টাটা স্টিল কলকাতা ২৫ কিমি ম্যারাথনকে ঘিরে উৎসবের চেহারা নিল রবিবার ভোরের রেড রোড। কলকাতা ম্যারাথনের সবকটি ক্যাটাগরিতে অংশ নিয়েছিলেন ২৩ হাজারেরও বেশি প্রতিযোগী। আন্তর্জাতিক মঞ্চের নামকরা রানারদের পাশাপাশি অংশ নিয়েছিলেন দেশের তারকা রানারাও। ম্যারাথনকে ঘিরে বসেছিল চাঁদের হাট। রোজ রামচা ভুলে একটু অন্য স্বাদে সকালটা কাটাতে শহরের রাজপথে উৎসবের মেজাজে দৌড়লেন ৮ থেকে ৮০।

কলকাতা এই ম্যারাথনকে ঘিরে বসেছিল চাঁদের হাট। টাটা স্টিল ২৫কে উপলক্ষ্যে দৌড়াল কলকাতা, টানটান প্রতিযোগিতার সঙ্গে আনন্দ রান, প্রতিযোগিতার দশম সংস্করণে কলকাতা সাক্ষী থাকল এক রঙিন ইভেন্টের। অলিম্পিক্স চ্যাম্পিয়ন অ্যাথলিট থেকে সাধারণ মানুষ কলকাতা ম্যারাথনে রাজপথে দৌড়ালেন কয়েক হাজার মানুষ। ভোর ৫.৪৫ মিনিটে ম্যারাথনের ফ্ল্যাগ অফ। উপস্থিত ছিলেন মার্কিন অ্যাথলিট কেনি বেডনারেক, ইন্টারন্যাশনাল ইভেন্ট অ্যাম্বাসাডর, বাইচুং ভুটিয়া, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস, সিপি মনোজ ভর্মা, সুজিত বসু, দেবাশিস কুমার সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রথমে ২৫কে সূচনার পর ধাপে ধাপে ১০কে, ৫কে, আনন্দ রান।শহরের রাজপথে ঝড়় তুললেন দেশি বিদেশি অ্যাথলিটরা। ভারতীয় বি্ভাগে রেকর্ড সৃষ্টি করে দিনের আসল নায়ক হয়ে উঠলেন ভারতের গুলভীর সিং। তিনি সময় নিলেন ১.১২.০৬। মহিলাদের আন্তর্জাতিক এলিট বিভাগে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন সুতুমে আসেফা কেবেদেকে হারিয়ে দেন ইথিওপিয়ার ডেগিটু আজিমেরাও। তিনি রেস শেষ করলেন ১.১৯.৩৬। ভারতীয় মহিলা বিভাগে ১.২৬.০৪ মিনিটে শেষ করে নয়া রেকর্ডসৃষ্টি করলেন। বাইচুং বলেন, “আমি অত্যন্ত সম্মানিত এই ম্যারাথনে অংশ নিতে পেরে। এটা শুধু কলকাতা নয় পূর্ব ভারতের জন্য বড় ইভেন্ট। দারুন একটা পরিবেশে হচ্ছে। সারা ভারত ও বিশ্ব থেকে অ্যাথলিটরা এসেছেন তারা কলকাতায় আইকনিক জায়গায় দৌড়াছেন।”

শীতল শীতের রবিবারে টাটা স্টিল ওয়ার্ল্ড ২৫কে কলকাতা উপহার দিল এক রোমাঞ্চকর দৌড়যজ্ঞ, যেখানে একের পর এক রেকর্ড ভাঙল, চ্যাম্পিয়নরা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলেন এবং ভারতীয় দীর্ঘদূরত্ব দৌড় আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। আন্তর্জাতিক এলিট পুরুষ বিভাগে উগান্ডার জোশুয়া চেপ্টেগেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলেও, দিনটির আসল নায়ক ছিলেন ভারতের গুলবীর সিং ও সীমা, যাঁরা নিজেদের এলিট বিভাগে নতুন কোর্স রেকর্ড গড়েন। ডাবল অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন চেপ্টেগেই শুরু থেকেই গতি নিয়ন্ত্রণে রেখে দৌড়ে আধিপত্য বিস্তার করেন এবং ১:১১:৪৯ সময়ে ফিনিশ লাইন অতিক্রম করে তাঁর প্রথম কলকাতা শিরোপা জয় করেন। তিনি তানজানিয়ার আলফোন্স ফেলিক্স সিম্বু ১:১১:৫৬ এবং লেসোথোর টেবেলো রামাকঙ্গোয়ানা ১:১১:৫৯-কে পিছনে ফেলেন। যদিও ২০২৩ সালে ড্যানিয়েল সিমিউ এবেনিওর গড়া ১:১১:১৩ কোর্স রেকর্ড তিনি ভাঙতে পারেননি, সংযত ও দৃঢ় দৌড় আবারও প্রমাণ করল এই প্রতিযোগিতিতে তাঁর আধিপত্য। শেষ চার কিলোমিটারে গতি বাড়িয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে আলাদা হয়ে যান।

চেপ্টেগেই বলেন, “রেকর্ডের চেয়ে জয়টাই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতায় ফিরে এসে জয় পাওয়া আমার জন্য বিশেষ। বেঙ্গালুরুতে জিতেছি, আর এখানে বিশ্বমানের অ্যাথলিটদের সঙ্গে বড় রেস ছিল। এই জয় আমাকে আগামী ম্যারাথনের জন্য আত্মবিশ্বাস দেবে।” আন্তর্জাতিক এলিট মহিলা বিভাগে ইথিওপিয়ার ডেগিতু আজিমেরাও চমৎকার দৌড়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন সুতুমে আসেফা কেবেদেকে হারান। ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন আজিমেরাও ১:১৯:৩৬ সময়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন। সুতুমে দ্বিতীয় ১:২০:২৮ এবং মেসেলেচ আলেমায়েহু তৃতীয় ১:২০:৪৮। যদিও আজিমেরাও জিতেছেন, কোর্স রেকর্ড থেকে যায় সুতুমের দখলে। শুরু থেকেই আজিমেরাও দৌড়ে নেতৃত্ব দিয়ে শেষ পর্যন্ত বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন। দৌড়ের পর আজিমেরাও বলেন, “এটা আগে থেকে পরিকল্পিত ছিল না। শুরুতে পা একটু শক্ত লাগছিল, তবে ১০ কিমির পর ভালো লাগতে শুরু করে। তখন গতি বাড়াই এবং শেষ পর্যন্ত জিততে পারি। আমি খুব খুশি।”

তবে দিনের সবচেয়ে আবেগঘন ও প্রেরণাদায়ক গল্প উঠে আসে ভারতীয় এলিট বিভাগ থেকে। গুলবীর সিং অসাধারণ দৌড়ে নিজেরই আগের রেকর্ড ভেঙে ১:১২:০৬ সময়ে ফিনিশ করেন, যা নতুন ইভেন্ট রেকর্ড। তিনি ২০২৪ সালে গড়া ১:১৪:১০ রেকর্ডের চেয়ে দুই মিনিটেরও বেশি সময় কমিয়ে দেন। হারমানজোত সিং ১:১৫:১১ ও সাওয়ান বারওয়াল ১:১৫:২৫ তাঁকে অনুসরণ করেন।

গুলবীর বলেন, “রেকর্ড হঠাৎ করে তৈরি হয় না। ধারাবাহিকতা, কঠোর অনুশীলন আর সঠিক সহায়তার ফলেই এটা সম্ভব। আমি নিজের জন্য কোনো সীমা ঠিক করি না। ভারত ধীরে ধীরে এগোচ্ছে, রেস ধরে ধরে।” ভারতীয় মহিলা বিভাগে সীমাও ছিলেন সমান দুর্দান্ত। ১:২৬:০৪ সময়ে ফিনিশ করে তিনি ২০১৭ সালে সূরিয়া এল-এর গড়া দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভাঙেন। সঞ্জীবনী যাদব ১:৩০:৩৪ ও নির্মাবেন ঠাকোর ১:৩২:০২ যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় হন। সীমা বলেন, “কোর্স এখন আরও চ্যালেঞ্জিং হয়েছে। তবুও আমি জয়ের লক্ষ্য নিয়েই এসেছিলাম। রেকর্ড করতে পেরে খুব খুশি। এখন লক্ষ্য এশিয়ান ও কমনওয়েলথ গেমসের যোগ্যতা অর্জন।”

রিপোর্টিং : হৃত্বিক মণ্ডল
ছবি : দেবব্রত বড়াই




