Sunday, April 26, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ভারত ললনাদের সামনে নতজানু শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া!‌ আকাশ ছোঁয়ার স্পর্ধা!‌ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জেমিমা ইউ বিউটি

প্রবল পরাক্রমশালী অজিদের ঔদ্ধত্য চূর্ণ করার ইনিংস চাক্ষুষ করেছে গোটা ক্রিকেট বিশ্ব। ২০১৭ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের দৃশ্য। ভারতীয় দল জেতা ম্যাচ মাঠে ফেলে এসে ভারতে ফিরছে। মিতালি রাজের নেতৃত্বাধীন দলকে আনতে বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন জেমিমা রড্রিগেজ। সেখান থেকে ২০২৫ সাল। জেমিমা রড্রিগেজ ১৪০ কোটি ভারতবাসীর মন জয় করে নিলেন। একদিনের ক্রিকেটের ইতিহাসে ভারত সর্বোচ্চ ২৬৪ রান তাড়া করে জিতেছিল। বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারত তাড়া করল ৩৩৮। মহিলাদের একদিনের ক্রিকেটের ইতিহাসে যা সর্বোচ্চ। মহিলা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে ভারতীয় মহিলা দল। বৃহস্পতিবার নভি মুম্বইতে জেমিমা রড্রিগেজ শো দেখল ক্রিকেট বিশ্ব। একটানা ১৫ ম্যাচ জেতা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল ভারত। ৩৩৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জেতাটাও রেকর্ড। তাও আবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো মঞ্চে। ম্যাচ জিতে ডিওয়াই পাটিল স্টেডিয়াম জেমিমার চোখে জল দেখল, দেখল স্মৃতি মান্ধানা এবং হরমনপ্রীত কৌর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। পোস্ট ম্যাচে কথা বলতে গিয়েও গলা ধরে আসছিল জেমিমার।

ধন্যবাদ জানালেন নিজের মা-বাবা, কোচকে।অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেননি যে এত বড় লক্ষ্য ভারত তাড়া করে দেবে, তাও আবার শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। চলতি বিশ্বকাপে এক ম্যাচে বাদও পড়েছিলেন জেমিমা। দলে ফিরে এসে নিজেকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেলেন ভারতীয় ব্যাটার। তিন নম্বরে নেমে একা হাতে ভারতকে ফাইনালে তুললেন। গত বিশ্বকাপে বাদ পড়েছিলেন, এবার সেটা পুষিয়ে দিলেন অনবদ্য ব্যাটিংয়ে। ওপেনার প্রতীকা রাওয়ালের বিকল্প হিসেবে মারকুটে শেফালি ভার্মা খেলছিলেন। কিন্তু ভাগ্য তাঁর দিকে গেল না। নিজের চেনা ভূমিকাতেই শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিনি ফিরে যান মাত্র পাঁচ বল খেলে ১০ রান করে। সেখান থেকে দলকে জেতার রাস্তায় নামানোর কাজ শুরু করেন জেমিমা রড্রিগেজ এবং স্মৃতি মান্ধানা। শুরুর দিকের ধাক্কা সামলে যখন মনে হচ্ছিল বড় পার্টনারশিপ হবে তখনই আউট হন স্মৃতি। কিম গার্থের বল তাঁর ব্যাটে লেগেছে সেটা বুঝতেই পারেননি। কিন্তু তারপরেই হরমনপ্রীত এবং জেমিমা ম্যাচে ফেরালেন ভারতকে। হরমনপ্রীত করলেন ৮৮ বল খেলে ৮৯ রান। জেমিমা অপরাজিত রইলেন ১৩৪ বল খেলে ১২৭ খেলে। দুই ক্রিকেটারের পার্টনারশিপে একজন মারছিলেন, একজন ধরছিলেন। জেমিমা একসময় হাঁপিয়ে গিয়েছিলেন, সেই সময় হরমনপ্রীত ধুয়ে দিলেন অজি বোলারদের। ভারত অধিনায়ক প্যাভিলিয়নে ফেরার পর মারার দায়িত্ব নিলেন দীপ্তি শর্মা। ফিরলেন ১৭ বল খেলে ২৪ রান করে। দীপ্তি যেখান থেকে শেষ করেছিলেন সেখান থেকেই অজি বোলারদের বাইরে পাঠালেন বাংলার রিচা। তাঁর ১৬ বলে ২৬ রানের মারকুটে ইনিংসে অনেকটাই চাপ কমে যায় ভারতের। শেষের দিকে আমনজ্যোত কৌর এবং জেমিমা ইতিহাস গড়লেন টিম ইন্ডিয়ার হয়ে। এদিন প্রথমে ব্যাট করে অস্ট্রেলিয়া ৩৩৮ রান করে। শুরুতেই ভারতের অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর ক্যাচ ফেলেন হিলির। জীবন ফিরে পেয়েও হিলি অবশ্য বড় রান করতে পারেননি। মাত্র ৫ রানে তিনি বোল্ড হন। অজিদের রান তখন ২৫। শুরুতে উইকেট হারালে চাপ এসে পড়ে যারা ব্যাট করছে তাদের উপরে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা যে অন্য ধাতুতে গড়া। লিচফিল্ড ও পেরি ১৫৫ রানের পার্টনারশিপ গড়েন। ভারতীয় বোলারদের উপরে নির্দয় হয়ে ওঠেন তাঁরা। উইকেট চলে গেলেও রানের গতি কমেনি অস্ট্রেলিয়ার। লিচফিল্ডকে একবার আউট দিয়ে দিয়েছিলেন আম্পায়ার। সাজঘরের দিকে হাঁটা লাগান তিনি। কিন্তু দেখা যায় বল লিচফিল্ডের ব্যাটে লেগে বল মাটিতে লাগে। সিদ্ধান্ত বদলান আম্পায়ার। শেষমেশ লিচফিল্ড থামেন ১১৯ রানে। ৯৩ বলের ইনিংসে সাজানো ছিল ১৭টি বাউন্ডারি ও ৩টি ছক্কা। ১৮০ রানে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় উইকেটটি যায়। এর পরে বেথ মুনি ও পেরি চল্লিশ রান জোড়েন। বেথ মুনি ২২ বলে ২৪ রান করে আউট হন। সাদারল্যান্ড (৩) রান পাননি। পেরি ব্যক্তিগত ৭৭ রানে রাধা যাদবের বলে বোল্ড হন। সেই সময়ে অজিদের রান ছিল পাঁচ উইকেটে ২৪৩। গার্ডনার (৬৩) ও ম্যাকগ্রা (১২) রান আউট হন। অস্ট্রেলিয়া ৪৯.৫ ওভারে করল ৩৩৮ রান। ভারতীয় বোলারদের মধ্যে শ্রী চরণী ও দীপ্তি শর্মা ২টি করে উইকেট নেন। ক্রান্তি, আমনজ্যোৎ কৌর ও রাধা যাদব একটি করে উইকেট নেন।

সারা ভারত তথা বিশ্ব জুড়ে একটাই নাম, জেমিমা রড্রিগেজ। প্রায় ৫০ ওভার ব্যাট করলেন, একটা সময় শরীরে এনার্জি বলতে কিছু ছিল না, বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, শুয়ে পড়ছিলেন মাঠের মধ্যেই। জেমিমা, ১৪০ কোটি ভারতবাসীর আবেগ নিজের কাঁধে নিয়ে লড়লেন। আর সেই লড়াইয়ের প্রভাব দেখা গেল ম্যাচের পর। আমনজ্যোতের ব্যাট থেকে উইনিং শট বেরোনোর পরেই পিচের মধ্যে শুয়ে পড়লেন। তখন তাঁর দু’চোখ দিয়েই অঝোর ধারায় ঝরছিল জল। কথা বলতে পারছেন না, ধীরে ধীরে হেলমেটটা খুললেন, ধন্যবাদ জানালেন সর্বশক্তিমানকে। নিয়নের আলোয় ভেসে যাচ্ছেন জেমিমা রড্রিগেজ। তাঁর ব্যাট কথা বলে উঠল। অস্ট্রেলিয়ার পাহাড়প্রমাণ রান তাড়া করতে নামার আগেও অনেকের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। প্রশ্ন উঠছিল ভারত কি পারবে এই রান তাড়া করতে? জেমিমা বলছেন, ‘প্রভু যিশুকে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই। একার পক্ষে আমার আজ অস্ট্রেলিয়াকে হারানো সম্ভবই হতো না। আমার মা, বাবা, কোচ এবং প্রতিটি মানুষকে ধন্যবাদ জানাতে চাই যাঁরা আমার উপরে বিশ্বাস রেখেছিলেন। গত মাস জুড়ে বেশ কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে। অবশেষ স্বপ্ন যেন সত্যি হল।’ লম্বা ইনিংস খেলছিলেন জেমিমা। বাড়তি অ্যাড্রিনালিনও ঝরছিল। মাঝে ক্লান্তি গ্রাস করছিল। কিন্তু হাল ছাড়ার বান্দা নন তিনি। কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য নিজের সঙ্গে কথা বলে চলছিলেন জেমিমা। নিজেকে অভয় দিচ্ছিলেন। ঠোঁট নড়ছিল। মনেই হচ্ছিল কারও সঙ্গে নীরবে তিনি কথোপকথন করে চলেছেন। কিন্তু শেষের দিকে শক্তি নিঃশেষিত হয়ে আসছিল। তখন প্রভু যিশুর শরণাপন্ন হচ্ছিলেন জেমিমা। বাইবেলের লাইন মনে মনে উচ্চারণ করে নিজেকে তাতিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রবল চাপের মুখে বাইবেলের লাইন জপে জেমিমা নিজেকে বোঝাচ্ছিলেন, ‘স্থিতধী হও, লড়ে যাও। ঈশ্বর তোমার হয়ে লড়াই করবে।’ খেলা শেষের গ্যালারির দিকে তাকিয়ে মা-বাবাকে ধন্যবাদ জানালেন তিনি, ফ্লাইং কিস দিলেন। একটু পরেই সোজা ছুটলেন মা-বাবার কাছে। দেশের হিরো হলে কী হবে, মা-বাবার কাছে তিনি তো আজও সেই ছোট্ট জেমিই। আদরের মেয়েকে জড়িয়ে ধরে চোখে জল জেমির মা-বাবারও। গত বিশ্বকাপে বাদ পড়া জেমিমা রড্রিগেজ আজ সব হিসাব মিটিয়ে দিলেন সুদে-আসলে।

মহিলাদের এক দিনের বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল জিতেই ফাইনালের পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছে তারা। নবি মুম্বইয়ের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে এমনটাই বললেন অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর। খেলা শেষে হরমনপ্রীত জানান, এ বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া ছাড়া কিছু ভাবছেন না তাঁরা। অধিনায়ক বলেন, “আর একটা ম্যাচ বাকি। আমরা আজ ভাল খেলেছি। কিন্তু এখন থেকেই ফাইনালের পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছি। এটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সকলে বিশ্বকাপ জিততে কতটা মরিয়া। দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জেতার অনুভূতি অন্য রকম। সেই অনুভূতি আমরা সমর্থকদের দিতে চাই। একটা ম্যাচ বাকি। সেখানে নিজেদের সেরাটা দেব।” রান তাড়া করতে নেমে জেমাইমা রদ্রিগেজ়ের সঙ্গে তাঁর জুটি দলকে জয়ের পথে নিয়ে গিয়েছে। নিজে ৮৯ রান করে আউট হয়েছেন। জেমাইমা ১২৭ রান করে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছেড়েছেন। একসঙ্গে ব্যাট করার সময় হিসাব করে খেলছিলেন তাঁরা। হরমনপ্রীত বলেন, “জেমাইমা সব সময় হিসাব করে খেলে। এই ম্যাচেও করেছে। আমাদের একে অপরের উপর ভরসা ছিল। আমরা হিসাব করছিলাম। ও বার এসে বলছিল, ৫ রান হয়েছে বা ৭ রান হয়েছে বা দু’বল বাকি আছে। দেখে মনে হচ্ছিল, গণিতজ্ঞের সঙ্গে ব্যাট করছি। যে ভাবে ও চাপ সামলে খেলল, তার কোনও তুলনা হয় না।” এ বারের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৬০ বলে ৬২ রান করতে পারেনি ভারত। হারতে হয়েছিল। এই ম্যাচে যাতে সেই ঘটনা না ঘটে সে বিষয়ে সতর্ক ছিলেন হরমনপ্রীত। একই ভুল তিনি করতে চাননি। হরমনপ্রীত বলেন, “ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জেতা ম্যাচ হেরেছিলাম। সেই ম্যাচে ঝুঁকি নিইনি। ফলে শেষ দিকে চাপ বেড়ে গিয়েছিল। এই ম্যাচে তাই মাঝে মাঝে ঝুঁকি নিচ্ছিলাম। চাইনি শেষ দিকে অনেক রান বাকি থাকুক। সেটা কাজে লেগেছে।” হরমন আরও বলেন, “হতে পারে এটা ৫০ ওভারের খেলা, কিন্তু শেষ ৫ ওভারে সব হিসাব করতে হয়। তাই আমরা চেয়েছিলাম, ৫০ ওভারের মধ্যে খেলা শেষ করতে। তার জন্য ঝুঁকি নিতে হত। সকলেই সেটা নিয়েছে। তাই অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে ফিরতে পারেনি।” খেলা শেষে কোচ অমল মুজুমদারকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন হরমনপ্রীত। কোচ-অধিনায়কের জুটিতে সাফল্যের একেবারে কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁরা। কোচের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা জানিয়েছেন অধিনায়ক। হরমনপ্রীত বলেন, “আমরা খুব পরিশ্রম করেছি। দলকে এই জায়গায় আনতে খাটতে হয়েছে। তাই ম্যাচ জেতার পর দু’জনে মিলে উল্লাস করেছি। এই দলকে নিয়ে আমরা গর্বিত। জানি, কিছু ভুল করেছি। সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি। এই ম্যাচে সেটা দেখা গিয়েছে।” এই সাফল্যের কৃতিত্ব সমর্থকদেরও দিয়েছেন হরমনপ্রীত। ভারত অধিনায়ক জানিয়েছেন, মাঝে যখন হারছিলেন, তখনও সকলে তাঁদের পাশে ছিলেন। তাঁদের উদ্বুদ্ধ করছিলেন। লড়াইয়ের শক্তি দিচ্ছিলেন। তাই রবিবার বিশ্বকাপ জিতে সমর্থকদের প্রতিদান দিতে চান হরমনপ্রীতেরা। সেমিফাইনাল জিতেই সেটা জানিয়ে দিলেন তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles