আগেই বাদ ৫৮ লক্ষের নাম। এসআইআর শুনানিপর্বে এখনও পর্যন্ত চিহ্নিত কত ‘অবৈধ’ ভোটার? অবধি বাংলায় এসআইআরের প্রায় ৯ লক্ষ ৩১ হাজার ভোটারের শুনানি হয়েছে বলে খবর। তালিকা থেকে ওই সংখ্যক ‘অবৈধ’ ভোটার চিহ্নিত হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হবে। এসআইআরের শুনানি চলছে রাজ্যজুড়ে। সেই শুনানিতে এখনও চূড়ান্ত তালিকা থেকে মোট ১১,৪৭২ জন ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। কমিশন সূত্রে প্রাথমিকভাবে সেই কথা জানা গিয়েছে। এখনও অবধি বাংলায় এসআইআরের প্রায় ৯ লক্ষ ৩১ হাজার ভোটারের শুনানি হয়েছে বলে খবর। সেই তালিকা থেকে ওই সংখ্যক ‘অবৈধ’ ভোটার চিহ্নিত হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হবে। আরও বেশ কিছুদিন শুনানি চলবে। ফলে এই অবৈধ ভোটারের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, এমনই আশঙ্কা করছে ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ। এসআইআরের খসড়া তালিকায় আগেই ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গত ৪ নভেম্বর। এনুমারেশন পর্ব ১১ ডিসেম্বর শেষ হয়। খসড়া ভোটার তালিকা ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। বাংলায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। এরপর নির্দিষ্ট দিন থেকে রাজ্যে শুরু হয় শুনানি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ শুনানির জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। মানুষের মধ্যে ক্ষোভও তৈরি হয়েছে। আতঙ্কে মৃত্যুর সংখ্যাও রাজ্যে বাড়ছে বলে অভিযোগ। নির্বাচন কমিশনকে এদিনও কাঠগড়ায় তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কমিশনের সঙ্গে বিজেপির আঁতাতের অভিযোগও করা হচ্ছে। সেই আবহে এবার শুনানিতে এখনও অবধি ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার তথ্য সামনে এল। রাজ্যে এসআইআরের শুনানি শুরু হয়েছে গত ২৭ ডিসেম্বর থেকে। এখনও অবধি মোট ৯ লক্ষ ৩০ হাজার ৯৯৩ জনের শুনানি হয়েছে। সেই শুনানিতেও মিলেছে অবৈধ ভোটার। এখনও অবধি শুনানি পর্বে ১১ হাজার ৪৭২ জনের নাম বাদ গিয়েছে বলে খবর। কিন্তু কোন জেলায় কত ভোটার শুনানিপর্বে বাদ গেল? প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, সব থেকে বেশি অবৈধ ভোটার বাদ পড়েছে নদিয়া জেলায়। এই পর্বে নদিয়ায় অবৈধ ভোটারের সংখ্যা এখনও অবধি ৯ হাজারের বেশি। নদিয়ায় প্রায় ৪ লক্ষ ৯৫ হাজার মানুষকে শুনানির জন্য নোটিস পাঠানো হয়। ওই নোটিস প্রায় ২ লক্ষ ৯১ হাজার মানুষ হাতে পান। শুনানিতে এখনও অবধি প্রায় ১ লক্ষ ২৭ হাজারের বেশি মানুষ হাজির হয়েছেন। এখন পর্যন্ত শুনানিতে কলকাতা দক্ষিণ এবং বাঁকুড়ায় একজন অবৈধ ভোটারও চিহ্নিত হননি বলে কমিশন সূত্রে খবর।
ভোটার তালিকা থেকে ‘টার্গেট’ করে মহিলাদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা দাবি করেন, যে মহিলারা বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ি চলে গিয়েছেন, যাঁদের পদবি বদলে গিয়েছে, তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। মমতার কথায়, ‘‘কেউ কি চিরকাল এক বাড়িতে আছেন? এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় চলে গিয়েছেন। যে মহিলারা বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ি চলে গিয়েছেন, যাঁদের পদবি বদলে গিয়েছে, টার্গেট করে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।’’ মমতা মহিলাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়লে এগিয়ে এসে নাম তোলাতে হবে। মঙ্গলবারও সেই একই সুর শোনা গেল তাঁর কণ্ঠে। তবে ফারাক একটাই। এর আগে মমতা বলেছিলেন দলীয় সভামঞ্চ থেকে। তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী হিসাবে। মঙ্গলবার বললেন নবান্ন থেকে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘মহিলা ভোটার, নতুন ভোটার, পরিযায়ী শ্রমিক, যাঁরা শিফট (স্থানান্তরিত) হয়েছেন, তাঁদের বলব, এইআরও, বিএলওদের কাছে গিয়ে জানতে চান নাম বাদ গেল কেন? নথি দেখানোর পরেও কেন রসিদ দেওয়া হচ্ছে না?’’ তাঁর আরও অভিযোগ, বিএলএদের ঢুতে দেওয়া হচ্ছে না। মাইক্রো অবজার্ভাররা বসে আছেন। কেউ গেলেই অ্যান্টি বেঙ্গলি, অ্যান্টি ন্যাশনাল। লিখে দেওয়া হচ্ছে ‘নো এভিডেন্স ফাউন্ড’। ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘‘এটি কোনও আইনে নেই, দলদাসদের মাথা থেকে বেরিয়েছে।’’মহিলা ভোটই তাঁর এবং তৃণমূলের জনসমর্থনের অন্যতম ভিত্তি। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর মতো প্রকল্প মমতার পালে হাওয়া আনতে জাদুকাঠির কাজ করেছিল। প্রকল্প শুরুর পরে লোকসভা ভোটের আগে তার টাকা বৃদ্ধিও তৃণমূলকে স্বস্তিজনক জায়গায় পৌঁছে দেয়। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের আগে সেই মহিলাদের উদ্দেশেই বার্তা দিতে চাইলেন মমতা। প্রশাসক মমতা যেমন মহিলাদের নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন, তেমন তৃণমূলও পূর্ব মেদিনীপুরের বিজেপি নেতার বক্তব্য পাড়ায় পাড়ায় মহিলাদের শোনানোর কর্মসূচি নিয়েছে। বিজেপির রাজ্যস্তরের ওই নেতাকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘যে মহিলারা লক্ষ্মীর ভান্ডার পান, তাঁদের ঘরে বন্দি রাখতে হবে। যাতে তাঁরা জোড়াফুলে ভোট না-দিতে পারেন।’’ মমতার অভিযোগ, বাইরের রাজ্য থেকে ভোটারদের নাম পশ্চিমবঙ্গের তালিকায় যুক্ত করার ষড়যন্ত্র চলছে বলেও অভিযোগ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রসঙ্গে তিনি বিহার, ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ডের নাম উল্লেখ করেছেন। ঘটনাচক্রে, ঝাড়খণ্ড বাদ দিয়ে বাকি দু’টি রাজ্যই বিজেপিশাসিত। মমতার আরও অভিযোগ, বহু লোকের নাম ব্লক করে দিয়ে বাদ দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের শুনানিতে যাওয়ার সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না।
কেন এ রাজ্যের বিষয়ে ‘ডোমিসাইল সার্টিফিকেট ’ গ্রহণ করা হচ্ছে না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সমস্ত নথি বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন মমতা। মাইক্রো অবজার্ভারদের নিয়ে মমতার প্রশ্ন, ‘‘কেন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ? কেন অসম, ত্রিপুরা, মণিপুরের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর করা হচ্ছে না?’’ বিএলও-সহ আপাতত কমিশনের নিয়ন্ত্রণে কর্মরত রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘‘মাইক্রো অবজার্ভারেরা আপনাকে নির্দেশ দিলে আপনি তা মানতে বাধ্য নন। কারণ এটা কমিশনের নিয়মে নেই।’’ মুখ্যমন্ত্রী এও অভিযোগ করেন, এসআইআরের ষড়যন্ত্র হচ্ছে ফোর্ট উইলিয়াম থেকেও। তাঁর কথায়, ‘‘আমি সব বাহিনীকে সম্মান করি। কিন্তু আমার কাছে খবর আছে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে এক জন কমান্ড্যান্ট এসআইআরের কাজ করছেন। বিজেপি করছে। মতুয়া ভাইবোনেদের বলব, নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নিন। নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব। সেখানে মানুষ ঠিক করবে কাকে ভোট দেবে, কাকে নির্বাচিত করবে, কাকে করবে না। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ভোটের আগে অর্ধেক লোকের নাম কেটে দিয়ে নির্বাচিত সরকার ঠিক করে দিচ্ছে।’’ মমতার ফেসবুক পেজে বাজছে ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’ তৃণমূলের থিম গান। প্রশাসনের সচিবালয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সাংবাদিক বৈঠকে কেন দলীয় গান, তা নিয়ে সমাজমাধ্যমে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।শাসকদলের সাংগঠনিক সেই কর্মসূচির সঙ্গে প্রশাসক মমতার এই বক্তব্যকে জুড়ে দেখতে চাইছেন অনেকে। তাঁদের বক্তব্য, তৃণমূল জনমানসে বিশেষত মহিলাদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করতে চাইছে, এক দিকে বিজেপি বলছে মহিলাদের ঘরবন্দি করে রাখতে, অন্য দিকে তাদের অঙ্গুলিহেলনেই নির্বাচন কমিশন মহিলা ভোটারদের নাম কাটতে চাইছে।





