যিনি মেসিকে এনে এত বড় অনুষ্ঠান করতে পারেন, তাঁর প্রভাব কতটা সেটা বলার প্রয়োজন নেই? হুগলির বাসিন্দা শতদ্রু দত্ত! ২৩ কোটি টাকার দুর্নীতিতে জড়িত? শতদ্রু দত্ত খুব প্রভাবশালী ব্যক্তি? জামিন পেলে পালিয়ে যেতে পারেন শতদ্রু? সরকারি দফতরের সঙ্গে চুক্তির আগেই খাবার ও পানীয় মাঠে ঢোকানোর চুক্তি হয়েছিল? একের পর এক প্রশ্ন? উত্তর মিলছে না! শতদ্রু দত্তের জামিনের বিরোধিতা করে সরকারি আইনজীবীর বক্তব্য, “শতদ্রু দত্ত খুব প্রভাবশালী ব্যক্তি। জামিন পেলে পালিয়ে যেতে পারেন শতদ্রু। কারণ তাঁকে বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিখ্যাত ফুটবলারের সঙ্গে প্লেনে ওঠার মুহূর্তে ধরা হয়েছে। এত বড় ঘটনা ঘটার পরে মাঠ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।” যুবভারতীকাণ্ডে শতুদ্রু দত্তের জামিনের আবেদন খারিজ করল আদালত। এদিনের মামলায় সরকারি আলিপুর আদালতে আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় সওয়াল করেন, যুবভারতীতে মেসিকে আনা নিয়ে প্রায় ২৩ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “এই তদন্ত একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ টিকিট কেটেছিলেন। ১৯ কোটি টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছিল।” সেদিনের অশান্তি, বিশৃঙ্খলায় ২ কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি নষ্ট হয়েছিল। শতদ্রুর জামিনের বিরোধিতা করে সরকারি আইনজীবীর বক্তব্য, “শতদ্রু দত্ত খুব প্রভাবশালী ব্যক্তি। জামিন পেলে পালিয়ে যেতে পারেন শতদ্রু। কারণ তাঁকে বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিখ্যাত ফুটবলারের সঙ্গে প্লেনে ওঠার মুহূর্তে পাকড়াও হয়েছে। এত বড় ঘটনা ঘটার পরে মাঠ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।” তাঁর বক্তব্য, যিনি মেসিকে এনে এত বড় অনুষ্ঠান করতে পারেন, তাঁর প্রভাব কতটা সেটা বলার প্রয়োজন নেই। তিনি আদালতে জানান, ১২ ডিসেম্বর চুক্তি হয়েছে। এদিকে খাবারের চুক্তি নভেম্বর মাসেই হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ সরকারি দফতরের সঙ্গে চুক্তির আগেই খাবার – পানীয় মাঠে ঢোকানোর চুক্তি হয়েছিল। সরকারি আইনজীবীর বক্তব্য, এই চুক্তির তারিখ থেকেই স্পষ্ট হচ্ছে শতুদ্রুর উদ্দেশ্য। এই মামলায় তদন্তে পুলিশ ২১ জনের বয়ান রেকর্ড করেছে। পাল্টা শতদ্রু দত্তের আইনজীবী সৌমজিত রাহার বক্তব্য, “এটা পেশাদার সংস্থার অনুষ্ঠান। মূল উদ্দেশ্য বিশ্ব বিখ্যাত ফুটবলারকে দেখানোর। প্রশাসন – সহ সব বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করা হয়েছিল।” তাঁর বক্তব্য, এই সংস্থা আগে আন্তর্জাতিক একাধিক এই ধরনের ইভেন্ট করেছে সফলতার সঙ্গে। এই সংস্থা তাদের পেশাদারিত্ব আগেই প্রমাণ করেছে। ৭ নভেম্বর বিধাননগর ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ দিয়েছিল বলেও আদালতে জানান তিনি। আদালতে তাঁর সওয়াল, ঘটনা ঘটার পরে কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়। তদন্ত কমিটি তৈরি হয়েছে। প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা জানানো হয়েছে। আয়োজক সংস্থার দিক থেকে কোনও নিয়মভঙ্গ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। আদালতে শতদ্রুর আইনজীবী জানান, দেশের সব জায়গায় শতদ্রু দত্তর সংস্থা তাদের পেশাদারিত্ব প্রমাণ করেছে। ফুটবল লেজেন্ডকে নিয়ে অন্য রাজ্যে সফল অনুষ্ঠান হয়েছে। আমার মক্কেল ৩-০ গোলে এগিয়ে আছেন। মেসির ক্ষেত্রে জেড প্লাস সিকিউরিটি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, গোয়েন্দা দফতরের তরফেও তদন্তে অশান্তির কোনও প্রমাণ মেলেনি। ২২ কোটি ফ্রিজ করা হয়েছে। শতুদ্রুর শরীরের একাধিক নানান জটিল রোগ রয়েছে বলেও আদালতে জানান তাঁর আইনজীবী। এই প্রেক্ষিত তুলে ধরে তিনি বলেন, “শতুদ্রু পালিয়ে যাবেন না। আমার মক্কেল কোথাও পালিয়ে যাচ্ছিলেন না। যেহেতু বিখ্যাত ফুটবলারের অন্য রাজ্যেও অনুষ্ঠান ছিল তাই যাচ্ছিলেন।” যদিও তদন্তের স্বার্থে শতুদ্রুর জামিনের আবেদন খারিজ করে আদালত। তাঁকে ফের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত জেল হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শতদ্রু দত্তের পক্ষে এক আইনজীবী বলেন, “কলকাতার পর বাকি রাজ্যে, মুম্বই, দিল্লি, হায়দরাবাদ, তিনটি জায়গাতেই সাফল্যের সঙ্গে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেই জন্যই বলা হয়েছে, আমরা ৩-০ গোলে এগিয়ে রয়েছি। দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠছে, সেগুলো সবই প্রমাণ সাপেক্ষ। একটা স্টেটমেন্ট দেওয়া মানেই তো সত্য নয়, প্রমাণ করতে হবে।” দু’পক্ষের সওয়াল-জবাব শুনে বিচারক অভিযুক্তের জামিনের আর্জি খারিজ করে দেন। শতদ্রুকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত জেল হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।

বিশ্বের সেরা ফুটবলার লায়োনেল মেসির ভারত আগমন। দেশজুড়ে মেগা ইভেন্টের শুরুটা ছিল ফুটবল মক্কা—কলকাতায়। সেখানেই বিপত্তি। বিশৃঙ্খলায় বিরক্ত হয়ে মাঠ ছাড়েন আর্জেনটাইন মহাতারকা। হাজার হাজার মেসিভক্তের কষ্টার্জিত টাকায় কেনা টিকিট কার্যত জলে যায়। ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতী ছেড়ে বেরোনোর সময়ই দর্শকদের ‘স্ক্যাম…, স্ক্যাম..’ বলে চিৎকার করতে শোনা যায়। ইভেন্টে পুলিশি বিধি না-মানা ও বিশৃঙ্খলাসৃষ্টির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় শতদ্রুকে। সেই মামলাতেই বিধাননগর দক্ষিণ থানার পুলিশ একাধিক ধারায় মামলা করে। যুবভারতীতে ভাঙচুরের ঘটনায় আরও পাঁচজনকে গ্রেফতার করে বিধাননগর দক্ষিণ থানা। ১৪ ডিসেম্বর পুলিশ হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছিল বিধাননগর আদালত। এজলাসের বাইরে শতদ্রুর আইনজীবী গোটা ঘটনার জন্য দায়ী করেন দর্শককেই। তাঁর কথায়, মেসিকে দর্শকরা দেখতে পাননি বলে আক্রোশের বশে সব ভাঙচুর করবেন কেন? বক্তব্যের কড়া বিরোধিতা করে সরকারি আইনজীবী বিভাষ চ্যাটার্জি আদালতে জানান, বিষয়টি হাইকোর্টে ওঠার পর প্রধান বিচারপতির নির্দেশেই তদন্ত চলছে। তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও ইতিমধ্যেই যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। তাঁর মতে, এই মামলায় এমন ধারাগুলি যুক্ত রয়েছে, যাতে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সাজা হতে পারে।

কে এই শতদ্রু দত্ত? শতদ্রু দত্ত পেশায় একজন ইভেন্ট প্রোমোটার এবং স্পোর্টস মার্কেটিং উদ্যোক্তা। মূলত আন্তর্জাতিক ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি এবং ভারতীয় স্পন্সর বা দর্শকদের মধ্যে তিনি একজন ‘মিডলম্যান’ বা ফ্যাসিলিটেটর। হুগলি জেলার রিষড়ার বাসিন্দা শতদ্রু। কেরিয়ারের শুরুতে ফিনান্স ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত কাজ করতেন। শতদ্রু প্রথমে জামাইবাবুর সঙ্গে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে হাত লাগান। পরে একাই এগিয়ে নিয়ে যান কাজ। খেলাধূলা, বিশেষত ফুটবল নিয়ে শতদ্রুর আগ্রহ ছিল প্রবল। আর সেই ‘প্যাশন’টাই একটা সময়ে ‘ফুলটাইম’ পেশা হিসেবে নেন শতদ্রু। তিনি ঠিক করে ফেলেন আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্কৃতির ছোঁয়া তিনি কলকাতা তথা ভারতে ছড়িয়ে দেবেন। সেই লক্ষ্যেই একের পর এক ফুটবলারকে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছেন। পেলে, মারাদোনা, কাফু, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, রোনাল্ডিনহো গাউচোদের ভারতে এনেছেন শতদ্রু। ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলকেও নিয়ে আসেন। শতদ্রুর সংস্থার নাম, ‘আ শতদ্রু দত্ত ইনিশিয়েটিভ’। ওই সংস্থাই শতদ্রুর একের পর এক স্বপ্নের প্রজেক্টে সাফল্য এনে দিয়েছে। তিনি পেশায় একজন স্পোর্টস প্রোমোটার এবং ইভেন্ট অর্গানাইজারও বটে। শুধু মেসি নয়, পেলে, মারাদোনা ও কাফুকেও ভারতে এনেছেন এই শতদ্রুই। এভাবেই তাঁর উত্থান। শ্রীরামপুরের হলি হোম স্কুলে পড়াশোনা করতেন শতদ্রু। ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলতেন। এক সময় প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করতেন। নিজের জামাইবাবুর সঙ্গে ইভেন্টের কাজ শুরু। পরে সেই কাজ একাই আরও এগিয়ে নিয়ে যান। নিজের বাড়ির ছাদেই বানিয়ে ফেলেছেন ফুটবল মাঠ। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মেসিকে আনার ব্যবস্থা করেন। এক লহমায় স্বপ্ন বদলে গেল দুঃস্বপ্নে। একেবারে হিরো থেকে জিরো। শতদ্রু দত্তের জন্য এই অধ্যায় একটি টার্নিং পয়েন্ট। এখান থেকে ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’ হয়ে উঠলেন ‘দুঃস্বপ্নের কাণ্ডারি’?





