বড়বাজারে হোটেলে অগ্নিকাণ্ড। ঠিক তার পরেই চিনার পার্কের রেস্তোরায়। এর আগেও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের শিকার কলকাতা। একের পর এক আগুন লাগার ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে কলকাতার বাসিল্দারা। বড়বাজারে হোটেলে অগ্নিকাণ্ড ঘটনায় অভিযুক্ত হোটেলের দুই মালিক দুই ভাই আকাশ এবং অতুল চাওলা। কে কলকাতা পুলিশ দুজনের খোঁজে দৌড়েছিল হাওড়ায়। মেছুয়া ফলপট্টিতে অগ্নিকাণ্ডের রেশ এখনও মেটেনি। এরই মধ্যে ফের অগ্নিকাণ্ড শহরে। চিনার পার্কের একটি রেস্তরাঁয় আগুন লেগে যায়। মুহূর্তেই কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় গোটা এলাকা।
মেছুয়া বাজারের একটি হোটেলে বিধ্বংসী আগুন লাগে। মৃত্যু কমপক্ষে ১৪ জনের। তার মধ্যে শিশুও রয়েছে। গোটা ঘটনার তদন্তে সিট গঠন করেছে কলকাতা পুলিশ। মৃতদের পরিবারপিছু ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ২ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণের কথা ঘোষণা করেছেন। চিনার পার্কের একটি রেস্তরাঁয় আগুন লেগে যায়। মুহূর্তেই কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় গোটা এলাকা। খবর পেয়ে তড়িঘড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দমকলের একটি ইঞ্জিন। যদিও কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। দমকলের পাশাপাশি ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বাগুইআটি থানার পুলিশ। গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দমকল এবং পুলিশ আধিকারিকরা। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি। প্রাথমিক অনুমান, রেস্তরাঁর বেশিরভাগ সামগ্রীই পুড়ে গিয়েছে। হতাহতের খবর নেই।
বড়বাজারের মেছুয়ার ফলপট্টির হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে হোটেলের সুরক্ষা ব্যবস্থায় নানা গাফিলতি প্রকাশ্যে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, হোটেলে দাহ্য পদার্থ মজুত ছিল। হোটেলের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন। বুধবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দমকলের ডিজি রণবীর কুমার জানান, ওই হোটেলের ‘ফায়ার লাইসেন্স’-এর মেয়াদ শেষ তিন বছর আগেই। আর নবীকরণ করাননি হোটেল কর্তৃপক্ষ। হোটেলে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকলেও অগ্নিকাণ্ডের সময় সেটি কাজ করেনি। দমকলের প্রাথমিক অনুমান, আদৌ অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা কার্যকর ছিল না ওই হোটেলে। দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় হোটেলে ‘ফায়ার অ্যালার্ম’ বাজেনি। প্রাথমিক তদন্তের পর দমকল আধিকারিকেরা মনে করছেন, হোটেলের দোতলায় প্লাইউডের কাজ চলছিল। দোতলা থেকেই আগুন এবং ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়া ক্রমশ উপরের দিতে উঠতে থাকায় তিনতলা কিংবা চারতলায় থাকা আবাসিকেরা হোটেলের নীচে নামতে পারেননি। প্রশ্ন উঠেছে, উপরের তলাগুলিতে থাকা জানলা দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে পারল না। হোটেলটিতে কেন্দ্রীয় বাতানুকূল ব্যবস্থা বা সেন্ট্রাল এসি নেই। তা সত্ত্বেও কেন অধিকাংশ জানলা বন্ধ ছিল কেন?
হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগও দায়ের করেছে দমকল। ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই সিট গঠন করেছে লালবাজার। কলকাতা পুলিশের ডিসি সেন্ট্রালের নেতৃত্বে ১১ জনের দলের ঘটনার তদন্ত শুরু। বড়বাজার অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে রাজ্য। মৃতদের পরিবার পিছু ২ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আহতদের পরিবার পিছু ৫০ হাজার টাকা। দমকলের ১০টি ইঞ্জিন। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চেষ্টা করেন কর্মীরা। হোটেলে কমপক্ষে ৪২ টি ঘর ছিল। অধিকাংশতেই ছিল না জানলা। ফলে ধোঁয়ায় বাড়ে বিপত্তি। একদিকে ভিতরে থাকা আবাসিকরা আটকে প্রায় আট ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। হাইড্রোলিক ল্যাডার দিয়ে ২৫ জনকে উদ্ধার করা হয়। এদিকে আতঙ্কে একজন কার্নিশ থেকে ঝাঁপিয়ে দিয়ে নামার চেষ্টা করার ফলে পড়ে মৃত্যু। দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয় আরও ১৩ জনের। জখম ১২ জন।
বড়বাজারের অগ্নিকাণ্ডে হোটেল মালিক আকাশ চাওলা ও ম্যানেজার গৌরব কাপুরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিলেন হোটেল মালিক ও ম্যানেজার। দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করে দমকল। পাশাপাশি, পুলিশও সুয়ো মোটো স্বতঃপ্রবৃত্ত অভিযোগ দায়ের করে। সেই দুই অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের হয়। ম্যানেজার গৌরবকে বুধবারই জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। মালিক ও ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করা হল। তাদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত খুন–সহ একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। মৃত ১৪ জনের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় জানা গিয়েছে। প্রায় সকলেই ভিনরাজ্যের বাসিন্দা। ময়নাতদন্তের পর দেহগুলি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মানুষের জীবনের স্বার্থে, সবকিছুর উর্দ্ধে উঠে, কিছুদের জন্য যাঁরা বাড়িতে রয়েছেন অন্যত্র সরিয়ে বাড়িগুলির সংস্কারে সুবিধা করে দিতে হবে। আমরা তো বলছি না কাউকে ছেড়ে দিতে হবে। আপনাদেরও শুনতে হবে। আপনাদের জমি, ঘর নিয়ে সমস্যা থাকতে পারে, বাড়ির মালিকের সঙ্গে ভাড়াটিয়ার সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু আপনাদের বুঝতে হবে এটি জীবন-মরণের প্রশ্ন। যদি ভাল ভাবে জীবনে বাঁচতে চান, তা হলে যাঁরা সশরীরে এখানে বাস করেন, তাঁদের সঙ্গে পুলিশ-পুরসভা কথা বলবে। কোন কোন মালিক তিনজনকে একই সম্পত্তি বিক্রি করে দেন। দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু, কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা, মন্ত্রী শশী পাঁজাকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান মুখ্যমন্ত্রী। এতোকিছুর পর একই প্রশ্ন উঠছে বারবার কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কেন?




