ভারতীয় সময় দূপুর তিনটে বেজে এক মিনিট। পৃথিবীতে নেমে এল ড্রাগন। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়াগো উপকূলে রাত। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে শুভাংশুদের ক্যাপসুল। এই সময়ে ক্যাপসুলের গতি ছিল ঘণ্টায় ২৮ হাজার কিলোমিটার। ধীরে ধীরে তা কমতে কমতে ২৪ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় নেমে আসে। এর পর একে একে খুলে যায় চারটি প্যারাশ্যুট। ভাসতে ভাসতে প্রশান্ত মহাসাগরে নেমে আসে ‘ড্রাগন’। রাতের অন্ধকারেই পৃথিবীতে ফিরলেন শুভাংশু শুক্লা। ৫০ মিনিট পর ক্যাপসুলের হ্যাচ খুলে বের করে বেশ কিছু শারীরিক পরীক্ষা। হাকাশের মাধ্যাকর্ষণহীন পরিবেশে কাটানোর পর পৃথিবীতে ফিরে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হয়। সে জন্য আগামী সাত দিন বিশেষ পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে চার নভশ্চরকে। এরপর ঘরে ফেরা মহাকাশচারীদের। প্রত্যাবর্তনের খবরে উচ্ছ্বসিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আনন্দাশ্রু শুভাংশুর মায়ের চোখে। শুভাংশুর বাবা শম্ভুদয়াল শুক্লা ও মা আশা শুক্লা জানিয়েছেন, ছেলের এই সাফল্যে তাঁরা গর্বিত।

সোম সকালে পৃথিবীর উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন ভারতীয় মহাকাশচারী ও তাঁর সঙ্গীরা। প্রশান্ত মহাসাগরে নেমে এল তাঁর ক্যাপসুল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এক্স হ্যান্ডলে তিনি লেখেন, ‘ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযান সেরে পৃথিবীতে ফিরে আসা গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লাকে আমি দেশের সকলের সঙ্গে স্বাগত জানাই। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পরিদর্শনকারী ভারতের প্রথম নভোচারী হিসেবে, তিনি তাঁর নিষ্ঠা, সাহস এবং অগ্রণী মনোভাবের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের স্বপ্নকে অনুপ্রাণিত করেছেন। এটা আমাদের নিজস্ব মানব মহাকাশ অভিযান গগনযানের দিকে এগনোর পথে আরেকটি মাইলফলক।’

শুভাংশুদের জন্য প্রস্তুত জলযান ‘রিকভারি ভেহিকল’ প্রশান্ত মহাসাগরে বুকে ভাসছিল। শুভাংশুরা নামার পরে তাঁদের ক্যাপসুলকে স্পেসএক্সের দল তুলে নেয় জাহাজে। কিছু ক্ষণ পর ক্যাপসুলের হ্যাচ খুলে যায়। ভিতরে ঢোকেন বিশেষজ্ঞদের দল। শারীরিক পরীক্ষার পর ভিতর থেকে বার করে আনা হয় চার নভশ্চরকে। প্রথমে হাসিমুখে বেরিয়ে আসেন কমান্ডার পেগি হুইটসন। এর পরেই বার করে আনা হয় শুভাংশুকে। মুখে হাসি, হাত নাড়তে নাড়তে ‘ড্রাগন’ ক্যাপসুল থেকে বেরিয়ে আসেন। ২৬ জুন ইতিহাস তৈরি করেন ভারতীয় নভশ্চর শুভাংশু শুক্লা। অ্যাক্সিয়ম-৪ অভিযানের অংশ হিসাবে অন্য তিন মহাকাশচারীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পৌঁছান শুভাংশু। কয়েকদিন ধরে মহাকাশে থাকার সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন ভারতীয় বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন। ইসরোর তরফে জানানো হয়েছে, মহাকাশে থাকলে মানুষের পেশির কোষের উপরে কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন। যা ভবিষ্যতে মহাকাশ তো বটেই, পৃথিবীতেও পেশি সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের পথ দেখাতে পারে। সার্বিকভাবে মহাকাশে মানবদেহে কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়েও গবেষণা চালিয়েছেন। মহাকাশে কীভাবে পেট্রি ডিশে স্বচ্ছ, ঢাকনাযুক্তি থালায় মুগ এবং মেথির বীজের অঙ্কুরোদগম হয়, তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন শুভাংশু।

তারপর সেগুলি আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রের ফ্রিজেও রেখে দেওয়া হয়েছিল। সায়ানোব্যাকটেরিয়া এবং অ্যাকোয়াটিক-ফোটোসিন্থেথিক অর্গ্যানিজম নিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন। যা অক্সিজেন উৎপদান, মহাকাশযানের পুনর্ব্যবহারের মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ইসরোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয় মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নেই, কম্পিউটার স্ক্রিনের প্রভাব কী পড়ে, তা নিয়েও গবেষণা চালিয়েছেন ভারতীয় মহাকাশচারী। এই গবেষণা ভবিষ্যতের দিশা নির্ধারণ করতে পারে। মানুষের মস্তিষ্ক এবং ভাবনাচিন্তার সঙ্গে কম্পিউটারের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা যায় কিনা, তা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন শুভাংশুরা।5নিত্যদিনের জীবনে পদার্থবিদ্যা যেরকমভাবে কার্যকর হয়, তা মহাকাশে কতটা পরিবর্তিত হয়, তা নিয়েও গবেষণা চালিয়েছেন ভারতীয় মহাকাশচারী। শূন্যে ভাসমান জলের বুদবুদও তৈরি করেন। মানসিক স্বাস্থ্য, ক্যানসার, উদ্ভিদের জীবনবিদ্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়েও শুভাংশুদের গবেষণা। অ্যাক্সিয়ম-৪ মিশনে গিয়ে শুভাংশু যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন, তা ভারতের গগনযান মিশনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে মহাকাশে গেলেন। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মিশনের সঙ্গে মহাকাশে গিয়েছিলেন রাকেশ শর্মা।

২৫ জুন ফ্লরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে আইএসএসের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন শুভাংশুরা। নাসার ‘অ্যাক্সিয়ম-৪’ নামে এই অভিযানে ভারতীয় নভশ্চর ছাড়াও রয়েছেন ক্রু-কমান্ডার পেগি হুইটসন, মিশন বিশেষজ্ঞ স্লাওস উজানস্কি-উইজ়নিউস্কি এবং টিবর কাপু। ১৮ দিন আইএসএসে কাটানোর পর সোমবার শুভাংশুদের প্রত্যাবর্তন শুরু হয়। মহাকাশচারী শুভাংশু শুক্লাকে শুভেচ্ছা জানালেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে শুভেচ্ছাবার্তা পোস্ট করে লেখেন “ওয়েলকাম হোম শুভাংশু শুক্লা। আপনি বাড়ি ফিরে আসায় আমরা সত্যিই খুশি। আপনি যা করেছেন, তা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।”। ১৮ দিন মহাকাশে কাটিয়ে অবশেষে পৃথিবীতে ফিরলেন ভারতীয় মহাকাশচারী শুভাংশু শুক্লা ও তাঁর সঙ্গীরা।নির্ধারিত সময়ের একটু পরে বিকেল ৪টে ৪৫ মিনিটে ভারতীয় সময় মহাকাশকেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয় শুভাংশুদের মহাকাশযান। শুরু হয় পৃথিবীর দিকে ফিরতি যাত্রা। ২৩ ঘণ্টার দীর্ঘ সেই যাত্রার শেষে ফিরলেন চার নভশ্চর।




