অঙ্কিত চট্রোপাধ্যায় : বাংলার হকিতে আবার নতুন ভোরের আলো ফোটার আভাস। অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিলেন মোহনবাগানের কর্মসমিতির এক সদস্য। রবিবার বিকেলে হাওড়ার ডুমুরজলায় নবগঠিত অ্যাস্ট্রো টার্ফে স্টেডিয়ামের ঘটনা। মোহনবাগানের ছোট-বড় কর্মকর্তারা অনেকে অনেক বিতর্কে জড়িয়েছেন। রবিবাসরীয় হকিতে মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত মোহনবাগানের এক কর্মসমিতির কর্তার কুৎসিত ভাষায় হকি বেঙ্গলের সচিব ইস্তিয়াক আলিকে গালিগালাজ বেশ বেদনাদায়ক বলে মনে করছেন খোদ সমর্থকরাই। মোহনবাগানের কর্মসমিতি সদস্যের প্রকাশ্যে গালিগালাজ স্তম্ভিত করেছে উপস্থিত অনেককেই। রাজ্য হকি সংস্থার সচিব ইস্তিয়াক নীরবে চোখের জলও মুছলেন অশ্লীল গালিগালাজে বিমর্ষ হয়ে। ইস্তিয়াকের অনুরোধেই হকি ফাইনালে হাজির ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলির মতো কিংবদন্তি তারকা ক্রিকেটার। গুরবক্স সিংয়ের মতো কিংবদন্তি হকি তারকা। হকি ফাইনালের আয়োজন অনেকটা হকি ইন্ডিয়া লিগের মতোই। আকর্ষণে কয়েক হাজার দর্শক হাজির ডুমুরজলার মাঠে।

ময়দান বলছে ইস্তিয়াক অর্থাৎ মিঠু, এই মুহূর্তে বাংলার খেলাধুলোর সবচেয়ে সফল কর্তা। বাংলার হকিকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার জন্য তাঁর লড়াইকে কুর্ণিশ করছেন রাজ্যের প্রাক্তন সফল কর্তারা। প্রাক্তন হকি তারকা ও সংগঠক গোপীনাথ ঘোষের কথায়, ‘মিঠু যে ভাবে হকির জন্য কাজ করছে, তা দেখে আমি মুগ্ধ। ওর পাশে সবাই থাকলে বাংলার হকির সুদিন ফিরে আসবেই।’ অথচ সেই মিঠুকেই এ দিন কাঁদতে হলো হকি মাঠে দাঁড়িয়ে। কলকাতা হকি লিগের প্রিমিয়ার ডিভিশনের ফাইনালে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচের পরে। কেন ইস্তিয়াককে গালিগালাজ শুনতে হলো? ইস্টবেঙ্গলকে ৩-১ গোলে হারিয়ে হকি লিগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরে মাঠের ভিতরে আসতে চেয়েছিলেন মোহনবাগানের সচিব দেবাশিস দত্ত। তাঁকে মাঠে ঢোকার অনুমতি দিলেও বাকি গোটা ২৫-৩০ জন কর্তাকে মাঠে ঢুকতে দিতে রাজি ছিলেন না হকি কর্তারা। দেবাশিস দাবি করেন, তাঁর ফুটবল সচিব, হকি সচিব সহ কর্মসমিতির সদস্যদের ঢুকতে দিতে হবে। বড় ক্লাবের এই আবেগটা বুঝতে হবে। কিন্তু হকি কর্তারা তা মানতে চাননি। কারণ এত মানুষ মাঠে নেমে পড়লে মূল্যবান অ্যাস্ট্রো টার্ফ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।

তারপরেই জোর করে মাঠে ঢুকে মোহনবাগানের ওই মনোনীত কর্মসমিতির (আগের বার ক্লাবে নির্বাচন হয়নি। মনোনয়ন হয়েছিল) সদস্য গালিগালাজের ফুলঝুরি ফোটাতে থাকেন। পুলিশ এসে ওই কর্তাকে বিরত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওই কর্তা চিৎকার করে বলেন, ‘গালাগালি করবো নাতো কী হরিনাম করব?’ এ সময় মাঠে ঢুকে পড়েন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও আর এক মন্ত্রী সুজিত বসু। অরূপবাবু মাইক হাতে নিয়ে সবাইকে মাঠ ছাড়ার অনুরোধ করেন অ্যাস্ট্রো টার্ফ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা তুলেই। সে সময় মোহনবাগান সচিবকে দেখা যায়, ওই কর্তাকে মাঠের বাইরে বের করে দিতে। মোহনবাগানের হকি সচিব শুভাশিস পাল গিয়ে মিঠুর কাছে দুঃখপ্রকাশ করেন। সেই কথায় হকি সচিবের অভিমান কমেনি। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলতে থাকেন, ‘মোহনবাগানের মতো ক্লাবের কোনও কর্তার থেকে এমন কুৎসিত আচরণ আশা করিনি। আমার সম্মান মাটিতে মিশে গেল।’ কিছুটা দূরে দাঁড়ানো দেশের হকির কিংবদন্তি গুরবক্স সিংয়েরও তখন মাথা হেঁট। নব্বইয়ে পা রাখতে চলা গুরবক্স বলছিলেন, ‘ইস্তিয়াকের এই অপমান তো আমাদের সকলের অপমান। হকি কর্তারা তো সবাইকে মাঠে ঢুকতে না দিয়ে ভুল করেনি।’ আসল কথা হকির বর্তমান সচিব ইস্তিয়াক সকলের কাছেই এখন ভীষণ গ্রহণযোগ্য। হকির ক্রমশ তলিয়ে যাওয়া এখন অতীত হতে চলেছে। বাংলা হকির উত্থানে বেশ চমক। ডেকার্স লেনের অত্যন্ত পুরোনো এক বাড়ির তিন তলার অফিস ঘর থেকে বেঙ্গল হকির অফিস উঠে এসেছে রেড রোডের ধারে ঝাঁ চকচকে তাঁবুতে। তাঁবু সলগ্ন মাঠ। জেলা পর্যায় থেকে প্রচুর টুর্নামেন্ট আয়োজন। হাওড়ার অ্যাস্ট্রো টার্ফে বহু সমস্যা কাটিয়ে হকি লিগের আয়োজন। সব রকমের সাফল্যে ভরা যজ্ঞের আসল পুরোহিত ইস্তিয়াকই।বাংলার হকি ঘুরে দাঁড়ানোর সূচনায় বেঙ্গল হকির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট স্বপন (বাবুন) বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় অবদান ছিল। এখন সেই কাজটা এগিয়ে নিয়ে চলেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট দমকলমন্ত্রী সুজিত বসুও। মোহনবাগানের পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত কর্তার গাত্রদাহের আসল কারণ অবশ্য এই স্বপন-সুজিতেই। স্বপন ঘনিষ্ঠ ওই কর্তা এখনও কিছুতেই মানতে পারছেন না নতুন প্রেসিডেন্টকে। ময়দানের খবর, সুজিত বসুর প্রেসিডেন্ট হওয়ার পিছনে বড় হাত ইস্তিয়াকের। রবিবার সুযোগ পেয়েই সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত কর্তা পুরোনো রোষ মিটিয়ে নিলেন বলে অভিযোগ। মোহনবাগানের কর্মসমিতির একজন কর্তা পদে অধিষ্ঠিত থেকে ক্লাবকে কলঙ্কিত করার অধিকার আছে কিনা তা ভেবে দেখা উচিৎ ছিল বলে মনে করে ক্রীড়ামহল।

কলকাতা হকি লিগ চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান। কলকাতা প্রিমিয়ার হকি লিগের খেতাবি লড়াইয়ে রবিবাসরীয় ডার্বিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গলকে ৩-১ গোলে হারায় সবুজ মেরুন বাহিনী। হাওড়ার ডুমুরজলা স্পোর্টস কমপ্লেক্সে ম্যাচে ব্যাপক উন্মাদনা সমর্থকদের। বেঙ্গালুরুতে ভারতীয় হকি দলের প্রস্তুতি শিবিরে যোগদান করা পাঁচ নিয়মিত খেলোয়াড়কে বাদ দিয়েই মাঠে নেমেছিল মোহনবাগান। আন্ডার ডগ হিসেবেই শুরু করে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই প্রথম পেনাল্টি কর্নার থেকে মোহনবাগান এক গোলে এগিয়ে যায়। দ্বিতীয় কোয়ার্টারের ১১ মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাকে গোল করেন কার্তি সেলভম। তৃতীয় কোয়ার্টারের ৪ মিনিটের মধ্যেই পেনাল্টি কর্নার পায় লাল-হলুদ বাহিনী। ইস্টবেঙ্গলের পক্ষে গোল করেন জাহির। চতুর্থ কোয়ার্টারে ৫ মিনিটের মধ্যে রাহিল মুশির গোলে মোহনবাগান চ্যাম্পিয়ন। ১৯৩৫ সালে মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব প্রথমবার কলকাতা হকি লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এইবছর মোহনবাগান ক্লাবের ২৭তম খেতাব জয়। চ্যাম্পিয়ন দল মোহনবাগান হকি প্লেয়ারদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার মূল্যের ৩ লক্ষ টাকা। রানার্স দলের জন্য ২ লক্ষ টাকা। সর্বোচ্চ গোলদাতা মোহনবাগানের আভারণ সুদেব। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় ইস্টবেঙ্গলের অটল দেব সিং। রবিবার দুপুরে ডুমুরজলা স্টেডিয়ামে ছিল ফাইনাল। ডার্বি বলেই প্রচুর সমর্থক হাজির হয়েছিলেন। হাজির ছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং হকি বেঙ্গলের সভাপতি সুজিত বসু। মোহনবাগানের বিদায়ী সচিব দেবাশিস দত্ত বলেন, “২২ বছর পর হকির দল নামিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। গত বছর রানার্স হওয়ার পর এ বার আবার চ্যাম্পিয়ন। গত কাল শুনলাম কোনও এক কর্তা বলেছেন, তাঁরা ক্রিকেট, হকি সবেতে মোহনবাগানকে হারাচ্ছেন। শুধু আইএসএলে পারছেন না। পরের দিনই মোহনবাগান হকিতেও ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে দিল। এই জন্যই আগে থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করতে নেই।” মোহনবাগানের কোচ সিমরনজিৎ সিং বলেন, “দলের মধ্যে একতা থাকার জন্যই আমরা জিতেছি। মাঠ নয়, মাঠের বাইরেও একতা রয়েছে। কোচের কাজই হল ক্রীড়াবিদের মধ্যে চ্যাম্পিয়নের মানসিকতা তৈরি করা। সেটা পেরেছি বলেই ট্রফি জিতেছি। ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে ঘরোয়া হকি লিগ চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান ক্লাব তাঁবুতে ক্লাবের পতাকা উত্তোলন। চ্যাম্পিয়ন কোচ-খেলোয়াড়দের দেড় লক্ষ টাকা ‘ইনসেনটিভ’ ঘোষণা ক্লাবের তরফে। গত তিন মরশুমে ঘরোয়া হকি লিগে দু’বার চ্যাম্পিয়ন, একবার রানার্স মোহনবাগান। মোহনবাগানের হকি কর্তারা চাইছেন ফুটবল ক্রিকেটের মতো হকিরও ‘গ্রাসরুট’ পর্যায়ে কাজ করা। দেবাশিস দত্তরা চাইছেন ঘরোয়া লিগের সব ম্যাচই হোক অ্যাস্ট্রোটার্ফের মাঠে। লনেই রাখা সদ্য চ্যাম্পিয়ন হওয়া লিগের ট্রফিটি।
ছবি সৌজন্য : হকি বেঙ্গল