অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সময়ের অভাবে অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, অত্যধিক ব্যস্ততা অথবা মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে হৃদ্রোগের ঝুঁকি। এর সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত খাবার, ভাজাভুজি, বাইরের তেল-মশলাদার খাবার বেশি খাওয়ার অভ্যাসেও রাশ টানতে হবে। এ সবের পাশাপাশি হৃদ্রোগ ঠেকাতে আরও একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা ভীষণ জরুরি। উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ডায়াবিটিসের সমস্যা থাকলে এই বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া জরুরি। কিন্তু অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সময়ের অভাবে অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, অত্যধিক ব্যস্ততা অথবা মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে হৃদ্রোগের ঝুঁকি। এর সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত খাবার, ভাজাভুজি, বাইরের তেল-মশলাদার খাবার বেশি খাওয়ার অভ্যাসেও রাশ টানতে হবে। এ সবের পাশাপাশি হৃদ্রোগ ঠেকাতে আরও একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা ভীষণ জরুরি। তা হল শরীরে লিপিড প্রোফাইলের মাত্রা।হার্টের সমস্যা নিয়ে যদি কোনও রোগী চিকিৎসকের কাছে যান, তখন সবার প্রথমেই তিনি রোগীকে প্রশ্ন করেন লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করিয়েছেন কি না। ভারতে দিন দিন হার্টের রোগীদের সংখ্যা বাড়ছে। আর চিকিৎসকদের মন্তব্য, ৮০ শতাংশ হার্টের রোগীর রিপোর্টে লিপিড প্রোফাইলের মাত্রা স্বাভাবিক আসে না। দিল্লি নিবাসী চিকিৎসক এস রামাকৃষ্ণন বলেন, প্রায় ৫০ শতাংশ হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে লিপিড প্রোফাইলের অস্বাভাবিক মাত্রার যোগ আছে। হার্ট অ্যাটাক বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর আক্রান্ত রোগীদের রিপোর্টে প্রায়শই অস্বাভাবিক লিপিড প্রোফাইল লক্ষ করা যায়। চিকিৎসকের মতে, বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে তাঁরা আগে কখনও লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করাননি। অনেকে এমনও আছেন, যাঁরা এই পরীক্ষার কথা কখনও শোনেননি। লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষার মাধ্যমে ঠিক কী কী পরীক্ষা করা হয়?
লিপিড প্রোফাইলের মাধ্যমে সাধারণত রক্তের খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা (এলডিএল), ভাল কোলেস্টেরলের মাত্রা (এইচডিএল) আর ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়।
যদি খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা ১০০ এর উপরে থাকে, তা হলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। তবে, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং ওষুধের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। এইচডিএল বা ভাল কোলেস্টেরল সাধারণত ৪০ এর উপরে হওয়া উচিত। নিয়ম করে শরীরচর্চা আর সঠিক নিয়ম মেনে খাওয়াদাওয়া করলে এইচডিএলের মাত্রা বাড়ানো সম্ভব। তবে দুর্ভাগ্যবশত, ভাল কোলেস্টেরল বাড়ানোর জন্য কোনও ওষুধ পাওয়া যায় না। এ ছাড়া ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা ২০০ এর নীচে থাকা উচিত। ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বৃদ্ধির নেপথ্যে থাকে সাধারণত খারাপ খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত চিনি খাওয়া, বেশি করে তৈলাক্ত খাবার খাওয়া, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা এবং নির্ধারিত ওষুধের মাধ্যমে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অনেক সময় আবার চিকিৎসকেরা এক্সটেনডেড লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করানোর কথাও বলেন। সে ক্ষেত্রে বাকি পরীক্ষাগুলির পাশপাশি লাইপোপ্রোটিনের (খারাপ কোলেস্টেরলের এক ধরন) মাত্রাও পরীক্ষা করা হয়। এর মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া মানেই হৃদ্রোগের আশঙ্কাও বৃদ্ধি পাওয়া। সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর পার করলেই প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করানোর কথা বলেন চিকিৎসকেরা। অন্য দিকে বয়স ৪০ পেরোলেই বছরে অন্তত এক বার এই পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা।
বাড়ছে হার্টের অসুখ। কোভিডের ঠিক পরে পরেই হার্ট অ্যাটাকে অনেকের মৃত্যুর খবর। হঠাৎ করেই বেড়ে গিয়েছে হার্টের ব্যামো। হার্টের স্বাস্থ্য ভাল আছে কি না, তা জেনে নিন নিজেই। হৃদ্রোগ একটি অন্যতম সমস্যা। হার্ট অ্যাটাক বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্র্যাকশন’ রোগীর মৃত্যুর প্রধান কারণ। ঠিকঠাক সময়ে সমস্যা ধরা না গেলে বা চিকিৎসা শুরু করা না গেলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর বেঁচে ফেরার আশা কম থাকে। হার্ট কেমন আছে তা জানতে ইসিজি, ইকোকার্ডিয়োগ্রাম-সহ আরও একগুচ্ছ পরীক্ষা করাতে বলেন চিকিৎসকেরা। সে সব সঠিক সময়ে করিয়ে নেওয়াই ভাল। তবে যদি নিজেই বুঝতে হয় যে হার্টের হাল কেমন, তার সহজ উপায় আছে। হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি আছে কি না, তা জানতে বাড়িতে সহজ পরীক্ষা করে নিন। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা ৪০ থেকে ৬০ সেকেন্ডের কিছু পরীক্ষার পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছেন। বাড়িতে সহজেই সেই পরীক্ষাগুলি করে দেখে নিতে পারেন, হার্টের স্বাস্থ্য ঠিক কেমন।
সিঁড়ি পরীক্ষা
ইউরোপীয় সোসাইটি অফ কার্ডিয়োলজির গবেষকেরাও এই পরীক্ষাটিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এতে সময় লাগবে ৪০-৬০ সেকেন্ড। পরীক্ষাটিকে বলা হয় ‘স্টেয়ার ক্লাইম্ব টেস্ট’। আপনাকে শুধু চার ধাপ সিঁড়ি ভাঙতে হবে। চার ধাপ মানে হিসেব মতো ৬০টি সিঁড়ি। যদি ৪০ সেকেন্ড বা তার কম সময়ে এটি সম্পন্ন করতে পারেন, তা হলে বুঝতে হবে আপনার হার্টে কোনও গোলমাল নেই। বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট ও বুকে ভারী পাথর চেপে থাকার মতো অনুভূতি যদি হয়, তা হলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। ৬০টি সিঁড়ি ভাঙতে যদি ১ মিনিটের বেশি সময় লাগে, তা হলেও বুঝতে হবে আপনি সম্পূর্ণ ফিট নন। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই জরুরি।
চেয়ার টেস্ট
অনেক চিকিৎসকই এই পরীক্ষাটির কথা বলেন। একে বলে ‘সিট টু স্ট্যান্ড টেস্ট’। হৃদ্গতির হার কেমন, হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে গিয়েছে কি না, তা বোঝা যেতে পারে এই পরীক্ষাটিতে। হাত দু’টি বুকের উপর আড়াআড়ি ভাবে রেখে, চেয়ারে একবার বসতে হবে ও উঠতে হবে। কোনও কিছুর সাহায্য নেওয়া যাবে না। ওঠা ও বসার সময়ে চেয়ারের হাতলও ধরতে পারবেন না। এ ভাবে ৪০ সেকেন্ড ধরে একটি করে যেতে হবে। পরীক্ষার পরে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ডে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অন্তত ১৫ বারের বেশি এটি করা উচিত। যদি কেউ এটি করতে গিয়ে দ্রুত হাঁপিয়ে যান বা বুক ধড়ফড় করে, তবে তা হার্টের দুর্বলতার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। ওঠা-বসা করতে গিয়ে যদি দেখেন প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, দম নিতে পারছেন না, তা হলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা সম্প্রতি বেশ বেড়েছে। ইদানীং হার্টের সমস্যা নিয়ে যাঁরা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই কমবয়সি। জিনগত কারণে বা জন্মগত ভাবে হার্টের অসুখ রয়েছে এমন মানুষ ছাড়া যাঁদের পরে কোনও কারণে হার্টের অসুখ ধরছে, তাঁদের মধ্যে একটা বড় অংশই ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সের তরুণ-তরুণী। তাই এই পরীক্ষা দু’টি বাড়িতে করে হার্টের স্বাস্থ্য কেমন, তা যাচাই করে নিতে পারেন।




