কার্যত ফাঁকা গুয়াহাটি স্টেডিয়ামে ব্যাট করতে নামে ভারতীয় দল। তৃতীয় দিন চা পানের বিরতিতে ভারত চার উইকেট হারিয়ে ফেলেছে। বোর্ডে উঠেছে মাত্র ১০২ রান। রাহুলের আউট দিয়ে শুরু হয় ভারতীয় ব্যাটারদের ড্রেসিংরুমে ফেরার পালা। ২২ রান করে আউট হন রাহুল। অর্ধশতরান করার পর ফিরে যান যশস্বীও (৫৮)। হার্মারের বলের বাউন্স বুঝতে না পেরে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। রান পাননি সাই সুদর্শনও (১৫)। তিনিও হার্মারের শিকার। ধ্রুব জুরেল কোনও রান না করেই ফেরেন। রবিবার থেকে শুরু করে সোমবার সকাল পর্যন্ত মন্থর গতিতে রান করছিলেন লোকেশ রাহুল। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁর ডিফেন্সে ফাটল ধরালেন কেশব মহারাজ। স্পিনের সঙ্গে অতিরিক্ত বাউন্স থাকা ডেলিভারি ব্যাটের কাণা ছুঁয়ে চলে যায় প্রথম স্লিপে। ২২ রান করে রাহুল হন আউট। তারপরেও অবশ্য খানিকটা আগ্রাসন ধরে রেখেছিলেন যশস্বী জয়সওয়াল। হাফসেঞ্চুরি আসে তরুণ তুর্কির ব্যাট থেকে। কিন্তু আবারও হার্মারের বলে উইকেট ছুড়ে দিয়ে আসেন ওপেনার। সাই সুদর্শন বা জুরেলও উইকেট ছুড়ে দিয়ে আসেন। দক্ষিণ আফ্রিকা যেখানে এই উইকেটে তুলেছে ৪৮৭, সেখানে ভারত নাকানিচোবিনি খাচ্ছে। যা পরিস্থিতি তাতে নিউজিল্যান্ডের পর ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছেও হোয়াইটওয়াশের দুঃস্বপ্ন তাড়া করতে শুরু করেছে টিম ইন্ডিয়াকে। আপাতত ক্রিজে রয়েছেন অধিনায়ক ঋষভ পন্থ এবং সহঅধিনায়ক রবীন্দ্র জাদেজা। মাঠে নেমেই ছক্কা হাঁকিয়েছেন পন্থ। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে শতরান করেন সেনুরান মুথুস্বামী। টেস্টে এটি তাঁর প্রথম শতরান। মারকাটারি ৯৩ করেন মার্কো জানসেন। ভারতীয় বোলারদের মধ্যে কুলদীপ পান চার উইকেট। দুটি করে উইকেট বুমরা, জাদেজা ও সিরাজের।
টেস্ট ব্যাটিংয়ের অ-আ-ক-খ ভুলে গিয়েছেন ভারতীয় ব্যাটারেরা। না আছে ডিফেন্স, না আছে ডিফেন্স করার মানসিকতা। প্রথম থেকেই চালিয়ে খেলার চেষ্টা। যতই পাটা উইকেট হোক, সেখানেও যে বোলারকে সম্মান করতে হয়, সেটা হয়তো ভুলে গিয়েছেন পন্থেরা। গাওস্করের মতো ব্যাটার বার বার বলেছেন, টেস্টে প্রথম ঘণ্টা বোলারকে দাও, পরের পাঁচ ঘণ্টা তোমার। সেই আপ্তবাক্যও মানছে না ভারত। তার ফলেই ভরাডুবি হচ্ছে। ১২২ রানের মধ্যে ভারতের সাত ব্যাটার আউট হয়েছেন। টপ ও মিডল অর্ডারের এই হাল হলে রান হবে কী ভাবে? ভারতীয় ব্যাটারেরা কী ভাবে আউট হলেন।
লোকেশ রাহুল পেস বোলারদের সামলাচ্ছিলেন। স্পিন আসতেই দাঁড়িয়ে পড়লেন। কেশব মহারাজের বল পিচে পড়ে সামান্য ঘুরল। ব্যাস! সামনের পায়ে ডিফেন্স করতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দিলেন। বল ভাল ছিল। কিন্তু রাহুলের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটারের উচিত ছিল তা সামলানো। পারলেন না রাহুল।
যশস্বী জয়সওয়াল একমাত্র যশস্বীকেই যা একটু সাবলীল দেখাচ্ছিল। সেই তিনিও সাইমন হারমারের বলের বাউন্সই সামলাতে পারলেন না। আর একটু দেরিতে খেললে ক্যাচ উঠত না। তাড়াতাড়ি শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন তিনি।
সাই সুদর্শন আইপিএলের রেকর্ড দেখে কাউকে টেস্ট খেলিয়া দিলে যা হয়, সুদর্শনের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। লাল বলের ক্রিকেটেও তিনি টি-টোয়েন্টির শট খেলেন। হারমারের একটি শর্ট পিচ বল তিনি মিড উইকেটে খেলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বল মাটিতে রাখতে পারেননি। হাওয়ায় খেলেন। ক্যাচ আউট হয়ে ফেরেন। যে তিন নম্বরে এক সময় রাহুল দ্রাবিড়, চেতেশ্বর পুজারারা খেলতেন, সেই তিন নম্বরকে হাসির খোরাক বানিয়ে ছেড়েছেন সুদর্শন।
ধ্রুব জুরেল ভারত ‘এ’ দলের হয়ে খেলা ও ভারতীয় দলের হয়ে খেলা যে এক নয়, সেটা হয়তো এখনও বুঝতে পারেননি জুরেল। এই সিরিজ়ে তাঁকে ব্যাটার হিসাবে খেলানো হয়েছে। দুই টেস্টের তিন ইনিংসেই ব্যর্থ তিনি। জানসেন তাঁর উচ্চতার জন্য বাকিদের থেকে বেশি বাউন্স পান। সেটা যাঁরা খেলা দেখছেন, তাঁরাও জানেন। জুরেল বোধহয় জানেন না। তিনি নামার পর বার বার বাউন্সার করছিলেন জানসেন। বার বার মারার চেষ্টাও করছিলেন জুরেল। ব্যাটে-বলে হচ্ছিল না। অফ স্টাম্পের বাইরের একটি বাউন্সারে অবশেষে ব্যাট লাগল। বল সামান্য হাওয়ায় উঠে ফিল্ডারের হাতে পড়ল। শূন্য রানে ফিরলেন জুরেল।
ঋষভ পন্থ ইডেনে হারের পর বলেছিলেন, অজুহাত দিতে চান না। ১২৪ রান করা উচিত ছিল। তাঁরা পারেননি। গুয়াহাটিতে তো তার প্রয়োজন ছিল না। ৪৮৯ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে দ্বিতীয় বলেই ছক্কা মারেন পন্থ। সকলে জানেন, তিনি এ ভাবেই খেলেন। কিন্তু এই টেস্টে তো দ্রুত রান করার প্রয়োজন ছিল না। প্রয়োজন ছিল উইকেটে পড়ে থাকার। পন্থ নতুন নন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁর। সেই তিনিই জানসেনের বলে উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে শট মারতে গেলেন। এটা তো টি-টোয়েন্টি চলছে না। কেন টেস্ট সবচেয়ে কঠিন ফরম্যাট, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন ভারতের ব্যাটারেরা। অধিনায়ক যে ভাবে উইকেট ছুড়ে দিলেন, তা ক্ষমার অযোগ্য।
নীতীশ কুমার রেড্ডি প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞেরা বার বার বলছেন, ভারতের মাটিতে টেস্টে নীতীশের কাজটা ঠিক কী? তার পরেও গম্ভীর তাঁকে খেলাচ্ছেন। আর নীতীশ বার বার প্রমাণ করছেন, বিশেষজ্ঞেরাই ঠিক। ভারতের উইকেটেও যিনি বলের বাউন্স সামলাতে পারেন না, তিনি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডে গেলে কী করবেন? কী ভাবে খেলবেন।
রবীন্দ্র জাদেজা পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাট করতে পারেন। গুয়াহাটিতে পারলেন না। জানসেনের বল ছাড়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বল ছাড়ার ন্যুনতম নিয়মও কি জানেন না তিনি? যে ভাবে ব্যাট উপরের দিকে রেখে তিনি বল ছাড়তে গেলেন তা দেখলে সুনীল গাওস্করের মতো ব্যাটার রেগে যাবেন। বল তাঁর কাঁধে লেগে তার পর ব্যাটে লেগে হাওয়ায় উঠল। আউট হলেন।
ইডেন টেস্টে সকলে পিচকে দোষারোপ করছিলেন। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, ভারতের উচিত ভাল পিচে খেলা। ভাল পিচ বলতে বোঝায়, যেখানে ব্যাটারেরাও রান পাবেন। গুয়াহাটিতে তেমনই উইকেট। অন্তত দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটারেরা সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন। এমন নয় যে, ভারত অন্য কোনও উইকেটে খেলছে। সেই একই উইকেট। তা হলে পন্থেরা কেন খেলতে পারছেন না? ইডেন টেস্টে হারের পর ভারতের দুই সহকারী কোচ সীতাংশু কোটাক ও রায়ান টেন দুশখাতেও পিচকে দায়ী না করে দলের ব্যাটারদের দায়ী করেছিলেন।




