‘আন্দোলনেই আমার জন্ম।’ ব্রহ্মাস্ত্রের নাম ধর্না। ধর্মতলায় মমতার ধর্না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসআইআর যুদ্ধে আন্দোলনের ব্রহ্মাস্ত্রটি প্রয়োগ। মমতা জানিয়ে দিয়েছেন, শনিবার ফের সকাল ১০টা থেকে কর্মসূচি শুরু। এর আগের দু’বারও মমতা মঞ্চে পর্দা টাঙিয়ে রাত্রি কাটিয়েছিলেন মেট্রো চ্যানেলে। এ বারেও তার অন্যথা হল না। দীর্ঘ চার দশক ধরে পক্ষে বা বিপক্ষে দু’দিক থেকেই তাঁর আন্দোলনের নানা ধারা দেখেছেন পশ্চিমবঙ্গবাসী। ধর্মতলায় ধর্না। দু’দশক আগে সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনের সময়ে এই ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলেই ২৬ দিন অনশন করেছিলেন মমতা। চলমান এসআইআর-পদ্ধতি বিরোধী আন্দোলনে সেই প্রসঙ্গ ফিরে এল মঞ্চে এবং জমায়েতেও। জয় গোস্বামী থেকে কবীর সুমনেরা সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় থেকেই ছিলেন মমতার পাশে। এবারও হাজির ছিলেন কবি এবং সঙ্গীতকার-গায়ক। দু’জনের কথাতেই ফিরে ফিরে এল সিঙ্গুরের দিনগুলি। আমৃত্যু মমতার সঙ্গে থাকা অধুনা প্রয়াত মহাশ্বেতা দেবী বা গায়ক প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের নামও। জমায়েতে দু’দশকের ব্যবধানে দুই ধর্নায় সেতুবন্ধন করলেন সিঙ্গুর থেকে আসা বছর ৫৫-র দিগন্ত সাঁতরার কথায়, ‘‘সে দিন জমির জন্য দিদির পাশে ছিলাম। আজ ভোটাধিকারের জন্য আছি। অনেকে দিদির হাত ছেড়েছে। আমি ছাড়িনি। ছাড়বও না।’’
শুক্রবার ধর্না শুরু। মেট্রো চ্যানেলে ঠাসা জমায়েত। বিকাল ৫টার পর থেকে সেই ভিড় কিছুটা পাতলা। জমায়েতে তরুণ ও মহিলাদের উপস্থিতি। এর আগে দু’বার ধর্মতলায় ধর্না করেছিলেন মমতা। দু’বারই পৌঁছেছিলেন ইপ্সিত লক্ষ্যে। সিঙ্গুর আন্দোলনে তাঁর রাজনৈতিক এবং আইনি জয় সর্বজনবিদিত। পরবর্তীতে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে ২০১৯ সালে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে সিবিআই হানার প্রতিবাদে ধর্নায় বসেছিলেন। সেই মামলাতে একটা সময়ের পর থেকে রাজীবকে সেই অর্থে কোনও ঝক্কি পোহাতে হয়নি। এ বার এসআইআর আন্দোলনে সেই ধর্মতলাতেই ধর্নার ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করলেন তৃণমূলনেত্রী। সিঙ্গুরের সময়ে মমতা যখন অনশন করেছিলেন, তখন তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর বিরোধী নেত্রী। রাজীবের বেলায় মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী হিসাবে বাহিনীর পাশে দাঁড়াতে ধর্নায় বসেছিলেন। সঙ্গে ছিল ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের’ আখ্যান তুলে ধরার কৌশলও। এ বার মুখ্যমন্ত্রী হয়েও মমতা নিজেকে ‘বিরোধী নেত্রী’ হিসাবেই উপস্থাপিত করতে চাইছেন এবং তিনি সে চেষ্টায় সফল বলেই অনেকে মনে করছেন। মূল নির্বাচনী প্রতিপক্ষ বিজেপির সঙ্গে তিনি জুড়ে নিয়েছেন নির্বাচন কমিশনকেও। কেন মমতাকে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করতে হল? অনেকের মতে, ভোটারদের নাম কাটা, আসনওয়াড়ি হিসাব, সংখ্যালঘু ভোটের নানাবিধ সমীকরণ এমন ভাবে আবির্ভূত হয়েছে, তাতে তৃণমূলের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যদিও ধর্নামঞ্চের প্রথম দিনের বক্তৃতায় তৃণমূলের সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ফের এক বার দাবি করেছেন, ‘‘এক বছর আগে যা বলেছিলাম, আজও তা-ই বলছি। এ বার তৃণমূলের ভোট এবং আসন দুই-ই বাড়বে। বিজেপি-কে ৫০-এর নীচে নামাতে হবে। যা দেখছি, তাতে ৪০-এর নীচে নেমে গেলেও অবাক হব না।’’মঞ্চ থেকে শুরু করে মঞ্চের নীচের জমায়েত, দু’জায়গাতেই ছিল নানা রঙের উপস্থিতি। সভার বাঁধা সুর এসআইআর থেকে ক্ষণিক বিক্ষিপ্ত হয়েছিল কয়েক জন পার্শ্বশিক্ষকের তুলে ধরা প্ল্যকার্ডে। তৃণমূলের রাজ্যসভাগামী মুখেরাও। তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে রাজ্যসভা ভোটে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান বিষয়ক আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী। ঘোষিত সমকামী হিসাবে তিনিই প্রথম দেশে সংসদের উচ্চকক্ষে যাচ্ছেন। মেনকা মঞ্চে বক্তৃতায় বলেন, ‘‘আমার মনের মধ্যে রয়েছে সংবিধান। যে সংবিধান বলে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে আমরা সকলে সমান। আর দুই, দেশের সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটদানের অধিকার আছে। আজকে বাংলার ৬০ লক্ষ মানুষের নাম বিবেচনাধীন! আমরা এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে লড়ব।’’ ‘জয় বাংলা, জয় সংবিধান’ বলে নিজের বক্তৃতা শেষ করেন মেনকা। প্রাক্তন পুলিশ কর্তা রাজীব কুমারও তৃণমূলের হয়ে রাজ্যসভায় মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। ধর্মতলার ধর্নামঞ্চে একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ করলেন। সাত বছর আগে তাঁর জন্য ধর্নায় বসেছিলেন মমতা। মমতার জন্য ধর্নামঞ্চে আগাগোড়া থাকলেন রাজীব। সাত বছরের ব্যবধানের ভিন্ন পরিচয়ে ধর্মতলার ধর্নায় হাজির হলেন সদ্যপ্রাক্তন দুঁদে আইপিএস রাজীব।
বিজেপি-কে সামাজিক বয়কটের ডাক দিলেন অভিষেক। নতুন স্লোগানও বাঁধলেন— বয়কট বিজেপি। তাঁর কথায়, ‘‘আগের বার ভোটে কিছু সংগঠন স্লোগান তুলেছিল ‘নো ভোট টু বিজেপি’। এ বার বলতে হবে বয়কট বিজেপি। এদের সামাজিক ভাবে বয়কট করতে হবে। বুঝিয়ে দিতে হবে বাংলা এবং বাঙালির শক্তি।’’ তৃণমূলের প্রথম বক্তা ছিলেন শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে হুঙ্কারে তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বলেন, ‘‘একা, কেবল একা। কোনও ব্র্যান্ড নিয়ে নয়, কোনও ন্যাশনাল পার্টির ব্র্যান্ড নিয়ে নয়। কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে এত নেতা তৈরি হয়েছেন, এত কর্মী তৈরি হয়েছেন। সেই মানুষটা যখন চিফ ইলেকশন কমিশনারের কাছে গেল, আমি তো সে দিন ছিলাম, কী দুর্ব্যবহার মমতাদির সঙ্গে করেছেন, আপনারা কল্পনা করতে পারবেন না। আঙুল তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কথা বলছেন। আরে আঙুল তুলে তুমি কাকে কথা বলছ? তুমি যদি চিফ ইলেকশন কমিশনার না-হতে, আঙুলটা তোমার কেটে বাদ দিয়ে আসতাম।” ২০১৯ সাল থেকে উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদিয়ার মতুয়া অধ্যুষিত এলাকা বিজেপির দখলে। লোকসভাতেও সেই ধারা অব্যাহত ছিল। এসআইআরের ফলে বহু মতুয়ার নামও বাদ অথবা বিবেচনাধীন। জমায়েতে হাজির মতুয়াদের উদ্দেশে বিজেপি-কে হারানোর বার্তা দেন সাংসদ মহুয়া মৈত্র-সহ তৃণমূল নেতারা। বাদ্যযন্ত্র সহযোগেই জমায়েতে এসেছিলেন মতুয়া সমাজের লোকজন। ঢাক-ঢোলের আওয়াজ পেয়ে মঞ্চ থেকে মমতাই মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে নির্দেশ দেন তাঁদের বসানোর বন্দোবস্ত করতে।
ধর্মতলায় মমতার ধর্নামঞ্চে শুক্রবার বিক্ষোভ দেখালেন কয়েক জন পার্শ্বশিক্ষক। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে হাতের প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেন তাঁরা। মুখ্যমন্ত্রী মঞ্চ থেকে বলেন, ‘‘রাজনীতি করবেন না। শান্ত হয়ে থাকতে পারলে থাকবেন। রাজনীতি করবেন না। বিজেপির কথায় এ সব করবেন না। এই জায়গা খোলামেলা বলে ভাববেন না, যা কিছু করা যাবে। প্রধানমন্ত্রী মোদী আর শাহকে দেখান। ভ্যানিশ কুমারকে দেখান।’’ তার পরেই তিনি পুলিশের উদ্দেশে বলেন, ‘‘ওদের আস্তে আস্তে অন্য জায়গায় বসিয়ে দিন।’’ পুলিশ প্ল্যাকার্ডধারীদের সরিয়ে নিয়ে যায় সভাস্থল থেকে। এসআইআর-কে অনেকেই ‘স্যর’ বলছেন। শুক্রবারের ধর্নামঞ্চে সেই ‘স্যর’ই মিলিয়ে দিলেন দু’জনকে। এক জন রাজ্য পুলিশের সদ্যপ্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমার এবং অন্য জন তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। কুণাল রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ। রাজীব কুমার রাজ্যসভায় যেতে চলেছেন। সাংসদ থাকাকালীন কুণালকে গ্রেফতার করেছিলেন বিধাননগরের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব। আবার রাজীবের বাড়িতে সিবিআই হানার পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই মেঘালয়ের শিলং শহরে রাজীব এবং কুণালকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করেছিল সিবিআই। আপাতত সে সব অতীত। দু’জনেই তৃণমূলে। এক জন প্রাক্তন সাংসদ। অন্য জন হবু। দু’জনের দেখা হল।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পার্শ্বশিক্ষকেরা আদালতের নির্দেশে বিকাশ ভবনের সামনে অবস্থান বিক্ষোভ করছেন। বৃহস্পতিবার কালীঘাট অভিযানের ডাক দিয়েছিল পার্শ্বশিক্ষকদের সংগঠন শিক্ষক ঐক্য মঞ্চ। স্থায়ীকরণ এবং বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ওই কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল তারা। শিয়ালদহ থেকে এই মিছিল কলেজ স্ট্রিট আসার পরই পুলিশ আটকে দেয় বিক্ষোভকারীদের। ফলে সেখানেই শুরু হয় পথ অবরোধ ও অবস্থান বিক্ষোভ। পার্শ্ব শিক্ষকদের দাবি, ২০০৯ সালে মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের আন্দোলনের মঞ্চে এসে স্থায়ীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ধাপে ধাপে স্থায়ীকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তার পর ১৫ বছর কেটে গেলেও সুরাহা হয়নি বলে অভিযোগ পার্শ্বশিক্ষকদের। ২০২৪ সালের ১ মার্চ শিক্ষা দফতরের তরফে পার্শ্বশিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গিয়েছিল নবান্নে। সেখানে প্রাথমিকে পার্শ্বশিক্ষকদের ২৮ হাজার টাকা, উচ্চ প্রাথমিকে ৩২ হাজার টাকা বেতন ধার্য করা হয়েছিল। এখনও ‘ঠান্ডা ঘরে’। পার্শ্বশিক্ষকেরা প্রভিডেন্ট ফান্ড, চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যু হলে আর্থিক সাহায্য ও পরিবারের সদস্যদের চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থা-সহ বেশ কিছু দাবি।





