বিভীষিকাময় সেই সন্ধ্যার পর ফের কসবার কলেজে নির্যাতিতা। তাঁর মুখ থেকে সবটা শুনল পুলিশ। ২৮ জুন সন্ধ্যায় কসবা ল’ কলেজে নিয়ে যাওয়া হয় নির্যাতিতা সেই ছাত্রীকে। ঘটনা কোথায় কী ঘটেছিল, তা পুলিশকে নিজে বলেন সেই নির্যাতিতা। গত ২৫ জুনে এই কলেজেই এই ছাত্রীকে গণধর্ষণ করেছিল টিএমসিপি করা মনোজিৎ মিশ্র, প্রতিম মুখোপাধ্যায়, জাইব আহমেদরা। এই ঘটনায় অভিযুক্ত তিনজনই গ্রেফতার হয়েছে। কলেজের নিরাপত্তারক্ষী পিনাকী বন্দ্যোপাধ্যায়কেও পুলিশ গ্রেফতার করেছে। সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজের কসবা ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ ইতিমধ্যেই সংগ্রহ করেছে একধিক প্রমাণ। যে কমন রুমে সেই নির্যাতিতা মারধরের অভিযোগ করেছিলেন, সেখানে রক্তের দাগ পেয়েছে পুলিশ। সেখান থেকে নমুনাও সংগ্রহ করেছেন ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা। এদিকে কলেজ থেকে হকিস্টিকও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। অভিযোগ ছিল, সেই হকিস্টিক দিয়ে নির্যাতিতাকে মারধর করা হয়েছিল। পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে কলেজের সিসিটিভির হার্ডডিস্ক। পুলিশ জানিয়েছে, সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজ থেকে পাওয়া সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে ২৪ বছরের এক ছাত্রীর অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ জুন বিকেল সাড়ে তিনটে থেকে রাত ১০টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত সাত ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজে কলেজ চত্বরের চারপাশের গতিবিধি ধরা পড়েছে। ফুটেজে দেখা যায়, নির্যাতিতাকে জোর করে গার্ডের ঘরে ঢোকানো হয়, যেখানে তিন অভিযুক্ত তাকে যৌন নির্যাতন করে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে মেয়েটির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তাতে তিন অভিযুক্ত, নিরাপত্তারক্ষী ও নির্যাতিতার গতিবিধি দেখা যাচ্ছে। মূল অভিযুক্তের মোবাইল ফোন থেকে দেড় মিনিটের একটি ভিডিয়ো ক্লিপও উদ্ধার করা হয়েছে। ভিডিয়োটির ফরেনসিক বিশ্লেষণ চলছে। কসবা ল’ কলেজে ধর্ষণের শিকার ছাত্রীর মেডিক্যাল রিপোর্ট সামনে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই ছাত্রীর গলায় কামড়ের দাগ রয়েছে। এদিকে যৌনাঙ্গ ক্ষত রয়েছে। এছাড়া শরীরের অন্যান্য জায়গায় মারধরের দাগও দেখা গিয়েছে। এই আবহে মেডিক্যাল রিপোর্টে স্পষ্ট যে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন সেই অভিযোগকারী তরুণী।
কলেজে নতুন ছাত্রী ভর্তি হওয়ার পরই ‘শিকার’ খুঁজত মনোজিৎ মিশ্র। প্রথম বর্ষের ছাত্রীদের সঙ্গে যেচে ‘বন্ধুত্ব’ করত। তারপর সুযোগ বুঝে তাঁদের স্পর্শ তথা হেনস্তা করতেও ছাড়ত না সে। অনেকে কলেজে ওই প্রভাবশালীর কার্যকলাপে বিরক্ত হলেও ভয়ে অভিযোগ করতেন না। কসবায় আইন কলেজে গণধর্ষণের ঘটনায় পুলিশের তদন্তে মূল অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্রর বিরুদ্ধে উঠে এসেছে একের পর এক তথ্য ও অভিযোগ। পুলিশ ও এলাকা সূত্রে জানা গিয়েছে, ক্লাস সেভেন থেকে মনোজিতের মদ আর গাঁজার প্রতি আসক্তি। স্কুল ছাড়ানোর পরই দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় ‘মস্তানি’। আর কলেজে ভর্তি হওয়ার পর মাঝেমধ্যেই কোমরে বেআইনি অস্ত্র নিয়ে ভয় দেখানোর অভিযোগ। সাহস এতটাই বেড়ে যায় যে, ফলস্বরূপ চেতলা ব্রিজের কাছে এক ব্যক্তিকে খুনের চেষ্টাও করে মনোজিৎ। এছাড়াও একের পর এক মারপিট, ঝামেলা, এমনকী, অস্ত্র আইনের দু’টি মামলাও হয় মনোজিতের বিরুদ্ধে। মামলায় জড়িয়ে যাওয়ায় ওকালতি পড়তে গিয়েও চার বছরের জন্য পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় তার। এদিকে, প্রতিনিয়ত প্রচণ্ড নেশা করার পর মনোজিৎ ওরফে পাপাই ওরফে ম্যাঙ্গোর বিভিন্ন কীর্তিতে বিরক্ত কালীঘাট রোডের বাসিন্দা তারই প্রতিবেশীরা। তাঁদের অভিযোগ, নেশা করে পাড়ার একের পর এক যুবতী ও তরুণীকে হেনস্তা করত মনোজিৎ। আর তার সঙ্গে করত তোলাবাজিও। মনোজিতের মা ও বাবা আলাদা থাকেন। বাবা কালীঘাট অঞ্চলের দাপুটে প্রাক্তন সিপিএম নেতা রবীন মিশ্রর কালীঘাটে পেঁড়ার দোকান রয়েছে। সেই দোকানটিও তিনি দখল করেন বলে এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ। রবীন মিশ্র জানান, তাঁর ছেলে রাজনীতির শিকার। তবে সে দোষী হলে যেন শাস্তি পায়। মনোজিতের মা জানান, তিনি হতবাক হয়ে গিয়েছেন ছেলের কীর্তি শুনে। তবে এখনই বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি নন তিনি। এলাকার বাসিন্দারা জানান, ছেলেকে মদত জোগাতেন বাবা। ২০১৪ সালে আলিপুরের রাখালদাস আঢ্যি রোডে এক ব্যক্তিকে ছুরি দিয়ে খুনের চেষ্টা করে। ওই বছরই সে আইন কলেজে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু মামলার হাত থেকে বাঁচতে উধাও হয়ে যায়। চারবছর পর ফের ২০১৮ সালে ওই আইন কলেজে ভর্তি হয়। কালীঘাটে পালান নামে এক যুবক ও কসবায় এক ছাত্রকে অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখায়। গত বছর টালিগঞ্জেও একই ধরনের অভিযোগ হয়। এছাড়া যৌন হেনস্তারও একটি অভিযোগ হয় তার বিরুদ্ধে। আলিপুর আদালতেও এক মহিলা আইনজীবীকে মারধরের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে উঠেছিল। মনোজিতেরই সঙ্গী ধৃত জায়েব আহমেদের কাকা তিলজলার বাড়িতে জানান, কলেজে যে এতবড় একটা ঘটনা ঘটেছে ও সেখানে সে হাজিরও ছিল, বাড়ি ফিরেও ঘুণাক্ষরে তা কাউকে বুঝতে দেয়নি সে। বৃহস্পতিবার সকালে মনোজিৎ মিশ্রর বাড়ি যায় সে। তবে জায়েব নির্দোষ এমনটাও দাবি করছে না পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের মতে, অপরাধ হতে দেখলে সেখানে চুপ থাকাটাও অপরাধের মধ্যে পড়ে। কিন্তু ঘটনার সময় জায়েবের কী ভূমিকা ছিল সেটা দেখা উচিত। এদিকে, অন্য অভিযুক্ত ছাত্র প্রমিত মুখোপাধ্যায়ের পরিবার এলাকায় সম্ভ্রান্ত বলে পরিচিত। তাঁদের ছেলে কীভাবে এই গণধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ল, তা নিয়ে ধন্ধে পরিবার। তাজ্জব এলাকাবাসীও।
ফোনের অপরপ্রান্তে হাউহাউ করে কাঁদছিল ছাত্রীটি। বলল, স্যর, আমায় প্রচণ্ড মেরেছে। সর্বস্ব লুঠ করেছে। আমি একটি মৃতদেহের মতো পড়ে ছিলাম। ওরা আমার উপর যা ইচ্ছা করেছে। কসবার আইন কলেজে গণধর্ষণের ঘটনার পর ঘরে ফিরে নির্যাতিতা ছাত্রী প্রথমেই ফোন করে একথা জানিয়েছিলেন তাঁর কলেজের অধ্যাপক-আইনজীবী অরিন্দম কাঞ্জিলালকে। অধ্যাপক বলেন, “ওর উপর নির্মম নির্যাতনের বিবরণ শুনে আমি টলে গিয়েছিলাম। আমার ছাত্রী ধর্ষণের শিকার মানে আমি বা আমার মতো শিক্ষকও ধর্ষণের শিকার। আইনি লড়াই কঠিন নয়, আবার যথেষ্ট কঠিন। আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব।” ঘটনার তদন্তে পুলিশ ও রাজ্য সরকারের প্রতি আস্থা রেখে অরিন্দম বলেন, “পুলিশ ও সরকারের ব্যবস্থাপনায় নির্যাতিতা সম্পূর্ণ নিরাপদে আছেন। পুলিশ তাকে যথেষ্ট সুরক্ষিত জায়গায় রেখেছে। অবশ্য আমি একথা ফাঁস করায় নিজে কতটা নিরাপদ তা জানা নেই।” নির্যাতিতার হয়ে সওয়াল করে অরিন্দমের দাবি, “মনোজিৎ অত্যন্ত প্রভাবশালী। তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যর সঙ্গে সরাসরি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল তাঁর। এ ছাড়াও দক্ষিণ কলকাতার একাধিক মন্ত্রী ও বিধায়কের কাছেও নিয়মিত যাতায়াত ছিল।” অরিন্দম বলেন, “একটা মানুষ ছাত্র না হয়েও দীর্ঘদিন ধরে এই কলেজে রাজ করছে কীভাবে? মনে করছে, দলীয় নেতাদের মদত থাকলে যা খুশি করা যায়। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তো এসব শেখাননি, এমন ঘৃণ্য কাজ করতে বলেননি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক কষ্ট করে এই দলটা দাঁড় করিয়েছেন, তিনি এমন খারাপ ঘটনার বিরুদ্ধে সব সময় ছিলেন, আজও আছেন। আমি নিজে তৃণমূল কংগ্রেস করি। আমাকে বা অন্যদেরও এমন কোনও কুকীর্তি করতে হয়নি।” এরপরই তিনি বলেন, “আমার ছাত্রীকে গণধর্ষিতা হতে হয়েছে। তাই যতদিন সে বিচার না পাচ্ছে, ততদিন আমি তার হয়ে লড়ব। শেষ দেখে ছাড়ব। ফোনে আমায় বলা হচ্ছে, তুমি মামলা লড়ছ কেন? আমি বলেছি, ছাড়ব না। অপরাধীদের পক্ষ নিয়েও ফোন এসেছে। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতি নয়। আমার ছাত্রী অত্যাচারিত হয়েছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।”
কসবা কাণ্ডে হস্তক্ষেপ জাতীয় মহিলা কমিশনের। শহরে এসে ল কলেজে যান মহিলা কমিশনের সদস্য অর্চনা মজুমদার। ঘুরে দেখেন ঘটনাস্থল। নির্যাতিতার সঙ্গে দেখা করতে না পেরে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কসবা গণধর্ষণ কাণ্ডে উত্তাল রাজ্য। সেই আবহে আজ, রবিবার শহরে এসে ল কলেজে গিয়ে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্যরা। ঘটনাস্থলে যান সদস্য অর্চনা মজুমদার-সহ আরও দুই জন। কিন্তু প্রথমে পুলিশ তাঁকে ঢুকতে বাধা দেয় বলে অভিযোগ। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মহিলা কমিশনের সদস্য ক্রাইম সিন পরিদর্শনের পাশাপাশি, ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও করতে চান। তা করা যাবে না বলে জানিয়ে দেয় পুলিশ। পরে ছবি না তোলার শর্তে তাঁকে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয়। তবে যে ঘরগুলি তদন্তের স্বার্থে বন্ধ করা হয়েছে তা খোলা হয়নি। ঘটনাস্থল ও কলেজ চত্বর ঘুরে দেখার পর নির্যাতিতার সঙ্গে দেখা করতে চান অর্চনা মজুমদার। পুলিশের তরফে জানানো হয়, নির্যাতিতার কোথায় তা তাঁরা জানেন না। এরপরই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অর্চনা। বলেন, “কমিশন নির্যাতিতার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তাঁকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। কিছু অসুবিধা হতে পারে বলেই লুকিয়ে রাখা হল। নির্যাতিতার পাশে সব সময় রয়েছে কমিশন।” শাসক দলের অভিযোগ, হাথরস, উন্নাও-সহ বিজেপি শাসিত রাজ্যে গণধর্ষণ বা ধর্ষণ হলে তখন জাতীয় মহিলা কমিশনকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কসবা কাণ্ডে পুলিশ সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তিন মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এক নিরাপত্তা রক্ষীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার তদন্তে সিট গঠন করা হয়েছে। কাউকে ছাড়া হবে না বলে জানিয়েছে শাসক দল তৃণমূল। মহিলা কমিশনের রাজ্যে আসা নিয়ে মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলেন, “জাতীয় মহিলা কমিশন নিরপেক্ষ সংস্থা। সেটা যেন রাজনীতির জায়গা না হয়ে ওঠে। ওদের বাংলায় আসতে ভালো লাগে আসুক। কাউকে বাধা দেওয়া হয়নি। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী কাউকে বাধা দেন না।”
কলেজকাণ্ডে নির্যাতিতার ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। গণধর্ষণে অভিযুক্ত তিন জনেরও ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। এই ডিএনএর নমুনা পরীক্ষা করা হবে। তার রিপোর্ট এই ঘটনার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন তদন্তকারীদের একাংশ। অন্য দিকে, কসবাকাণ্ডের তদন্তে যে সিট বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছিল, এ বার তার সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হল। আগে সিটের সদস্য সংখ্যা ছিল পাঁচ। এখন তা বৃদ্ধি পেয়ে হল নয়। যে চার জন নতুন যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে এক জন মহিলা সাব ইনস্পেক্টরও রয়েছেন। দক্ষিণ কলকাতার এক আইন কলেজে এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনায় এখনও পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছেন চার জন। শনিবার নির্যাতিতাকে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে এক আধিকারিক জানিয়েছেন, দু’ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ঘটনার পুনর্নির্মাণ হয়েছে কলেজ ক্যাম্পাসে। ঘটনার দিনের সাত ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশের হাতে এসেছে। সেখানে ধৃত চার জনকেই দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ, ঘটনাস্থলে চার জনের উপস্থিতি নিশ্চিত। বাকি বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কলেজে নির্যাতিতাকে নিয়ে দু’ঘণ্টা ধরে ঘটনার পুনর্নির্মাণ! ফুটেজে দেখা গিয়েছে ধৃত চার জনকেই। ঘটনার তদন্তের জন্য সিট গঠন করেছে কলকাতা পুলিশ। ওই তদন্তকারী দলের নেতৃত্বে রয়েছেন কলকাতা পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ শহরতলি) প্রদীপকুমার ঘোষাল। এ বার সেই সিটের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হল। প্রসঙ্গত, বুধবারের ওই ঘটনার পরের দিনই তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে পুলিশ। দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তালবাগান ক্রসিংয়ের সামনে থেকে। তৃতীয় অভিযুক্তকে ওই দিন রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ গ্রেফতার করে পুলিশ। নির্যাতিতা অভিযোগপত্রে এই তিন জনের নাম উল্লেখ করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, তিন জনের মধ্যে এক জন তাঁকে ধর্ষণ করেছেন। বাকিরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং এই কাজে সাহায্য করেছিলেন। কলেজের নিরাপত্তারক্ষীকে অভিযোগপত্রে ‘অসহায়’ বলে উল্লেখ করেছিলেন নির্যাতিতা। তাঁর কাছে সাহায্য চেয়েও পাননি বলে জানিয়েছিলেন। এই নিরাপত্তারক্ষীকে প্রথমে আটক করেছিল পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের পর শনিবার সকালে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এক পুলিশ আধিকারিক বলেন, ‘‘জিজ্ঞাসাবাদে অসংলগ্ন উত্তর দিচ্ছিলেন তিনি (রক্ষী)। বয়ানে অসঙ্গতি ছিল। কলেজ ক্যাম্পাসে যে সিসি ক্যামেরা রয়েছে, সেখান থেকে ঘটনার সময়ে তাঁর উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে।’’ পুলিশের সূত্রে খবর, রক্ষী তাঁর দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সে সময়ে তিনি একাই ডিউটিতে ছিলেন, না কি আর কোনও রক্ষী দায়িত্বে ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অভিযোগকারিণী এবং অভিযুক্ত তিন জনের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করা হল।
গণধর্ষণকাণ্ডে মূল অভিযুক্তের মোবাইল থেকে দেড় মিনিটের ভিডিয়ো ক্লিপ উদ্ধার। কসবা গণধর্ষণকাণ্ডে নির্যাতিতা নিজে অভিযোগ করেছিলেন অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র নাকি ঘটনার ভিডিয়ো করে রেখেছিল ব্ল্যাকমেইল করার জন্য। এখন মনোজিতের সেই ‘হাতিয়ার’ তারই বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে পুলিশ। রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ ইতিমধ্যেই মূল অভিযুক্তের মোবাইল ফোন থেকে দেড় মিনিটের একটি ভিডিয়ো ক্লিপ উদ্ধার করেছে। ভিডিয়োটির ফরেনসিক বিশ্লেষণ চলছে। গণধর্ষণের তদন্তে কলকাতা পুলিশের সহকারী কমিশনার দক্ষিণ শহরতলি ডিভিশন প্রদীপ ঘোষালের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল সিট গঠন করা হয়েছে ইতিমধ্যেই। সিট নির্যাতিতা এবং তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে একটি গোপন জবানবন্দি রেকর্ড করেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই নিয়ে সিটের তদন্তকারী এক অফিসার বলেছেন, ‘ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে, বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় মূল অভিযুক্ত নির্যাতিতাকে নির্যাতন করেছে। পারিপার্শ্বিক তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযোগটি প্রাথমিক ভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তবে এটি পূর্বপরিকল্পিত অপরাধ কিনা তা প্রমাণ করতে হবে।’ পুলিশ জানিয়েছে, মনোজিৎ, জাইব এবং প্রমিতকে সেই নির্যাতিতা বলেছিল যে তার প্রেমিক আছে। এরপরই অভিযুক্তরা নাকি হুমকি দেয় যে তারা নির্যাতিতার প্রেমিককে খুন করে সেই মামলায় নির্যাতিতার মা-বাবাকে ফাঁসিয়ে দেবে। এই ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে কলেজের সিসিটিভির হার্ডডিস্ক। পুলিশ জানিয়েছে, সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজ থেকে পাওয়া সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে ২৪ বছরের এক ছাত্রীর অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ জুন বিকেল সাড়ে তিনটে থেকে রাত ১০টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত সাত ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজে কলেজ চত্বরের চারপাশের গতিবিধি ধরা পড়েছে। নির্যাতিতা ছাত্রী জানিয়েছেন, গত ২৫ জুন দুপুর ১২টা ০৫ মিনিট নাগাদ তিনি কলেজে ঢোকেন। কলেজে কিছু কাজ মিটিয়ে ইউনিয়ন রুমে বসে ছিলেন তিনি। সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ তিনি বাড়ি যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করেন। তখন তাঁকে আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলেছিল অভিযুক্তরা। এরপর তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল দাপুটে টিএমসিপি নেতা। পরে ধর্ষণ করা হয়েছিল সেই ছাত্রীকে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ১০টা ৫০ মিনিট, প্রায় ৩ ঘণ্টা ২০ মিনিট ধরে কলেজের গার্ডস রুমে অকথ্য নির্যাতন চলে। ২৫ জুন এই ঘটনার পর নির্যাতিতা তরুণী কসবা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর শারীরিক পরীক্ষা করানো হয় পার্ক সার্কাসের কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে। এফআইআরে নাকি আবার সেই অভিযুক্তদের পুরো নাম লিখতে দেয়নি পুলিশ। অভিযোগ, নির্যাতিতার লেখার ওপর হোয়াইটনার চালানো হয়। তিন অভিযুক্তের নাম বলা হয়েছে – এম, পি, জে। এরই মধ্যে আবার ধর্ষণের শিকার ছাত্রীর মেডিক্যাল রিপোর্ট সামনে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই ছাত্রীর গলায় কামড়ের দাগ রয়েছে। যৌনাঙ্গ ক্ষত রয়েছে। শরীরের অন্যান্য জায়গায় মারধরের দাগও দেখা গিয়েছে। মেডিক্যাল রিপোর্টে স্পষ্ট যে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন সেই অভিযোগকারী তরুণী।
কসবার আইন কলেজে গণধর্ষণকাণ্ডে ধৃত ‘পি’ (পুলিশের খাতায় কোডনেম) হাওড়ার চ্যাটার্জিহাট থানার বাসিন্দা। এলাকায় তিনি বেশ পরিচিত। ধর্ষণের ঘটনায় তাঁর নাম জড়ানোর প্রতিবেশীরা অবাক। গত বৃহস্পতিবার ‘পি’ গ্রেফতার হন। তার পর এই প্রথম বার তাঁকে নিয়ে বাড়িতে যায় পুলিশ। জানা যাচ্ছে, বাড়িতে বেশ কিছু ক্ষণ তল্লাশি চলে। বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলে পুলিশ। তার পর বেশ কিছু নথি উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছেন তদন্তকারীরা। ধৃত যুবককে নিয়ে পুলিশ যখন গাড়িতে ওঠে ভিড় জমে যায় আশপাশে। বস্তুত, ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ হাতে পেয়েছে পুলিশ। সেখানে ধৃত ‘পি’ উপস্থিত ছিলেন বলেই জানা গিয়েছে। প্রতিবেশীরা জানাচ্ছেন, ‘পি’ বরাবরই পড়াশোনায় ভাল। হাসিখুশি তরুণ। তাঁর সম্পর্কে এর আগে খারাপ কিছু কেউ শোনেননি। এক প্রতিবেশীর কথায়,‘‘তবে যে অপরাধ ও করেছে বলে অভিযোগ,তা যদি সত্যি হয়, কঠোর শাস্তি হোক। দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’’ ‘পি’-র বাড়ির কেউ কোনও প্রতিক্রিয়া দিতে রাজি হননি। কসবার ল কলেজে গণধর্ষণ কাণ্ডে গ্রেফতার হয়েছেন চার জন। ধৃতদের মধ্যে মূল অভিযুক্ত ‘এম’ (নামের আদ্যক্ষর)। তিনি কলকাতার বাসিন্দা। বাকি দু’জনের মধ্যে ‘জে’-ও কলকাতার। ‘পি’-র বাড়ি হাওড়া। গ্রেফতার হয়েছেন কলেজের এক রক্ষীকে ‘অসহায়’প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন ‘নির্যাতিতা।’ গত শনিবার ‘নির্যাতিতা’কে কলেজে নিয়ে গিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)। গণধর্ষণে অভিযুক্ত তিন জনের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তা ছাড়া সিট-এর সদস্য সংখ্যা পাঁচ থেকে বেড়ে নয় হয়েছে। যে চার অফিসারকে যুক্ত করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে এক জন মহিলা সাব-ইনস্পেক্টর।




