Saturday, July 18, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

কুরুচিকর শব্দের প্রাধান্যই বেশী সোস্যল মিডিয়ায়!‌ সমাজমাধ্যমে বাঙালির তর্কের ভাষা অতি নিম্নরুচির?‌ নেতাদের আক্রমণের ভাষা?‌

বাংলায় এখন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় যেন একটাই—তুমি কোন পার্টির সমর্থক? কার দলে?‌ কোন পার্চির নেতা?‌ অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে পার্টির ভক্তই হোন, ফেসবুকে ভেসে উঠবে একেবারে একইরকম ভাষা। গলির ভাষা। আজকের পার্টি নেতারা তো সমর্থকদের ভাষা শিক্ষা দেয় না। এলন মাস্কের জমানায় টুইটার নাম বদলে এক্স হয়ে ওঠার পর এখন তো আর টুইট বলে না, বলা হয় পোস্ট। টুইট শব্দটাই বিশ্বজুড়ে প্রচলিত। টুইটে টুইটে প্রতিদিনই ছয়লাপ। কট্টর বিরোধী কথাবার্তার প্রাধান্য। এমন বাজে কথা, একেক সময় গা ঘিনঘিন করে। চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক শব্দব্রম্ভ। নোংরা রাজনীতি তুচ্ছ হয়ে যায়। আবেগঘন পোস্টেও ক্লেদাক্ত রাজনীতি। সম্পর্ককে তিক্ত করতে বিশ্রী কটাক্ষের রাস্তায় হাঁটার ভালো উদাহরণ। অবাঙালিরাও জানেন, বাঙালি ভদ্রলোক বলে আর কিছু হয় না। আজকের সমাজে ওই ভালো উদাহরণের মূল্য আছে কোনও? মন্তব্যগুলো আরেকবার মনে করিয়ে দিল, বাঙালির চিরাচরিত ভদ্রলোকের সংজ্ঞা কীভাবে পাল্টে গিয়েছে। কীভাবেই বা বাঙালি ভদ্রলোক আস্তে আস্তে বিলুপ্ত প্রাণীর দলে নাম লিখিয়ে ফেলছি। সোশ্যাল মিডিয়ায় বাঙালির গালাগালির নতুন নতুন শব্দ, নতুন নতুন ভাষা আমাদের দিন বদলের করুণ পথে দাঁড় করিয়ে যায়। যা বলে দিয়ে যায়, বাঙালি ভদ্রলোক আর হবে না ভবিষ্যতে।

বঙ্গসন্তানরা লোকের মৃত্যু কামনাও করে একেবারে প্রকাশ্যে। অতি অশ্লীলভাবে। নয়াদিল্লি থেকে বারাণসী, এলাহাবাদ থেকে জব্বলপুর, লখনউ থেকে ভাগলপুর, বেঙ্গালুরু থেকে মুম্বই প্রবাসী বাঙালির জগৎ অনেকটাই প্রভাবিত হত কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের জীবনযাপন ভাষা প্রয়োগ থেকে। পাঞ্জাবি মারাঠি বিহারী মাড়োয়ারি দক্ষিণ ভারতীয় সবাই জানতেন, বাঙালিদের মধ্যেই একটি বিশেষ শ্রেণী রয়েছে। বাঙালি ভদ্রলোক। বাঙালি ভদ্রলোকের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য অনেক অবাঙালিও স্পষ্ট জানতেন। শ্রদ্ধা করতেন সেই আভিজাত্যকে। এখন দিল্লি বারাণসী মুম্বইয়ের অবাঙালিরাও বুঝে গিয়েছেন, বাঙালি ভদ্রলোক বলে আর কিছু হয় না। ঝোলে ঝালে, ডালে অম্বলে মিলেমিশে সব একাকার আজ। টুইটের কূটকাচালি। উগ্রবাদী জেলখাটা রাজনীতিকের স্টাইলের হেটার‌। ঘৃণা ছড়াতে ওস্তাদ। ও নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখতে বসলে পাড়ার জগা গবার সঙ্গে কোনও ফারাক নেই। বরং পাড়াতুতো জগা গবারাও বাক্য শালীনতার দিকে এগিয়ে। অশিক্ষিত গিরগিটে তুল্য তাঁবেদার জোলখাটা রাজনীতিক অর্থহীন ঝগড়া জুড়ে দিতে পারে অচেনা লোকের সঙ্গে।

হে রাম, বাঙালি ভদ্রলোক নেই বলে এত হাহাকার করে লাভটা কী? রাজনৈতিক দলের এক ক্লাস এইট ফেল ভক্ত যা লিখেছিলেন, উচ্চশিক্ষিত রাজনীতিকও সেরকমই কিছু লেখেন। এসব দেখে আবার মনে হয়, তাহলে আর বাঙালি ভদ্রলোক খুঁজে লাভ কী? সোশ্যাল মিডিয়া আসার পরে একটি বড় লাভ হয়েছে আমবাঙালির। যে অশালীন ভাষা প্রয়োগ করে সে পাড়ার চায়ের দোকান বা রকের আড্ডা জ্বালিয়ে দিত, সেই ভাষা সে প্রয়োগ করছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এখানে তথাকথিত সেলেবদের সরাসরি গালাগাল দেওয়া যাচ্ছে, মাঝে মাঝে এঁড়ে তর্কও জুড়ে দেওয়া যায়। তাহলে আর পাড়ার আড্ডায় এসব বলে অপাত্রে দান কেন? যে গালাগালটা পাড়ায় দিতাম, সেটা সোশ্যাল মিডিয়াতেই দিই। আলিপুরদুয়ার থেকে আলিপুর, আমেরিকা থেকে আলাস্কা, সবাই জানতে পারবে নিজেকে। গায়ককে বলতে পারব, ‘রবীন্দ্রসংগীতের স্বরবিতানটা তাকে তুলে রেখে দে, নিজের সুরে রবীন্দ্রসংগীত গাইছিস।’ আমি অভিনেতাকে অনায়াস বলতে পারব, ‘ওই তো সেই দাঁতে দাঁত চেপে সংলাপ বলিস রে, সব ডায়ালগ একরকম!’ বাঙালি ভদ্রলোক হারিয়ে যাচ্ছে বলে কেউ পোস্ট করলে তাঁকে দিব্যি বলে দেব, ‘যান যান, এসব বুদ্ধিজীবীগিরি এখানে ফলাবেন না তো!’ আপনার সঙ্গে আমার সব ব্যাপারে মতের মিল থাকবে, তা হতে পারে না। তর্ক হোক, হোক তর্ক। সমস্যা হল, তর্কের মধ্যে চাপা পড়ে যাচ্ছে শ্লীলতাবোধ, ভদ্রতাবোধ। বাংলায় এখন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় যেন একটাই। তুমি কোন পার্টির সমর্থক? অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে পার্টির ভক্তই হোন, ফেসবুকে ভেসে উঠবে একেবারে একইরকম ভাষা। গলির ভাষা। আজকের পার্টি নেতারা তো সমর্থকদের ভাষা শিক্ষা দেয় না।

বাঙালি ভদ্রলোক বলতে কাদের বোঝানো হত? অতি সংক্ষেপে তাঁদের গুণগুলো এভাবে লেখা যাক। শিক্ষা থাকবে। নম্রতা ও বিনয় সঙ্গী হবে তাঁর। থাকবে আত্মমর্যাদা বোধ এবং মূল্যবোধ। সৎভাবে দিন কাটাতে চাইবেন, পরিবারেও সততা প্রয়োগ করবেন। সমাজের জন্য কিছু করতে চাইবেন মন থেকে। ভাষা ব্যবহারে থাকবে অত্যন্ত সচেতনতা। তাঁর সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি বা সাদা শার্ট বলে দেবে, তিনি বাঙালি ভদ্রলোকের প্রতিভূ। পয়সা না থাকলেও ভদ্রতাবোধ বিসর্জন দেবেন না। যৌথ পরিবারের গ্রন্থি থাকবে জমাট। শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি তাঁদের মননে জায়গা পাবে সবার আগে। বাংলার নবজাগরণে বড় ভূমিকা ছিল বাঙালি ভদ্রলোকদের। তাঁরা ইউরোপিয়ানদের ভালো দিকগুলো নিতে যেমন দ্বিধা করেননি, তেমনই তাঁদের ভারত থেকে তাড়ানোর ব্যাপারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। হুতোম প্যাঁচার নকশায় কালীপ্রসন্ন সিংহ তৎকালীন ভদ্রলোকদের ভণ্ডামি ও সামাজিক ধারণাকে ব্যঙ্গ করলেও আজ বোঝা যায়, এখনকার তুলনায় তাঁদের ভণ্ডামি কিছুই ছিল না। এখন বেঁচে থাকলে কালীপ্রসন্ন আরও বহু রসদ পেতেন, দেখতেন রাজনীতি কীভাবে চাটুকারদের জন্ম দিয়েছে, পাল্টে দিয়েছে মানুষকে। এই ধরনের মানুষ আর এখন কত পাবেন বাংলায়? সাধারণ মানুষই যদি এমন হয়, রাজনীতিকদের দোষ দিয়ে কী হবে? তাঁদের ভাষা, ভঙ্গিও এমনই হবে। তাঁরা জানেন, জনতা এখন ওই জাতীয় ভাষাই পছন্দ করছে। ওই কদর্য ভাষাতেই হাততালি পড়বে। টিভিতে একই বিশেষজ্ঞদের সান্ধ্য কলতলার ঝগড়াই দাম পাবে বেশি। কাঞ্চন মল্লিকরা ভাববেন, ডাক্তারদের হুমকি দিয়েই তো সিনেমার থেকে বেশি প্রচার পাওয়া যায়। আর হোক না নেতিবাচক প্রচার, প্রচার তো! রাস্তায় গড়াগড়ি খায় শিক্ষা। লাঠি ও লাথি দুইই হজম করেন শিক্ষকরা। সমাজমাধ্যম ও অন্যান্য গণমাধ্যমে পরিবেশিত ও প্রচারিত বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর তথ্য জনমতকে ভুল পথে পরিচালিত করে একটা গোটা গণতন্ত্রকে ভারসাম্যহীন করে দিতে পারে। কোনও যুগেই শব্দ আর ছবির এত ক্ষমতা বা নাগাল ছিল না, যা আজ নানা সমাজমাধ্যমের সূত্রে সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি, কোনও যুগেই মাধ্যমগুলির আজকের মতো এতটা লাগামছাড়া দায়িত্বহীনতা ছিল না। আজ সবাই লেখক, সবাই সংবাদ পরিবেশক। কিন্তু শব্দ, ছবি, আর সম্পাদিত ভিডিয়োর শক্তি কতখানি, সেটা খুব কম মানুষ উপলব্ধি করেন। সংবাদ এবং মতামত যে দুটো আলাদা বস্তু, এবং তাদের যে আলাদা রাখাই বাঞ্ছনীয়, এ কথা আমাদের অবিলম্বে বুঝতে হবে।

বিকৃত তথ্য পরিবেশনের মূল উদ্দেশ্যই হল বিশ্বাসী, অলস মনের সুযোগ নেওয়া। মানুষের গভীরতম বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে ব্যবহার করে তাদের মধ্যে এমন এক আবেগ ও চিত্তচাঞ্চল্য তৈরি করা, যাতে তাদের যুক্তিবোধ অচল হয়ে যায়। এই নিপুণ প্রতারণার কৌশলের বিরুদ্ধে পৃথিবী জুড়ে আন্দোলন ও সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। ‘ম্যানিপুলেশন ইন্ডেক্স’ তৈরি হচ্ছে, তথ্য যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন ওয়েবসাইট হচ্ছে। আন্তর্জাতিক স্তরে রাজনৈতিক দল-মত-জাতি-বর্ণ-নির্বিশেষে প্রকৃত তথ্যভিত্তিক সংবাদ-সচেতনতা তৈরি করার প্রয়াস চলছে। ফেসবুক-কে নানা অপতথ্যের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম হিসাবে বিভিন্ন মামলার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এই সংস্থারই মালিকানাভুক্ত হোয়াটসঅ্যাপ ভারতীয় উপমহাদেশে এতই জনপ্রিয় যে, কৌতুক করে বলা হয়, ভারতে সূর্যোদয় হলে ক্যালিফর্নিয়ার সার্ভারগুলির উপর খুব চাপ পড়ে, এক সঙ্গে একশো কোটি মানুষের পরস্পরকে পাঠানো সুপ্রভাত-বার্তার চাপে! এত দূর যার নাগাল, তাকে গণমাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্যপ্রচারের লাভজনক ফন্দি তো স্বাভাবিক ভাবেই কিছু গোষ্ঠীর মাথায় আসবে!গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, বিভ্রান্তিকর তথ্যের উদ্দেশ্য মোটামুটি ছয়টি ধারায় বিভক্ত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, অপ বিজ্ঞান-মূলক, প্রযুক্তি-সম্পর্কিত, আবহাওয়া সংক্রান্ত, এবং আইনকানুন সংক্রান্ত। এই তালিকার মধ্যে বিশেষ করে আমাদের নজরে পড়ে কোনও আসন্ন নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য সংখ্যা ও যুক্তির ছদ্মবেশে মিথ্যে ঘটনার প্রচার, ইতিহাসের বিকৃতি ও পুনর্নির্মাণ, ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব, ভ্যাকসিনবিরোধ বা কোভিড-১৯ বিষয়ে অপতথ্য, পরিবেশ নিয়ে অবৈজ্ঞানিক প্রচার, কুসংস্কার বা অপসংস্কার; বা কখনও কখনও নেহাতই খেলা বা বিনোদনজগৎ থেকে কুরুচিকর চাঞ্চল্যকর মিথ্যে রটনা।

নীরদ সি চৌধুরী ‘‌আত্মঘাতী বাঙালী’‌ বইয়ে ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, যদা শ্রৌষং ১৯২০ সনে চিত্তরঞ্জন দাশ মহাত্মা গান্ধীর বিরুদ্ধতা করিবার জন্য সদলবলে নাগপুরে গিয়া তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়া আসিলেন, তদা নাশংসে বিজয়ায়, সঞ্জয়! যদা শ্রৌষং ১৯৩২ সনে ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট বাংলাদেশ সম্বন্ধে কম্যুনাল অ্যায়োআর্ড’ দিলেন কিন্তু বাঙালী তাতে বাধা দিল না, তদা নাশংসে বিজয়ায়, সঞ্জয়! যদা শ্রৌর্ষং ১৯৩৭ সনে ভারতীয় কংগ্রেস বাংলার কংগ্রসকে ফজলুল হকের প্রজাপার্টির সহিত সহযোগিতা করিতে দিলেন না, তদা নাশংসে বিজয়ায়, সঞ্জয়! যদা শ্রৌর্ষং সেই সনেই মুসলিম লিগ ও প্রজাপার্টি মিলিয়া বাংলার মন্ত্রিসভা গঠন করিল, তদা নাশংসে বিজয়ায়, সঞ্জয়! যদা শ্রৌষং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও লক্ষ্মীকান্ত মৈত্রেয় বাংলাদেশকে বিভক্ত করিবার জন্য আন্দোলন করিতেছেন, তদা নাশংসে বিজয়ায়, সঞ্জয়! যদা শ্রৌষং ১৯৪৭ সনে মুসলমান বাঙালীর বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও হিন্দু বাঙালীর ভোটে বাংলাদেশ বিভক্ত হইল, তদা নাশংসে বিজয়ায় সঞ্জয়!
নীরদবাবুর এই অংশটুকুর শিরেনাম ছিল ‘বাঙালীর জাতীয় অদৃষ্ট’। যা থেকে স্পষ্ট কতযুগ আগে থেকেই স্ববিরোধিতায় ভুগত বাঙালি। আমরা সবাই তো তাঁদেরই উত্তরসূরি! বাঙালি ভদ্রলোকের উত্থান অনেকের মতে, ১৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে। বেশির ভাগ সমাজতাত্ত্বিকের ধারণা, ওই শব্দবন্ধ তৈরি হয়েছিল ব্রাহ্মণ-বৈদ্য-কায়স্থ তিন বর্ণের জোটকে কেন্দ্র করে। ১৮২৩ সালে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে ‘ভদ্রলোক’ শব্দটি সাহিত্যে প্রথম প্রয়োগ করেন ‘কলিকাতা কমলালয়’ গ্রন্থে। ১৮২৩ থেকে দুশো বছর হয়ে গেল প্রায়! ১৭৫৩ ধরলে তো ২৭০ বছর। বড় দীর্ঘ সময়! বাঙালি ভদ্রলোক নামক শব্দবন্ধের মৃত্যু প্রত্যাশিতই ছিল। ভাষার বিবর্তন। সমাজের লজ্জাজনক অবক্ষয়ের কারণ!‌

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles