Wednesday, March 18, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

নেই তারকা-চমক! ‘নতুন’ পথে তৃণমূলের পদক্ষেপ! প্রার্থী তালিকায় রাজনীতিকদের নাম বাড়িয়ে দিলেন মমতা-অভিষেক

দেড় দশকেরও বেশি সময় পরে বড় কোনও নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় নেই কোনও তথাকথিত ‘তারকা চমক’। বিধানসভা নির্বাচনের জন্য রাজ্যের ২৯১টি কেন্দ্রের(পাহাড়ের তিনটি আসন তৃণমূল ছেড়ে রেখেছে অনীত থাপাদের জন্য) প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই তালিকায় নতুন কোনও তারকার নাম নেই। বারাসত এবং উত্তরপাড়ায় দুই অভিনেতা চিরঞ্জিত চক্রবর্তী এবং কাঞ্চন মল্লিককে টিকিট দেওয়া হয়নি। অনেক নতুন মুখকে প্রার্থী করা হয়েছে, যাঁরা আপাদমস্তক ‘রাজনৈতিক’। তৃণমূলের প্রার্থিতালিকায় দলের অন্দরে এই বার্তা পৌঁছে যে, খ্যাতনামীরা পুরস্কারে ভূষিত থাকবেন, রাজনীতিকেরা থাকবেন রাজনীতিতে। সেই বিভাজনরেখা তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বাস্তবে অন্যকিছু ঘটেনি। নতুন কোনও তথাকথিত ‘তারকা’ বা ‘খ্যাতনামী’ যেমন তৃণমূলের প্রার্থী হননি, তেমনই পুরনো মুখ কয়েক জনের আসন বদলে দেওয়া হয়েছে। গত বার পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুর থেকে জয়ী অভিনেতা সোহম চক্রবর্তীকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে নদিয়ার করিমপুরে। প্রাক্তন ফুটবলার বিদেশ বসুকে প্রার্থী করা হয়েছে হুগলির সপ্তগ্রামে। দলিত সাহিত্যিক মনোরঞ্জন ব্যাপারী টিকিট পাননি। বাদ প্রাক্তন ক্রিকেটার তথা মন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি। পুরনো কেন্দ্রেই প্রার্থী করা হয়েছে অভিনেত্রী লাভলি মৈত্র, সঙ্গীতশিল্পী অদিতি মুন্সিকে। প্রাক্তন ক্রিকেটার শিবশঙ্কর পাল এবং ক্রীড়াবিদ স্বপ্না বর্মণকে প্রার্থী করা হয়েছে। এই দু’জন ‘তারকা’ হিসাবে প্রার্থী নন, মনোনয়নে জুড়ে ‘স্থানীয় সমীকরণ’। তুফানগঞ্জের ভূমিপুত্র শিবশঙ্কর ও নিজের এলাকা জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জে প্রার্থী করা হয়েছে স্বপ্নাকে।

তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেকই তথাকথিত ‘টলিউড তারকা’-দের প্রার্থী করার বিষয়ে গররাজি। কারণ, সিংহভাগ নিজের কেন্দ্রে সময় দিতে পারেন না। সময় দিতে পারেন না আইনসভাতেও। লোকসভা ভোটের সময় অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তী এবং নুসরত জাহানের দৃষ্টান্ত। নতুন তারকা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। খ্যাতনামীদের মধ্যে রাজনীতিতেই বেশি সময় অতিবাহিত করার কারণে শতাব্দী রায় বা সায়নী ঘোষের টিকিট পেতে অসুবিধা হয়নি। অভিষেকের বিশ্বাস, রাজনীতি কোনও মামুলি বিষয় নয়। তারকাদের চাকচিক্যে রাজনীতির মৌলিক বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। আবার তারকা বলেই যে তাঁকে দূরে সরিয়ে রাখবেন, এই মনোভাবও নেই। যে কারণে, শতাব্দী রাজনীতির প্রতি নিষ্ঠা প্রমাণ করেই লোকসভায় তৃণমূলের উপদলনেত্রী হয়েছেন। মানুষের দৈনন্দিন কাজে এক জন রাজনীতিক জনপ্রতিনিধি থাকলে যে পরিষেবা দেবেন, তারকাদের থেকে সেটা পাওয়া যায় না। তারকা হওয়া সত্ত্বেও তৃণমূলে অনেকেই মন দিয়ে রাজনীতি করছেন। শতাব্দীর পরে তেমন উদাহরণ জুন মালিয়া। বিধানসভা থেকে তুলে নিয়ে সোজা লোকসভায়।

প্রার্থীতালিকায় সমান্তরাল বার্তা দেওয়া হয়েছে রাজনীতিকদের প্রার্থী করে। রাজ্যসভায় আবার না-পাঠিয়ে বিধানসভায় প্রার্থী। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে টিকিট দেওয়া হয়েছে উলুবেড়িয়া পূর্ব গ্রামীণ আসনে। সেই আসন থেকে সরিয়ে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে প্রাক্তন ফুটবলার বিদেশকে। নোয়াপাড়ায় প্রার্থী তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য দিনভর সংগঠন নিয়েই থাকেন। বারাসতে চিরঞ্জিতের আসনে সব্যসাচী দত্ত। সব্যসাচীও ‘রাজনীতিক’। বারাসতে পাঠানোর নেপথ্যে ভিন্ন সমীকরণ। সব্যসাচী বিধাননগরের মেয়র ছিলেন। এখন পুরনিগমের চেয়ারম্যান। বিধাননগরের বিধায়ক তথা মন্ত্রী সুজিত বসুর সম্পর্ক ‘মধুর’। সব্যসাচী এর মধ্যে বিজেপি থেকে তৃণমূলে ফেরায় সব্যসাচীকে বারাসতে প্রার্থী করে বিধাননগরে একদিকে যেমন সুজিতের জন্য নিরাপদ মাঠ তৈরি করে দেওয়া হল। গত লোকসভা ভোটের নিরিখে সুজিত বিধাননগরে ১১ হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিলেন। অন্য দিকে সব্যসাচীকে পুনর্বাসনও দেওয়া হল। বীরভূমের জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখকে হাসন থেকে প্রার্থী করা হয়েছে। বীরভূমের প্রার্থিতালিকায় বিরাট বদল হয়নি। কাজলের অন্তর্ভুক্তি এবং সিউড়ির বিদায়ী বিধায়ক বিকাশ রায়চৌধুরীকে টিকিট না-দেওয়া ‘তাৎপর্যপূর্ণ’। জেলার রাজনীতিতে এক দিকে কাজল যেমন অনুব্রত মণ্ডলের বিরোধী বলে পরিচিত, তেমনই বিকাশের পরিচয়, তিনি ‘কেষ্টদার লোক’। বীরভূমের রাজনৈতিক সমীকরণে কাজলের পাল্লা ভারী হল বলেই মনে করা হচ্ছে।

রাজনীতিকদের মধ্যে আরও কয়েক জন উল্লেখযোগ্য ভাবে টিকিট পেয়েছেন। ২০১৬ সালে বাঁকুড়ার তালড্যাংরা থেকে জিতেছিলেন সমীর (বুয়া) চক্রবর্তী। তিনি ঘটনাচক্রে বিধাননগরের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তীর স্বামী। পুরোদস্তুর রাজনীতিক। সুবক্তা বলে পরিচিত। কিন্তু খানিকটা ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে সমীর ২০২১ সালে ভোটে দাঁড়াতে চাননি। এমন একটি আসন চেয়েছিলেন, যাতে কলকাতা থেকে এক দিনে যাতায়াত করা যায়। গত ভোটে তাঁর জন্য তেমন আসন খুঁজে না-পাওয়া গেল‌েও এ বার তাঁকে হুগলির পাণ্ডুয়ায় প্রার্থী করা হয়েছে। সল্টলেক থেকে পান্ডুয়ার দূরত্ব ৭৫ কিলোমিটার। কলকাতার তৃণমূল কাউন্সিলর তথা বাম আমলের পূর্তমন্ত্রী প্রয়াত ক্ষিতি গোস্বামীর জ্যেষ্ঠ কন্যা বসুন্ধরা গোস্বামীকে পূর্বস্থলী উত্তরে প্রার্থী করা হয়েছে। তিনিও পুরোদস্তুর রাজনীতিক। কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলরও বটে। ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে শতাব্দী ও অধুনাপ্রয়াত তাপস পালকে প্রার্থী করে তৃণমূলে ‘তারকা সংস্কৃতি’ শুরু করেছিলেন স্বয়ং মমতা। ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘিতে তদানীন্তন মন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দেবশ্রী রায়কে প্রার্থী করে চমক দিয়েছিলেন তৃণমূলনেত্রী। ‘পরিবর্তনের হাওয়ায়’ কান্তিকে হারিয়েও দিয়েছিলেন দেবশ্রী। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দেব, সন্ধ্যা রায়, মুনমুন সেনকে প্রার্থী করেছিলেন মমতা। তিন জনেই জিতেছিলেন। গায়ক ইন্দ্রনীল সেন হেরে গিয়েছিলেন বহরমপুরে অধীর চৌধুরির বিরুদ্ধে। পরে ২০১৬ সালে তাঁকে চন্দননগর বিধানসভায় প্রার্থী করা হয়। জিতে পর পর দু’বার তিনি মন্ত্রী হয়েছেন। এ বারও তিনি সেখানেই প্রার্থী। ২০১৬ সালেই প্রথম বার সোহম তৃণমূল প্রার্থী হিসাবে লড়েছিলেন বাঁকুড়া থেকে। কিন্তু তাঁকে সে বার হারতে হয়েছিল। আবার প্রাক্তন ক্রিকেটার লক্ষ্মীরতন শুক্ল জিতে মন্ত্রী হয়েছিলেন সে বারই। প্রাক্তন ফুটবলার রহিম নবি প্রার্থী হয়েছিলেন পাণ্ডুয়ায়। কিন্তু তিনি হেরে যান। ২০১৯ সালের লোকসভায় তৃণমূলের প্রার্থিতালিকায় ‘চমক’ ছিলেন বসিরহাটে নুসরত এবং যাদবপুরে মিমি। ২০২১ সালের বিধানসভায় জুন, কৌশানী মুখোপাধ্যায়, লাভলি, কাঞ্চন, অদিতিদের প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের পর থেকেই তৃণমূলের সংগঠনের বিষয়টি মূলত দেখেন অভিষেক। সাংগঠনিক স্তরে তিনি নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার বিষয়ে আগ্রহী। কখনও তা পেরেছেন, কখনও তাঁকে থমকে যেতে হয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে থেকেই অভিষেক ‘নতুন তৃণমূল’-এর কথা বলছেন। দেড় দশকের বেশি সময় পরে ‘তারকা চমক’ ছাড়া প্রার্থিতালিকা এবং রাজনীতির নতুন মুখে জোর দেওয়াকে সার্বিক ভাবে ‘নতুন’ তৃণমূলের পথে পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন ‌অনেকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles