যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে লিওনেল মেসির কলকাতা সফরের সময় যে ঘটনা ঘটে তার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তদন্ত কমিটির নির্দেশে শোকজ নোটিশ পাঠানো হল রাজীব কুমার এবং সিপি বিধাননগর মুকেশ কুমারকে। জানা গিয়েছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শোকজ নোটিশের জবাব দিতে হবে রাজীব কুমারকে। জবাব তলব করা হয়েছে সিপি মুকেশ কুমারের কাছেও। মুখ্যমন্ত্রীর তৈরি করা তদন্ত কমিটি সিট গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল এদিন। চার আইপিএসের নেতৃত্বে সিট গঠন করা হয়। আরও জানা গিয়েছে, বিধাননগরের ডিসিপি অনীশ সরকারের বিরুদ্ধে বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। ক্রীড়া দপ্তরের প্রধান সচিব রাজেশ কুমার সিনহাকেও নোটিশ পাঠানো হয়েছে। চার আইপিএসের নেতৃত্বে গঠিত সিটে রয়েছেন জাভেদ শামিম, সুপ্রতিম সরকার, পীযূষ পাণ্ডে এবং মুরলীধর। অন্যদিকে, দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে বিধাননগরের ডিসিপি অনীশ সরকারের বিরুদ্ধে বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ। যুবভারতীর দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে স্টেডিয়ামের সিইও দেবুকমার নন্দনকেও। উল্লেখ্য, গত শনিবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে অপেক্ষা করার পরেও মানুষের ভিড় মেসিকে ঘিরে থাকায় ভক্তরা আর্জেন্টিনার ফুটবল তারকাকে এক ঝলকও দেখতে পারেননি। স্টেডিয়ামে বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। অনুষ্ঠানটি দুই ঘণ্টাব্যাপী হওয়ার কথা ছিল এবং যেখানে মেসির অভিনেতা শাহরুখ খান, সৌরভ গাঙ্গুলি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। অনুষ্ঠানটি আধ ঘণ্টারও কম সময়ে শেষ হয়ে যায়। যা ভক্তদের হতাশ করে। এর পরেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় যুবভারতী। মাঠে পৌঁছতেই মেসিকে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদরা ঘিরে ধরেন। এর ফলে গ্যালারিতে থাকা দর্শকরা তাঁকে ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিলেন না। এর ফলে ক্ষুব্ধ দর্শকরা কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে আওয়াজ দিতে থাকেন। মাঠের দিকে চেয়ার ও বোতল ছুঁড়ে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে থাকেন। বিশৃঙ্খলার মধ্যে মেসির স্টেডিয়াম প্রদক্ষিণ সংক্ষিপ্ত করা হয় এবং নিরাপত্তা কর্মীরা তাঁকে স্টেডিয়াম থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। ৩৮ বছর বয়সী মহাতারকা মাত্র ২০ মিনিটের জন্য স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন। ১১টা ৫৩ মিনিটে মাঠ থেকে বেরিয়ে যান তিনি। গ্যালারির ফেন্সিং টপকে মাঠে ঢুকে পড়লেন অগুণতি দর্শক। ভাঙচুর করা হল ডাগ আউটে। শামিয়ানা উল্টে দেওয়া হয়। গ্যালারি থেকে চেয়ার এবং জলের বোতল ছুঁড়ে মারা হয়। গোলপোস্ট ভেঙে ফেলা হয়। ক্ষুব্ধ জনতাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ব়্যাফ নামানো হয়। বেশ খানিকক্ষণ পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। স্টেডিয়ামের বাইরে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন আগত দর্শকরা। তাঁরা একটাই দাবি ছিল, টাকা ফেরত চাই। যুবভারতীর পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেন ডিজি রাজীব কুমার এবং এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) জাভেদ শামিম। দু’জনেই জানান, যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আয়োজকদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে। আয়োজকদের লিখিত জানাতে হবে যে, টিকিটের মূল্য ফেরত দিতে হবে। নইলে আইনি ব্যবস্থা। ডিজি এবং এডিজি প্রথমে জানান মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তকে আটক করা হয়েছে। কিন্তু পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

যুবভারতীকাণ্ডের জেরে ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের পাঠানো পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে নিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইস্তফা গ্রহণ করে তিনি জানান, ক্রীড়া দফতর অন্য কারও হাতে দেওয়া হবে না। ‘নিরপেক্ষ’ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি নিজের হাতেই রাখবেন সেই দফতর। ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের মন্ত্রী হবেন মমতা। যুবভারতীকাণ্ডে তদন্ত কমিটি গড়েছিলেন মমতা। সেই কমিটির সুপারিশে সিট (বিশেষ তদন্তকারী দল) গঠন করা হয়েছে। মমতাকে পাঠানো চিঠিতে অরূপ লেখেন, যুবভারতীর ঘটনায় মমতা যে তদন্ত কমিটি গড়েছেন, তা যাতে ‘নিরপেক্ষ ভাবে’ অনুসন্ধান করতে পারে, তাই তিনি ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ থেকে অব্যাহতি চান। মমতা সেই ইস্তফা গ্রহণ করে চিঠিতে ক্রীড়ামন্ত্রীর ‘আবেগ এবং উদ্দেশ্য’-এর প্রশংসা করেন। তার পরেই লেখেন, ‘তিনি (অরূপ) একেবারেই সঠিক। যত ক্ষণ না নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ হচ্ছে, তত ক্ষণ এই দফতর আমি দেখব।’ অরূপ ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ দফতরের পাশাপাশি রাজ্যের বিদ্যুৎ দফতরেরও মন্ত্রী। তবে অব্যাহতি চেয়েছেন শুধু ক্রীড়া দফতর থেকে। ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ থেকে তাঁর ইস্তফাপত্র গৃহীত হয়ে গেলেও মন্ত্রিসভায় থাকছেন অরূপ। অরূপ দফতর থেকে ইস্তফা দিতে চাওয়ার পরেই ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ দফতরের উচ্চপদস্থ কর্তাদের নবান্নে তলব করা হয়। মঙ্গলবার দুপুরে তাঁরা সেখানে পৌঁছেও যান। তার পরেই ক্রীড়া দফতর সূত্রে জানা যায়, অরূপের ইস্তফাপত্র গৃহীত হয়েছে। যুবভারতীতে ফুটবল তারকা লিয়োনেল মেসির অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তাঁকে ভাল ভাবে দেখতে না পেয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন দর্শকেরা। মেসি মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরেই শুরু করে দেন ভাঙচুর। তাঁদের অভিযোগ, মাঠে মেসি যত ক্ষণ ছিলেন, তত ক্ষণ তাঁর গায়ের সঙ্গে সেঁটে ছিলেন প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ। তার পর থেকেই ফুটবলপ্রেমী জনতার কাঠগড়ায় অরূপ। দিন যত গড়িয়েছে, ততই মোবাইলে মোবাইলে ঘুরতে শুরু করে মেসির গায়ে লেপ্টে-থাকা অরূপের ছবি। যুবভারতীয় গ্যালারি ছাড়িয়ে দলের অন্দরেও সমালোচিত হতে শুরু করেন অরূপ। তখন থেকেই প্রশাসনের অন্দরে জল্পনা তৈরি হয়, অরূপকে কি তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে, অরূপ কি পদত্যাগ করবেন? অরূপের ঘনিষ্ঠদের অনুমান ছিল, এসআইআর-এর খসড়া তালিকা প্রকাশের পরে যুবভারতীকাণ্ড চাপা পড়ে যাবে। আলোচনার অভিমুখ হয়ে উঠবে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া। আনুষ্ঠানিক ভাবে নির্বাচন কমিশন খসড়া তালিকা প্রকাশের আগেই মমতাকে চিঠি লিখে ক্রীড়ামন্ত্রীর পদে ইস্তফা দিতে চান অরূপ। ইস্তফা গৃহীত। যুবভারতীকাণ্ডে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। সেই কমিটি সোমবার রাতে নবান্নে প্রাথমিক রিপোর্ট পেশ করে। সেই সঙ্গে প্রাথমিক সুপারিশও করে। তার পরের দিনই যুবভারতীকাণ্ডে রাজ্য পুলিশের সর্বোচ্চ কর্তা, ডিজিপি রাজীব কুমারকে শো কজ করেন মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ। বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার মুকেশ কুমারকেও শো কজ় করা হয়েছে। শনিবার ফুটবল তারকা লিয়োনেল মেসির অনুষ্ঠানে কেন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তার জবাব ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিতে হবে তাঁদের। পাশাপাশি, বিধাননগর পুলিশের ডিসি অনীশ সরকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত যত দিন চলবে, তত দিন নিলম্বিত (সাসপেন্ড) থাকবেন তিনি। ক্রীড়া ও যুব বিষয়ক দফতরের প্রধান সচিব রাজেশ কুমার সিংহকেও শো কজ় করা হয়েছে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সিইও দেবকুমার নন্দনকেও অপসারণ করা হয়েছে পদ থেকে। মুখ্যসচিব মনোজের দফতরের তরফে বিবৃতি প্রকাশ করে এই নির্দেশ জানানো হয়। কমিটির সুপারিশ মেনে এই ঘটনার তদন্তের জন্য সিট (বিশেষ তদন্তকারী দল) গঠন করা হয়েছে।

ক্রীড়াঙ্গনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ রাজ্যের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি। সরাসরি নাম না-করলেও, ঘটনার দায় ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের উপরেও চাপিয়েছেন ভারতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং অরূপের ডেপুটি মনোজ। লিয়োনেল মেসির কলকাতা সফর ঘিরে শনিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের ঘটনায় প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ রাজ্যের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মনোজ তিওয়ারির। ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত হিসাবে বার বার আঙুল উঠছে ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের দিকে। তাঁর দফতরের প্রতিমন্ত্রীও কার্যত দায়ী করলেন অরূপকে। মনোজের বক্তব্য, শনিবার মেসির পাশে যাঁদের দেখা গিয়েছে, তাঁদের সকলকেই বিশৃঙ্খলার দায় নিতে হবে। ‘‘বিভিন্ন ভিডিয়ো এবং ছবিতে যাঁদের দেখলাম, তাঁদের প্রত্যেকেরই দায়। যাঁদের জন্য মেসি দ্রুত মাঠ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, দায় তাঁদের সকলের। মেসিকে ঘিরে অন্তত ২০০ লোক ছিল দেখলাম। এত লোকের ওখানে থাকা উচিত হয়নি। টিকিটের এত দাম রাখাও ঠিক হয়নি। কলকাতা তো মুম্বই-দিল্লি নয়।’’ ঘটনা হল, ছবিতে যাঁদের দেখা গিয়েছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অরূপও। গত বেশ কয়েক মাস যাবৎই দল এবং প্রশাসনের সঙ্গে মনোজের সম্পর্ক অবশ্য ভাল নয়। তিনি মন্ত্রী হলেও বিধানসভার অধিবেশনে যোগ দেন না। দফতরের কাজেও তাঁকে সে ভাবে দেখা যায় না। ফলে অনেকে মনোজের বক্তব্যের মধ্যেই সেই বিষয়গুলিও মনে করিয়ে দিতে চাইছেন। মনোজ সরাসরি নাম না-করলেও ঘিরে থাকা মানুষদের মধ্যে ছিলেন মন্ত্রী অরূপও। বরং অরূপই মেসির সবচেয়ে কাছে ছিলেন। নিরাপত্তারক্ষীরা একাধিক বার সরে যাওয়ার অনুরোধ করলেও শোনেননি রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী। মেসিকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুলেও বিতর্কে জড়িয়েছেন। শনিবার থেকেই সাধারণ ক্রীড়াপ্রেমীদের রোষানলে রয়েছেন। জাতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার মনোজ সমাজমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘‘আমার শহরে যা ঘটেছে, তাতে আমি বাক্রুদ্ধ। খুবই লজ্জাজনক ঘটনা এটা। এক জন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদ হিসাবে অনুভব করতে পারছি, মেসির জন্য কতটা লজ্জাজনক পরিস্থিতি ছিল। আমরা সকলে মেসিকে ভালবাসি। তাঁকে ঘিরে এই উন্মাদনা প্রত্যাশিতই ছিল। মূল আয়োজক শতদ্রু দত্ত গ্রেফতার হয়েছেন। দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ করায় পুলিশ বিভাগকে ধন্যবাদ। যুবভারতীতে বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের কষ্টার্জিত অর্থ এবং আবেগ নিয়ে শতদ্রু যে ভাবে ছেলেখেলা করেছেন, তা শাস্তিযোগ্য। কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। শতদ্রুর আর একটি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি এবং অব্যবস্থাপূর্ণ ঘটনা। সৌভাগ্য যে আমি উপস্থিত ছিলাম না। কলকাতায় এই ধরনের ইভেন্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে শতদ্রুর যোগ্যতা নিয়ে আমি প্রথম থেকেই সন্দিহান ছিলাম। মেসির মতো এক জন কিংবদন্তি খেলোয়াড়ের অনেক ভাল কিছু প্রাপ্য ছিল। আমি নিশ্চিত রাজ্য সরকার শতদ্রু এবং ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করবে। এটা কলকাতার প্রাপ্য ছিল না।’’ যুবভারতী–কাণ্ড প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, প্রাক্তন বিচারপতি অসীমকুমার রায়ের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই তদন্ত চলার মধ্যেই মঙ্গলবার রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশক রাজীব কুমারকে শনিবারের ঘটনার বিষয়ে শোকজ করেছেন রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ। শোকজ করা হয়েছে বিধাননগরের পুলিশ কমিশনারকেও। সাসপেন্ড করা হয়েছে বিধাননগরের ডিসি অনীশ সরকারকে।



