জমি বিবাদে প্রতিবেশীকে বেধড়ক ‘মারধোর’। মহম্মদ সামির প্রাক্তন স্ত্রী হাসিনের ‘দিদিগিরি’। এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ। হাসিন জাহানের প্রথম পক্ষের মেয়ে আরশি জাহানের সিউড়ির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাতোড় এলাকায় জমি রয়েছে। অভিযোগ, ওই জমি আত্মসাতের চেষ্টা করছেন প্রতিবেশী গুড্ডু বিবি। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হাসিন জাহানের সঙ্গে তাঁর অশান্তি। অভিযোগ প্রায় বছরখানেক পুরনো। জমি মাপজোকের পর শুক্রবার সেখানে নির্মাণ কাজ শুরুর জেরে অশান্তি মাথাচাড়া দেয়। প্রতিবেশীকে হাসিন জাহান মারধর শুরু করে বলে অভিযোগ। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, ওই মহিলাকে বেধড়ক মারধর করছেন হাসিন জাহান। ওই মহিলা মাথায় আঘাত পেয়েছেন। তাঁকে সিউড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ বিষয়ে হাসিনের তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।ঘটনার পর হাসিন এবং তাঁর প্রতিবেশী দু’পক্ষই সিউড়ি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। হাসিন ৫ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলারের স্বামী কাজী ফরজুদ্দিনের নামেও অভিযোগ দায়ের করেন। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় বাসিন্দারাও রাতে সিউড়ি থানায় দ্বারস্থ হন হাসিনের বিরুদ্ধে। তাঁদের অভিযোগ, কিছু হলেই বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা মামলার ভয় দেখান হাসিন। অকথ্য ভাষা ব্যবহার করেন। এ বিষয়ে হাসিনকে প্রশ্ন করা হলেও তিনি প্রকাশ্যে কিছু বলতে চাননি।

এই ঘটনার পর ৫ নম্বর তৃণমূল কাউন্সিলারের স্বামী কাজী ফরজুদ্দিন বলেন, “হাসিনের মাথায় সমস্যা আছে। জমি দখল করা নিয়ে ওঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। শুধু তা-ই নয় পুরসভা থেকে লোকজন বাড়িতে এলে তাঁদের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেন, গায়ে থুথু দিয়ে দেন। এই ঘটনায় স্থানীয় কিছু মহিলা প্রতিবাদ করাতে তাঁদেরকেও তিনি মারধর করেন। হাসিনের মাথায় ছিট আছে। না হলে এ রকম পাগলামো কেউ করতে পারে না। তিনি তাঁর পরিবারের সকলের নামে মামলা করেছেন। তাঁর প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিয়ে এবং বিচ্ছেদ দুটোই আমার বাড়ির নিচে হয়। আমার বাড়িতে আশ্রিতা হিসাবে ছিলেন। পাড়ার মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। উনি কেস করতে ভালবাসেন। সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশকে নষ্ট করেন। আইন আইনের পথে চলবে। জোড় করে অন্যায় ভাবে কেই কারও জায়গা দখল করতে পারবে না।” সিউড়ির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কাজী ফরজুদ্দিন বলেন, “আমার মনে হয় হাসিন জাহানের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। নইলে এমন পাগলামি কেউ করে? মা, বাবা, বোনের নামে কেস করে। শামির নামে কেস করে। প্রথম বিয়েটা আমার বাড়ির নিচে হয়। বিচ্ছেদও হয়। একসময় ও আমার বাড়িতে আশ্রিতা হিসাবে ছিল। ও পাড়ায় বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। সুস্থ পরিবেশকে নষ্ট করছে। আমার মনে হয় ও কেস করতে ভালোবাসে। প্রচারের আলোয় থাকতে মনে হয় এসব করে।” স্থানীয় বাসিন্দারা হাসিন জাহানের বিরুদ্ধে গণস্বাক্ষর করে ডেপুটেশন জমা দিয়েছে। হাসিন জাহানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বারবার একের পর এক সমস্যা। ভারতীয় ক্রিকেটর মহম্মদ সামির বিবাহ বিচ্ছিন্না প্রাক্তন স্ত্রী হাসিন জাহানের। ২০১৪ সালে মডেল এবং অভিনেত্রী জাহানের সঙ্গে বিয়ে হয় সামি। ২০১৫ সালে তাঁদের কন্যাসন্তানের জন্ম। কিন্তু তাঁদের দাম্পত্য সুখের হয়নি। ২০১৮ সালে যাদবপুর থানায় সামি এবং তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসার অভিযোগ দায়ের করেন জাহান। স্ত্রী নির্যাতন, বিষ খাওয়ানো, খুনের চেষ্টা, ধর্ষণ-সহ একাধিক অভিযোগ করা হয় সামির বিরুদ্ধে। বিবাহবিচ্ছেদ চেয়ে আদালতেরও দ্বারস্থ হন জাহান। প্রোটেকশন অফ উইমেন ফ্রম ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যাক্ট ২০০৫ অনুযায়ী মামলা দায়ের করেন। মামলার খরচ এবং অন্তর্বর্তিকালীন ভরণপোষণ বাবদ ১০ লাখ টাকা চেয়েছিলেন। নিজের জন্য মাসে ৭ লাখ এবং মেয়ের জন্য মাসে ৩ লাখ টাকা চান। কিন্তু নিম্ন আদালতে তাঁর এই আবেদন গ্রাহ্য হয়নি। ২০১৮ সালে সামি কাছ থেকে খোরপোশ বাবদ ৭ লক্ষ টাকা দাবি করেছিলেন হাসিন জাহান। আরও ৩ লক্ষ টাকা দাবি করেছিলেন মেয়ের পড়াশোনার খরচ বাবদ। কিন্তু সেই সময় আদালতে সেই আবেদন খারিজ হয়ে যায়। জানিয়ে দেওয়া হয়, হাসিন নিজে মডেলিং করে আয় করেন। তাই সামিকে কোনও খোরপোশ দিতে হবে না। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে লড়াই চালিয়ে যান হাসিন। আলিপুর আদালত শুধুমাত্র তাঁর সন্তানকে ৮০,০০০ টাকা প্রতি মাসে দেওয়ার নির্দেশ দেয় সামিকে। পরে জেলা জজ সেই নির্দেশ সংশোধন করে জাহানকেও মাসে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের বিরুদ্ধে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন জাহান। তাঁর আইনজীবী বলেন, মাসে জাহানের আয় ১৬ হাজার টাকা। ব্যাঙ্কে স্থায়ী আমানত থেকে সুদ বাবদ এই টাকা পান। এই টাকায় তাঁর এবং কন্যার খরচ চালানো সম্ভব নয়। অথচ সামির সঙ্গে থাকার সময় থেকে তাঁরা ব্যয়বহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে তাঁর প্রতি মাসে খরচ হয় প্রায় ৬ লাখ টাকা। অন্য দিকে, তাঁর প্রাক্তন স্বামীর ২০২০-২১ অর্থ বর্ষের আয় প্রায় ৭.১৯ কোটি টাকা। সামর্থ্য থাকতেও তিনি টাকা দিতে চাইছেন না।
আদালতে সামির জবাব, তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী একজন সফল মডেল এবং অভিনেত্রী। বিজ্ঞাপনেও কাজ করেন। তাঁর মাসিক আয় অন্তত ৫ লাখ টাকা। এ ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাঙ্কে তাঁর বেশ কিছু আমানত রয়েছে। তথ্য গোপনের অভিযোগও করেন সামি। প্রথমে আলিপুর আদালত স্ত্রী ও সন্তানের জন্যে মাসিক ৮০ হাজার টাকা দিতে সামিকে নির্দেশ দেয়। পরে জেলা জজ সেই নির্দেশ সংশোধন করে স্ত্রীর জন্যে মাসিক ৫০ হাজার টাকা ও সন্তানের জন্যে ৮০ হাজার টাকা মেটাতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাসিন হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁর দাবি, নিজের মাসিক খরচ প্রায় সাড়ে ৬ লক্ষ টাকা। স্বামীর বার্ষিক আয় প্রায় সাড়ে ৭ কোটি। কিন্তু টাকা দেওয়ার সমর্থ্য থাকলেও স্ত্রী ও সন্তানের প্রয়োজনীয় টাকা দিচ্ছেন না জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটার। হাই কোর্ট তাই সামির আয়ের কথা মাথায় রেখে এই নির্দেশ দিয়েছে। আদালতে জয় পেয়েই প্রাক্তন স্বামীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন হাসিন জাহান। স্পষ্ট জানিয়েছেন, মডেলিং দুনিয়ায় তাঁর কেরিয়ার শেষ করে দিয়েছেন তারকা পেসার মহম্মদ সামি। আপাতত তাঁর কোনও রোজগার নেই। তবে আদালতের নির্দেশে খোরপোশ পেয়ে খুশি হাসিন বলেন, বিয়ের আগে মডেলিং করতাম। তাতে আমার খরচ দিব্যি চলে যেত। কিন্তু সামি আমার কাজ করা বন্ধ করে দেয়। আমাকে গৃহবধূ হয়ে থাকতে বাধ্য করেছিল। যেহেতু সামিকে খুব ভালোবাসতাম, তখন এসব মেনে নিয়েছি। কিন্তু এখন আমার কোনও উপার্জন নেই। আমাদের যাবতীয় খরচের দায়িত্ব সামিকে নিতেই হবে। তাই ও যখন দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করল, বাধ্য হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি। ঈশ্বরকে অশেষ ধন্যবাদ, আমাদের দেশে এখনও আইন রয়েছে যা সকলকে নিজেদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।
কিছুদিন আগে করকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে জাহানকে প্রতি মাসে দেড় লাখ টাকা করে দিতে হবে ভারতের ফাস্ট বোলারকে। মেয়ের জন্য মাসে দিতে হবে আরও আড়াই লাখ টাকা। চাইলে মেয়ের পড়াশোনা বা অন্য প্রয়োজনে আরও টাকা খরচ করতে পারেন ভারতীয় দলের ক্রিকেটার। গার্হস্থ্য হিংসার মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই টাকা দিতে হবে তাঁকে। প্রাক্তন স্ত্রী হাসিন জাহানের আবেদনের প্রেক্ষিতে নির্দেশ দেন বিচারপতি অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়। সামিকে মাসিক ৪ লক্ষ টাকা খোরপোশ বাবদ দিতে হবে। স্ত্রীর মাসিক খরচ বাবদ দেড় লক্ষ টাকা ও নাবালিকা মেয়ের খরচের জন্যে আড়াই লক্ষ টাকা অর্থাৎ সব মিলিয়ে মাসে ৪ লক্ষ টাকা খোরপোশ।




