একাধিক মামলায়, সাজা ফাঁসি। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সোমবার পাঁচ মামলায় ফাঁসির সাজা দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। হাসিনার সঙ্গেই, ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়েছে ওপার বাংলার প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে। পুলিশের প্রাক্তন মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন’কে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার পরেই, বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকার বিবৃতি জারি করে, এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলেছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে বিবৃতি জারি করে জানানো হয়েছে- মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড একটি ঐতিহাসিক রায়। বিবৃতিতে লেখা হয়েছে,’সমাজমাধ্যমে এই রায়ের গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করে অন্তবর্তীকালীন সরকার সর্বস্তরের জনগণকে শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। রায়- পরবর্তী সময়ে কোনও ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতা, উত্তেজনাপ্রসূত আচরণ, হিংসা বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে বিশেষ অনুরোধ জানানো হচ্ছে। জনগণের, বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদদের স্বজনদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই রায়কে ঘিরে জনমনে স্বাভাবিক ভাবেই আবেগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে, সেই আবেগের বশবর্তী হয়ে যেন কেউ জনশৃঙ্খলায় বিঘ্ন সৃষ্টিকারী কোনও পদক্ষেপ না করে-সরকার এ বিষয়ে দৃঢ় ভাবে সবাইকে সতর্ক করছে। সরকার আরও স্পষ্ট করে জানাচ্ছে, যে কোনও ধরনের অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা বা জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের চেষ্টা কঠোর ভাবে দমন করা হবে।’ মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণার পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খোদ হাসিনা। তাঁর অভিযোগ, এই রায় এসেছে ‘একটি অনির্বাচিত সরকারের প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত রিগড ট্রাইব্যুনাল’ থেকে, যার মূল লক্ষ্য তাঁর দল আওয়ামী লিগকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দুর্বল করে দেওয়া। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের সময়ে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরপরই প্রকাশিত বিবৃতিতে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মহম্মদ ইউনুসের বিশৃঙ্খল, সহিংস, সামাজিক ভাবে পিছিয়ে দেওয়া প্রশাসন কোটি কোটি বাংলাদেশিকে কোনওভাবেই বোকা বানাতে পারবে না। তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই প্রচেষ্টা তারা বুঝে গিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিচার পরিচালনা করেছে, তার কখনওই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্য ছিল না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সম্পর্কে প্রকৃত সত্য উদঘাটনেরও কোনও চেষ্টা করেনি ট্রাইব্যুনাল।’ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ঢাকা থেকে পালিয়ে ভারতে আত্মগোপনে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সোমবার তাঁর ফাঁসির সাজা ঘোষণা করে। বঙ্গবন্ধুর মেয়ের ফাঁসি, বাংলাদেশেই মানবতাবিরোধী অপরাধে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা মামলা দায়ের হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করল। এই রায় ছিল মোট ৪৫৩ পাতার। রায়ের মোট ছ’টি অংশ ছিল। ট্রাইব্যুনালের প্রধান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার রায়ের শেষ অংশ পড়ে শোনান।
বাংলাদেশ জুড়ে বন্ধ ডাকল আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সোমবার রায় ঘোষণা করেছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে। সাজা শুনে এ বার প্রতিক্রিয়া জানালেন দেশান্তরী হাসিনা। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সোমবার রায় ঘোষণা করেছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে। সাজা শুনে এ বার প্রতিক্রিয়া জানালেন দেশান্তরী হাসিনা। সব অভিযোগ অস্বীকার করে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, এই রায় ‘পক্ষপাতদুষ্ট’। এ হেন রায়ের প্রতিবাদে মঙ্গলবার দেশজোড়া বন্ধের ডাক দিল আওয়ামী লীগও। রায় ঘোষণার পর লিখিত বিবৃতি দিয়ে হাসিনা দাবি করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলির সপক্ষে কোনও প্রমাণ নেই। বরং তাঁর আমলে মানবাধিকার এবং উন্নয়নমূলক অনেক কাজ হয়েছে। সে জন্য তিনি গর্বিতও। আওয়ামী লীগ নেত্রীর দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে এই রায় দেওয়া হয়েছে, তা-ও আবার একটি অনির্বাচিত সরকারের অধীনস্থ অবৈধ ট্রাইবুনাল সেই রায় দিয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের রায়ও প্রত্যাখ্যান করেছেন হাসিনা। তাঁর কথায়, ‘‘এই রায় অন্তর্বর্তিকালীন সরকারে থাকা চরমপন্থী ব্যক্তিদের নির্লজ্জতা ও খুনি মনোভাবের প্রতিফলন মাত্র। বাংলাদেশের শেষ নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণ করতে এবং আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক ভাবে ভেঙে দিতে এই কাজ করা হয়েছে।’’
হাসিনা লিখেছেন, ‘‘আমার বিরুদ্ধে আনা ট্রাইবুনালের সব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভাবে অস্বীকার করছি। গত বছরের জুলাই-আগস্টে যত জনের মৃত্যু হয়েছে, সে জন্য আমি শোকাহত। কিন্তু আমি কিংবা কোনও রাজনৈতিক নেতা কখনওই কোনও আন্দোলনকারীকে হত্যা করার নির্দেশ দিইনি। আমাকে আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও সুযোগই দেওয়া হয়নি। এমনকি, নিজের পছন্দমতো আইনজীবীও বাছার সুযোগ দেওয়া হয়নি আমাকে। এই ট্রাইবুনাল পক্ষপাতদুষ্ট।’’ হাসিনার দাবি, যে সব বর্ষীয়ান আইনজীবী বা বিচারপতি কোনও না কোনও সময় প্রকাশ্যে পূর্ববর্তী সরকারের পক্ষ নিয়েছিলেন, তাঁদের সকলকে হয় এক এক করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বেছে বেছে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের সদস্যদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। মুজিব-কন্যা জানিয়েছেন, তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার এই রায় আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। হাসিনা বলেন, ‘‘মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তিকালীন প্রশাসন নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে দেশের বিচার বিভাগকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে। বিশ্বের কোনও প্রকৃত পেশাদার আইনজীবী বাংলাদেশের ট্রাইবুনালের এই রায় সমর্থন করবেন না।’’ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর কথায়, ইউনূসের আমলে বাংলাদেশ আরও ‘বিশৃঙ্খল, সহিংস এবং সামাজিকভাবে পশ্চাদ্গামী’ একটি শাসনব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যেখানে পদে পদে নারী ও সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ, ভিন্নমতের দমনপীড়ন চলছে। অর্থনীতিও ভেঙে পড়েছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য এত দিন ধরে ইচ্ছাকৃত ভাবে নির্বাচনে দেরি করেছেন ইউনূস। নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন আওয়ামী লীগকে। হাসিনা লিখেছেন, ‘‘বৈধ ট্রাইবুনালে উপযুক্ত প্রমাণ-সহ বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে আমি ভয় পাই না। তবে আমি জানি, অন্তর্বর্তী সরকার এই চ্যালেঞ্জ মানবে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা গেলে তারা আমাকে অব্যাহতি দেবে।’’ আগস্টে বাংলাদেশে হাসিনার সরকারের পতন হয়। দেশ ছাড়েন। এর পর পুনর্গঠিত হয় সে দেশের আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল। হাসিনা সরকারের তৈরি করা ট্রাইবুনালেই শুরু হয় তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম মামলার বিচার। বাংলাদেশের বিভিন্ন আদালত এবং থানায় এখনও পর্যন্ত হাসিনার বিরুদ্ধে ৫৮৬টি মামলা হয়েছে। ৩৯৭ দিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়া চলার পর সোমবার সাজা ঘোষণা হয়েছে ওই মামলায়। হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। রায় প্রসঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবীর নানক বলেন, ‘‘এই আদালত অবৈধ। বাংলাদেশের জনগণ এই রায় প্রত্যাখ্যান করছে। আগামিকাল সারা বাংলাদেশে সকাল-সন্ধ্যা শাটডাউন হবে। যত ক্ষণ না অবৈধ ইউনূস সরকার পদত্যাগ করবে, আমাদের সংগ্রাম ততই তীব্র হবে। একদিন হাসিনা বীরের বেশে বাংলার জনগণের প্রিয় দল হিসাবে ফিরবেন। আমাদের জয় অবশ্যম্ভাবী।’’
বাংলাদেশের হাতে ভারত তুলে দেবে?
হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসির সাজা ঘোষণা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মধ্যরাতে বাংলাদেশী সেনা অফিসারদের হাতে নির্মমভাবে খুন হতে হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেই সময় দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। ২০২৫ সালেও তিনি বাংলাদেশে নেই। কিন্তু ফাঁসির সাজা এড়াতে পারলেন না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা মামলা দায়ের হয়েছিল। সেই মামলায় হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সোমবার ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁর ফাঁসির সাজা ঘোষণা করেছে। এই রায়ে বাংলাদেশের দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৫০ বছরের যাত্রা সম্পন্ন হল।
মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণার পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, “এই রায় দিয়েছে একটি অনির্বাচিত সরকারের প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত রিগড ট্রাইব্যুনাল। যার মূল লক্ষ্য আওয়ামী লিগকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দুর্বল করে দেওয়া।” হাসিনা জানান, তিনি বাংলাদেশের জনগণের জন্য কাজ করে যাবেন এবং প্রতিটি অন্যায়ের জবাবদিহি করা হবে।
গণহত্যায় বেঁচে যাওয়া
১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই পরমাণু বিজ্ঞানী স্বামীর কাছে জার্মানি চলে যান হাসিনা এবং তাঁর বোন রেহানা। তাঁদের বিমানবন্দরে ছাড়তে এসেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। তখন হাসিনা জানতেন না যে, এটিই তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ। ২০২২ সালে ভারত সফরে একটি সর্বভারতীয় সংবাদ সংস্থাকে দেওয়ে একটি সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেছিলেন, “আমার স্বামী বিদেশে থাকায়, আমিও একই বাড়িতে থাকতাম (আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে)। সেদিন সবাই সেখানে ছিল: আমার বাবা, মা, আমার তিন ভাই, দুই নববিবাহিতা ভগ্নিপতি, সবাই সেখানে ছিল।” ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকার ধানমন্ডির বাসভবনে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর স্ত্রী-সহ পরিবারের সকলকে গুলি করে হত্যা করে বাংলাদেশী সেনারা একটি দল। মোট ৩৬ জনকে হত্যা করা হয়। বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান হিসেবে গণ্য এটিকে। এর পরে হাসিনা, তাঁর স্বামী এবং সন্তান সজীব ওয়াজেদ এবং সায়মা ওয়াজেদ এবং তাঁর বোন রেহানা ভারতে আশ্রয় নেন।
জনপ্রিয় নেত্রী
১৯৮১ সালে ভারতে থাকার সময়েই তিনি আওয়ামি লিগের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। সেই পদে এক সময় ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশ বিএনপি সরকার গঠন করে এবং আওয়ামি লিগ ছিল প্রধান বিরোধী দল। হাসিনা বিরোধী দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে হাসিনার আওয়ামি লিগ দুর্দান্ত ফল করে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে হাসিনা পুনরায় নির্বাচিত হন এবং গত বছর ক্ষমতাচ্যুত না হওয়া পর্যন্ত তিনি শীর্ষ পদে বহাল থাকেন।
হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যে কয়েক বছর ছিলেন সেই সময় ঢাকার সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর বছরগুলিকে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পর হাসিনার হস্তান্তরের জন্য নতুন সরকারের ক্রমাগত চাপ সত্ত্বেও, দীর্ঘদিনের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের কারণেই ভারত তাঁকে আশ্রয় দেয়।
পলাতক প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর চতুর্থ মেয়াদ শুরু করার কয়েক মাস পর, বাংলাদেশে সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। সে দেশের সংরক্ষণ ব্যবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যরা অর্থাৎ যাঁরা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা চাকরি এবং শিক্ষায় অগ্রাধিকার পেতেন। বিক্ষোভের জবাবে হাসিনা মন্তব্য করেন, “যদি মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিরা কোটা সুবিধা না পায়, তাহলে কি রাজাকারদের নাতি-নাতনিরা সেটা পাবে।”এই মন্তব্যের ফলে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে এবং তাঁর অপসারণের দাবিতে পূর্ণাঙ্গ আন্দোলনে রূপ নেয়। হাসিনা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এর প্রতিক্রিয়া জানান। অনেকের দাবি, এই আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন আন্দোলন দমন করতে ব্যর্থ হয়, এবং বিক্ষোভকারীরা হাসিনার বাসভবনে পৌঁছয়। তাঁকে বোন রেহানার সঙ্গে ভারতে পালিয়ে যেতে হয়। তখন থেকে তিনি এখানেই আছেন। এর ১৫ মাস পরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের একটি আদালত আজ তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে এবং বলেছে যে তিনি সহিংসতা উস্কে দিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন এবং অসামরিক জনগণকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আদালত আরও বলেছে যে সমন সত্ত্বেও হাসিনা বিচারে যোগ দেননি এবং বলেছে যে তাঁর ‘অনুপস্থিতি অপরাধের ইঙ্গিত দেয়’।
মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনাকে ফাঁসির সাজা শুনিয়েছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। হিংসায় উস্কানি দেওয়া, হত্যার নির্দেশ এবং দমনপীড়ন আটকানোর ক্ষেত্রে পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা—এই তিন অভিযোগে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে ট্রাইবুনাল। বর্তমানে ভারতে রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেত্রী হাসিনা। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, হাসিনাকে ফেরাতে চেয়ে ভারতের কাছে আবারও চিঠি দেবেন তাঁরা। তবে বিচারের সম্মুখীন হতে ভারত তাঁকে আদৌ বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে একটি বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী আদালতের রায়ে প্রত্যর্পণ করানোর মতো অপরাধ করে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এক দেশ অপর দেশের হাতে তুলে দেবে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই হাসিনাকে ফেরত চেয়ে নয়াদিল্লিকে ‘কূটনৈতিক চিঠি’ (ভার্বাল নোট) পাঠিয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। ওই চিঠির প্রাপ্তিস্বীকারও করেছিল ভারত। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছিলেন, হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের একটি চিঠি তাঁরা পেয়েছেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য এখনই করা যাবে না বলে জানান তিনি। বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছিল, আগে ওই চিঠির বৈধতা যাচাই করতে চায় নয়াদিল্লি। কোনও দেশের অন্তর্বর্তী সরকার (যা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়) অন্য রাষ্ট্রের নির্বাচিত সরকারের কাছে কোনও রাজনৈতিক নেতার প্রত্যর্পণ চাইলে, আইনি দিকগুলি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। চলতি বছর অক্টোবর মাসে হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ফের নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় ভারত। ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রী জানান, এটির সঙ্গে আইনি বিষয় জড়িয়ে আছে। উভয় দেশের মধ্যে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তিনি আরও বলেন যে, “আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি যে, এটি একটি বিচার বিভাগীয় এবং আইনি প্রক্রিয়া। এর জন্য দু’দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা এবং পরামর্শের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি এবং এই বিষয়গুলি নিয়ে আমরা বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও একসঙ্গে কাজ করার জন্য তৈরি।
ভারত কি হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করতে বাধ্য?
বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির মধ্যে থাকা বেশ কয়েকটি শর্তের জন্যই ভারত হাসিনাকে ফেরাতে বাধ্য নয় বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এই প্রসঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক অনিন্দ্যজ্যোতি মজুমদার বলেন, “ভারত হাসিনাকে ফেরাতে বাধ্য নয়। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত চুক্তি থাকলেও সেখানে এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যার জন্য নয়াদিল্লি সেটি মানতে বাধ্য নয়।” প্রত্যর্পণ চুক্তির ওই শর্তের কথা বলে হাসিনাকে প্রত্যর্পণে ভারত বাধ্য নয় বলে জানান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমনকল্যাণ লাহিড়ীও। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী বলেন, “ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ নিয়ে চুক্তি রয়েছে। কিন্তু সোমবারের রায়ের পর বাংলাদেশে হাসিনার প্রাণসংশয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ওই চুক্তিতে থাকা নিয়ম অনুসারেই ভারত হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করতে বাধ্য নয়।”
আইনগত দিকটি ব্যাখ্যা করে কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী বলেন, “হাসিনা এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন। কিন্তু দেশে না-থাকার জন্য হাসিনাকে যদি তা করতে বাধা দেওয়া হয়, তবে তা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, যদি কোনও দেশে কারও জীবনের ঝুঁকি থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়া দেশ তাঁকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য নয়। হাসিনার ক্ষেত্রেও এই আইনের কথা তুলে ধরতে পারে ভারত।”
কী বলছে ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি
২০১৩ সালে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তখন কেন্দ্রে মনমোহন সিংহের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। অন্য দিকে, ঢাকার মসনদে হাসিনাই। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, আদালতের রায়ে প্রত্যর্পণ করানোর মতো অপরাধ করে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এক দেশ অপর দেশের হাতে তুলে দেবে। এই বিষয়ে সবিস্তার ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছিল, ন্যূনতম এক বছরের জেল হতে পারে, এমন অপরাধ করে থাকলে সেই ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করা হবে। এ-ও বলা হয়েছিল যে, সেই অপরাধকে চুক্তি স্বাক্ষর করা দুই দেশেই শাস্তিযোগ্য হতে হবে। অপরাধে প্ররোচনা দেওয়া বা সাহায্য করা ব্যক্তিকেও প্রত্যর্পণ করা যেতে পারে বলে জানানো হয়। ২০১৬ সালে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে চুক্তি সংশোধন করা হয়। সংশোধিত চুক্তিতে বলা হয়, কারও নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেই তাঁকে প্রত্যর্পণ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে অপরাধের প্রমাণস্বরূপ কোনও তথ্যপ্রমাণ দাখিল করতে হবে না। হাসিনার বিরুদ্ধেও একাধিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। সংশোধিত চুক্তি অনুসারেই তাঁকে প্রত্যর্পণ করার আর্জি জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
কোন কোন ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ হবে না
চুক্তিতে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে, অপরাধটির যদি রাজনৈতিক চরিত্র থাকে, তা হলে প্রত্যর্পণ করা হবে না। খুন, গুম করা এবং অত্যাচার (যেগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি হাসিনা অভিযুক্ত) রাজনৈতিক অপরাধের তালিকায় রাখা হবে না বলেও চুক্তিতে বলা হয়েছে। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সেখানে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে যে, বিচারের নেপথ্যে যদি সৎ কোনও উদ্দেশ্য না-থাকে, তা হলে ভারত বা বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করবে না। হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না-করার জন্য এই যুক্তিগুলি খাড়া করতে পারে ভারত। হাসিনা নিজেও বারবারই তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক আচরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন। বিচারের নামে প্রহসনের অভিযোগও তুলেছেন।
কেন এই চুক্তি করা হয়েছিল?
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় গা ঢাকা দেওয়া অপরাধীদের নাগাল পেতেই প্রত্যর্পণ চুক্তি করেছিল ভারত এবং বাংলাদেশ। সেই সময় (২০১৩ সাল) উত্তর-পূর্ব ভারতে অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পরিকল্পনা নিয়ে বেশ কয়েক জন উগ্রপন্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছিল। আবার বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের রাজ্যগুলিতে জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশ বা জেএমবি-র সদস্যরা ঘাঁটি গেড়েছে বলে খবর মেলে। উভয় দেশে আশ্রয় নেওয়া অপরাধীদের প্রত্যর্পণ করার জন্যই এই চুক্তি স্বাক্ষর করে ভারত এবং বাংলাদেশ। বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের জেরে ২০২৪ সালের অগস্ট মাসে ক্ষমতাচ্যুত হন সে দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা। পতন হয় তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সরকারের। ৫ অগস্ট বাংলাদেশ ছাড়েন হাসিনা এবং আশ্রয় নেন ভারতে। তার পর থেকে তিনি ভারতেই রয়েছেন।




