যুবভারতীতে ২২ মিনিটেই নাভিশ্বাস উঠেছিল লিয়োনেল মেসির। অথচ ওয়াংখেড়েতে ৬১ মিনিট থাকলেন তিনি। হাসিমুখে মাতিয়ে দিলেন সকলকে। মেসিকে দর্শন করলেন মুম্বইবাসী। দর্শন করলেন সচিন তেন্ডুলকর, সুনীল ছেত্রীও। কলকাতায় মেসির সঙ্গে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎ না হলেও শচীন দেখা পেলেন মেসির।
ওয়াংখেড়েতে যাওয়ার আগে ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে ‘ক্রিকেট ক্লাব অফ ইন্ডিয়া’য় গিয়েছিলেন মেসি। সেখানে ‘প্যাডল কাপ’-এ যোগ দেন মেসি। সঙ্গে ছিলেন লুইস সুয়ারেজ ও রদ্রিগো ডি’পল। সেখানে গিয়েছিলেন সস্ত্রীক হরভজন সিংহ, করিনা কপূর খানেরা। তাঁরা মেসির সঙ্গে দেখা করেন। ওয়াংখেড়ে ভরে গিয়েছে। দুপুর ২টো থেকে দর্শকেরা ঢুকতে শুরু করেছিলেন। মেসি তখনও এসে না পৌঁছোলেও তাঁদের বিনোদনের অভাব ছিল না। সঞ্চালক জানান, চারটি দলের মধ্যে একটি করে ম্যাচ হবে। প্রতিটি দলে সাত জন করে খেলছিলেন। সেখানে সুনীল ছেত্রী, আশুতোষ মেহতা, চিংলেনসানা সিংহ, রাহুল ভেকে, বালা দেবীর মতো ফুটবলারের পাশাপাশি ডিনো মোরিয়া, জিম সরবের মতো অভিনেতাও ছিলেন। মাঠের পাশে একটি ভিআইপি জ়োন করা হয়েছিল। সেখানে পুত্রকে নিয়ে বসেছিলেন অভিনেতা অজয় দেবগন। ফুটবল খেলতে নেমে হেডে গোল করেন সুনীল। দর্শকেরা আনন্দে চিৎকার করে ওঠেন। বেশ হাড্ডাহাড্ডি খেলা চলছিল। ঘড়ির কাঁটায় ৫:৪২ মিনিটে মাঠে ঢোকেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস। ছিলেন তাঁর স্ত্রী অমৃতাও। তার ৪ মিনিট পরেই মাঠে ঢোকেন সচিন। ঠিক ৫:৫০ মিনিটে ঢোকেন মেসি, সুয়ারেজ় ও ডি’পল। মেসির নিরাপত্তারক্ষীরা সঙ্গে ছিলেন। ফোটোগ্রাফার, সঞ্চালকও ছিলেন। কিন্তু কেউ মেসিদের ঘাড়ের কাছে যাননি। একটা দূরত্ব রাখছিলেন। তার ফলে মেসিদের দেখতে পাচ্ছিলেন সকলে। যে সুযোগ যুবভারতীতে হয়নি। এখানে মেসিকে ঘিরে যে ভিড় তৈরি হয়েছিল, তা ওয়াংখেড়েতে ৬১ মিনিটের মধ্যে এক বারের জন্যও দেখা গেল না।
সুনীলদের সঙ্গে হাত মেলালেন মেসি। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারের সঙ্গে দেখা হল ভারতের সেরা ফুটবলারের। এক ফ্রেমে দুই ‘গোট’-কে দেখা গেল। সুনীলকে নিজের সই করা আর্জেন্টিনার জার্সিও দিলেন মেসি। দু’জনে পেনাল্টি শট নিলেন। গোলও করলেন। দলের সকলের সঙ্গে ছবি তুললেন তিন তারকা। তার পর একের পর এক শটে গ্যালারিতে ফুটবল পাঠানো শুরু করলেন মেসিরা। একটা সময় তো তাঁদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিল। কে বেশি দূরে বল পাঠাবেন, তার লড়াই চলছিল। তাতে অনেক সময়ে মেসিকেও হারিয়ে দিচ্ছিলেন ডি’পল। গোটা মাঠ ঘুরে ঘুরে এই কাজ করছিলেন তাঁরা। গ্যালারির একদম কাছে ছিলেন তিন ফুটবলার। সকলে মনের আনন্দে নিজের প্রিয় তারকাকে দেখলেন। এক বারও ভিড় তাঁদের বাধা হয়ে দাঁড়াল না। মাঠে মনের আনন্দে ঘুরছিলেন মেসিরা। সবসময় একটা হাসি লেগেছিল মুখে। বোঝা যাচ্ছিল, কতটা নিশ্চিন্তে রয়েছেন মেসি, সুয়ারেজ়রা। যুবভারতীতে মেসিদের দেখে বোঝা যাচ্ছিল, বিরক্ত হচ্ছেন। সুয়ারেজ় ও ডি’পল তো ভিড়ে ধাক্কাও খান। কিন্তু ওয়াংখেড়ে দেখাল, কী ভাবে একটি সফল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যায়। ‘প্রজেক্ট মহাদেব’ শুরু করেছে মহারাষ্ট্র সরকার। রাজ্যের ৩৫ জেলা থেকে ৩০ জন ছেলে ও ৩০ জন মেয়েকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তাদের পাঁচ বছরের স্কলারশিপে ফুটবল শেখানো হবে। সেই প্রজেক্টের উদ্বোধন হল মেসির হাতে। তার আগে বাচ্চাদের সঙ্গে ‘পাসিং দ্য বল’ খেললেন মেসিরা। মাঝে মাঝে ডি’পলকে দেখে মনে হচ্ছিল, নিজের সতীর্থদের সঙ্গে খেলছেন। এত মজা করছিলেন তাঁরা। যুবভারতীতে মেসির সঙ্গে সারা ক্ষণ ছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। ছিলেন অনেক খ্যাতনামী। কিন্তু ওয়াংখেড়েতে কোনও রাজনৈতিক নেতাকে দেখা গেল না। এমনকি, কোনও মন্ত্রীও ছিলেন না। সস্ত্রীক মুখ্যমন্ত্রী ফডণবীসও দর্শকাসনে বসেছিলেন। সচিনও তাই। অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও গ্যালারিতেই ছিলেন। কেউ মাঠে নামেননি। যাঁরা মাঠে ছিলেন, তাঁরা কেউ মেসির সঙ্গে নিজস্বী তোলার চেষ্টা করেননি। ফলে মেসিরও কোনও সমস্যা হয়নি। শেষে একটি সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। মাঠের মাঝে তৈরি মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর স্ত্রী, ভারতীয় ফুটবল সংস্থার প্রাক্তন সভাপতি প্রফুল্ল পটেল, সচিন, অজয় দেবগনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল মেসি, সুয়ারেজ়, ডি’পলের। তিন জনকে সংবর্ধনা দেওয়া হল। ছিলেন ‘প্রজেক্ট মহাদেব’-এর মুখ টাইগার শ্রফও। মেসির হাতে সই করা নিজের জার্সি তুলে দিলেন শচীন। মেসি পাল্টা তাঁর হাতে তুলে দিলেন ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের বল। মেসিকে সংবর্ধনা দিতে গিয়ে সচিন বললেন, “দুর্দান্ত সময় কাটালাম। মুম্বই স্বপ্নের নগরী। এই মাঠে অনেক স্বপ্ন সত্যি হতে দেখেছি। আরও এক বার তা দেখলাম। মুম্বই তিন তারকাকে যে ভালবাসা দিয়েছে তার জন্য সকলকে ধন্যবাদ। মেসির খেলা নিয়ে বলার কিছু নেই। একটা কথাই বলব। খেলার পাশাপাশি ও দারুণ একজন মানুষ।” শেষে ধন্যবাদ দিলেন ফডণবীস। ৬১ মিনিট ধরে সুষ্ঠুভাবে একটা অনুষ্ঠান হল। এক বারের জন্যও তাল কাটল না। সঞ্চালক সারা ক্ষণ স্টেডিয়ামের দর্শকদের তাতিয়ে গেলেন। দর্শকেরাও আনন্দ করলেন। যুবভারতীতে মেসির পিছনে সুয়ারেজ় ও ডি’পলকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল না, তাঁরাও তারকা। সেটা ওয়াংখেড়েতে দেখা গেল। যত বার মেসির নামে জয়ধ্বনি উঠল, তত বার সুয়ারেজ় ও ডি’পলের নামেও চিৎকার হল। মেসির সমান সম্মান পেলেন দু’জনে।
বিশ্ব ফুটবলের মহানায়ক লিওনেল মেসি ভারতে। অথচ দেশে এখন ফুটবলই বন্ধ। বড় কঠিন এক সময়। কবে দেশে বল গড়াবে কেউ জানে না। অনেকেই মনে করছেন, এবার ফুটবলের প্রতি আগ্রহ হারাবেন সবাই। অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের ফুটবল খেলতে আর পাঠাবেন না। এমন এক সময়ে লিওনেল মেসি ভারতীয় ফুটবলকে যেন জীবন্ত করে দিয়ে গেলেন। তাঁর স্নেহপরশে কি মৃতপ্রায় ফুটবল সঞ্জীবনী পেল? হয়তো তাই। মুখে কিছু না বলেও অস্ফুটে কি এলএম ১০ বলে দিয়ে গেলেন, এই দেশ থেকে আরও সুনীল ছেত্রী তৈরি হতেই পারে। ভাবীকালকে উৎসাহ জুগিয়ে গেল লিও মেসির রবিবারের মুম্বই সফর। ক্রমতালিকায় ক্রমশ পিছোতে থাকা এক দেশের মহাতারকা ফুটবলারকে মেসি সম্মান দিয়ে গেলেন। তাঁর কৃতিত্বকেও স্বীকৃতি দিয়ে গেলেন। মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়েতে এসে অনেক স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। এই বিশালাকায় স্টেডিয়ামেই ২৮ বছর পরে ভারত ক্রিকেটে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তাও চোদ্দো বছর আগে। ঘটনার অভিঘাতে অনেক কিছু ভুলে গেলেও নুয়ান কুলশেখরাকে গ্যালারিতে আছড়ে ফেলার মহেন্দ্র সিং ধোনি-মুহূর্ত ভোলার নয়। গ্যালারিতে সেদিন জয়ধ্বনি হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেটের। শচীন তেণ্ডুলকরের অমৃতকুম্ভে এদিন সোনালী এক ফ্রেম তৈরি হল। লিও মেসি পরম শ্রদ্ধায়, ভালবাসায়, আদরে সুনীল ছেত্রীকে ছুঁলেন। ওই ছোঁয়া ভারতীয় ফুটবলকেও মুহূর্তে যেন নবজন্ম দিয়ে গেল। অনেক আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে গেল ওয়াংখেড়েতে। ফুটবলে সুনীল ছেত্রীর দেশ এখন অসময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তিনিই তো ফুটবল মাঠে এই দেশের পতাকাবাহক। তিনি একা বল নিয়ে ছুটেছেন। গোল করেছেন। একসময়ে রোনাল্ডো-মেসির সঙ্গে গোল করায় প্রায় সমান সমান ছিলেন। রেকর্ড বইয়ের পাতায় মেসি নিশ্চয় সুনীল ছেত্রীর নাম দেখে থাকবেন। হয়তো মেসিরও সেই রেকর্ড দেখে মেসির মনে হয়েছিল, অখ্যাত-অজানা দেশের কে এই বিখ্যাত ফুটবলার যে আমাকেও দূর থেকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে? সেই মেসি ও সুনীল ছেত্রীর দেখা হল ওয়াংখেড়েতে। মেসি পরম আদরে সুনীল ছেত্রীর পিঠে হাত রাখলেন। দেখে মনে পড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক ইতিহাসের পাতার দুই সম্রাটের অমর সংলাপ। যুদ্ধে পরাজিত পুরুকে আলেকজান্ডার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ”আপনি আমার কাছে কেমন ব্যবহার আশা করেন?” বুক চিতিয়ে পুরু জবাবে বলেছিলেন, ”একজন রাজা অপর একজন রাজার কাছে যেমন ব্যবহার আশা করেন।” সুনীল ও মেসি দুই রাজা। মেসির ব্যবহার সুনীলের প্রতি পুরনো সেই সংলাপকেই যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিয়ে গেল ওয়াংখেড়েতে। মেসি ওয়াংখেড়েতে পা রাখার আগে সেভেন আ সাইড ফুটবল ম্যাচ চলছিল। সুনীল সেখানে হেডে দুর্দান্ত এক গোল করেন। তখনও মেসির আবির্ভাব হয়নি। খেলা চলাকালীনই থ্রি মাস্কেটিয়ার্স-মেসি, সুয়ারেজ ও দি পলের মাঠে প্রবেশ। দু’দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন তিন মহাতারকা। সারিবদ্ধ খেলোয়াড়দের তালিকায় সবার শেষে দাঁড়িয়ে সুনীল ছেত্রী। মেসি এগিয়ে এলেন সুনীলের দিকে। আর্জেন্টাইনের হাসি ততক্ষণে লক্ষ ওয়াট ছাড়িয়েছে। সুনীলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। সস্নেহে ভারতীয় কিংবদন্তির পিঠে হাত রাখলেন। গ্যালারি ততক্ষণে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। গগনভেদি চিৎকারে কান পাতা দায়। এ তো দেশের ফুটবলতারকাদের কাছে গর্বের এক মুহূর্ত। কে বলে ভারতীয় ফুটবল পিছিয়ে গিয়েছে? কে বলে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে ভারতীয় ফুটবল মুছে যেতে বসেছে? রবি ঠাকুরের বিখ্যাত কবিতার লাইন মনে করিয়ে দেন সুনীল ছেত্রী, ”দিনের পথিক মনে রেখো, আমি চলেছিলেম রাতে, সন্ধ্যাপ্রদীপ নিয়ে হাতে।” সুনীলকে জড়িয়ে ধরছেন মেসি। সুনীলের হাতে হাসতে হাসতে মেসি তুলে দিচ্ছেন দশ নম্বর লেখা আর্জেন্টিনার জার্সি। এই ছবি ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। এই ছবি বিজ্ঞাপন হোক দেশেবিদেশে। স্পনসররা টাকার থলি নিয়ে এগিয়ে আসুন, এরকম আরও অনেক সুনীল ছেত্রী তৈরি করার নেশায়। ফুটবল বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশে এসে মেসি ফুটবল খেলেননি। কিন্তু তিনি আদরে আলিঙ্গনে সুনীলের গ্রেটনেসকে বড় সিলমোহর দিয়ে গেলেন। পক্ষান্তরে জীবন-মরণের সীমানায় দোদুল্যমান দেশের ফুটবলেও যেন প্রাণের ছোঁয়া দিয়ে গেলেন। ধুঁকতে থাকা, নুইয়ে পড়া জীবন বলে উঠুক জোর গলায়, সুনীল ছেত্রী পারলে আমরা পারব না কেন? মেসির ভারত সফর কেবল ধ্বংসের ছবি আঁকে না। নতুন ভোরেরও সন্ধান দেয়। ঘুম থেকে জেগে ওঠার বার্তা দিয়ে যায়। সুনীল ছেত্রী কেবল দেশের নন, তিনি পৌঁছে গিয়েছেন বিশ্বের দরবারে। যেখানে সবাই জানেন সুনীল ছেত্রী তাঁর দেশ ভারতের হয়ে গোল করেন। সুসময়ে ও দুঃসময়ে। এ সব দৃশ্য দেখলে বলতে ইচ্ছা করে, আমাদেরও একজন সুনীল ছেত্রী রয়েছেন। যে সুনীল ছেত্রী কেরিয়ারের সায়াহ্নে পৌঁছেও দেশের হয়ে গোল করে যান মহাসম্রাটের সামনে। সুনীল ছেত্রী, তোমাকে সেলাম। তিন দেশেরে পতাকা নিয়েও ছবি তুললেন ফুটবলাররা। শচীন এবং মেসির হাতে ছিল ভারতের পতাকা, সুয়ারেজের হাতে ছিল উরুগুয়ের পতাকা এবং ডি-পল হাতে নিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার পতাকা। পেনাল্টিও মারলেন মেসি। হেলায় গোল করে গেলেন। সাক্ষী থাকল ওয়াংখেড়ে। এবার মেসি যাবেন দিল্লি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করবেন তিনি। অনুষ্ঠান রয়েছে সেখানেও।




