালতে আবেদন করেন সরকারি আইনজীবী। সেই আবেদন মঞ্জুর করেন বিচারক। আদালত কক্ষ থেকে বেরিয়ে শতদ্রুর আইনজীবী জানান, তিনি মক্কেলের জামিন চেয়ে আবেদন করেছিলেন। তাঁর মক্কেলকে ১৪ দিন হেফাজতে রাখার প্রয়োজন নেই বলেও জানিয়েছেন। কেন, সে কথাও জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘যে সব কারণে পুলিশ আমার মক্কেলকে হেফাজতে চেয়েছে, তার জন্য ১৪ দিন রাখার দরকার নেই। ঘটনাস্থলের কাছেই থাকবেন আমার মক্কেল।’’ আইনজীবীর প্রশ্ন, মাঠে কে কী করছেন, না করছেন, তার জন্য শতদ্রুর বিরুদ্ধে মামলা করা হবে কেন। ইভেন্ট ম্যানেজার এবং আয়োজকের কাজ এক নয়। তিনি এ-ও দাবি করেছেন, তাঁর মক্কেল মেসিকে রাজ্যে নিয়ে এসেছিলেন একটি ‘মহৎ’ উদ্দেশ্যে। বাংলার খুদে ফুটবলারেরা যাতে তাঁর থেকে শিখতে পারেন, সেটাই ছিল উদ্দেশ্য। তাঁর কথায়, ‘‘আমার মক্কেলকে ভিকটিমাইজ করা হয়েছে।’’ যুবভারতীতে শনিবার সকালে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল, তার দায় শতদ্রুর নয় বলেও দাবি করেছেন আইনজীবী। তিনি এই ব্যর্থতার দায় দর্শকদের উপরেই চাপিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘ব্যর্থতা আসলে মানুষের। সকলে জানেন, মেসি এক জন আন্তর্জাতিক তারকা। এটা ঠিক, অনেক টাকা দিয়ে টিকিট কেটে দর্শকেরা সেখানে গিয়েছিলেন। সকলে চাইছিলেন মেসির কাছে গিয়ে ছবি তুলতে, যাতে স্মৃতি হয়ে থাকে। কিন্তু পরিস্থিতি অনুযায়ী যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোতায়েন থাকে, তাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’’ তিনি আরও জানান, দর্শকদের একটা উন্মাদনা থাকে। তবে যা পরিস্থিতি হয়েছে, তা মানা যায় না। প্রশ্ন ওঠে, তবে কি যুবভারতীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলছেন তিনি? শতদ্রুর আইনজীবী বলেন, ‘‘যাঁরা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা জানবেন কী ব্যবস্থা ছিল। এখন কাউকে দায়ী বলাটা সম্ভব না। তদন্ত করে যেটা পাওয়া যাবে, জানতে পারবেন। বিষয়টি কোর্টে বিচারাধীন।’’ তিনি এ-ও জানিয়েছেন, কলকাতা থেকে মেসি হায়দরাবাদে গিয়েছেন। সেখানে কোনও সমস্যা হয়নি। ‘সুষ্ঠু ভাবে’ হয়েছে অনুষ্ঠান। এখানে যাঁরা ঘটনাস্থলে ছিলেন, তাঁদের কিছু ইতিবাচক-নেতিবাচক কাজেই এই বিশৃঙ্খলা হয়েছে। তবে কলকাতার ঘটনা নিয়ে তিনি এই পর্যায়ে আর কিছু বলতে চান না বলেই জানিয়েছেন আইনজীবী।

মেসি এসেছিলেন কলকাতায়। অপেক্ষা করেছিল গোটা শহর। তবে অপেক্ষার ছবি আর বাস্তব পরিস্থিতির ছবির যে ফারাক বিস্তর, স্পষ্ট হয়ে যায় শনিবার দুপুরেই। ১৩ ডিসেম্বর কলকাতায় যেন মেসি ম্যাসাকার ডে। চরম বিশৃঙ্খলা, তীব্র অশান্তি, অনুরাগী-সমর্থকদের ক্ষোভ। মাঝ-মাঠ থেকেই ফিরে যান মেসি। এসবের মাঝেই, শনিবার দুপুরেই বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মূল উদ্যোক্তা শতদ্র দত্তকে। রবিবার শতদ্রু দত্তকে তোলা হয় বিধাননগর মহকুমা আদালতে। সেখানে তাঁকে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূত্রের খবর তেমনটাই। শনিবারের চরম বিশৃঙ্খলার পর, দিনভর সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনরা উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রবিবারেও তাঁকে আদালতে তোলার সময় বহু মানুষের জমায়েত হয়। ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে তখনও। উদ্যোক্তা শতদ্রুর উদ্দেশে স্লোগান দেন অনেকেই। কলকাতার জন্য ঘটনাবহুল, ঘটনাবহুল মেসির জন্য এবং আরও বহু খেলোয়াড়, অনুরাগী, সমর্থকদের জন্য। শনিবার মেসির অনুষ্ঠান ঘিরে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন। পুলিশ-জনতা খণ্ডযুদ্ধ বাধে। ক্ষুব্ধ জনতা দখল নিয়ে নেয় যুবভারতীর। তাঁদের অভিযোগ ছিল, মেসিকে ঘিরে ছিলেন নেতা-মন্ত্রীরাও। আরও অভিযোগ, মেসি যুবভারতীতে পৌঁছোতেই অন্তত ৭০-৮০ জন মানুষের ভিড় ঘিরে ধরে তাঁকে। গ্যালারি থেকে তাঁকে দেখাই যায়নি। চড়া দামে টিকিট কেটেও মেসিকে দেখতে না পাওযায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে জনতা। পরিস্থিতি সামাল দিতে নামানো হয় ব়্যাফ। ছেঁড়া হয় মেসির পোস্টারও। ঘটনার পরেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ক্ষমা চান মেসি’র কাছে। শনিবার মমতা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে লেখেন, ‘আজ সল্টলেক স্টেডিয়ামে যে অব্যবস্থাপনা দেখা গিয়েছে, তাতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত ও হতবাক। যাঁরা তাঁদের প্রিয় ফুটবলার লিওনেল মেসিকে এক ঝলক দেখার জন্য জড়ো হয়েছিলেন, সেই সকল হাজার হাজার ক্রীড়াপ্রেমী ও ভক্তদের সঙ্গে অনুষ্ঠানটিতে যোগ দিতে স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছিলাম। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার জন্য আমি লিওনেল মেসি, সেইসাথে সকল ক্রীড়াপ্রেমী ও তাঁর ভক্তদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’ সঙ্গেই তিনি লেখেন, ‘আমি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীম কুমার রায়ের সভাপতিত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করছি, যার সদস্য হিসেবে থাকবেন মুখ্যসচিব এবং স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক বিভাগের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব। এই কমিটি ঘটনাটির বিস্তারিত তদন্ত করবে, এর জন্য দায়ী কে তা খতিয়ে দেখা হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুপারিশ করবে। আরও একবার, আমি সকল ক্রীড়াপ্রেমীর কাছে আমার আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’ ঘটনার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সামনে আসে রাজ্য পুলিশের ডিজি’র বক্তব্য। তিনি জানান, ‘মেসি খেলছেন না শুনে ভক্তদের মধ্যে ক্ষোভ বা উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। আয়োজকদেক পরিকল্পনা ছিল যে তিনি এখানে আসবেন, হাত নাড়বেন, নির্দিষ্ট কিছু লোকের সাথে দেখা করবেন এবং চলে যাবেন। এখন সরকার ইতিমধ্যেই একটি কমিটি গঠন করেছে, যা আয়োজকদের পক্ষ থেকে কোনও অব্যবস্থাপনা ছিল কি না বা অন্য কোনও কিছু ঘটেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। আয়োজকদের লিখিত অবস্থায় জানাতে হবে যে টিকিটের মূল্য ফেরত দেওয়া হবে। নইলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা ইতিমধ্যেই উদ্যোক্তাকে আটক করেছি।’ উদ্যোক্তাকে আটক, গ্রেপ্তারির পর, রবিবার ১৪দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠাল আদালত।



